ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
হারাধন দইওয়ালার ভূত

মণ্টুর মায়ের আগের রাত্রে মোটেও ঘুম হয় নি । বছর সাতেকের মণ্টুর মাঝ রাত থেকে জ্বর আর মাথায় খুব ব্যথা হচ্ছিল । বাড়ীতে যেসব ওষুধ পত্র রাখা ছিল তার থেকেই দুবার মণ্টুর বাবা ছেলেকে ট্যাবলেট খাইয়েছিলেন । যখন প্রায় ভোর হয়ে আসছিল, সেই তখনই মণ্টু একটু ভালো করে শান্ত-ভাবে ঘুমচ্ছিল । মায়েরও রাতজাগা আর ক্লান্তির জন্য চোখ-দুটো ঘুমে বন্ধ হয়ে এসেছিল । ঠিক সেসময়, বাইরে থেকে হারাধন দইওয়ালার ডাক শোনা গেছিল "দই লিবে গো, দই।" যবে থেকে মণ্টুর বাবা ইছাবনি গ্রামের পোস্ট-অফিসেতে বদলি হয়ে এসেছিলেন, প্রায় প্রতি দিনই এই হারাধন দইওয়ালাকে আসতে দেখছিলেন মণ্টুর মা । সেই-রাতে তো ঘুমটা এক্কেবারে ভালো হয় নি, সবে মাত্র একটু চোখের পাতা ধরেছিল, সেই জন্য বিরক্তির সাথেই কথা-গুলো তাঁর মাথায় এসেছিল, "আর বাবা, এখনো যে ভাল করে ভোরের আলো পরিষ্কার হয় নি, এরই মধ্যে সেই বুড়ো এসে পড়ল !"

ইছাবনি গ্রামের পাকা রাস্তার দুই দিকেরই বাড়ী গুলিতে সে দই বিক্রি করতে আসত । কাঁধে বাঁক নিয়ে মাটির সরাতে ভরে সে দই আবার কখনো কখনো মাখন, ঘি এসবও নিয়ে আসত । যেদিকে পোস্ট-অফিস আর পুলিশ-স্টেশন তারই কাছাকাছি ছিল অনেক গুলি সারি সারি ইস্কুল কলেজের কোয়াটার । ভোর ভোর সেখানেই আগে পৌঁছে যেত সে । সেদিকের রাস্তা ঘাট ভাল ছিল, হয়তো তাই । পরে সে পাকা রাস্তার অন্যদিকে যেদিকে হাসপাতাল, মাকড়া-পাথরের-তৈরি-প্রাচীন-মন্দিরটি আর পুরনো ইছাবনি-গ্রাম সেই দিকে আসত । তার নিজের বাড়ীও ছিল সেই পুরনো-গ্রামের দিকেই । বুড়ো হারাধন দইওয়ালার বয়েস সেসময় এককথায় ষাট বছর তো হবেই । সেসময়টা সম্ভবত ১৯৭০-এর দশকের কথা । বুড়ো হারাধনের বড় ছেলে কেষ্টর ছোট থেকেই একটা পা পোলিও হওয়ার জন্য পঙ্গু কিন্তু তাও সে বেকার বাড়ীতে বসে থাকতো না । ইছাবনির পাত্র-বাবুদের কাপড়ের দোকানে সে কাজ করতো । দোকানে আসা খদ্দেরদেরকে সে কাপড় জামা দেখাত আবার সেসব ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখত । হারাধন চাষের কাজ ছাড়াও বাড়ীর গরু মোষ গুলির খুব যত্ন করতো, তাই তার বাড়ীতে কখনো দুধের অভাব ছিল না । আর সেই কারণেই তার দই, ঘি, মাখন সেই-সবের বিক্রি করার এবং দু-পয়সা রোজগারের সুযোগ ছিল ।

সেদিন দুপুর বেলা মণ্টুকে সাথে করে নিয়ে হাসপাতাল এসেছিলেন মণ্টুর বাবা ও মা । ডাক্তার দেখানোর পর হাসপাতাল থেকে ওষুধ নিয়ে তারা কোয়ার্টারে ফিরে এসেছিলেন । দুপুরের পর মণ্টুর বাবা অন্য দুজন কর্মচারীর সাথে পোস্ট-অফিসের কাজ-কর্মগুলি করছিলেন । এমন সময় ভেতরের দিকের দরজায় টোকা দিয়ে মণ্টুর মা আবার একবার সন্ধেতে মণ্টুকে নিয়ে হাসপাতাল যাওয়ার কথাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন । সেই কোয়ার্টারটির রাস্তার দিকের একটি ঘর ছিল পোস্ট-অফিসের কাজ-কর্মের জন্য, আর বাকি পুরো বাড়িটাই ছিল পোস্ট-মাস্টারের 'রেসিডেন্স', অর্থাৎ বাসস্থান । দরজার টোকা শোনার পর মণ্টুর বাবা কোয়ার্টারের ভেতরের দিকে গেছিলেন কিছুক্ষণের জন্য ।

সেদিন আবার একবার মণ্টুকে ডাক্তার দেখানোর পর সন্ধ্যাবেলা হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে মণ্টুর মা ও বাবা পাকা রাস্তার উপর লোকজনের ভিড় দেখতে পেয়েছিলেন । দূর থেকেই কিছু লোকজনের কাঁধের উপর রাখা গামছা দেখে মণ্টুর বাবা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন ইছাবনি গ্রামের কেউ সেদিন মারা গেছিলেন । সুজয়ের মিষ্টির দোকানের কাছাকাছি আসার পর তারা শুনেছিলেন কিভাবে আচমকা হারাধন দইওয়ালার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল এবং লোকজন ডাক্তারকে ডেকে আনার আগেই সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল । গ্রামের অনেকেই বলেছিলেন পুণ্যবান মানুষ ছিল সে, সদা সর্বদা নিজের কাজের মধ্যেই কেটে যেত তার, সারা দিন 'কারো সাতেও নেই, পাঁচেও নেই' । মণ্টুর মায়ের এই মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকেই মনে মনে খুব অস্বস্তি হচ্ছিল, সেদিনই ভোর-বেলা সেই বুড়ো মানুষটির "দই লিবে গো, দই" ডাক শোনার পর, ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য, তিনি বিরক্ত হয়েছিলেন বেচারা সহজ-সরল বুড়ো মানুষটির উপর । খুবই মন-খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে সেই মানুষটি অবশ্যই তাঁর নিজের বাবার থেকেও বয়সে বেশ বড় ছিলেন ।

একটু পরে হারাধন দইওয়ালার আত্মীয় পরিজন শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য আসতে শুরু করেছিল একে একে । সেই কারণেই ইছাবনির 'আশুদতলা-বাস-স্টপ' আর তার কাছাকাছি অনেক লোকজন এসে জড় হয়েছিল । হারাধনের মেয়ের শ্বশুর-বাড়ীতেও খবর পাঠানো হয়েছিল । গ্রামের এমাথা থেকে ওমাথা সব জায়গাতেই লোকজন এই একই কথা বলাবলি করছিল । বিকেলের পরের থেকে ইছাবনির চারিদিক যেন কেমন থমথমে হয়ে গেছিল । সেই রাতে শ্মশান থেকে গ্রামে ফিরে আসতে লোকজনের বেশ দেরী হয়ে গেছিল । আসার পথে পুরনো ইছাবনি গ্রামের মন্দিরটির কাছে এক অন্ধকার গলিতে নিস্তব্ধতার মধ্যে কোন একজন কেবল মাত্র বদমাইশি করার জন্য "দই লিবে গো, দই" এই কথা গুলি হারাধন দইওয়ালার মতই সুর করে বলে উঠেছিল আর তারপর চুপচাপ নিজের বাড়ীতে চলে গেছিল ।

পরের দিন সকাল থেকেই এক কথা ইছাবনির প্রায় সবার মুখে মুখ ঘুরতে লাগল -'হারাধন দইওয়ালার ভুত' । বাচ্চাদের তো এই কথা শুনে মুখ একেবারে শুকিয়ে গেছিল । বড়োদের অনেকেই বেশ বুঝতে পেরেছিলেন কথাটা গুজব ছাড়া আর কিচ্ছু ছিল না । কিন্তু বড়োদেরও কেউ কেউ ভুতের নাম শুনে খুব ভয়ে ভয়েই ছিলেন । ওদিকে বিকেলের পর পুলিশ থানাতে খবর এসেছিল হারাধন দইওয়ালার বাড়ির থেকে একটু দূরেই রায়দের বাড়ির একটি কুড়ি বাইশ বছরের ছেলেকে সকাল থেকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । প্রথম দিকে বাড়ীর লোকজন মনে করেছিল, আশেপাশেই কোথাও হয়তো গিয়েছিল সে, কিন্তু দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল হয়ে গেছিল, সেই ছেলেটির তখনো কোন খোঁজ না পেয়ে বাড়ির লোকজন থানাতে খবর দিতে এসেছিল । পুলিশ থানাতে একটি রিপোর্ট করা হয়েছিল ।

দু-তিন দিনের মধ্যেই গুজব এরপর ঠিক এই ভাবে ছড়িয়ে পড়ল যে 'হারাধন দইওয়ালার ভুত' যখন "দই লিবে গো, দই" এভাবে ডেকেছিল তখন রায় বাড়ির সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেটি তার উত্তর দিতে গেছিল , আর তারপর থেকেই তাকে আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না । থানার লোকজন অবিশ্যি রায় বাড়ির কয়েক জনের সাথে সেই রাতে বেশ কিছুক্ষণ বিভিন্ন কথাবার্তা বলেছিলেন । এবং তাদের বাড়ির সেই ছেলেটিকে যে ঠিক কেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না তার কিছুটা আন্দাজ করেই ছিলেন রায় বাড়ির সেই কজন এবং পুলিশরাও । কিন্তু ওদিকে, এই দইওয়ালা-ভূতের কথা জঙ্গলের আগুন যেমন ছড়ায় ঠিক তেমনি করে ছড়িয়ে পড়েছিল এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায়, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে । রাত্রে লোকজন ভয়ে ভয়ে বাইরে বেরোত, নেহাত না বেরোলে নয়, এমন লোকজনকেই বাইরে রাস্তাঘাটে দেখা যেত । পুলিশ থানার দারোগা বাবু, কনস্টবলরা এবং হোম গার্ডের লোকজন বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেই গুজব রটান বদমাশদের হাতে-নাতে ধরার জন্য ।

হারাধন দইওয়ালার ভূত

ইছাবনির 'আশুদতলা-বাস-স্টপ' থেকে একটু দূরেই উত্তর দিকে সাতমৌলি যাওয়ার লাল-ধুলোর রাস্তার পাশে নিতাই নাপিতের চুল-দাড়ি কাটার সেলুন । কাঠের কাঠামোর উপর টিনের পাত লাগিয়ে তৈরি করা ছোট গুমটি ঘর, ভেতরে কাঠের উঁচু পায়া-ওয়ালা একটি চেয়ার যার পিছনের দিকে মাথা হেলান দিয়ে রাখার জন্য উপরে নীচে অ্যাডজাস্ট করা যায় এমনি একটি কাঠের সাপোর্ট, চেয়ারের সামনে ও পিছনে দুটি আয়না, আর ছিল কিছু চকচকে কাগজের রঙিন ছবি, প্রাকৃতিক দৃশ্যর এবং সিনেমার নায়ক নায়িকার । ইছাবনি আর তার আশে-পাশের সাত পাড়ার তো বটেই এমনকি অন্য কাছাকাছি গ্রামের লোকজনও তার কাছে আসত চুল-দাড়ি কাটার জন্য। আর সেখানে হত যত সব আজগুবি কথাবার্তা । যে পাড়ায় কিম্বা যে গ্রামে হারাধন দইওয়ালা জীবনে কখনো দই বিক্রি করতে যায়নি সেখানেও নাকি রাত্রে কেউ কেউ শুনতে পেয়েছিল দইওয়ালা ভূতের নিশি-ডাক । হুজুগে লোকের কোন অভাব ছিল না সেখানে ।

ইছাবনির লোকজন সেই সব আজগুবি রকম কথাবার্তা নিয়েই ব্যস্ত ছিল । ওদিকে ন্যাড়া মাথা নিয়ে হারাধনের বড় ছেলে কেষ্ট পাত্র-বাবুদের কাপড়ের দোকানের কাজে নিয়মিত আসতে শুরু করে দিয়েছিল । কাজ না করলে সংসার চলবে কি করে? কেষ্টর মা ছোট ছেলেটিকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাজি করিয়ে ছিলেন, বাড়ীতে দু-পয়সা আসে যদি সে কিছুটা দুধ, দই আর ঘি এসব ঘরে ঘরে বিক্রি করতে যায়। কেষ্টর ভাই বিষ্টু প্রথমটা অনিচ্ছা করলেও শেষমেশ রাজি হয়েছিল । খুব ভাল করে বেঁধে সমান ওজন করে বাঁকে সেসব গুছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পাশের ঘরের একটি বাচ্চা সাথে লন্ঠন হাতে নিয়ে পিছনে পিছনে চলছিল ।

হারাধন দইওয়ালার ভূত

সেই সময় যেকোনো দিন কোন না কোন পাজি লোক রাতের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অযথা গ্রামের মানুষকে নিছক ভয় দেখাতে "দই লিবে গো, দই" এই কথা-গুলি হারাধন দইওয়ালার মতই সুর করে করে বলে উঠত আর তারপরই চুপচাপ নিজের বাড়ীতে সরে পড়ত । সেদিন নিতাই নাপিত বাইরে কোথাও গেছিল, যখন সে সেখান থেকে বাড়ী ফিরে আসছিল তখন অনেক রাত হয়ে গেছিল, আর ঠিক তখনই দুর্বুদ্ধি হয়েছিল তার মাথায়, সেই ফিরে আসার পথে পুরনো গ্রামের একটি অন্ধকার গলিতে আচমকা নিস্তব্ধ পরিবেশে বদমাইশি করে সে সুর করে বলে উঠেছিল "দই লিবে গো..., দ...ই" আর ঠিক তারপরই সে চুপচাপ নিজের বাড়ীর দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে-ছিল । এমন সময় সে দেখে কি, সামনের গলিতে আবছা অন্ধকারেও সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল, হুবহু হারাধন দইওয়ালার মতই একজন বাঁক কাঁধে নিয়ে তার দিকেই আসছে আবার একটি আলো দুলে দুলে আসছে সাথে সাথে । গলির মধ্যে দাঁড়িয়ে, সেই জায়গাতেই, নিতাই নাপিত "ওমা, মা... গো..." এই বলে অদ্ভুত রকম 'গোঁ... গোঁ...' শব্দ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছিল মাটিতে। একটু পরে হারাধনের ছোট-ছেলে বিষ্টু আর লন্ঠন হাতে নিয়ে পিছনে পিছনে হেঁটে-আসা সেই বাচ্চা ছেলেটি, আশপাশের বাড়ীর লোকজনদেরকে ডেকে নিতাই নাপিতের চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে তার জ্ঞান ফিরিয়েছিল।

পরের দিন, এই ঘটনার কথা শুনে, ইছাবনির সব্বাই বলেছিল 'বেশ হয়েছে, যার যেমন কর্ম তার তেমনি ফল'।


ছবিঃত্রিপর্ণা মাইতি

লেখক পরিচিতি

চান্দ্রেয়ী ভট্টাচার্য্য

চান্দ্রেয়ী ভট্টাচার্য্যের বাড়ি ও জন্মস্থান বাঁকুড়া জেলার মন্দির-নগরী বিষ্ণুপুর শহর। বাবার কর্মসূত্রে সূত্রে গুজরাতে আসা। আর তার জন্যই স্কুল কলেজের পড়াশুনা গুজরাতের কাঠিয়াবাড় প্রান্ত থেকে। বর্তমানে ফার্মাকোলজি নিয়ে পোস্ট গ্রাজুয়েশনের ফাইনাল ইয়ারে। মাতৃভাষা বাংলার সাথে শিশু অবস্থা থেকে কখনই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। নিজের পড়াশুনোর মাধ্যমে ইংরেজি, হিন্দি এবং গুজরাতি শেখার সাথে সাথেই বাংলা বইও পড়তে ভালো লেগেছে বরাবরই।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা