ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমতম জেলা পুরুলিয়া 'মানভূম' নামেও খ্যাত। এটি কংসাবতী নদীর উত্তরে অবস্থিত। আগে এটি বিহারের অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ১৯৫৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে, রয়ে গেছে জীবনযাত্রা, কলা, সংস্কৃতি, এবং ভাষায় সুচারু মিল। এই রাঙামাটির দেশে আদিবাসী সংস্কৃতি এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এই জনসংখ্যার অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণী। কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীলতাই অধিকাংশের জীবিকা এবং সেই সংক্রান্ত উৎসবই চলে সারাবছর ধরে। পুরুলিয়ার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ধরা পড়ে লোকশিল্পের বিভিন্ন আঙ্গিকে এবং পালা-পার্বণে।
 
এই প্রবন্ধে, আমরা আলোচনা করব পুরুলিয়ার হারিয়ে যেতে বসা দেওয়াল চিত্র নিয়ে।

দেওয়াল চিত্র

কুঁদে অথবা ছবি এঁকে মাটির দেওয়াল অলংকরণের প্রথা গ্রাম-বাংলায় বহুদিন ধরে চলে আসছে। দেয়ালের গায়ে এই অলংকরণকেই পশ্চিমবঙ্গে বলা হয় দেওয়াল চিত্র। বীরভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং মেদিনীপুরের বৃহত্তম আদিবাসী গোষ্ঠী সাঁওতালদের দেয়ালেই মূলতঃ এগুলো দেখতে পাওয়া যায়।

পুরুলিয়ায় এই দেওয়াল চিত্রগুলো সাধারণত কালীপুজোর কাছাকাছি সময়েই আঁকা হয়, কারণ এই একই সময়ে সাঁওতাল জনজাতির এক বড় উৎসব, বাদনা পরব  অনুষ্ঠিত হয়।  তাই এই সময়ে গ্রামের লোকজন তাঁদের পুরনো ঘর পুনরায় মেরামত করেন, সাজিয়ে তোলেন। যেহেতু আর কিছুদিনের মধ্যেই খামার শস্যে ভরে উঠবে, তাই হয়ত এই ঘর সাজানোর প্রেরণা মানুষের ভেতর থেকেই আসে।

দেওয়াল চিত্র আঁকার এই প্রথায় প্রথমে দেওয়ালগুলো গোবর দিয়ে নিকানো হয়, এবং তারপর যে মোটিফ বা চিহ্নের ধরন এবং ধাঁচ ব্যবহার করা হয়, তা প্রকৃতির থেকে অনুপ্রাণিত। উজ্জ্বল রঙগুলো তাঁদের আড়ম্বরবিহীন জীবনযাত্রার সঙ্গে বেশ বেমানান।

ইতিহাস

এইসব দেওয়াল চিত্রের উৎস সম্পর্কিত কোনো লিখিত উপাদান পাওয়া যায় না। মনে করা হয়, এটি এক শৃঙ্খলিত প্রতিক্রিয়া থেকে জন্ম নিয়েছে। প্রথমে একজন ব্যক্তি রঙ দিয়ে ঘর সাজাচ্ছিলেন, তা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ধীরে ধীরে প্রতিবেশীরাও তাঁদের ঘরেও ছবি আঁকতে আরম্ভ করেন। আদিবাসী দেওয়াল চিত্রও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক কাঠামো, এবং ভৌগোলিক অঞ্চলের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরণ এবং আকারে পরিবর্তিত হয়েছে। এটি বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং উৎসব ভেদেও বদলে বদলে যায়। পুরুলিয়া শহরের উপপ্রান্তে হুড়া, লক্ষ্মণপুর, হাতিমারা এবং শুকনিবাসা গ্রামে সাধারণত দেওয়াল চিত্র চোখে পড়ে।

পদ্ধতি

  • মহিলারা বিভিন্ন ধরণের কাদা/মাটি সংগ্রহ করেন। চুনা মাটি মাঠ থেকে জোগাড় করা হয়। তারপর তাকে কুয়ো থেকে তুলে আনা জল দিয়ে মন্ড তৈরী করা হয়।
  • কাদার সঙ্গে গোবর মিশিয়ে দেওয়াল মেরামত করা হয়। একে কথ্য বুলিতে বলা হয় ‘নিকানো’।
  • দেওয়াল সারাই হয়ে গেলে, সাধারণত দুধি মাটি বা খড়ি মাটির একটা প্রলেপ দেওয়া হয়। এমনকি, যখন দেওয়াল ভিজে থাকে তখনো বিভিন্ন ধরণের চিহ্ন / মোটিফ আঙুল দিয়ে খুব দ্রুত আঁকা হয় ।  সাদা মাটি শুকিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন রঙের নকশা আঁকা হয়।
  • পিন্ড, যা সাধারণত দেওয়ালের বাড়তি অংশের চেয়ে পুরু হয়, বসার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটাকে গোবর দিয়ে মোটা করে লেপে দেওয়া হয়, যাতে কিনা বৃষ্টি বা জলে ধুয়ে যাওয়া থেকে একে রক্ষা করা যায়। এটিকে কালো রঙের আঁকা হয়। বৈচিত্র্য আনতে কখনো কখনো এর মধ্যে সাদা মাটিরও কাজ থাকে। পিন্ড নিজে দেওয়াল চিত্র নয় কিন্তু রঙের বৈচিত্র্য আনতে এবং ক্যানভাসের সীমা নির্ধারণে এর গুরুত্ব অপরিহার্য।
  • দেওয়ালের কন্ঠ অংশে থাকে প্রকৃত ক্যানভাস, যেখানে ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে (কাদা অথবা প্লাস্টারের উপর এঁকে সেটাকে শুকানো) কিংবা খোদাই করে  অলংকরণ করা হয়। যেহেতু দেয়ালটাই এক প্রকান্ড ক্যানভাস ফলে একে যথাযথ রূপ দিতে বেশ বিশদে স্তরে স্তরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়।

প্রক্রিয়া এবং উপাদান

দেওয়াল চিত্রের শিল্পীরা নানারকমের সহজলভ্য ,আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা, ফেলে দেওয়া, উপাদান থেকে তাঁদের ছবির জন্য রং যোগাড় করেন।

কালো- টায়ার এবং অন্যান্য শুকনো খোলা ও খড় পোড়ানো ভুসা কালি থেকে পাওয়া যায়।
সাদা- চুন অথবা কাঠখড়ি, খড়িমাটি অথবা দধিমাটি থেকে পাওয়া যায়।
হলুদ- আলয় মাটি অথবা হলুদ থেকে।  
লাল-  গেরি মাটি এবং আলতা থেকে।
নীল- কাপড় সাদা করার জন্য ব্যবহৃত সস্তার নীল এবং ব্লু  ভিট্রিয়ল থেকে, যাকে কথ্যভাষায় ‘নীল বড়ি’ বলে।
সবুজ- শিমের পাতা থেকে। এছাড়াও লেবু জাতীয় উদ্ভিদ ‘জাম্বির’ থেকে।

তুলি তৈরী হয় বিভিন্ন খড়ের প্রান্তভাগ, ছোট ন্যাকড়া, ও স্থানীয় শাল গাছ অথবা পাট গাছের চিবানো গাছের তন্তু। কখনো কখনো সিন্থেটিক তুলিতে কিংবা আঙুলে করে বিভিন্ন নকশা আঁকা হয়।

বিভিন্ন ধরন

দুই প্রকারের দেওয়াল চিত্র গ্রামীণ কুঁড়ে ঘরে মূলত দেখা যায়- প্রথমটি হল দেয়ালে রঙের ব্যবহার। খড়িমাটি অথবা চুন দেয়ালে শুকিয়ে যাওয়ার পর বিভিন্ন ডিজাইন আঁকা হয় দেয়ালে। এই ডিজাইনগুলোর মধ্যে খিলানযুক্ত গঠন, জ্যামিতিক আকার এবং বিভিন্ন জীবজন্তু ও ফুলের আকৃতি দিয়ে সাদা, কালো, নীল ও সবুজ রঙে মূলত ফ্রেস্কো আঁকা হয় দেয়ালে।

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

সহরাই দেওয়াল অধিকাংশ সময়ে হয় একরঙা। কালো জমির উপর ভিজে, দুধে-আলতা রঙের দধিমাটির একটা স্তর আঁকা হয় এবং আঙুল অথবা চিরুনি দিয়ে কালোর মধ্যে সাদা সাদা দাগ টানা হয়। এই ছবিগুলোতে উর্বরতার চিহ্ন থাকে যা মিলন এবং প্রজননের উদযাপনে ব্যবহৃত হয়।

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র
সহরাই দেওয়াল

কিছু কিছু বাড়ির দেয়ালে খোদিত ডিজাইনের ধরন দেখা যায়। এইসব আকর্ষণীয় বাস-রিলিফ ডিজাইন নতুন ঘর তৈরীর সময়ে করা হয়। প্রথমে কাদার একটা মসৃণ স্তর দেওয়ালে লেপে একটা বর্ডার টানা হয়। মসৃণ বর্ডারের ভিতর একটা প্রাথমিক ছাঁচ এঁকে নিয়ে তারপর কাদার স্তর যোগ করা হয়। তারপর বাঁশের ডগা অথবা আঙুল দিয়ে বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা হয়। কখনো কখনো ফ্রেস্কো এবং খোদাই মিশিয়ে সম্পূর্ণ ভাব পরিস্ফুট করা হয়।

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র খোদিত নকশাওলা দেওয়াল

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র খোদিত নকশাওলা দেওয়াল

 

নকশা গুলিকে বোঝা

পুরুলিয়ার দেওয়ার চিত্রের বেশিরভাগ মোটিফ বা চিহ্নগুলো প্রকৃতি থেকে নেওয়া। গাছ, লতাপাতা, ফুল, পশু, পাখি, ফল আর পাঁচটি প্রাকৃতিক শক্তি /পঞ্চভূত- মাটি, জল, আগুণ, হাওয়া আর আকাশ বা শূণ্যতা – এসবের ছবিই বেশি দেখা যায়। বেশিরভাগ সময়েই এই সব চিহ্নগুলি বিমূর্ত (abstract) হয়।

পদ্মফুল

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্রগুলির এক খুবই পরিচিত এবং ব্যবহার করা মোটিফ। এখানে নানারকমের পদ্মফুলের মোটিফ দেখা যায়- কোনওটি খুবই সহজ, কোনওটি একটু জটিল ভাবে আঁকা। অনেক সময়ে পদ্মের সঙ্গে লতার ছবিও আঁকা হয়, যেটার মাধ্যমে জীবন বৃক্ষ বা ‘Tree of Life’ বোঝান হয়। এই ছবিগুলির মাধ্যমে ফিরে আসে অক্ষয়বট বা সেই সুপ্রাচীন বৃক্ষের রূপক, যে গাছটি সবরকমের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও অপরাজেয় জীবনের প্রতীক হিসাবে বেঁচে ছিল।

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পশু ও পাখি

লতাপাতার ছবির মধ্যে মধ্যে দেখা যায় পশু পাখিদের ছবি। ময়ূর,লক্ষ্মী প্যাঁচা, কপোত-কপোতী, গরু তিয়াদি দেখা যায়। খুবই আশ্চর্যের যে, এরা অনেকেই কোনওদিন নিজের চোখে ময়ূর দেখেনি, কিন্তু পূর্বপুরুষদের আঁকা ছবি দেখে দেখে এরা নতুন করে সেই ছবি নিজেদের দেওয়ালে ফুটিয়ে তোলে।লক্ষ্মী প্যাঁচা আঁকা হয় সৌভাগ্যের চিহ্ন রূপে, গরু ভালো ফসলের কামনায় আর কপোত-কপোতীর ছবি আঁকা হয় সুখী পরিবারের কথা মাথায় রেখে।

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

জ্যামিতিক নকশা

নানা রঙের সরল বর্গক্ষেত্র, বৃত্ত আর ত্রিভুজ ব্যবহার করে  দেওয়াল জুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় জ্যামিতিক নকশা। অনেকের মতে, এই জ্যামিতিক আকার গুলির মাধ্যমে পৃথিবীর পাঁচটি মৌলিক শক্তিকে বোঝানো হয় ।

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

আত্মার মোটিফ

কিছু কিছু বাড়ির দেওয়ালে দেখা যায় পরিবারের মানুষদের হাতের ছাপ, যার মাধ্যমে তাঁরা আত্মার  ধারনাকে স্বীকার করে নেন।

 

পুরুলিয়ার দেওয়াল চিত্র

 

পন্ডিতেরা বলেন, এই সমস্ত আপাত সাধারন ছবিগুলির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে প্রাচীনকাল থেকে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কের নানা রহস্য। এইরকম ভাবে দেওয়ালগুলিকে তৈরি করে রং করে ছবি আঁকতে শিল্পীদের খুবই পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সে পরিশ্রমের উপযুক্ত ফল মেলে কই?

ক্রমশঃ আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আমাদের সবার মধ্যেই প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মতা কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পুরুলিয়ার এই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যেও। গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আর এইসব সাবেকী শিল্পকলা শিখতে বা জানতে আগ্রহী নয়। তাই এই ধরনের গ্রাম বা বাড়ির সংখ্যাও ক্রমশ কমে আসছে। আর হয়ত এইভাবেই কোন একদিন, অন্যান্য আরোও অনেক শিল্পকলার মত হারিয়ে যাবে পুরুলিয়ার এই বিশেষ দেওয়ার চিত্র আঁকার ধারাটিও।


ছবিঃ ঈশিতা চন্দ্র
মূল ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন পৃথু হালদার ও মহাশ্বেতা রায়

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা