ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
শূন্যস্থান পূরণ
(১)

ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে কুপ্ওয়ারা নাম –টা বহুদিন ধরেই একটা মাথাব্যথা বিশেষ। এটা হলো জম্মু -কাশ্মীর রাজ্যের একটা জেলা যার অনেকখানি জায়গা দিয়ে ভারত- পাকিস্তানের সীমান্তরেখা চলে গিয়েছে। এর খুব কাছেই , সীমান্তের ওপারে পাকিস্তান অনেকগুলো 'মিলিটারী ট্রেনিং স্কুল' খুলেছে , ওদের জঙ্গীদের কে ওরা সেখানে অস্ত্র -শিক্ষা আর, চোরাগোপ্তা যুদ্ধের নানারকম কৌশল শেখায়। তারপর, শিক্ষান্তে , ওই সব জঙ্গীদের, অস্ত্র সহ আমাদের দেশে ঢুকিয়ে দেয়। তার জন্য ওরা মাটির তলা দিয়ে বিশাল গুপ্ত সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রেখেছে। তাছাড়া , ওই জায়গা হল ঘন জঙ্গলে ভরা , যেখানে সূর্যের আলো প্রায় ঢোকেই না, আর মেঘ করলে তো কথাই নেই। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী ও সেনাবাহিনী আবার , এই ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমাণে ওয়াকিবহাল এবং সজাগ। মে মাসে বরফ গলতে শুরু করলে এই জঙ্গীদের কার্যকলাপ বেড়ে যায়, ওরা সক্রিয় হয়ে ওঠে আমাদের সেনাবাহিনীর নজর এড়িয়ে ভারতের মাটিতে ঢুকে পড়তে। ওরা যখন সফল হয়, তখন আমাদের কত রকম ক্ষতিই না করে। আর যদি ধরা পড়ে যায় তো, প্রাণের মায়া না করে, গুলির যুদ্ধ্ শুরু করে দেয়। ওরা তো মারা পড়েই , ওদের অভিযানও ব্যর্থ হয়. কিন্তু ওদের গুলি-তে আমাদের এক-আধ জন সৈন্য -ও যে মারা পড়ে ! কত মায়ের কোল খালি হয়ে যায়, কতো মেয়ে তাদের অল্প বয়সেই বিধবা হয়, তাদের ছেলেমেয়েরা অনাথ হয়ে পড়ে ! ব্যাপারটা দু পক্ষের দেশবাসীর জন্যই ভয়ানক দু:খের। কিন্তু কেন জানি না ,বহুদিন ধরে চলে আসা এ হানাহানি আর থামে না ! ক'দিন আগে কাগজে পড়লাম , আমাদের সেনা রাম প্রতাপ যাদব ওভাবেই ওখানে মৃত্যুবরণ করেছে। আমি মনে মনে ফিরে গেলাম ১৯৮৭ সালের জুন মাসে ।

আমি তখন একটা গোর্খা রেজিমেন্টে ডাক্তার হিসাবে আছি এবং আমার রেজিমেন্ট পাঠানকোটে রয়েছে । এক বুধবার , আমাদের কাছে গোপন খবর এলো যে, কূপওয়ারা সীমান্ত দিয়ে সেই শুক্রবারই বিকেলে বেশ কিছু জঙ্গী ভারতে ঢুকবে। হেড কোয়ার্টার্সের নির্দেশে আমাদের পুরো রেজিমেন্ট কূপওয়ারাতে মুভ করে গেল এবং আমাদের ভাষায় এল. ও. সি.[L.O.C.] বা লাইন অব কনট্রোল ধরে ওই রাতে পজিশন নিয়ে নিলো। আমার লোকেরা মানে প্যারামেডিক্যাল জওয়ানরাও ক্যামোফ্লেজ করা একটা অস্থায়ী ডাক্তারখানা খুলে ফেললো। প্রচন্ড ঠান্ডা আবহাওয়া , তবে কুয়াশা নেই। বড় আলো জ্বালানো মানা , তাই মোমবাতির আলোতে জীবন রক্ষাকারী ড্রেসিং ওষুধ আর ইনজেকশন গুছিয়ে ফেললাম।

(২)

আমার সহায়ক প্রসন্ন ধারা আমায় প্রচুর সাহায্য করলো। ছেলেটা একজন ফার্মাসিস্ট / ড্রেসার। আমাকে বাদ দিলে ও হল , ওই রেজিমেন্টের একমাত্র বাঙালী এবং ভীষণ জনপ্রিয়। মাঝে মাঝে আমার তো ওকে বেশ হিংসেই হত। যাই হোক , রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ কাজ শেষ করে দুটো রুটি আর সবজী খেলাম। তার পর খেলাম এক গ্লাস ' ডালের জল ' যেটা ওই ঠান্ডাতে বেশ আরামদায়ক। এবারে স্যালাইনের বোতলগুলো মাথার নীচে রেখে 'লম্বা' হলাম। তৃতীয়ার চাঁদ তখন দিগন্তে অনেকটা নেমে গেছে।কখন ঘুমিয়ে পড়েছি -তা মনে নেই।

সকালে ব্রেকফাস্ট ( রুটি আর চা ) নিয়ে এসে প্রসন্ন আমার ঘুম ভাঙ্গালো। রুটি-চা খেয়ে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঝকঝকে সকাল , চারদিকে টিলা আর জঙ্গল , আর, আর, উত্তর - পূর্ব্ব দিকে অনেক দুরে , বেশ উঁচুতে সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসা 'সিয়াচিন হিমবাহ'! কী দুর্ধর্ষ সে জিনিষ , আর একটু ভালো করে দেখব বলে সামনের টিলাতে উঠতে যাচ্ছিলাম , দেখলাম, মেজর থাপা ডাকছেন । ফিরে গিয়ে তো ওনার দাঁত -খিঁচানী খেলাম , " ডক্টর , হোয়াই মেকিং আস অবভিয়াস টু দোজ ... ?" আমি ক্ষমা চেয়ে আমার ডাক্তারখানাতে গুঁড়ি মেরে ঢুকে গেলাম। উনি ঠিক বলেছেন , আমি কি এখানে ট্যুরিস্ট ?

বিকালে খাতায় ওষুধের হিসাব লিখছিলাম। প্রসন্ন আমার কারবাইন -এর নল পরিষ্কার করে আমার হাতে দিয়ে ওপাশে গেল ওর বন্দুক পরিষ্কার করতে। হঠাৎ আমি কানের পাশে বোমার কান -ফাটানো আওয়াজ পেলাম। তারপরেই দেখি, দরজা দিয়ে এক লম্বা চেহারার মুখোশধারী আমার ঘরে ঢুকে আমার দিকে বন্দুক তাক করে ধরেছে । আমার মাথার উপরে রাখা স্যালাইনের বোতল ভাঙ্গার শব্দে বুঝলাম যে বেঁচে গিয়েছি ! লোকটা বাইরের দিকে দৌড় দিল , ততক্ষণে হুইস্‌লের তীব্র আওয়াজ , আরো বহু লোকের দাপাদাপি ,একটানা গুলি চালানোর শব্দ আর আর্তনাদের মাঝে আমি বিছানার নীচে ঢুকে পড়ে আমার কারবাইনের ট্রিগার চেপে রেডী হয়ে আছি। আমার কোন বিপদ হয়েছে কিনা জানতে প্রসন্ন যেই আমার ঘরে ঢুকেছে ,ওর পিছন পিছন আসা দুই জঙ্গী ওর শরীরটা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমি আরো বেশ কিছু ক্ষণ চলতে থাকা সেই তান্ডবের বিবরণে আর যাব না। শুধু , যখন সব কিছু থামল . দেখা গেল প্রসন্ন ছাড়া আমাদের পোস্টের দুজন জওয়ান মারা গেছে কিন্তু, নয়জন জঙ্গীর মৃতদেহ ফেলে বাকিরা পালিয়েছে। প্রসন্নকে পরীক্ষা করে বুঝলাম, ও আর বেঁচে নেই। ওর শরীরটা ধরে যত্ন করে তুলে আমার খাটে নিয়ে শোয়ালাম। এরপর ,আমি আহত সেনা দের প্রাথমিক চিকিৎসা করে দিলাম। মন খুব খারাপ ছিল, কিন্তু ফৌজিদের তো কাঁদতে নেই !

শূন্যস্থান পূরণ
( ৩)

পরদিন, বড় অফিসারদের নিয়ে ডিভিশনাল কম্যান্ডার এলেন। আমার সাথে কথা বলে , আমাদের আহতদের পাঠানকোটে হাসপাতালে পাঠালেন। প্রসন্ন সহ আমাদের মৃত জওয়ানদের শবদেহে মালা দিয়ে তাদেরকে সামরিক অভিবাদন জানালেন। এরপর উনি আমাকে অনুরোধ করলেন, প্রসন্নের কফিন নিয়ে তার দেশে যে পার্টি যাচ্ছে , তার ইন-চার্জ হিসেবে আমি যেন যাই এবং সরকারের তরফ থেকে নিয়ম মতো আত্মীয় পরিজনকে শোকবার্তা জ্ঞাপন করে আসি।

সেই কথামতো আমাদের দল ও প্রসন্ন-র কফিনবন্দী দেহ সহ কলাইকুন্ডা অবধি সামরিক হেলিকপ্টারে এসে ,গাড়ীতে চড়ে ওদের বাড়ি পৌঁছালাম। সবাই সব জেনে গেছে , গোটা গ্রাম ভেঙ্গে পড়েছে ওদের উঠোনে। প্রসন্নর বাবা বেঁচে নেই , বুড়ি বিধবা মা'কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে মনে হল বড়ই যান্ত্রিক পুরো ব্যাপারটা ,ওনাকে আমি কী বলতে পারি ! এর পর তো ওর বিধবা স্ত্রী র সাথেও আমাকে কিছু কথা বলতে হবে। ওই তো মহিলাটি , একটা সাত বছরের বাচ্ছা ছেলের হাত ধরে দাঁড়িয়ে, লাল হয়ে যাওয়া চোখে আর জল নেই ।আমি এগিয়ে গেলাম, বললাম - দিদি, আমি নিজেকে খুব বড় অপরাধী মনে করছি। বাচ্চা টাকেই বা কী বলব আমি , সেটা বুঝতে পারছি না।

মহিলা আমাকে অবাক করে দৃপ্ত কন্ঠে বললেন , ওর বাবার সৎকারের ব্যবস্থা আমি করে নেব। আপনারা যারা এসেছেন তাঁদের আমি পরিবারের তরফ থেকে ধন্যবাদ জানাই। আপনাদের আর্মি কমান্ডারকে বলবেন, আমার ছেলে বড় হয়ে নিক, তারপর , ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ও ওর বাবার শূন্যস্থান পূরণ করতে চলে যাবেই। আপনারা কিচ্ছু চিন্তা করবেন না , কেমন !

 

 

ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

আর্মি -র ডাক্তার

আমরা তিন বুড়ো রোজই বিকালের দিকে জুবিলী পার্কের বেঞ্চে বসে আড্ডা মারি। আমরা তিনজন-ই প্রাক্তন সরকারী কর্মচারী এবং এখন পেনশনভূক। তিনজনই প্রায় একই সময়ে অবসর গ্রহণ করেছি। তাছাড়া আমাদের পারিবারিক অবস্থা প্রায় একই আর, য়ার মনের মিলও খুব। ফলে, আমাদের আড্ডা জমে ভালো এবং খোলা মনে, খোলামেলা আলোচনাও চালানো যায়।

আমাদের একজন, যাকে আমরা দুজন সমীর দা বলে ডাকি , তিনি তাঁর বুকের ব্যথা নিয়ে মাসখানেক যাবৎ, একটু চিন্তিত ছিলেন। আমাদের বলতেন যে , তিনি ডাক্তার দেখাচ্ছেন , নানান পরীক্ষা -নিরীক্ষা করাছেন এবং গাদা -গাদা ওষুধ খাচ্ছেন। অথচ , তাঁর অসুবিধা এখনো মাঝে-মাঝেই চাগিয়ে ওঠে । মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, সব ওষুধ তিনি বন্ধ করে কিছুদিন দেখবেন , কিন্তু , আমাদের বৌদির তীক্ষ্ণ নজর ও জিজ্ঞাসাবাদের ঠ্যালায় , সেটা হবার যো নেই ।

অনেক ইতস্ততঃ করার পর এবং মেলা আগু-পিছু ভাবার পর, আমি একদিন বলেই বসলাম , " দাদা আপনার অসুখটা ও তার চিকিৎসা নিয়ে একটু বলুন তো শুনি, ডাক্তার না হয়েও যদি আপনাকে আমি কোন সদুপোদেশ দিতে পারি।" সমীর-দা চট করে রাজী হয়ে বললেন - "ভায়া ,আমি তো কতদিন ভেবেছি যে, আপনাদের আমার অসুখের ব্যাপারটা একটু বলব । কিন্তু, যদি আপনাদের মনে বিরক্তি ঘটে বা আপনারা অসহায়ভাবে বলে দেন, দেখুন দাদা, আমরা তো কেউ ডাক্তার নই যে..... তাই আর বলে উঠতে পারি নি । আজ আমার দ্বিধা থাকলো না এবং তাহলে শুনুন,

গত মাস-খানেক ধরে আমার বুকে একটা চিনচিনে ব্যথা হচ্ছিলো। তার সঙ্গে পরিশ্রম বা আপনাদের বৌদির সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া লেগে যাওয়া ইত্যাদি কোন কিছুর যোগাযোগ নেই। এর সাথে খালি পেট বা ভরাপেট কিংবা দিনের বা রাতের কোন সময়ের কোন সরাসরি সম্বন্ধও নেই । আমার ওই সুগার-ফুগার বা ব্লাড -প্রেশার আজও হয় নি । তাই আমি ব্যথা শুরু হবার সপ্তাহ দুই বাদে পাড়ার এক ডাক্তারকে দেখাই। ডাক্তারবাবু তো আমাকে খুব কথা শোনালেন , আমি কেন নিজের সম্পর্কে এত উদাসীন সেটাও জিজ্ঞাসা করলেন ,তারপর নানান রক্ত-পরীক্ষা আর ইসিজি করাতে বলে দু-সপ্তাহের ওষুধ লিখে, রিপোর্ট নিয়ে কদিন পরে আসতে বললেন। সেই মতো, পরে আবার আমি যেতে, উনি রিপোর্ট দেখে বললেন , আপনার তো কোলেস্টেরল বেশী আর হার্টে ইসকিমিয়া হয়েছে। তারপর, পাঁচটা আরো নতুন ওষুধ লিখে রেস্ট-এ থাকতে বলে একমাস পরে রিপিট -ইসিজি সহ যেতে বললেন। সেই ওষুধ খেয়ে আমার সারাদিন মাথা ধরে থাকতো আর বুকের ওই চিনচিনে ব্যথার খুব উপশম হল না । মনে তো ভয় ঢুকে গেল, আমি একজনের সাহায্যে, গেলাম মেডিকেলে এক কার্ডিওলোজিস্ট-কে দেখাতে। বাপস, কি ভীড়। আমার আবার একটা ইসিজি হল ওখানে। উনি আমার ইসিজি দেখে, আগের ডাক্তারের প্রেসকিপশন পড়ে বললেন, আপনার হার্টে ইসকিমিয়া আছেই তো. আমি নতুন করে অন্য ছয়টা ওষুধ লিখে দিছি। আগেরগুলো বাতিল করে এখন থেকে এই ওষুধ খেয়ে ,ছয় সপ্তাহ পরে আসবেন। বুকে অসময়ে বেশী ব্যথা উঠলে, হাসপাতালের ইমার্জেন্সী -তে চলে আসবেন। আপনাকে আই .সি. ইউ -তে তক্ষুনি ভর্তি নিয়ে নেবে- অবশ্য যদি বেড খালি থাকে।

আমি আরো ভয় পেয়ে গেলাম । মনে ভাবলাম, যা খরচা হয় হোক , আমি বাড়ির কাছের বড় হার্ট সেন্টারে গিয়েই দেখাবো। টাকা আগে , না, প্রাণ আগে ? দু-দিন পরে ওখানে গেলাম। কর্পোরেট হাসপাতাল, ঝাঁ -চকচকে ছ - তলা বাড়ী , গেটে সিকিউরিটি ,মাঝখানে ফোয়ারা - হাসপাতাল বলে মনেই হয় না । রিসেপশানে পাঁচশো টাকা গেল টিকিটের জন্য। তারপর ওরা আমার ফাইল বানালো , আর গলায় ব্যাজ পরিয়ে দিয়ে লিফটে করে চারতলায় নিয়ে গেল । সেখানে, মুহুর্তে রক্ত-পরীক্ষা , প্রেশার মাপা এবং অ্যানজিওগ্রাম হয়ে গেল । একটু পরে বড় ডাক্তারবাবুর ঘরে ডাক পড়লো। উনি আমায় খাটে শুইয়ে , বুকে ওনার স্টেথো বসিয়ে কিছু শুনলেন, তারপর আমাকে খালি-গা করে , ইকো বলে একটা টেস্ট করলেন। তারপর ওখানেই,গভীর চিন্তান্বিত মুখে বললেন , আপনার মেডিক্লেম করা আছে তো ? আমি ' না ' বললাম। উনি বললেন , আপনি দেরী করে ফেলেছেন এখানে আসতে। অ্যানজিওগ্রাম ও ইকো -কোনটাই খারাপ কিছু শো করছে না ,কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, আপনার বয়সে এই সিম্পটম-টা এলার্মিং। ভর্তি হতে হবে- কারণ আপনার বাই-পাস সার্জারী লাগবে , না হলে , এই ব্যথা সারবে না। বরং উল্টে , কোনদিন ম্যাসিভ অ্যাটাক হয়ে যাবে। কিন্তু এর তো প্রচুর খরচ , সাত লাখের প্যাকেজ ,ওটাকে তবু ছয়ে নামিয়ে আনা যাবে, একদিন আগে ডিসচার্জ করে দিয়ে। যাক গে ঠিক আছে, বাড়ী গিয়ে আলোচনা করে নিন, তারপর পরশু চলে আসবেন। আমার মাথা ঘুরতে লাগলো, মুখ তো শুকিয়েই গেল। বললাম , আমার তো ব্যথা অনেক কমেছে। আর কিছুদিন ওষুধ খেয়ে দেখলে হতো না ? ডাক্তারবাবু ব্যঙ্গ করে বললেন, কে কার ওপিনিয়ন নিতে এসেছে ? আপনি আপনার জীবন নিয়ে খেলতে চাইলে , যা খুশি করুন ।

আমি বাড়ী ফিরে এলাম, কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারছি না। অত টাকা কোথায় পাবো - তারপর তো রাস্তায় বসতে হবে !"

আর্মি -র ডাক্তার

আমার খুব খারাপ লাগলো। বললাম, "দাদা, আমার ছেলে কলকাতা কমান্ড হাসপাতালের সিভিলিয়ান স্টাফ। ওর মুখে ,ওদের আর্মির ডাক্তারদের কথা শুনি। আপনি ওখানকার কার্ডিওলোজিস্ট-কে একবার দেখান তো ।ওনার নাম ডক্টর গোপালন, ভালো ডাক্তার বলেই শুনেছি।ভালো বাংলা বলতে শিখেছে। আপনি চাইলে, ছেলে ওনাকে দেখানোর ব্যবস্থা করে দেবে। "একটু ভেবে,সমীরদা রাজী হলেন।তবে,শর্ত দিলেন যে, উনি ডক্টর গোপালনের উপদেশ না মানলে, আমার ক্ষুব্ধ হওয়া চলবে না । বললাম,"না না-আপনার ব্যাপারটায় আপনিই শেষ কথা।"মনে ভাবলাম যে বাইপাসের চিন্তা সমীরদার মাথায় ভালোই ঢুকেছে ।

নির্দিষ্ট দিনে, তিনতলার ঘরে ডক্টর গোপালন সমীরদা কে ভালো করে দেখলেন। তারপর, বহুবিধ জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। মন দিয়ে কাগজপত্র ও রিপোর্ট দেখলেন। তারপর একবার নাড়ী ধরে পাল্‌স্‌ গুনে , সিঁড়ি দিয়ে নীচে গিয়েই উপরে উঠে আসতে বললেন। সমী্রদা সেইমতো আবার উপরে উঠে আসলে , আবার পালস গুনে ওনার হাতে জলভর্তি এক লিটারের বোতল ধরিয়ে , চারতলায় উঠে আবার নেমে আসতে বললেন। সমীরদা নেমে এলে জিজ্ঞাসা করলেন, একবার-ও কি বুকে ব্যথা হলো ? সমীরদর সত্যই কোন ব্যথা হয় নি । ডক্টর গোপালন স্টেথো দিয়ে ভালো করে সব দেখে শুনে বললেন, 'আপনার কিছুই হয় নি । আমি আপনাকে মোট তিন রকম ওষুধ খেতে দিলাম। এগুলোতে মনের মধ্যেকার দুশ্চিন্তা কমে যাবে ,বুকে ব্যথাও হবে না । তিনমাস পরে আসবেন-তখন আমার সামনে একটা ট্রেড -মিল টেস্ট করিয়ে নেবো।'

সমীরদা চিন্তামুক্ত হলেও, আমি খুব নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না । কিন্তু তারপর দুই মাস কেটে গেল. সমীরদা একবারের জন্যও বুক-ব্যথার কথা বলে না । আবার আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "দাদা, ব্যাপারটা কী, তাহলে ?" উনি বললেন, "আর্মির ডাক্তাররা তাদের প্রফেশনের প্রতি ডেডিকেটেড , ধান্দাবাজ নয়। তোর্ জন্য, আমি এ-যাত্রা ধনেপ্রাণে বেঁচে গেলাম। ভাবছি , তোকে একদিন আমি পেট পুরে খাওয়াবো ।"


ছবিঃপার্থ মুখার্জি

পাঞ্জাব প্রদেশের কাপুরথালা জেলা থেকে একটা রোগা পাতলা ছেলে ১৯৫৬ সালের জুন মাসের কোন এক দিন অমৃত্সরে আসে , তার ইচ্ছে যে সে নাম লেখাবে সেনাবাহিনীতে। ফৌজি অফিসারেরা তাকে ভর্তি করে দিলেন কোর্ অব সিগন্যালস -এ । ছেলেটার ডাক নাম অজিত ,ভালো নাম ছিল হরভজন সিং ভাইনি। হ্যাঁ , ওর গ্রামের নাম ছিলো ভাইনি।
১৯৬২ সালে , চীন -ভারত যুদ্ধে আমাদের দেশ ভারত পর্যুদস্ত হয় । আমাদের নেফা সীমান্তের ( অধুনা অরুণাচল প্রদেশ ) অনেক খানি জমি চীন জবর দখল করে নেয় । ব্যাপারটা হরভজনের খুব মনে লাগে এবং সে ঠিক করে যে ও এই ব্যাপারটার বদলা নিয়ে ছাড়বে । যুদ্ধ করতে গেলে সিগন্যাল কোর -এ থেকে কোন লাভ নেই । লড়তে গেলে, পদাতিক সেনা বা ইনফ্যানট্রি তে যোগ দিতে হবে।

ছেলেটি এবার এলো দিল্লীতে। ওর একান্ত ইচ্ছে শুনে রিক্রুটিং অফিসারেরা ওর বিভিন্ন রকম শারীরিক সক্ষমতা এবং সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়ে খুশি হলেন। সে যেহেতু ম্যাট্রিক -পাস ছিল, তাকে ১৯৬৫ সালের জুন মাসে ১৪ রাজপুত রেজিমেন্টে অফিসার পদ দেওয়া হল। তখন ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধ চলছে বটে, কিন্তু তার পল্টন সেই যুদ্ধে অংশ নেয় নি । ভারত সেই যুদ্ধে জেতে বটে, কিন্তু চীন সম্বন্ধে ভয় কাটে নি । সেরা ভালো ভালো অফিসার পেলে চীন সীমান্তে পাঠিয়ে দিত । এইভাবেই, হরভজন এলেন সিকিমে ১৮ রাজপুতে মেজর পদে যোগ দিতে। প্রথমে তাকে, শেরাথাং -এ বাঙ্কার -ইন চার্জ করা হল। সে বছর সিকিমে দারুন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নামে আর হরভজন তার মোকাবিলার জন্য প্রাণপাত করে্ন ।তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে পাঠানো হল একটা কোম্পানি-কম্যান্ডার হিসাবে,মেজর পদে নাথুলা পাস-এ ।১৯৬৭ সালে সেখানে চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত -রেখা নিয়ে বিবাদ হলে, চীনা সেনারা হঠাৎ ভারতীয় সেনার উপর গুলি চালায়। মেজর হরভজন সিং অসীম সাহসে লড়ে , সেখানেই মারা যান । মতান্তরে, তিনি সেই সময় নাথুলা পাসে, নিজের সেনাদের জন্য খচ্চরের পিঠে চড়িয়ে মাল আনবার পথে, টাল সামলাতে না পেরে হিমবাহে তলিয়ে হারিয়ে যান । বলা হয়, বহু খোঁজা -খুঁজির পর যখন তাঁর মৃতদেহ পাবার আশা সবাই ছেড়ে দিয়েছে, তখন তিনি তার পল্টনের একজনকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে নিজের মরদেহে পাওয়ার ব্যাপারে এক নির্দিষ্ট স্থানের কথা জানান । পরে ,সেইখান থেকেই যখন তাঁর দেহ পাওয়া যায়। তিনি নাকি এর পরে আবার স্বপ্নে দেখা দিয়ে নিজের সমাধি গড়তে বলেন। এইভাবে ধীরে ধীরে তাঁর উপর দেবত্ব আরোপিত হয় তাকে বাবা হরভজন সিং -নাম দেওয়া হয়।

তাঁর পরিচিত এবং অধিনস্থ সেনারা সেই স্বপ্নাদেশ মেনে তাঁর নামে একটি সমাধি মন্দির তৈরি করেন। শেরাথাং বাঙ্কারের পাশে তাঁর নাম মন্দির গড়া হয় । পরে শোনা যায়, বাবার পুজো করলে সেখানে কর্মরত জওয়ানদের অসুখ হয় না. কেউ কেউ আবার, নিশুতি রাতে তাঁর ছায়া দেখতে পেল। শোনা গেছে, শুধু ভারতীয়রাই নয়, এই অপার্থিব ব্যাপারটা চীনারাও স্বীকার করে নিয়েছে আর যখন ভারত -চীন দু পক্ষের মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিং হয়, তখন তারা আলাদা করে একটা ফাঁকা চেয়ার রেখে দেয়, বাবা হরভজনের জন্য।

ফৌজিরা ছাড়া সেখানকার মানুষও বিশ্বাস করছেন যে বাবার পুজো দিলে তাদের ভালো হবে । এখন তো অন্যান্য জায়গা থেকে আসা ভ্রমণার্থীদের জন্য ছাঙ্গু লেক যাবার পথে রাস্তার উপর বাবা হরভজনের আরেকটা মন্দির করা হয়েছে। ভ্রমণার্থীরাও এখন এইসব গল্প সোৎসাহে শুনছে, বিশ্বাস করছে এবং বাবার ভক্ত -সংখ্যা বাড়াচ্ছে। ঘরের মধ্যে তারা বাবার বসবাসের নানা চিহ্ন খুঁজে বার করছে।

বাবা হরভজন সিং মাত্র ২৭ বছর বয়সে মারা যান। ভারতীয় সেনাবাহিনী, এই সাহসী সেনার সম্মানে তাঁকে প্রতি বছর একদিন করে সাম্মানিক ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেনে। সেই নিয়মে, মাত্র কয়েক ছবর আগে অবধিও, যতদিন না কাগজে-কলমে হরভজন সিং অবসর নিচ্ছেন, প্রতি বছর ১১ই সেপ্টেম্বর , একটা খালি ফৌজি জীপ্ , বাবার মন্দির থেকে তাঁর নামে রাখা নিজস্ব জিনিষ্পত্র নিয়ে রওনা হয়ে নিউ -জলপাইগুড়ি পৌঁছাতো। তারপর কাপুরথালা-গামী ট্রেনে আগে থেকে বুক করা সিটের উপর সেসব রেখে দেওয়া হত। সেই ট্রেন ঐভাবে কাপুরথালা পৌঁছে, আবার একইভাবে সবকিছু নিয়ে ফিরে আসত। সাথে অবশ্যই থাকত একজন সেনা, বাবার সহচর রূপে।

এইভাবেই সত্যি কথা আর অন্ধ বিশ্বাস মিলে মিশে এক পুরোপুরি ভারতীয় আধুনিক লোককথার সৃষ্টি হয়েছে।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

জান কবুল

পূর্ব-সিকিমের পাহাড়ে , ছবির মতো সুন্দর গ্রামটার নাম হোল পদমচেন। গ্রামটার উচ্চতা প্রায় নয় হাজার ফুট- সারাবছরই দিনের সর্বাধিক তাপমাত্রা কখনো ১০ ডিগ্রী ছাড়ায় না আর শীতের রাতে ওটা চলে যায় শূন্যের দু-তিন ডিগ্রী নিচে ( সেল্সিয়াস )। গ্রামের লোকে সামান্য 'ক্ষেতি' করে, হাঁস -মুরগী পালে আর শীতে কাঁপে।

গ্রামটার পুবদিকে আরিতার পাহাড় , যার ওপারে ভুটান। গ্রামের উত্তরে পাহাড় কেটে পাকা রাস্তা ঘুরতে ঘুরতে, প্রচুর বাঁক নিয়ে উপরে উঠে , জুলুক, লুংথুং ছাড়িয়ে,অনেক উঁচুতে সেই নাথুলা পাস অবধি চলে গ্যাছে। এখান থেকে ভালো করে নজর করা যায় না-ঘন কুয়াশা ওই জায়গা গুলোকে সব সময় ঘিরে আছে I আমাদের মিলিটারির লোক পাকা রাস্তা বানিয়েছে । আমাদের গাড়ি ওই বিপদ-সংকুল রাস্তা দিয়ে বারবার যাতায়াত করে । এই সময়টা ,যখন তুষার পড়ার মরশুম, তখন রাস্তাটা আরো বিপজ্জনক হয় । তবে, আমাদের গাড়িচালকদের যেমন ভালো চালানোর হাত, তেমনি ওরা সবাই দুর্জয় সাহসী লোক । আর, কেনই বা হবে না ? চীনাদের সাথে সমানে টক্কর দিতে হচ্ছে না !

গাঁয়ের মানুষজনদের মতে, আমরা লোকগুলো ভালো, গাঁয়ের লোকের অনেক উপকার করি। ওদের জন্য একটা বাস সকালে মিলিটারির রাস্তা দিয়েই নীচে কালিম্পং হয়ে শিলিগুড়ি যায় আর, একটা বাস শিলিগুড়ি থেকে উঠে আসে কাপুপ নামের গ্রাম অবধি যাবার জন্য। ওই বাসে খবরের কাগজ, ব্যবসার জিনিস আর লোকজন আসে । বর্ষায় ফি -বছর ওই রাস্তায় ধ্বস নামে, আমাদের লোকজনই চটপট রাস্তা খোলার ব্যবস্থা করে । এই গ্রামেই আমাদের একটা বড়ো মিলিটারী মেডিক্যাল ইউনিটও আছে, এখানে অসুখ-বিসুখে, গাঁয়ের লোক চিকিৎসা করাতে আসে । তাই তো ওরা মতদান করেছিলো, যার জন্য ১৯৭৫ সালে সিকিম পাকাপাকিভাবে ভারতের একটি রাজ্যে পরিণত হয় । সেই সঙ্গে এটা, চীনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভারত এখন চীন -তিব্বত সীমান্তে নিজের সেনাবাহিনীকে খুব ভালো করে সাজিয়ে নিয়েছে , যাতে ১৯৬২ সালের মত আবার একটা অকারণ যুদ্ধ না শুরু হয়ে যায়। মাঝেমধ্যেই একেবারে জেনারেল পদের উচ্চপদস্থ অফিসারেরা এই সব সীমান্ত এলাকা ঘুরে ঘুরে দেখেন ও উপযুক্ত পরামর্শ দেন ।

একদিন আমার মেডিক্যাল ইউনিটের অফিসে বসে আমার এম্বুল্যান্স ড্রাইভার করণ সিং-এর সাথে টুকটাক কথা বলছি, এমন সময় আমাদের সিগন্যাল্স কোরের ছেলেটা আমার জন্য পাঠানো একটা লগ- মেসেজ নিয়ে এলো । কালিম্পং থেকে জানিয়েছে যে, কাল, লেফটেন্যান্ট জেনারেল কুলদীপ সিং কলকাতা থেকে ( ইস্টার্ন কমান্ডের হেড -কোয়ার্টার ) থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছে , ওখান থেকে একটা হেলিকপ্টারে চড়ে এসে নাথুলা পাসের আশেপাশে আমাদের অবজারভেশন পোস্ট আর সীমান্ত এলাকাগুলি ঘুরবেন । উনি সকালেই আসছেন,তাই , নজরদারি হয়ে গেলে ( আর্মি-র ভাষায়, 'রেকি' ) কাপুপ গ্রামে আমাদের হেলিপ্যাডে নেমে কিছুক্ষণ হয়তো বিশ্রাম নেবেন । আমি যেন তার আগেই মেডিক্যাল কিট ও অ্যাম্বুল্যান্স সহ ওখানে হাজির থাকি ।

পরদিন খুব সকালে ওঠা হল। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেন সিলিন্ডার চেক করলাম। তারপর,গাড়ির পিছনে এক জোড়া স্নো-চেন ভরে, পেট্রল-মোবিল চেক করে ,স্যালুট ঠুকে করণ সিং বোঝালো যে সে যাত্রার জন্য প্রস্তুত। আমরা বেড়িয়ে পড়লাম এবং গাড়ি সহ পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে উঠতে লাগলাম। বেশ কয়েকবার এই পথে যাতায়াত করেছি, কিন্তু প্রতিবারই রাস্তার অজস্র হেয়ার-পিন বেন্ড গুলো মনে ভয় জাগায়।

লুংথুং ছাড়িয়ে আরো উপরে উঠতে লাগলাম। কিন্তু, থাম্বি ভিউ পয়েন্ট-এ না দাঁড়িয়ে চলে যাওয়া যায় নাকি! সামনে সম্পূর্ণ খোলা দিগন্তে, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর আশ-পাশের পাহাড়ে তখন সোনা রোদের ছোঁয়া লেগেছে। প্রাণ ভরে দেখছিলাম ,করণ ব্যাটা তাড়া লাগালো। কাপুপ এখনো এক ঘন্টার রাস্তা। আর, সব চেয়ে চিন্তার কারণ হল পশ্চিম আকাশের কালো মেঘটা।

মেঘটা আস্তে আস্তে আয়তনে বাড়ছে এবং আমরা কাপুপ পৌঁছানোর সময় সারা আকাশ ভরিয়ে দিনের আলো কমিয়ে দিল । কে বলবে যে আমি এক ঘন্টা আগে সূর্যোদয় দেখেছি। কিন্তু, এই সব জায়গায় তো এই রকমই ব্যাপার-স্যাপার দিনরাত চলে ।

কাপুপ হল ১৩,৫০০ ফিট উচ্চতায় একটা গ্রাম, এখানে আমাদের একটা এ্যাডভান্স ড্রেসিং স্টেশন (এ.ডি .এস) আছে, আর আছে তার লাগোয়া গল্‌ফ্‌ খেলার মাঠ - পৃথিবীর উচ্চতম গল্‌ফ্‌-কোর্স । টেলিফোনের ঝনঝনানি আমার চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে দিল । ব্রিগেড কমান্ডার ফোন করেছেন । তাঁকে জানালাম যে আমি পৌঁছে গেছি । কিন্তু উনি জানালেন, আমি যেন নেমে আসি। আচমকা ডাক পেয়ে, জেনারেল সাহেব সকালে শিলিগুড়ি থেকেই দিল্লী চলে গেছেন । উনি দুই সপ্তাহ পরে আবার একদিন এখানে আসবেন । একটু হতাশ হলাম। ভেবেছিলাম,নতুন জি.ও.সি -ইন -সি সাহেবের সঙ্গে আলাপ করব .....। ততক্ষণে এখানে ময়দার গুঁড়োর মতো তুষারপাত শুরু হয়েছে। মিনিট দশেকের মধ্যে রাস্তা ও চারিপাশ ভরে গেল বরফে আর রাস্তার উপরের বরফ জমে কঠিন হয়ে যেতে লাগলো। এই রাস্তায় সোজা-পথে চালাতেই গাড়ি হড়কে যাবে , তার উপরে হেয়ার -পিন বেন্ড সামলে নীচে নামা তো আরো কঠিন কাজ ।

করণ সিং গাড়ির সামনের চাকা দুটোতে স্নো -চেন পড়াতে লাগলো । এগুলোতে স্পাইক লাগানো থাকে , যারা ওই বরফের মধ্যে গেঁথে গিয়ে আবার খুলে যাবে ,পরের টার্নে বরফের মধ্যে গেঁথে যাবার জন্য। গাড়িটা লো –গীয়ারে ধীরে চললে পিছলানোর সম্ভাবনা কম । করণ বললো , "চলো সাব , যো হোগা দেখা যায়গা !"

করণের হাতে গাড়ি ও ভাগ্য দুই-ই সঁপে দিয়ে নামতে লাগলাম । ও বাঁক গুলো ভালই সামলাচ্ছে , উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি আসছে না বটে, কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ আপদ তো আপেল ছেড়ে এখন আমাদের ধরেছে এবং টেনে নামাচ্ছে । সত্যি ,বেশ রিস্কি ব্যাপার । ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করে বেরোলেই হতো । কিন্তু, ড্রাইভারের সামনে ভীতু সাজতে চাই নি ।

অনেকটাই পথ পেরিয়ে এসেছি। আর আধা ঘন্টার মধ্যে জুলুক পৌঁছাবো। সামনে একটা টানা উতরাই আছে, তারপর কিছুটা সোজা রাস্তা। আবার আলো ফুটেছে। একপাশে পাহাড়, আরেক পাশে করণ সিং এর দিকটায় অতল খাদ, বহু নিচে ঝোপ-জঙ্গল।

জান কবুল

তখনই ঘটল ব্যাপারটা। করণ বলল, "সাব-জী , ঘাবড়াইয়ে মত , লেকিন বাত এয়সা হ্যায় কি, গাডডি কা ব্রেক নেহি লাগ রহা হ্যায়।" তারপর ও বলতে চাইল এখন ও চাইলেও এই ভারী গাড়ি দাঁড় করানো যাবে না । ওর কর্তব্য-জ্ঞান বলে ,আগে সিনিয়রের জান বাঁচাও, তারপর সরকারী সম্পত্তি ( গাড়ি ) বাঁচাও, নিজে বাঁচবে পরে , কিন্তু সব ছেড়ে পালিয়ে যেও না । আমি যেন দরজা খুলে নেমে পড়ি ,এই সময় স্পিড তো বেশী নেই। ও নিজের জান কবুল করে দেবে কিন্তু শেষ অবধি দেখে যাবে। আমি ওর মানসিক কাঠিন্য দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কিন্তু, ওকে ছেড়ে যেতে মন চাইল না । আমি ওর পাশে বসে হ্যান্ড-ব্রেক টানলাম, কোন লাভ হল না । বললাম,ব্যাক-গীয়ার লাগাও । ও বলল, আপনি প্লীজ নেমে যান। আমার চোখে জল এলো -যা হয় হোক , জবরদস্তি ব্যাক গীয়ার দিতে গেলাম । ও এক ঝটকা দিয়ে আমার হাত সরিয়ে মাপ চাইলো । এতে ,গাড়িটা ওর কন্ট্রোলের বাইরে চলে গেল, সামনেই রাস্তার বাঁক ,তারপরই অতল খাদ । আপকে লিয়ে জান কবুল হ্যায় , সাব"- বলে, ও উঠে আমার দরজার লক খুলে আমাকে এক ধাক্কা দিলো! আমি ছিটকে পড়লাম রাস্তায় ,আর বরফে খানিকটা পিছলে গেলাম। আমি সোজা হয়ে উঠতে উঠতে, টলমলে গাড়ী সামনের নিচু পাঁচিলে ধাক্কা খেয়ে করণ সহ উল্টে পড়লো নিচে অতল খাদে । আমি অবশেষে কিনারে পৌঁছিয়ে দেখলাম, বহু নিচে ঝোপের উপর শব্দ করে গাড়ীটা পড়লো ,তারপর আরো নিচে , ঝাপসা দৃষ্টির আড়ালে কোথাও নেমে গেল । ওই সময় আমার আর কিছুই করার রইল না ।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

রেইজিং  ডে

শার্দুল সিং ১১২ নং রাজপুত রাইফেলস এর একজন সিপাহী। ওর বাবা, হাবিলদার ভানোয়ার সিং এই পল্টন থেকেই অবসর নিয়ে, বাড়িতে আরাম করছেন। প্রতি বছর-ই, এই পল্টনের রেইজিং-ডে তে ওঁকে এবং আরো সব পুরনো সেনাদের সাদরে নিমন্ত্রণ করে আনা হয়। তারপর ,ওই দিনটা খানা-পিনা ও পুরনো দিনের গল্প-গুজবে খুব ভালো কাটে। একটা কথা বলি , প্রথম যে দিন, কোন রেজিমেন্ট বা পল্টন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই দিনটাকে ওই পল্টনের জন্মদিন বা রেইজিং-ডে বলে মানা হয়।

শার্দুল হল আমার আর্দালী। ছেলেটা বেশ ভালো, বিনয়ী এবং চটপটে। শার্দুলদের বাড়ি রাজস্থানের ঝুনঝুনা জেলার লুনা গ্রামে। ঝুনঝুনা জেলা ও আশপাশ নিয়ে একটা বড় জায়গা জুড়ে এক রাজা ছিলেন , যাঁর নাম ছিল মহারাও শার্দুল সিং । উনি ওদের এলাকায় অত্যন্ত নামী এবং পূজিত মানুষ । ঝুনঝুনা জেলা-সদরে, ওঁর বিরাট মূর্তি বসানো। পাশে সেনাবাহিনির রিক্রুট অফিস। আমাদের শার্দুল ওই খান থেকে দু-বছর আগে এই পল্টনে ঢোকে। শার্দুল নামটা আমাদের এই ছেলেটার স্বভাবের সাথে খাপ খেয়ে যায় । ছেলেটা অসম-সাহসী কিন্তু মাথা গরম করে না । অন্যের উপকারে ঝাঁপায় , কিন্তু তার জন্যে কিছু প্রত্যাশা নেই ।প্রথম দিন ওর ডান হাতের তর্জনীর আগা ( অগ্রভাগ ) কাটা দেখে একটু কৌতুহলী হয়েছিলাম। তারপর জেনেছি, কেন ওর এই অবস্থা হল । ওই দিন থেকেই আমি ওকে খুব ভালোবাসতে শুরু করি।

ও যেদিন জয়েনিং -লেটার পেল, ওকে রাতের বাস চড়ে দিল্লিতে আসতে হল ,ওদের রাজপুত রেজিমেন্ট সেন্টারে। ওর পাশে এবং উল্টো দিকের সিট্গুলো এক পরিবারের দখলে। তারা দিল্লি বেড়াতে চলেছে ,সাথে তাদের দুই বছরের শিশু । ভোরবেলা শার্দুলের ঘুম ভাঙলো। দিল্লি প্রায় এসে গেছে। এখন এক কিলোমিটার রাস্তা বাকি। এ রাস্তাটা খুব বাজে, সারা রাস্তা বাস এখন লাফাতে লাফাতে যাবে। বাচ্চাটা জানালার উপর হাত রেখে ঘুমাচ্ছে ।হটাৎ ঝাঁকুনীর চোটে বাসের ওই জানালার ফ্রেম উপর থেকে খুলে পড়লো ।কোন কিছু না ভেবেই শার্দুল বাঁ হাত দিয়ে বাচ্চাটার হাত সরিয়ে নিল।জানালার ফ্রেম গিয়ে পড়ল শার্দুলের ডান হাতের তর্জনীর উপর। বাস ততক্ষণে স্ট্যান্ডে ঢুকে পড়েছে। শার্দুল কারো কোন কথা ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে হাতের ব্যাগ নিয়ে লাফিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল. ওর হাত তখন ব্যথা ও ধাক্কার জন্য নীল হয়ে গ্যাছে । দারুন ব্যথা সহ্য করে ওই ভাবে ছেলেটা অটো ধরে ওদের সেন্টারে রিপোর্ট করে। তারপর , মেডিক্যাল রুমে গিয়ে পট্টি করানোত়ে বিশেষ লাভ হল না ,ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালের বড়-সার্জেন ওর আঙুলের মাথাটা কেটে বাদ দিলেন- না হলে সারাশরীরে বিষ ছড়াতো ।শার্দুল এখন বাঁ হাতে রাইফেলের ট্রিগার টেপে, কিন্তু তাতেও টার্গেট হিট করতে ওর অসুবিধা হয় না।

রেইজিং  ডে

এই বছর আমাদের কম্যান্ডিং অফিসার ঠিক করলেন যে, এবারের রেইজিং-ডের মধ্যে একটু নতুনত্ব আনবেন। তার জন্য উনি নোটিশ দিলেন যে, ওর আগের দিন পল্টনের জুনিয়র সিপাহী বা জওয়ানদের নিয়ে ফায়ারিং কম্পিটিশন হবে এবং যে বেস্ট ফায়ারার হবে, তাকে রেইজিং- ডের দিন সৈনিক – সন্মেলনে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে।এই ঘোষণায় পল্টনে ব্যাপক সাড়া পড়ে গেল। শার্দুল-কে আমি বললাম , গ্রুপিং-এ তোকে ফার্স্ট হতে হবে কিন্তু। পুরা কোশিস করেঙ্গে, সাব - শার্দুলের উত্তর পেলাম ।

নির্দিষ্ট দিনে, ওদের ফায়ারিং কম্পিটিশন শুরু হোল। যখন শুনলাম, শার্দুল ফাইনাল রাউন্ডে চলে গ্যাছে , আমিও ওই খানে হাজির হলাম। আমার সামনেই শার্দুল, তার বাঁ হাতে রাইফেল চালিয়ে এক ইঞ্চির কমে গ্রুপিং করলো। ও তখন বাকিদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গ্যাছে।

পর দিন, বিরাট আকারের সৈনিক- সন্মেলনে কম্যান্ডিং অফিসার আমাদের সঙ্গে প্রথমে পুরনো সাথীদের পরিচয় করলেন, তারপর এই পল্টনের ইতিহাস ও নানা বীরত্বের কথা বললেন। অবশেষে বিপুল হর্ষ-ধ্বনির মধ্যে , তার বাবার উপস্থিতিতে , শার্দুল সিং-কে বেস্ট ফায়ারার ঘোষণা করে বিশেষ পুরস্কার দিলেন। আমি আজ-ও জানিনা, ঐদিন আমার, শার্দুলের, নাকি তার বাবা ভানোয়ার সিং - কার সবচেয়ে বেশী আনন্দ হয়েছিল ।


ছবিঃপার্থ মুখার্জি

 ফৌজি  লোগ

আমি কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চলের ছেলে। বাড়ীর পাশে ময়দান। দূরে ময়দানের উল্টো দিকে আছে, 'ফোর্ট উইলিয়াম' । ওখান থেকেই আমি সেনা-বাহিনীর চাকরিতে ঢুকি। সে-ও প্রায় দশ বছর আগের কথা Iএখন আমদের বাড়ীর পিছনে চক্র-রেলের লাইন বসেছে । ট্রেন বিমানবন্দর থেকে, চক্রপথে চলে , বিমানবন্দরে গিয়ে শেষ হয় I সেই পথের মাঝে আমাদের স্টেশনটা হল খিদিরপুর, আর পরের স্টেশন প্রিন্সেপ-ঘাট। এখান থেকে একটু দূরেই ফোর্ট উইলিয়াম।

'ফোর্ট উইলিয়াম' হল ময়দান ও গঙ্গার মাঝামাঝি একটা বিশাল জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা ফৌজি কেল্লা বা দুর্গ । একটু ইতিহাসের পাতায় যদি চোখ বোলাই, তবে জানা যাবে যে , ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এটা চার বছর ধরে তৈরী করে। ১৭০০ সালে, এর কাজ শেষ হলে , ইংল্যান্ডের তৎকালীন সম্রাট, তৃতীয় উইলিয়াম এর নামেই এই কেল্লার নাম রাখা হয়। ১৭৫৬ সালে, বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লা ব্রিটিশদের যুদ্ধে হারিয়ে এটি নিজের দখলে নিয়ে নাম রাখেন 'আলিনগর'। আবার এটি ব্রিটিশদের দখলে ফিরে আসে মাত্র এক বছরের মধ্যেই , যখন, ১৯৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ, নবাব সিরাজদৌল্লাকে হারিয়ে বাংলায় ব্রিটিশ -রাজত্ব কায়েম করেন।এখন অবশ্য এটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পত্তি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের হেড- কোয়ার্টার্স হিসাবে ব্যবহৃত হয় ।

আমি ছুটি-তে কয়েক দিনের জন্য কলকাতায়, মানে, খিদিরপুরে নিজের বাড়ি তে এসেছিলাম। বিধবা মা , দু-বছরের খোকা এবং তার মা -সবাই আমাকে পেয়ে পুলকিত। আমার মহানন্দে দিন কাটে, কিন্তু সময় যেন উর্দ্ধ-শ্বাসে দৌড়ে চলে আমার ছুটি শেষ করবার জন্য।

আমার ইউনিটে ফিরে যাবার আগে ভাবলাম, মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনি। কে বলতে পারে, এই যদি শেষ দেখা হয় ! বাসে চেপে বড়বাজার গেলাম এবং মনের মত একটা শাড়ি কিনলাম -এটা আমার মা-কে ভালো মানাবে। ফিরবার পথে চক্র-রেল ধরলাম। ফাঁকা ট্রেন , তার শেষ কামরা-তে উঠে জানালার পাশে একদিকে বসে, উল্টোদিকের সীটের উপর ব্যাগ রেখে দিলাম। গঙ্গা- নদীর শোভা দেখতে দেখতে বাড়ী পৌঁছে যাব- মোটে তো তিনটে স্টেশন !

ওই স্টেশনেই একদল স্কুল-পড়ুয়া আমার কামরায় উঠলো। ওরা কেউ বসছে না -সারা ট্রেনের কামরাতে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে। ওদের হুল্লোড়ে কানে তালা ধরে যায়,বাপরে-বাপ।

পরের স্টেশনে যখন ট্রেন ঢুকে থামার জন্য অতি মন্থর হয়ে এলো, ওদের মধ্যে থেকে একটা ছেলে হঠাৎ আমার কাছে ছিটকে এসে ,চট করে আমার ওই ব্যাগ ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে লাইনে ফেলে দিয়ে আবার ট্রেন থেকে লাফ মারলো। তারপর আমাকে পুরো বোকা বানিয়ে ,ওটা হাতে তুলে ,উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে উঠতে গেল । আমি অসহায়ের মতো কামরার দরজার কাছে ছুটে গেলাম। দেখলাম ,উল্টোদিকের লাইন দিয়ে ওই প্ল্যাটফর্মে আপ ট্রেন ঢুকছে। এখানে ক্রসিং হবে,তারপর আমার ট্রেন ছাড়বে। আর আমার নামা হোল না।

কিন্তু, একি ! এবারে যা দেখলাম, হিন্দি সিনেমা -ও তার কাছে নস্যি। ওদিকের ট্রেন ঢুকতে ঢুকতে, একজন মাঝবয়সী লোক প্ল্যাটফর্ম থেকে ছুটে গিয়ে এক ধাক্কায় ,ব্যাগ হাতে করে প্ল্যাটফর্মে উঠে পড়া ছেলেটাকে নিয়ে দুই ট্রেনের মাঝখানে পড়লো। তারপর, ব্যাগ কেড়ে আমার কামরার দরজা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিলো । আমিও আমার ফেরত পাওয়া ব্যাগটা ধরলাম। তত ক্ষণে আমার ট্রেন হুইস্‌ল্‌ দিয়ে দিয়েছে। আমি লাফিয়ে নেমে গেলাম ট্রেন থেকে, আমায় দেখতেই হবে, কে লোকটা। ট্রেনটা মুখের সামনে থেকে সরে যেতে , দেখলাম , দুই লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে ওই লোকটি জামা-কাপড়ের ধুলো ঝাড়ছে। আর সেই ছোঁড়া বোধ হয় পালিয়েছে।

 ফৌজি  লোগ

উনি আমাকে দেখে একটু আশ্চর্য -বোধ করে হিন্দীতে বললেন , আবার কি হলো ? আমিও হিন্দি জানি, তাই আলাপচারিতায় অসুবিধা হলো না I বললাম, আপনি এই প্ল্যাটফর্মে উঠে আসুন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ দেব বলেই ব্যাগ ফেরত পেয়েও ট্রেন থেকে নেমে গেলাম। উনি হেসে, এক লাফে প্ল্যাটফর্মে উঠে বললেন , আমি সেই কাজ-ই করেছি, যা সব লোকেই করতো। ইস মে কোই বড়ী বাত নহি হ্যায়। আমি হাসলাম , এই রিস্ক কেউ নেবে না। উনি বললেন , জীবনে তো রিস্ক নিতেই হয় -আজ আপনার জন্য, কাল নিজের জন্য। আসলে, ব্যাপারটা আমার চোখে না পড়লে তো আপনার মুশকিল হয়ে যেত, তাই না ! ছোড়িয়ে, হামে ইউনিট ওয়াপস লোটনা হ্যায় ,ফোর্ট উইলিয়াম পর ; হম ফৌজি আদমি হ্যায় ; নমস্তে জী। ফির কঁহি মিলেঙ্গে।

আমি বললাম , জরুর। কিন্তু , এটা বললাম না যে আমিও একজন ...।
আমার বাড়ী এখান থেকে বেশি দূরে নয়। তাই রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম।

এবার বুঝলাম , ওই দুর্জয় সাহস , নিজের জীবন বাজী রেখে পরোপকার করার গুণ ওর মধ্যে কেন দেখলাম। লোকটা যে সেনাবাহিনীর একজন । আমার গর্ব হল , আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যে , আমিও এরকম মানুষ হবো ।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা