ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
চোখে জল

আমি যখনকার কথা বলছি , তখন ও বোফর্স কামান কেনা হয় নি। কিন্তু, গোলন্দাজ বাহিনীর কাছে যা ছিল, যুদ্ধে তার-ও কর্ম-কুশলতা ছিল দারুণ ! এই- রকমই এক গোলন্দাজ (আর্টিলারী)বাহিনী ১৯৯৭ সালে হিমাচল- প্রদেশ ও পাঞ্জাবের সীমান্তে শোন নদীর গায়ে ছাউনি ফেলেছিল । একটা ইনফ্যানট্রি (পদাতিক বাহিনী)-র সঙ্গে মিলে একটা দিন তাদের মিলিত -মহড়া হবে। এর মানে , নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া আরেক বার একটু ঝালিয়ে নেওয়া আর সেই ফাঁকে অস্ত্র গুলো একটু শান দিয়ে দেওয়া । এই করতে গিয়ে কোন কোন জওয়ান আহত বা অসুস্থ হতেই পারে , কাজেই ওদের সাথে এখন আমাকে দু-এক দিন থাকতে হবে ।

যতদুর জানি, মোঘল সম্রাট বাবর প্রথম কামানের ব্যবহার করেন এবং ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে জয়্লাভ করেন। তারপর থেকে কামানের ব্যবহার আজ ও কিন্তু কমেনি । ট্যাঙ্ক-বিধ্বংসী আর.সি.এল কামান তো আবার কাঁধে রেখেও চালানো যায় I এইসব ভাবতে ভাবতে গোলন্দাজ-বাহিনীর এলাকায় ঢুকলাম। বড় বড় করে লেখা, 'ইজ্জত সর্বত্র ইকবাল' । এটা ফার্সী ভাষা যার বাংলা অর্থ করা যায় যে, সম্মানের চেয়ে বড় কিছু হয় না। আমি আর্টিলারী বাহিনীর সি.ও.( বড়সাহেব)র সঙ্গে এর মধ্যেই ভাব জমিয়ে ফেলেছি । ওর নাম লেফটেন্যান্ট কর্ণেল রাজেশ ভার্মা। ও আজ বিকেলে ওর তাঁবুতে আমাকে চা খেতে আসতে বলেছে।

পাঞ্জাবের হোসিয়ারপুর থেকে গাড়োয়ালি ব্যাটালিয়ন আসছে - ওরা হল ইনফ্যানট্রি। আমি তিন মাস আগেই ওদের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে এসেছি বলে ওরা তো আমার পুরনো বন্ধু। যাক, সময়টা আমার ভালোই কাটবে। ওই তো ওরা এসেই পড়েছে। ওদের সি.ও. কর্ণেল সুহাস গোস্বামী আমায় দেখে হাত নাড়লো । আমিও প্রত্যাভিবাদন জানালাম।

মিনিট দশেকের মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। দুটো জীপে দুই সি.ও. আর আমি। পিছনে আসছে আর দুটো জীপে কিছু জুনিয়র অফিসার, আর অস্ত্রধারী গার্ড। আমরা বেরিয়েছি জায়গাটা ঘুরে দেখতে এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করতে। নিয়ম অনুযায়ী , মিলিত -মহড়া কোন লোকালয়ের মধ্যে না হলেও, এই ব্যাপারে আশ-পাশের বাসিন্দা-দের সতর্ক করে দিয়ে নোটিশ আটকানো হয়। যাই হোক , সে সব ব্যাপার মিটলে, ফেরার পথে, আমার এম-আই ( মেডিক্যাল ইমারজেন্সি) রুমের সাইট -টা ঠিক করে ফেললাম। আমার নার্সিং -হাবলদার তাঁবু পোঁতার কাজ শুরু করে দিল ।

মিলিত-মহড়া ব্যাপারটা একটু বলি। যখন যুদ্ধ লাগে, তখন শত্রু দেশের উপরে স্থল ,জল এবং আকাশপথে -তিন ভাবেই ( সম্ভব হলে ) আক্রমণ চালানো হয় । এজন্য এই তিন বাহিনীর প্রধান, তাঁদের নিজের নিজের বাহিনী- কে সেই মতো পরিচালনা করেন। এবারে স্থলবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমঝোতা রাখার কারণেই , মাঝে মাঝে মহড়ার ব্যবস্থা হয় -যেমনটি এখানে পদাতিক বাহিনী ও গোলন্দাজ বাহিনীর মধ্যে হচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিভাগ কিন্তু আবার মাঝে মধ্যে তিনটি বাহিনীর মিলিত-মহড়া করার আদেশ দেয়। সে তো ভারী ব্যাপক ঘটনা - মনে হবে, যেন যুদ্ধ লেগে গেল !

আমাদের কথায় ফেরা যাক। আমার মিনি হাসপাতাল (তাঁবুর মধ্যে, কিন্তু সব ব্যবস্থা থাকে ) তৈরি করে, পাশে ছোট অ্যাম্বুল্যান্স পার্ক করিয়ে তাকে আবার ক্যামোফ্লেজ -জাল দিয়ে ঢেকে দিয়ে দুই সাহেবকে-ই রিপোর্ট দিলাম। ওরা তখন বসে একটা সাদা বোর্ডে মহড়া নিয়ে আঁকিবুকি করছে।ওখান থেকে আমি বেরিয়ে এলাম। গোলন্দাজ বাহিনীর ছাউনির দিকে এগোতে যাচ্ছি এমন সময় একটু চেনা গলায় ডাক শুনলাম, সাব-জী,হমারে তরফ তো চলিয়ে। পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে চিনতে পারলাম, ও হলো গাড়ওয়াল -দের নায়েক , ছোটু সিংহ নাটিয়াল। এখানেই কোথায় যেন ওর গ্রাম। ও আগে আমার আর্দালী ছিল। ছোটু যেন আমার মনের জিজ্ঞাসা টের পেল। বললো সাবজী, আপনার কি মনে আছে যে এই মানগুওয়াল গ্রামেই আমার বাড়ী ? এর-ই পাশ দিয়ে বয়ে চলা শোন নদীর জল শুকিয়ে যে বিরাট চড়া পড়েছে, ফৌজ থেকে সেটাকেই মহড়ার জন্য বাছা হয়েছে। এর শেষে খানিকটা জঙ্গল, তারপর আমার গ্রামের শুরু, সেটা হিমাচল-প্রদেশ নয় ,পাঞ্জাবের হোসিয়ারপুর জেলায় পড়ে। লোকজন এই জঙ্গলে আসে কাঠ কুড়াতে ,বাড়ীতে জ্বালানীর কাজে লাগে, তাই। ছোটুর বাবা তো রোজই আসে. কিন্তু এখন এই মহড়া চলাকালীন এখানে এলে গোলা বা তার টুকরোর আঘাতে প্রাণ যাবে। সেটা ও পই-পই করে বাপ কে বলে তো এসেছেই ,তা ছাড়া সরকারী নোটিশবোর্ড লাগিয়ে এসেছে। এবারে ও মন দিয়ে RCL (রিকয়েল-লেস গান) নিয়ে প্র্যাকটিস করবে। আমার মনে পড়লো, রিকয়েল-লেস গান হল এমন বন্দুক যা দিয়ে ট্যাঙ্ক উড়িয়ে দেওয়া যায়। মহড়ার সময় একটা তেপায়া-র উপর ওটা রেখে অনেক দূরে ট্যাঙ্ক-এর বদলে,কেরোসিনের খালি ড্রাম রাখা হয়. এরপর গোলা ভরে দূরবীনে চোখ দিয়ে, প্যারাবোলার গতিপথের অঙ্ক মাথায় রেখে ফায়ার করা হয়. কয়েক মুহুর্তের মধ্যে গোলা আছড়ে পড়ে , টার্গেট চুরমার হয়ে যায়। আর্টিলারীর একটা বিভাগ আছে- এই পুরো জিনিসটা পর্যবেক্ষণের জন্য, তার নাম হল এয়ার অবজারভেশন পোস্ট। এদের কাছে এমন হেলিকপ্টার আছে, যারা প্রায় সোজা উপরে উঠে খানিকটা সময় ভেসে থেকে আবার সোজা, নিচে নেমে আসে। তার মধ্যেই এদের কম্পিউটারে সবকিছু রেকর্ড হয়ে যেতে থাকে। পরে সেই রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ভুল-ভ্রান্তি গুলো শুধরানো হয়।

ছোটু-রা তাদের কামানের প্র্যাকটিসের জন্য তৈরি হচ্ছে। আমিও হেলিকপ্টারে চড়ে বসলাম। এবার ওদের সিগন্যাল দেওয়া হল এটা জানতে, যে ওরা তৈরি কিনা। ওরা পাল্টা সিগন্যাল দিয়ে জানালো যে,ওরাও তৈরি। ছোটু-র কম্যান্ড কানে এলো -"লোড,অ্যাটেন্‌শন্‌,ফায়ার"। মুহুর্তে গোলা ছুটলো আর আমি পরিষ্কার দেখলাম, পাশাপাশি বসানো সাদা রং করা ব্যারেল-দের একটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এরপর আরো ছয় জনকে দিয়ে প্র্যাকটিস করিয়ে শেষ শট নিল ছোটু। এটাও টার্গেট হিট করলো।

চোখে জল

এবার সব গোটানো আর গোছানোর পালা। সকলে একে একে অস্ত্র গুলো হিসাব মিলিয়ে গাড়ীতে তুলছে। হেলিকপ্টার-টা নিরাপদ জায়গাতে সরানো হচ্ছে।ছোটু ছুটলো জীপ্ নিয়ে ব্যারেল গুলোর দুরবস্থা দেখতে। সকলে, সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ফিরে আসার পর-ও ছোটু ফিরছে না দেখে, এক হাবিলদার গেল সেই দিকে। তারপর তার মুহূর্মুহু সিগন্যাল পেয়ে অনেকে ছুটলো। ওখানে গিয়ে সকলে দেখলো,মৃত বাপের ছিন্ন-ভিন্ন দেহ ধরে ছোটু খুব কাঁদছে। বার বার বলছে, ইনকো কিতনেবার সমঝাকে আয়া কি, ইধার আজ নেহী আনা...। বাবা ছাড়া ছোটুর কেউ ছিল না।সকলের গভীর সমবেদনার মধ্যেই সেই রাতে শোন নদীর ধারে ছোটু'র বাবার দেহ সৎকার করা হল।

সেনাবাহিনীতে 'ড্যামেজ কন্ট্রোল' ব্যাপারটা অভ্যাসের মধ্যে পড়ে।তা না হলে সেনাবাহিনী-র মনোবল অটুট থাকবে না। তাই,পরদিন দুই সি.ও. সাহেব যৌথ মিটিং ডাকলেন। একে 'সৈনিক সম্মেলন' বলা যায়। গ্রামের কিছু লোককেও আমন্ত্রণ করে এনে, প্রচুর জওয়ানের উপস্থিতিতে একটা গুরু গম্ভীর পরিবেশে দুই সাহেব সামান্য বক্তৃতা দিয়ে গ্রামের মুখিয়া-কে স্টেজে ডেকে নিলেন। তারপর তার হাত দিয়ে ছোটু'র ইউনিফর্মে , বেস্ট সার্ভিস মেডেল আটকিয়ে দিলেন। ছোটু সম্মানিত হয়ে অভিবাদন জানালো। তার শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা চোখে জল ছিল না। সৈন্যদের যে কাঁদতে নেই। কিন্তু, তাকে তারিফ জানিয়ে যখন প্রবল হাততালির ঝড় উঠলো তখন তার ফাঁকা বুকের ভিতরটা অবশ্যই হু হু করে উঠেছিলো।


ছবিঃ শিলাদিত্য বোস

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা