ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
 ফৌজি  লোগ

আমি কলকাতার খিদিরপুর অঞ্চলের ছেলে। বাড়ীর পাশে ময়দান। দূরে ময়দানের উল্টো দিকে আছে, 'ফোর্ট উইলিয়াম' । ওখান থেকেই আমি সেনা-বাহিনীর চাকরিতে ঢুকি। সে-ও প্রায় দশ বছর আগের কথা Iএখন আমদের বাড়ীর পিছনে চক্র-রেলের লাইন বসেছে । ট্রেন বিমানবন্দর থেকে, চক্রপথে চলে , বিমানবন্দরে গিয়ে শেষ হয় I সেই পথের মাঝে আমাদের স্টেশনটা হল খিদিরপুর, আর পরের স্টেশন প্রিন্সেপ-ঘাট। এখান থেকে একটু দূরেই ফোর্ট উইলিয়াম।

'ফোর্ট উইলিয়াম' হল ময়দান ও গঙ্গার মাঝামাঝি একটা বিশাল জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা ফৌজি কেল্লা বা দুর্গ । একটু ইতিহাসের পাতায় যদি চোখ বোলাই, তবে জানা যাবে যে , ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এটা চার বছর ধরে তৈরী করে। ১৭০০ সালে, এর কাজ শেষ হলে , ইংল্যান্ডের তৎকালীন সম্রাট, তৃতীয় উইলিয়াম এর নামেই এই কেল্লার নাম রাখা হয়। ১৭৫৬ সালে, বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লা ব্রিটিশদের যুদ্ধে হারিয়ে এটি নিজের দখলে নিয়ে নাম রাখেন 'আলিনগর'। আবার এটি ব্রিটিশদের দখলে ফিরে আসে মাত্র এক বছরের মধ্যেই , যখন, ১৯৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ, নবাব সিরাজদৌল্লাকে হারিয়ে বাংলায় ব্রিটিশ -রাজত্ব কায়েম করেন।এখন অবশ্য এটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সম্পত্তি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের হেড- কোয়ার্টার্স হিসাবে ব্যবহৃত হয় ।

আমি ছুটি-তে কয়েক দিনের জন্য কলকাতায়, মানে, খিদিরপুরে নিজের বাড়ি তে এসেছিলাম। বিধবা মা , দু-বছরের খোকা এবং তার মা -সবাই আমাকে পেয়ে পুলকিত। আমার মহানন্দে দিন কাটে, কিন্তু সময় যেন উর্দ্ধ-শ্বাসে দৌড়ে চলে আমার ছুটি শেষ করবার জন্য।

আমার ইউনিটে ফিরে যাবার আগে ভাবলাম, মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনি। কে বলতে পারে, এই যদি শেষ দেখা হয় ! বাসে চেপে বড়বাজার গেলাম এবং মনের মত একটা শাড়ি কিনলাম -এটা আমার মা-কে ভালো মানাবে। ফিরবার পথে চক্র-রেল ধরলাম। ফাঁকা ট্রেন , তার শেষ কামরা-তে উঠে জানালার পাশে একদিকে বসে, উল্টোদিকের সীটের উপর ব্যাগ রেখে দিলাম। গঙ্গা- নদীর শোভা দেখতে দেখতে বাড়ী পৌঁছে যাব- মোটে তো তিনটে স্টেশন !

ওই স্টেশনেই একদল স্কুল-পড়ুয়া আমার কামরায় উঠলো। ওরা কেউ বসছে না -সারা ট্রেনের কামরাতে দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছে। ওদের হুল্লোড়ে কানে তালা ধরে যায়,বাপরে-বাপ।

পরের স্টেশনে যখন ট্রেন ঢুকে থামার জন্য অতি মন্থর হয়ে এলো, ওদের মধ্যে থেকে একটা ছেলে হঠাৎ আমার কাছে ছিটকে এসে ,চট করে আমার ওই ব্যাগ ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে লাইনে ফেলে দিয়ে আবার ট্রেন থেকে লাফ মারলো। তারপর আমাকে পুরো বোকা বানিয়ে ,ওটা হাতে তুলে ,উল্টোদিকের প্ল্যাটফর্মে উঠতে গেল । আমি অসহায়ের মতো কামরার দরজার কাছে ছুটে গেলাম। দেখলাম ,উল্টোদিকের লাইন দিয়ে ওই প্ল্যাটফর্মে আপ ট্রেন ঢুকছে। এখানে ক্রসিং হবে,তারপর আমার ট্রেন ছাড়বে। আর আমার নামা হোল না।

কিন্তু, একি ! এবারে যা দেখলাম, হিন্দি সিনেমা -ও তার কাছে নস্যি। ওদিকের ট্রেন ঢুকতে ঢুকতে, একজন মাঝবয়সী লোক প্ল্যাটফর্ম থেকে ছুটে গিয়ে এক ধাক্কায় ,ব্যাগ হাতে করে প্ল্যাটফর্মে উঠে পড়া ছেলেটাকে নিয়ে দুই ট্রেনের মাঝখানে পড়লো। তারপর, ব্যাগ কেড়ে আমার কামরার দরজা দিয়ে ভিতরে ছুঁড়ে দিলো । আমিও আমার ফেরত পাওয়া ব্যাগটা ধরলাম। তত ক্ষণে আমার ট্রেন হুইস্‌ল্‌ দিয়ে দিয়েছে। আমি লাফিয়ে নেমে গেলাম ট্রেন থেকে, আমায় দেখতেই হবে, কে লোকটা। ট্রেনটা মুখের সামনে থেকে সরে যেতে , দেখলাম , দুই লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে ওই লোকটি জামা-কাপড়ের ধুলো ঝাড়ছে। আর সেই ছোঁড়া বোধ হয় পালিয়েছে।

 ফৌজি  লোগ

উনি আমাকে দেখে একটু আশ্চর্য -বোধ করে হিন্দীতে বললেন , আবার কি হলো ? আমিও হিন্দি জানি, তাই আলাপচারিতায় অসুবিধা হলো না I বললাম, আপনি এই প্ল্যাটফর্মে উঠে আসুন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ দেব বলেই ব্যাগ ফেরত পেয়েও ট্রেন থেকে নেমে গেলাম। উনি হেসে, এক লাফে প্ল্যাটফর্মে উঠে বললেন , আমি সেই কাজ-ই করেছি, যা সব লোকেই করতো। ইস মে কোই বড়ী বাত নহি হ্যায়। আমি হাসলাম , এই রিস্ক কেউ নেবে না। উনি বললেন , জীবনে তো রিস্ক নিতেই হয় -আজ আপনার জন্য, কাল নিজের জন্য। আসলে, ব্যাপারটা আমার চোখে না পড়লে তো আপনার মুশকিল হয়ে যেত, তাই না ! ছোড়িয়ে, হামে ইউনিট ওয়াপস লোটনা হ্যায় ,ফোর্ট উইলিয়াম পর ; হম ফৌজি আদমি হ্যায় ; নমস্তে জী। ফির কঁহি মিলেঙ্গে।

আমি বললাম , জরুর। কিন্তু , এটা বললাম না যে আমিও একজন ...।
আমার বাড়ী এখান থেকে বেশি দূরে নয়। তাই রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলাম।

এবার বুঝলাম , ওই দুর্জয় সাহস , নিজের জীবন বাজী রেখে পরোপকার করার গুণ ওর মধ্যে কেন দেখলাম। লোকটা যে সেনাবাহিনীর একজন । আমার গর্ব হল , আর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম যে , আমিও এরকম মানুষ হবো ।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

লেখক পরিচিতি

প্রদোষ প্রদীপ ভট্টাচার্য্য

প্রদোষ প্রদীপ ভট্টাচার্য্য পেশায় চিকিৎসক । ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন; বর্তমানে স্থায়ীভাবে কলকাতায় কর্মরত। স্কুলজীবন থেকেই লেখার অভ্যাস, কলেজে দেয়াল-পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। ছোটদের জন্য লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
এসে গেল ইচ্ছামতীর শারদসম্ভার ২০১৭
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা