ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

সকালবেলা তাড়াতাড়ি উঠে স্নান করে ব্রেকফাস্টটাও পুরোপুরি শেষ করিনি, তার মধ্যেই ড্রাইভার এসে হাজির। এই ড্রাইভার আমাকে নিয়ে যাবে বড় বাসস্টপে। বাসস্টপে এসে দেখলাম এর মধ্যেই চারিদিকে রীতিমত তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের লোকের ভাষা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে একটু কান পাতলেই। হাতে একটু সময় ছিল। ব্রেকফাস্টটা পুরোটা শেষ করতে পারিনি বলে তখনও একটু খিদে ছিল। বাসস্টপের গায়েই একটা খাবারের দোকান ছিল। সেখান থেকে এক কাপ "স্কীর" খেলাম। স্কীর হল আইসল্যান্ডের দই। কিন্তু খুব ঘন আর পুষ্টিকরও বটে। একটা খেলেই বেশ পেট ভরে যায়। এখানকার লোকেরা কাজের মধ্যে সময় না পেলে প্রায়শই স্কীর খেয়ে পেট ভরে নেয়।

বাইরে এসে দেখলাম অনেকগুলো বড় বড় বাস দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকটার সামনের কাঁচে গন্তব্যস্থলের নাম বড় করে লেখা। আমাকে যে ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল সে অবশ্য আমাকে কোন বাসে উঠতে হবে তার নম্বরটা বলেই গিয়েছিল। সেটা খুঁজে পেতে বিশেষ অসুবিধে হল না। বাসে বসে পাশের সিটে বসা দুজন ইজরায়েলির সাথে আলাপ হল - একজন একটু বয়স্ক, শরীরের গঠন দেখে যদিও বোঝার উপায় নেই - নাম দানিয়েল, আর সাথে তার ছেলে নাতি। নাতিকে দেখে মনে হল আমার সমবয়েসি বা একটু ছোট। নাতির হাতে অমিতাভ ঘোষের "সী অফ্‌ পপিস" দেখে বলতেই হল যে আমারো পদবী ঘোষ। আরেকটু আলাপ করে কথায় কথায় জানতে পারলাম যে ওরা দু'জনও পরবর্তী দশ দিনের জন্য আমার যাত্রায় সহযাত্রী হবে।

মানচিত্রে তুমি যদি আইসল্যান্ডকে দেখ তাহলে দেখবে অনেকটা পেট মোটা একটা মাছের মত দেখতে। এর মোটামুটি লেজের কাছাকাহি জায়গায় রয়েছে রাজধানী শহর রেইকাভিক। বাকি ছোটখাটো যে শহরগুলো আছে সেগুলো প্রায় সবই দেশটার পরিধি বরাবর। আর সবচেয়ে বড় রাস্তাটাও গেছে পরিধি বরাবর - যেটাতে একবার চক্কর কাটলে তুমি পুরো দেশটা একবার প্রদক্ষিণ করতে পারো। আজ এই রাস্তা ধরে রেইকাভিক থেকে পূর্বদিক বরাবর গিয়ে আমার বাসটা যেখানে গিয়ে থামবে সেই শহরটার নাম "কিরকিউবাইয়ারক্লাউস্টুর", যাকে এখানকার লোক চলতি কথায় শুধু "ক্লাউস্টুর" বলে ডাকে। নামে শহর হলেও আয়তনে আর লোকসংখ্যায় বড়সড় গ্রামের থেকে বড় কিছু নয়। টুরিস্ট বাস বলে লাঞ্চ ছাড়াও রাস্তায় যা যা দেখার জায়গা আছে সব জায়গাতেই কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়াবে।


'ভিক'-এ আগ্নেয়গিরি আর সমুদ্রের সহাবস্থান

রাস্তায় অনেককিছুর মধ্যে যে দুটো জায়গা সবচেয়ে ভাল লাগল তার মধ্যে একটার নাম "ভিক"। ভিক একদম সমুদ্রতটে - আর সমুদ্রতটের গা বেয়েই উঠে গেছে লাভা জমে তৈরী হওয়া পাহাড়।


লাভাস্রোতের ওপর জল এবং হাওয়া ক্ষয়কার্য চালিয়ে তৈরি করেছে এমন সুন্দর সব আকৃতি

সমুদ্রের হাওয়া আর জল সেই পাহাড়ের গায়ে অজস্র সুন্দর আর অদ্ভুত দেখতে খাঁজ সৃষ্টি করেছে। আর সেই সুযোগের সদব্যবহার করে এদিক ওদিক গজিয়ে উঠেছে অনেক পাখির বাসা।


'স্কোগার'-এর জলপ্রপাতের সাথে রামধনুর খেলা

এর পরের জায়গাটার নাম "স্কোগার"। একদিকে লাভা পাথর আর মসের উপর গজিয়ে ওঠা সবুজের সমারোহ আর অন্যদিকে পাহাড়ের উপর থেকে হিমবাহ গলা জল যেন হঠাৎ পা হড়কে পড়ে গিয়ে তৈরী করেছে "স্কোগা" জলপ্রপাত। খুব ছোট জায়গার উপর অনেকটা জল ছিটকে পড়ছে বলে সেই জলের ছিটে সামনের অনেকটা জায়গায় কুয়াশার মত একটা পর্দা তৈরী করেছে। আর সূর্যের আলো তার মধ্যে এদিক ওদিক থেকে ঢুকে পড়ে মাঝেমাঝেই রামধনু তৈরী করছে।

মাঝে এক জায়গায় খানকয়েক রেস্তোরাঁ। বাসটা সেখানে থামল লাঞ্চের জন্য। আইসল্যান্ডের ভেড়ার মাংস খুব বিখ্যাত আর সেই ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরী করা স্যুপ এদেশের খুব জনপ্রিয় খাবার। খাবার টেবিলে বসেই বুঝলাম যে কি প্রচন্ড খিদে পেয়েছে! তাই একটা বড় বাটিতে ভর্তি সুস্বাদু স্যুপ সাবাড় করতে মিনিট দশেকের বেশী লাগল না। বাসে বসে ঘুম পাচ্ছিল, কিন্তু বাসের জানালায় বসে চারিদিকের দিগন্তবিস্তৃত উপত্যকার শোভা দেখতে দেখতে চোখ বুজতে ইচ্ছে করল না। লাভা পাথরের উপর গজিয়ে ওঠা মস যে এত পুরু হতে পারে সেটা এখানে না আসলে বিশ্বাস করতাম না। ধূসরের সাথে সবুজ মিলেমিশে সে এক অদ্ভুত রং! আর তার উপর ছড়িয়ে রয়েছে উঁচুনীচু পাহাড় আর সবুজ ঘাস।


ক্লাউস্টুরে পাহাড়ের ওপর থেকে দেখা সুদূরবিস্তৃত সমভূমি

ক্লাউস্টুরে এসে পৌঁছলাম বিকেল ৪ টে নাগাদ। আজ একরাত সেখানে একটা হোস্টেলে থাকা। আমার দুই ইজরায়েলী সহযাত্রীর সাথে তো বাসেই আলাপ হয়েছিল। এখানে এসে আলাপ হল আমাদের চতুর্থ সহযাত্রী এক অস্ট্রেলিয় মহিলার সাথে - নাম রেনে। জায়গাটা পায়ে হেঁটে একটু এদিক ওদিক ঘুরে, স্নান করে আর হোস্টেলের লাগোয়া রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে যখন ঘরে ফিরেছি তার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের গাইড রবার্ট এসে উপস্থিত। রবার্ট যদিও আমাদের সাথেই যাবে, তবুও ও আমাদের পরবর্তী পাঁচ দিনের যাত্রাপথের একটা মোটামুটি আন্দাজ দিল ম্যাপ দেখিয়ে। ওর সাথে স্যাটেলাইট ফোন থাকবে। আমরা যে পথ দিয়ে হেঁটে যাব সেই পথে স্যাটেলাইট ফোনই একমাত্র ভরসা। আমাদের সকলের পিঠেই থাকবে এক একটা বড় বড় সাইজের ব্যাগ - যাকে বলে ব্যাকপ্যাক। তার মধ্যে আমাদের নিজেদের জামাকাপড়, টুকিটাকি জিনিস, স্লিপিং ব্যাগ, টেন্ট খাঁটানোর সামগ্রী ছাড়াও থাকবে পাঁচ দিনের খাবার ব্যবস্থা। রবার্ট খাবারের জিনিস সব সাথে করে নিয়ে এসেছিল। সেগুলো পাঁচ ভাগে ভাগ করে একটা নিজের কাছে রেখে প্রত্যেককে একটা প্যাকেট করে দিল। খুব ভাবনা চিন্তা করে ওকে এই খাবার প্যাকেট করতে হয়েছে। অনেক হাঁটতে হবে বলে পিঠের ব্যাগে কয়েকশো গ্রাম বেশি ওজন হলেও অনেক বাড়তি পরিশ্রম হবে। আবার উল্টোদিকে এমনভাবে খাবার নিতে হবে যাতে কোনভাবেই কমতি না পড়ে। ওর নিজের ব্যাগটা আমাদের থেকেও বেশ অনেকটা বড়। তার মধ্যে বাকি সব কিছু ছাড়াও আছে রান্না করার সরঞ্জাম। এসব কাজ শেষ করে রবার্ট বেরিয়ে গেল আর বলে গেল যে কাল যেন আমরা সকাল ঠিক সাড়ে সাতটার মধ্যে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে যাই।


রাত সাড়ে এগারোটাতেও দেখা যাচ্ছে অস্তমান সূর্য

তখন রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। কিন্তু আকাশের পশ্চিম দিকে কমলা রঙের সূর্যের কিছুটা তখনও দেখা যাচ্ছে। এ আমার কাছে একটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। সারাদিনের ক্লান্তি রয়েছে, পরের দিন তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠার চিন্তাও রয়েছে, কিন্তু বাইরে দিনের আলো থাকতে কি ভাবে ঘুমাব বুঝতে পারছিলাম না। বাইরে থেকে একটু হেঁটে এসে খানিকটা জোর করেই বিছানায় গিয়ে উঠলাম। আর তারপরেই একদম নির্বিঘ্নে পরের দিন সকাল বেলা ঘুম ভাঙ্গল।


ছবিঃ লেখক

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা