ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ডবল্‌ ক্যারি

সাইকেলের প্যাডেলে পা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম দোতলার বারান্দার দিকে। মা হাত নাড়লেন। আমিও নাড়লাম। এরপর সোজা সামনের রাস্তা দিয়ে চালিয়ে বাঁ দিকের গলিটা নিলাম। আর মা'কে দেখা যাবে না। সাদা জামা, কালো প্যান্ট, পায়ে চটি আর কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে আমি চলেছি।

আমার এখন ক্লাস নাইন। ছোটবেলা থেকেই এই স্কুলেই পড়ি। সামনের বছর মাধ্যমিক। তাই এবছর থেকে অনেকগুলো টিউশানে ভর্তি হতে হয়েছে। পাশের পাড়ায় অঙ্ক করতে যাই। ফিজিকাল সায়েন্সের স্যার পল্টুদের বাড়ি আসেন। আমরা ছয় জন ওনার কাছে পড়ি। এ ছাড়া ইংরেজিরও একজন গৃহশিক্ষক আছেন।

আমার বাবা এই শহরেই এক ব্যাঙ্কে চাকরি করেন। মনে পড়ে ছোটবেলায় যখন স্কুলে যেতাম, বাবা আমাকে নিয়ে যেতেন। বাবার হিরো সাইকেলের সামনে একটা ছোট সিট আছে। আমার জন্যই সেটা তৈরি হয়। আমি সেখানে বসতাম দু'দিকে পা ঝুলিয়ে। একবার নাকি বসতে গিয়ে আমি উল্টে পড়ে যাই। আমার যদিও এই ঘটনাটা মনে নেই। যাই হোক, বাবার সাইকেলের কেরিয়ারে আমার ব্যাগ লাগানো থাকত। জলের বোতল আমার গলায় ঝুলত। আমাকে বাবা সাইকেলে করে সকালে স্কুলে দিয়ে আসতেন। দুপুরবেলা স্কুল ছুটি হলে দেখতাম মা স্কুলের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। একা না অবশ্য। সঙ্গে থাকতেন সুজয়ের মা, চন্দনের মা, সৌভিকের মা। মায়ের হাত ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতাম। আমরা আর চন্দনরা একই পাড়ায় থাকতাম বলে একটা রিক্সাতেই চারজনে উঠতাম। দুই মায়ের কোলে আমরা দুজন বসতাম। একবার মনে আছে রিক্সার মধ্যে আমি আর চন্দন মারামারি শুরু করায় দুই মায়ের হাতে ধোলাই খেয়েছিলাম।

তারপর সেই সাদা জামা এক থাকলেও কালো হাফ প্যান্ট পাল্টালো। আমি ফুল প্যান্ট পরা শুরু করলাম। ক্লাস সিক্স থেকে সাইকেলে যাই। প্রথম প্রথম মা বাবা খুবই চিন্তা করতেন। চন্দন আর আমি একসাথে যেতাম। সাইকেল চালাতে গিয়ে যে পড়িনি তা নয়, কিন্তু সে তো সবাই পড়ে! বাবা কিন্তু সেই সাইকেলটা এখনো ব্যবহার করেন। ঐ ছোট সিটটা আজও আছে। আমার নিজস্ব সাইকেল – অ্যাটলাস গোল্ডলাইন সুপার। এরপর একদিন চন্দনরা আমাদের পাড়া ছেড়ে চলে গেল। আমি একা একাই সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম।

আমাদের স্কুলের এই জেলা শহরে খুবই বিখ্যাত। এমনকি এ বি টি এ-র প্রশ্নপত্রেও আমাদের স্কুলের পেপার থাকে। অনেক দূর দূর থেকে ছেলেরা পড়তে আসে এখানে। অনেক ছোট ছোট ছেলেকে দেখি হেঁটে হেঁটে স্কুলে আসছে। সবাই আমার মত ভাগ্যবান না যে বাবার সাইকেলের সামনে বসে আরাম করে স্কুলে আসতে পারবে। আচ্ছা এরা কত্টা হাঁটে রোজ? হয়ত এক কিলোমিটার, বা দু' কিলোমিটার বা হয়ত আরো বেশি!

আজ আমাদের পাড়া পেরোতেই দেখি এক দল ছেলে হাঁটছে। বেল বাজিয়ে ওদের পাশে সরতে ইশারা করলাম। এর মধ্যেই একটি গলা পেলাম

"দাদা, স্কুলে পৌঁছে দেবে?"
ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আমাকে বলছে?
ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকাতেই দেখি এক সাদা জামা, হাফ প্যান্ট পরিহিত চেহারা।
"দাদা একটু নিয়ে যাবে?"
কোনদিন এর আগে ডবল ক্যারি করিনি, ভাবতে লাগলাম পারব কিনা। আমার সাইকেলের সামনে বাবার সাইকেলের মত ছোট সিটটাও নেই।
"আয়।"

ডবল্‌ ক্যারি

বলা মাত্রই ছুটে এল ছেলেটি। আমার হাত সরিয়ে সামনের রডে এক দিকে দু' পা ঝুলিয়ে বসে বলল
"চলো।"

বাঁ পাটা মাটিতে ঠেলে ডান পা দিয়ে প্যাডেল চালালাম। হাফ প্যান্ট থেকে ফুল প্যান্টের পরিবর্তনের সময়ও যা বুঝিনি, আজ বুঝলাম – বড় হচ্ছি।


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

লেখক পরিচিতি

কণাদ বসু

কণাদ বসুর শৈশব কেটেছে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে; অধুনা ব্যাঙ্গালোর নিবাসী। বাঙলা বই পড়তে, বাঙলা গান শুনতে আর বাঙলা সিনেমা দেখতে ভীষণ ভালোবাসেন। অবসর সময়ে স্মৃতির মণিকোঠার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন।
এসে গেল ইচ্ছামতীর শারদসম্ভার ২০১৭
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা