ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
কাঁঠাল

মনুদের সংসারে অভাবের অন্ত নেই । জন্মের পর থেকে এ একটা বস্তুকেই খুব কাছ থেকে দেখে এসেছে সে। ঘরে কয়েকটি ক্ষুধার্ত প্রাণ উদরপূর্তির ব্যর্থ তাড়নায় নেড়ি কুকুরের ন্যায় ছোটাছুটি করে । ওদের দিকে দৃষ্টি গেলে ভিতরটা কেমন হাহাকার করে তার। যেন তরমুজ কাটার মতো করে কেউ এসে হ্নদয়টা ফালাফালা করে তখন। মনুর বাপ করম আলী শহরে ধানের আড়তে কাজ করে, অগ্রহায়নে দিনমজুরীর কাজ করে গ্রামে। সংসারে অভাব মেটানোর তাড়না তার ভেতরে সামান্যই। পরিবারের লোকসংখ্যা বৃদ্ধির খেলায় মত্ত সে। দেশের সরকার যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হ্রাসকল্পে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বছরে বছরে করম আলীর সংসারে নতুন প্রানের সঞ্চার। এইতো কয়েক দিন আগেও মনুর ভাই এলো একজন । এখানে ছনের ছাউনি দেওয়া ছোট দুচালা ঘরে কয়েক জোড়া চোখের অহর্নিশ আস্ফালন। পরনে কাপড় নেই , খালি গা ওদের। মুখ থেকে লালা পড়ে কারও কারও । ওটা গড়িয়ে মাটিতে পড়ার সুযোগ পায়না কখনোই, তার আগেই চেটে মুখে তুলে নেই শিশুগুলো।

মনু এবার আটে পা দিল। গ্রামের স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছে সে। আর কয়েকদিন পর হয়তো সংসারে হাল ধরতে হবে তাকেই। তারপর গেরস্তের বলদের মতো হাড়ভাঙা খাটুনি যাবে তার। সে বেশ পরের কথা, এখন ছোট মানুষ সে। শেষ কবে নতুন কাপড় দিয়েছিল বাপ মনে করতে পারেনা মনু । আধ ছেড়া সুতি কাপড়ের একটা প্যান্ট পরে পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় সে। মনুদের স্কুলে মন্ডলের ছেলেটাও পড়ে। কিছুদিন পরপর নতুন জামাকাপড় পড়ে স্কুলে আসে সে। চলনে কেমন সাহেবী ভাব। তাকে দেখলে মাঝে মাঝে নতুন কাপড়ের খায়েশ জন্মে মনের মধ্যে । তবে সেটা ক্ষনস্থায়ী । খালি গায়ে থাকতে খারাপ লাগেনা মনুর। পোষ- মাঘ মাসে সামান্য কষ্ট হয় , এ আর কি। তখন শীত পড়ে গ্রামে। মনুরা বাড়িতে আগুনের ডিবি জ্বালিয়ে দেহ গরম রাখে। সে সময় খুব বেশি বাহিরে যেতে পারেনা মনু।

পাশের পাড়ার হাসুর সাথে মনুর গলায় গলায় ভাব। একই স্কুলে পড়ে ওরা। একই বেঞ্চে বসে প্রতিদিন। বাজিতপুর প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার নুরুল স্যার। স্কুলের সবাই হাই স্যার বলে ডাকে তাকে। মনুদের স্কুলে গণিত পড়ান তিনি। মনুকে খুব স্নেহ করেন হেড স্যার। এইতো গতকাল সাত সাতে কত হয়, যখন কেউ বলতে পারছিলনা তখন হঠাৎ মনুর মুখে সঠিক উত্তরটা শুনে কি খুশিই না হয়েছিলেন তিনি। আনন্দে চোখগুলো কেমন চকচক করছিল তাঁর। চেয়ার থেকে উঠে এসে মনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন ভদ্রলোক । তারপর বলেছিলেন, - বাহ,-মনু তুই তো বেশ পারিস। তারপর টিফিনের সময় মনুকে ডেকে নিয়ে খাওয়ালেন তিনি ।

বাড়িতে কুকুর পোষে মনু। নেড়ি কুকুরটা জিভ বের করে সারাদিন পিছন পিছন ঘুরে ওর।স্কুলে গেলেও সাথে সাথে থাকে সে।রাতে বাড়ি পাহারা দেয় কুকুরটা। অচিন কাউকে বাড়ির আশে পাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখলে ঘেউ ঘেউ করে প্রায়ই। নদীর পাশে কাশফুলের ঘন জঙ্গল । প্রত্যহ হাসুকে নিয়ে সেখানে ফড়িং ধরে মনু। বাঁশের কঞ্চিতে সজনা গাছের আঠা লাগিয়ে ফড়িং ধরে ওরা। মনু হাঁক দেয়-

--লাল ফুলুমটা আমারে দিস হাসু ।
--তুই নিবি, আমি কোনটা নিমু তাইলে ?
--তুই এই কালাডা নে ।

এখন গ্রীষ্মকাল । আগুণরূপী গরম পড়েছে বাজিতপুরে । বৈশাখ যাবো যাবো করছে । গ্রামের হাটে কাঁঠাল নামতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই । প্রতিদিন বড় বড় নৌকার বহর আসে বাজারে । পাহাড়ী কাঁঠাল নিয়ে পাইকারী বিক্রেতারা এসে সমবেত হয় সেখানে । বাজারটা কেমন সরগরম থাকে এ সময় ।

মনুর মন খারাপ আজ । সকালে করম আলী খুব মেরেছে তাকে । ফর্সা পিঠে মারের দাগগুলো কেমন কালো হয়ে আছে এখন । চোখগুলোও ফুলে গেছে তার । গতকাল হাসুকে নিয়ে মন্ডলের বাগানে আম পাড়তে গিয়েছিল সে । সুবিধা করতে পারেনি কেউই । সোজা ওদের চাকরটার হাতে ধরা পড়ে গিয়েছে তারা । আজ সকালে করম আলীকে ডেকেছিল মন্ডল । গ্রামে এই মানুষটাকে যমের মতো ভয় পায় করম । কাছে গিয়ে সালাম ঠুকতেই মন্ডল কতগুলো কথা শুনিয়ে দিল তাকে

-পুলাযে চুর অইতাছে, খোঁজ রাহসনি করম ?
-ক্যান কি করছে কনতো ?
-কাল আম চুরি করতে যাইয়ে ধরা পড়ছে হাতেনাতে । তর পুলা তাই কিছু কই নাই । আরেকদিন পাইলে ছাড়মনা কইলাম ।

মন্ডলের বাড়ি থেকে ফিরে এসে মনুকে মেরেছে করম । তারপর লাপাত্তা হয়ে গিয়েছে হঠাৎ । এখনো বাড়ি ফিরেনি মানুষটা । করম প্রহার করলে মনু মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করে । বেশ সময় ধরে কাতরায় সে । তারপর উঠে দরজার কাঠে হেলান দিয়ে বসে থাকে চুপচাপ । কুকুরটাও কেমন নির্জীব হয়ে থাকে এ সময় । পলকহীন দৃষ্টি দিয়ে মনুকে সমবেদনা জানায় হয়তো ।

মনুর মা হাজেরা বেগম বেশ স্নেহ বৎসল মানুষ । বিকেলে উঠোনে বসে রান্না করে সে । পরক্ষণে হাঁক দেয়

-মনু বাপজান গেলাস নিয়াই, ফেন দেই তরে ।

ভাতের ফেন খেতে পছন্দ করে মনু । এক গেলাস ফেনে এক চিমটি লবণ দিলে খুব সুস্বাদ হয় ওটা । মায়ের কণ্ঠ শুনে ও যখন গেলাস নিয়ে বাইরে আসে ততক্ষণে আরও কয়েকটি হাত এসে সমবেত হয়েছে সেখানে । ওরা মনুর ভাইবোন । এতগুলো হাত ঘুরে ফেনের ভাগ আসবেনা তার কাছে এটা সে জানে । তাই ইচ্ছুক মনকে মিথ্যা অনিচ্ছার কথা বলে প্রবোধ দিতে হয় তার । পরক্ষণে বাইরে এসে গাঁয়ের পথ ধরে হাঁটে সে । হেড মাস্টারের বাড়ির সামনে প্রকান্ড পুকুর । মন খারাপ হলে পাড়ে বসে পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে মনু । মাস্টারের দৃষ্টিগোচর হলে ওকে ডেকে নিয়ে যান বাড়িতে। তারপর পাশে বসিয়ে ভাত খাওয়ান তাকে । এই মানুষটাকে খুব শ্রদ্ধা করে মনু । আহ ! কি ভাল মানুষ তিনি, একেবারে কাদামাটির মতো নরম মন । খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে কথা বলে নূরুল স্যার ,

- বাপ মারছে ?
-হুম ।
-আম খাবি আমারে বলিসনি ক্যান ? আমি পেড়ে দিতাম ।
হেডস্যারের কথার সহসা জবাব দেয়না মনু । কেমন হতবিহ্বলের মতো মাথাটা নিচু করে রাখে সে । হেড মাস্টার আবার বলেন
- ঘরে আম পাড়া আছে , যাবার সময় নিয়ে যাস মনু ।

এক সময় মনুকে মেরে মনে মনে অনুতপ্ত হয় করম আলী । বন্ধুহীন সংসারে অভাব মেটানোর স্বামর্থ নেই তার । সন্তানদের কোনদিন বন্ধুবৎসল হৃদয়ও উপহার দিতে পারেনি সে । যে হৃদয় ভালবাসার জন্য সৃষ্টি তাকে ভালবাসা দিয়েই তুষ্ট করতে হয় এ বোধশক্তি করমের আছে হয়তো । কিন্তু ভালবাসা দেওয়ার জন্য যে ভালবাসাপূর্ণ হৃদয় থাকতে হয় সেখানে হয়তো ঘা হয়েছে তার । হয়তো জং ধরেছে পোড়ামনে । এর মধ্যে একদিন হেডমাস্টারের সাথে কথা হয় করম আলীর ।

- মনুতো ছেলেমানুষ । সব সময় রাগ করোনা ওর উপর । পড়াশোনায় মাথা আছে ছেলেটার ।
- মাথা দিয়া করুম কি ? কামে দিমু সামনে ।
- ভুল করোনা করম, নিজের থেকে শিক্ষা নেও ।

বৈশাখ - জ্যৈষ্ঠ্য মাসে কালবৈশাখী ঝড় হয় বাজিতপুর । গাঁয়ের ছেলেবুড়োরা দল বেঁধে পাড়ায় আম কুড়ায়। জ্যৈষ্ঠ্য মাসে কাঁঠাল পাওয়া যায় গ্রামের সর্বত্র । পাকা কাঁঠালের গন্ধে গ্রামটা কেমন মৌ মৌ করে তখন। মনুদের বাড়িতে এখনও কাঁঠাল আসেনি । কদিন থেকে কাঁঠাল খাওয়ার লোভ হয়েছে তার ।স্কুলে গেলে পাকা কাঁঠালের গল্প করে হাসু ।

-এইবার কাঁঠাল খাইছসনি মনু ?
- না, তুই ?
- খাইলাম কালকে , কি মিঠা ।

হ্যাঁ, কাঁঠাল খাওয়ার সত্যি খুব সাধ হয়েছে মনুর । নিজের ইচ্ছের কথা কখনও বাড়ির কারো কাছে ব্যক্ত করেনা সে। অভাবের সংসারে তার ইচ্ছের দাম কানাকড়িও নেই , এটা সে জানে । বাড়িতে এসে মায়ের চারপাশে আনাগোনা করে মনু। হাজেরা বেগম ছেলের বাসনা বুঝতে পারে সহসায় ।

- কিছু কবি মনু ?
- হ, বাজানরে একখান কাঁঠাল আনতে কওনা মা ? - অহন ? অহন যে মেলা দাম । কইডা দিন যাবার দে, দাম কমুক । কমুনি তর বাজানরে । - না, অহনই কও বাজানরে । একখান ছুডো কাঁঠাল ।

এ বাড়িতে এতগুলো মুখের উদরপূর্তি একটা ছোট কাঁঠালে সম্ভব নয় । এটা হাজেরা বেগমের চেয়ে আর ভাল কে জানে ? মনুর বড় বোন রূপালীর বিয়ে হয়েছে পাশের গ্রামে । বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাস আম কাঁঠালের মওসম । এ সময় জামাই দাওয়াত করে খাওয়ানোর রীতি আছে বাজিতপুর । রাতে আরজ আলী বাড়ি ফিরলে মনোবাসনা খুলে বলে হাজেরা বেগম।

- একখান কথা কমু আপনেরে ।
- কও হুনি ।
- রূপালীরে নিয়া জামাইরে আইতে কন এইবার । আমের মওসুম শেষ অয় । গোস্যানী অয় হের ।
- হ, আইতে কও তাইলে ।

কাঁঠাল

আরজ আলীর সদিচ্ছায় মনে মনে পুলকিত হয় হাজেরা বেগম। পরদিন দুলা মিয়াকে দাওয়াত দিতে যেতে হয় মনুর । দুলা মিয়াও সুযোগ বুঝে একদিন শ্বশুর বাড়ি বেড়াতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করে তার কাছে । অবশেষে মনুদের বাড়িতে পাঁকা কাঁঠাল আসে । কিন্তু কাঁঠাল ভাঙার অনুমতি মিলেনা সহসা । দুলামিয়ার জন্য অপেক্ষা করে সবাই । দুলামিয়ারও সহসা সময় হয়না শ্বশুর বাড়ি আসার । প্রতিদিন সকাল , বিকাল আর রাতে কাঁঠালটা নেড়েচেড়ে দেখে মনু । ওটা পেঁকে কেমন গলগল করে একসময় । গন্ধ ছড়ায় ঘরের সর্বত্র । কাঁঠালের উপরে মাছির ঝাঁক ভন ভন আওয়াজ করে । বাইরে থেকে মেয়েলি কণ্ঠের আওয়াজ শুনা যায়,

- কাঁঠালখান ভাঙিসনা মনু । দিলে সবুর দে ।

কিন্তু মন তার বাঁধ মানেনা সহসা ।

মনুদের বাড়িটা আজ লোক সমুদ্র । চেনা -অচেনা অনেকের সমাগম হয়েছে এখানে । অনেকগুলো মুখের স্পষ্ট , অস্পষ্ট আওয়াজে কেমন গমগম করছে চারপাশ । মনুর মা বড় ঘরের মেঝেতে গলাকাঁটা মুরগীর মতো আস্ফালন করে , মনু আজ কোথাও নিরুদ্দেশ । আজ কাঁঠালের গন্ধ নেই কোথাও , নুরুল স্যারের পাঞ্জাবিতে আতরের গন্ধ লেগে থাকে । অশ্রুসিক্ত হেডমাস্টার , হাসু কেমন কাঁদতে ভুলে গেছে আজ । মনুর কুকুরটা খাটিয়ার সামনে থ মেরে বসে থাকে । মুরুব্বীরা এসে সরানোর চেষ্টা করে তাকে , ব্যর্থ হয় বারংবার । করম আলী চিৎকার করে

-আল্লা আমাবর তুইল্যা নেও , পুলাডারে খাইলাম আমি ।

অবশেষে সাদা কাপড়ে মুড়ানো মানুষটার অস্তিত্ব মিলে । কে সে? সে আর কেউনা - আমাদের মনু । আজীবন নির্লোভ শিশুটার শেষকালে কাঁঠালের প্রতি লোভ হয়েছিল খুব । মনুদের বাড়িতে আনা কাঁঠালটা ভাঙা হয়নি দুলা মিয়া না আসায় । ওটা সুরক্ষিত ছিল আরজের ঘরে চৌকির নিচে । একদিন রাতে চুপি চুপি বাবা মার ঘরে ডুকেছিল মনু । লোভ সংবরণ করতে কাঁঠালটা ভেঙেছিল সে । খায়নি তখনও । কাঁঠালের গন্ধেই হয়তো ঘুম ভেঙে গিয়েছিল হাজেরা বেগমের । স্বামীকে ঠেলা দিয়ে তুলে দিয়েছিল সে ,

-কুত্তে কাঁঠাল খাইনি, হেরে খেদান ।

আরজ আলী সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের প্রয়োজন অনুভব করেনি তখন । নিজের বিছানার কাছে রাখা ক্ষুরধার শাবলটা তুলে ছুঁড়ে মেরেছিল সে দিকে । শাবলটা গিয়ে মনুর পেটে বিঁধেছিল । পরক্ষণে মানুষের কণ্ঠ শুনে যখন চেতনা হয় ততক্ষণে মনু মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে । বাবা - মার চোখে চোখাচোখি হলে একটি কথা বলেছিল সে,

- খাইনাই অহনও । একটাই নিছি ।

কাঁঠাল

কাঁঠাল খাওয়া হয়নি মনুর । পরদিন ওর রসমিশ্রিত হাতে মাছিদের ঘোরাঘুরি করতে দেখেছে সবাই । আমার নাম আবুল হাসেম । বাজিতপুর প্রাইমারী স্কুলের হেডমাস্টার আমি । হাসু নামটি হারিয়ে গেছে এখন । মনু মারা যাওয়ার পর ওর নেড়ি কুকুরটাকে একদিনও ওদের বাড়িতে দেখিনি । ওটা রাতদিন মনুর কবরকে পাহারা দিত । এরপর একদিন মরে পড়েছিল সেখানেই । মনুর কবরটা জংলা হয়ে গেছে এখন । একটি কাঁঠাল গাছ হয়েছে ওর কবরে । ওটাতে ফল ধরেছে এবার । গাছে টিন সমেত একটি পেরেক ঠুকানো । টিনে লেখা - মরহূম মনোয়ার হোসেন ।


ছবিঃ পারিজাত ভট্টাচার্য্য

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা