ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
রেইজিং  ডে

শার্দুল সিং ১১২ নং রাজপুত রাইফেলস এর একজন সিপাহী। ওর বাবা, হাবিলদার ভানোয়ার সিং এই পল্টন থেকেই অবসর নিয়ে, বাড়িতে আরাম করছেন। প্রতি বছর-ই, এই পল্টনের রেইজিং-ডে তে ওঁকে এবং আরো সব পুরনো সেনাদের সাদরে নিমন্ত্রণ করে আনা হয়। তারপর ,ওই দিনটা খানা-পিনা ও পুরনো দিনের গল্প-গুজবে খুব ভালো কাটে। একটা কথা বলি , প্রথম যে দিন, কোন রেজিমেন্ট বা পল্টন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই দিনটাকে ওই পল্টনের জন্মদিন বা রেইজিং-ডে বলে মানা হয়।

শার্দুল হল আমার আর্দালী। ছেলেটা বেশ ভালো, বিনয়ী এবং চটপটে। শার্দুলদের বাড়ি রাজস্থানের ঝুনঝুনা জেলার লুনা গ্রামে। ঝুনঝুনা জেলা ও আশপাশ নিয়ে একটা বড় জায়গা জুড়ে এক রাজা ছিলেন , যাঁর নাম ছিল মহারাও শার্দুল সিং । উনি ওদের এলাকায় অত্যন্ত নামী এবং পূজিত মানুষ । ঝুনঝুনা জেলা-সদরে, ওঁর বিরাট মূর্তি বসানো। পাশে সেনাবাহিনির রিক্রুট অফিস। আমাদের শার্দুল ওই খান থেকে দু-বছর আগে এই পল্টনে ঢোকে। শার্দুল নামটা আমাদের এই ছেলেটার স্বভাবের সাথে খাপ খেয়ে যায় । ছেলেটা অসম-সাহসী কিন্তু মাথা গরম করে না । অন্যের উপকারে ঝাঁপায় , কিন্তু তার জন্যে কিছু প্রত্যাশা নেই ।প্রথম দিন ওর ডান হাতের তর্জনীর আগা ( অগ্রভাগ ) কাটা দেখে একটু কৌতুহলী হয়েছিলাম। তারপর জেনেছি, কেন ওর এই অবস্থা হল । ওই দিন থেকেই আমি ওকে খুব ভালোবাসতে শুরু করি।

ও যেদিন জয়েনিং -লেটার পেল, ওকে রাতের বাস চড়ে দিল্লিতে আসতে হল ,ওদের রাজপুত রেজিমেন্ট সেন্টারে। ওর পাশে এবং উল্টো দিকের সিট্গুলো এক পরিবারের দখলে। তারা দিল্লি বেড়াতে চলেছে ,সাথে তাদের দুই বছরের শিশু । ভোরবেলা শার্দুলের ঘুম ভাঙলো। দিল্লি প্রায় এসে গেছে। এখন এক কিলোমিটার রাস্তা বাকি। এ রাস্তাটা খুব বাজে, সারা রাস্তা বাস এখন লাফাতে লাফাতে যাবে। বাচ্চাটা জানালার উপর হাত রেখে ঘুমাচ্ছে ।হটাৎ ঝাঁকুনীর চোটে বাসের ওই জানালার ফ্রেম উপর থেকে খুলে পড়লো ।কোন কিছু না ভেবেই শার্দুল বাঁ হাত দিয়ে বাচ্চাটার হাত সরিয়ে নিল।জানালার ফ্রেম গিয়ে পড়ল শার্দুলের ডান হাতের তর্জনীর উপর। বাস ততক্ষণে স্ট্যান্ডে ঢুকে পড়েছে। শার্দুল কারো কোন কথা ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে হাতের ব্যাগ নিয়ে লাফিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল. ওর হাত তখন ব্যথা ও ধাক্কার জন্য নীল হয়ে গ্যাছে । দারুন ব্যথা সহ্য করে ওই ভাবে ছেলেটা অটো ধরে ওদের সেন্টারে রিপোর্ট করে। তারপর , মেডিক্যাল রুমে গিয়ে পট্টি করানোত়ে বিশেষ লাভ হল না ,ক্যান্টনমেন্ট হাসপাতালের বড়-সার্জেন ওর আঙুলের মাথাটা কেটে বাদ দিলেন- না হলে সারাশরীরে বিষ ছড়াতো ।শার্দুল এখন বাঁ হাতে রাইফেলের ট্রিগার টেপে, কিন্তু তাতেও টার্গেট হিট করতে ওর অসুবিধা হয় না।

রেইজিং  ডে

এই বছর আমাদের কম্যান্ডিং অফিসার ঠিক করলেন যে, এবারের রেইজিং-ডের মধ্যে একটু নতুনত্ব আনবেন। তার জন্য উনি নোটিশ দিলেন যে, ওর আগের দিন পল্টনের জুনিয়র সিপাহী বা জওয়ানদের নিয়ে ফায়ারিং কম্পিটিশন হবে এবং যে বেস্ট ফায়ারার হবে, তাকে রেইজিং- ডের দিন সৈনিক – সন্মেলনে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হবে।এই ঘোষণায় পল্টনে ব্যাপক সাড়া পড়ে গেল। শার্দুল-কে আমি বললাম , গ্রুপিং-এ তোকে ফার্স্ট হতে হবে কিন্তু। পুরা কোশিস করেঙ্গে, সাব - শার্দুলের উত্তর পেলাম ।

নির্দিষ্ট দিনে, ওদের ফায়ারিং কম্পিটিশন শুরু হোল। যখন শুনলাম, শার্দুল ফাইনাল রাউন্ডে চলে গ্যাছে , আমিও ওই খানে হাজির হলাম। আমার সামনেই শার্দুল, তার বাঁ হাতে রাইফেল চালিয়ে এক ইঞ্চির কমে গ্রুপিং করলো। ও তখন বাকিদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গ্যাছে।

পর দিন, বিরাট আকারের সৈনিক- সন্মেলনে কম্যান্ডিং অফিসার আমাদের সঙ্গে প্রথমে পুরনো সাথীদের পরিচয় করলেন, তারপর এই পল্টনের ইতিহাস ও নানা বীরত্বের কথা বললেন। অবশেষে বিপুল হর্ষ-ধ্বনির মধ্যে , তার বাবার উপস্থিতিতে , শার্দুল সিং-কে বেস্ট ফায়ারার ঘোষণা করে বিশেষ পুরস্কার দিলেন। আমি আজ-ও জানিনা, ঐদিন আমার, শার্দুলের, নাকি তার বাবা ভানোয়ার সিং - কার সবচেয়ে বেশী আনন্দ হয়েছিল ।


ছবিঃপার্থ মুখার্জি

লেখক পরিচিতি

প্রদোষ প্রদীপ ভট্টাচার্য্য

প্রদোষ প্রদীপ ভট্টাচার্য্য পেশায় চিকিৎসক । ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন; বর্তমানে স্থায়ীভাবে কলকাতায় কর্মরত। স্কুলজীবন থেকেই লেখার অভ্যাস, কলেজে দেয়াল-পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন। ছোটদের জন্য লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
এসে গেল ইচ্ছামতীর শারদসম্ভার ২০১৭
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা