ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
শাপে বর

বুতাইদের স্কুলে সবে শীতের ছুটি পড়েছে। বুতাই তাই খুব খুশি ছিল। কতো কিছু প্ল্যান করেছিল করার জন্য; গল্পের বই পড়া, নিজের ঘর বানানো, আরও কতো কি। নিজের বন্ধুদের সাথে এই নিয়ে অনেক গল্প করেছে সে। কিন্তু ছুটির শুরুতেই দু-ধাপ টপকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে নিজের পা ভেঙে ফেলেছে। পায়ের সাথে ছুটির সব মজাও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ওর। ডাক্তার বলেছে দু-মাস বেডরেস্টে থাকতে হবে। মা-বাবার সাথে শুলে পায়ে লেগে যেতে পারে বলে ওকে একটা নিজের ঘর দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সেই ঘর ওর পছন্দ নয়। মা-বাবার পাশের ঘরটাই দেওয়া হয়েছে ওকে। ওই ঘরে কখনই ও তেমন ঢুকত না। ওই ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তা দেখা যায় না। এখন সারাক্ষন জানলার দিকে পেছন করে বালিশে হেলান দিয়ে বসে গল্পের বই পরে বা অঙ্ক করে। রেজাল্ট নিতে গিয়ে ক্লাস টিচার বলেছেন অঙ্কে আরো ভালো করতে হবে। তাই দিদি ক্লাস সিক্সের কিছু নতুন অঙ্ক শিখিয়ে দিয়েছে ওকে। দিদির পুরনো বই থেকে বসে বসে অঙ্ক কষে। বাকি সময় বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ে। সারাদিন একই ঘরে বসে থাকতে একদম ভালো লাগেনা ওর। বুতাইয়ের পা ভাঙার জন্য মা-বাবাকে দীঘার ট্রিপটা ক্যান্সেল করতে হয়েছে। ও মনে মনে ভাবে, এখন যেখানে আমার সমুদ্রের জলে পা ভেজানোর কথা বা সাইকেল শেখার কথা সেখানে আমি এই বাজে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছি। নিজের ওপরই একটু রাগ হয় বুতাইয়ের। মিতা মাসির বানানো ডাল ভাত আর ট্যালট্যালে মাছের ঝোল খেতে একদম ইচ্ছে করেনা ওর। কিছুটা ডাল ভাত আর মাছের টুকরোটা কোনোমতে খেয়ে বাকি ভাতটা ও লুকিয়ে লুকিয়ে জানলার চাতালে ফেলে দেয়। জানলার বাইরে ফেলতে হলে পা ওঠাতে হবে। তাই ওই অবধি হাত পৌঁছয় না।

শাপে বর

একদিন দুপুরে যখন ও বসে বসে অঙ্ক করছে তখন হঠাৎ ঠিক পেছনে একটা আওয়াজ পায়। এতদিন এই ঘরে আছে, কখনও জানলার বাইরে তাকায়নি ও। পেছন ঘুরে দেখে একটা কাঠবেড়ালি ওর ফেলে দেওয়া ভাতের ওপর ভাগ বসিয়েছে। ওকে দেখে একটু দূরে চলে গিয়ে সংগ্রহ করা ভাতের দানাগুলো খেতে লাগল। বুতাইয়ের দেখে খুব ভালো লাগল। সামনের আম গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখল কটা চড়াই পাখি লাফালাফি করছে আর মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকাচ্ছে। ওদের মধ্যে একটা উড়ে এসে পড়ে থাকা ভাতের দানা খেতে লাগল। ওর পেছন পেছন আরও কটা এলো। এর পর থেকে গল্পের বই পড়তে পড়তে বা অঙ্ক কষতে কষতে মাঝে মাঝেই জানলার বাইরে তাকায় ও। চড়াই, শালিখ, কাকের লাফালাফি, কাঠবেড়ালির এদিক সেদিক দৌড়নো, বেড়ালের ঝগড়া এসব ওর খুব ভালো লাগে। অবাক হয়ে ও ভাবে রাস্তা দেখা যায় না বলে আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিল জানলা দিয়ে কিছু দেখার নেই। কী বোকা ও। আমগাছটার গা বেয়ে ওঠা কিছুর লতা, পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা ছোট্ট টুনটুনি পাখি ও হাঁ করে দেখে। রাতে শুয়ে শুয়ে বন্ধ কাঁচের জানলার মধ্যে দিয়ে বাইরের গাছপালার ছায়া দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। পূর্ণিমা হলে জ্যোৎস্না আলোয় গাছের পাতাগুলো চিকচিক করে।

এখন ওর পা সেরে গেছে। এই ঘরটাকেই নিজের ঘর বানিয়ে নিয়েছে ও। এখন দিদিও ওর সাথে এই ঘরে থাকে। স্কুল খুলে সিক্সের পড়া শুরু হয়ে গেছে। পড়ার বই পড়তে পড়তে মাঝে মাঝেই জানলার বাইরে তাকায় ও। দূরে কোনো বাড়ি থেকে ভেসে আসে, “যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে/ জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে”।


ছবি ও লেখাঃ শ্রীতমা সরকার
সেন্ট জন্‌স ডায়োসেশন স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী।বই পড়তে, লিখতে, আঁকতে, ছবি তুলতে ও ম্যাজিক শিখতে ভালবাসে।

লেখক পরিচিতি

শ্রীতমা সরকার

এই লেখকের অন্যান্য রচনা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা