ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

সময়টা ২০১২ সালের আগষ্ট মাসের শুরুর দিকে। পোর্টল্যান্ড শহর থেকে আমার ফ্লাইট এসে পৌঁছল আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকাভিকে ভোর সাড়ে ৬ টা নাগাদ। মালপত্র নিয়ে বাইরে এসে যখন দাঁড়ালাম তখন প্রায় ৭ টা। গ্রীষ্মের এইরকম সময়ে খুব কম সময়েই আইসল্যান্ডে পুরোপুরি অন্ধকার হয়। তাই খুব রোদ না থাকলেও দিনের আলো যথেষ্ঠ ছিল। এয়ারপোর্টটা আসলে রেইকাভিকের একটু বাইরে কেফ্লাভিক বলে আরেকটা ছোট শহরে। বাসে চড়ে রেইকাভিকের বড় বাস টার্মিনাসে এসে পায়ে হেঁটেই আমার গেষ্ট হাউসে চলে এলাম ৮টার মধ্যে। গেষ্ট হাউসে বুকিং তো আছে, কিন্তু মুশকিল হল ঘরের চাবি দুপুরের আগে পাওয়া যাবে না। কি আর করব? গেষ্ট হাউসের ম্যানেজারের অফিসে আমার মালপত্র রেখে আর একটা ছোট ব্যাগ পিঠে নিয়ে আবার ফেরত চলে এলাম বাস স্টেশনে।

দেখলাম বেশ কিছু টুরিস্ট বাস ছাড়ছে সেখান থেকে, যেগুলো চড়ে দিনের মধ্যেই আশেপাশের কিছু জায়গা ঘুরে আসা যায়। আমিও আর সময় নষ্ট না করে একটা টিকিট কেটে বাসে উঠে পড়লাম। গত মাস দু'য়েকের প্রচেষ্টায় এর মধ্যে কিঞ্চিৎ আইসল্যান্ডিক ভাষা বলতেও শিখেছি। এখানে যদিও সকলেই খুব সাবলীল ইংরেজী বলতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য করলাম যে, ওদের ভাষা বলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা দেখালেও ওরা খুবই খুশী হয়।


গুলফস

আমাদের বাস প্রথমে নিয়ে গেল "গুলফস" নামে একটা জলপ্রপাতের কাছে। আক্ষরিক অনুবাদ করলে "গুলফস" এর মানে দাঁড়ায় - সোনালী (গুল) জলপ্রপাত (ফস)। সূর্যের আলোর প্রতিফলনে সত্যিই সোনালী রঙের দেখতে লাগছিল জলপ্রপাতটাকে। আমি বাস থেকে নেমে একটু হেঁটে যেখানে এসে দাঁড়ালাম সেখান থেকে জলস্রোত ধুপ করে নেমে পড়ছে অনেকটা নীচে। তার সাথে জলের গর্জনের শব্দ আর চারিদিকে কুয়াশার মত ছিটে পড়ছে জলোচ্ছ্বাস। এই জল আসছে আইসল্যান্ডের অগুণতি হিমবাহের কোন এক হিমবাহের জল গলে।


গাইজার

এরপর গেলাম "গাইজার" বলে একটা জায়গায়। জায়গা বলতে শহরের একটু বাইরে পাহাড়ের উপত্যকার ফাঁকা একটা জায়গায় রয়েছে অসংখ্য প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ। এই "গাইজার" শব্দ থেকেই এসেছে ইংরেজী শব্দ "গীজার" শব্দ। শীতের সময়ে স্নান করতে গরম জলের দরকার হলে তুমি হয়তো বাবা-মার কাছে "গীজার" কথাটা শুনে থাকবে। এগুলো বেশীরভাগই মাটির নীচে। হটাৎ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তোমার চোখের সামনে জেগে উঠবে একটা গরম জলের ফোয়ারা আর মিনিট খানেকের মধ্যে চোখের সামনে হটাৎ করে ভ্যানিশ করে যাবে।


এই সেই গরম জলের গীজার

এরপর একটা জায়গায় বাস থামল দুপুরের খাওয়াদাওয়ার জন্য। আইসল্যান্ডের ভেড়ার মাংস খুব বিখ্যাত। আর সেই ভেড়ার মাংস দিয়ে তৈরী সুপ আর পাউরুটি খুবই প্রচলিত খাবার। আমিও তাই দিয়ে দুপুরের খাওয়া সারলাম। আর তার সাথে এক কাপ "স্কীর"। "স্কীর" হল খুব ঘন দই। এক কাপ স্কীর খেয়েই শুধু এক বেলা কাটিয়ে দেওয়া যায়। খিদে পেয়েছিল প্রচন্ড। তাই সব কিছুই একদম অমৃত মনে হল। বাসে বসে একটু চোখ লেগে এসেছিল। চোখ খুলে দেখলাম এবারে আমরা শহরের অনেকটা বাইরে চলে এসেছি। বাসে ক্যাসেট প্লেয়ারে জায়গাগুলোর বিবরণ দিয়ে যাচ্ছিল। তার থেকে জানলাম এই জায়গাটার নাম "থিংভেলির ন্যাশনাল পার্ক"।


থিংভেলির ন্যাশনাল পার্ক

তুমি যখন পৃথিবীর ভূ-তত্ব নিয়ে আরো পড়াশোনা করবে, তখন জানতে পারবে যে পৃথিবীর উপরের স্তরটা অনেকগুলো প্লেট বেঁকিয়ে বেঁকিয়ে জোড়া লাগিয়ে একটা গোলক বানালে যেমন হয়, অনেকটা সেরকম। এই প্লেট গুলোকে বলে "টেকটনিক প্লেট"। এই প্লেটগুলো যখন এদিক-ওদিক নড়াচড়া করে তখনই হয় ভূমিকম্প। এই রকম দুটো প্লেট যেখানে জোড়া লেগেছে, তার ঠিক উপরে বসে আছে আইসল্যান্ড দেশটা। বাসের গাইড আমাদের বলল যে প্রতি বছর এই প্লেটগুলো নাকি বাইরের দিকে এক ইঞ্চি করে সরে যাচ্ছে আর মাঝের সেই ফাটল ভরে যাচ্ছে আগ্নেয়গিরির লাভা জমে যাওয়া পাথরে। এই থিংভেলির ন্যাশনাল পার্কে এক সময় ছিল এদেশের পার্লামেন্ট, যখন আইসল্যান্ড ছিল তার শৈশবে। নরওয়ে থেকে ভাইকিংরা এসে সবে হয়তো বসবাস শুরু করেছে। এখন পার্লামেন্ট নেই এখানে, কিন্তু আছে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। গাঢ় নীল রঙের একটা লেক রয়েছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। বেশ কিছু জায়গায় দু'দিকের প্লেটের সেই মাঝের ফাটলও বেশ স্পষ্টই বোঝা যায়।

এখানে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাফেরা করে বাসে করে ফিরে এলাম বাসস্টপে। গেষ্টহাউসে ফিরে ঘরে এসে স্নান করে যখন বেরলাম তখন সন্ধ্যে ৭ টা। আবার বেশ খিদে পেয়েছে। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পরে স্নান করে বেশ আরাম লাগছিল। খাটের উপর গা এলিয়ে দিয়ে গাইডবুক নেড়েচেড়ে খুঁজছি যে কোথায় রাতের খাবার সারা যায়। একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। জানালা দিয়ে বাইরের আলো চমৎকার দেখা যাচ্ছে তখনও। খুব বেশিক্ষণ ঘুমোইনি নিশ্চয়ই তাহলে। হাত বাড়িয়ে ঘড়িটা টেনে নিয়ে চোখ পড়তেই আমার মাথায় হাত! রাত ১২ টা! উত্তর গোলার্ধের একদম উত্তরের দেশগুলোতে এই সময় আলো অনেকক্ষণ থাকে জানতাম, কিন্তু সেটা যে এরকম সেটা কখনও ভাবতেই পারিনি। যাই হোক, আর সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি হেঁটে ভাগ্যক্রমে বেশ কিছু দোকান খোলা পেয়ে গেলাম। রতের বেলায় শহরের এই জায়গাটা বেশ জমজমাট। রক মিউসিক-এর আসর বসেছে কয়েক জায়গায়। এইরকম এক জায়গায় বসে গান শুনতে শুনতে খেয়াল হল যে পরের দিন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে হবে। বাইরে বেরিয়ে যখন গেষ্ট হাউসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম তখন রাত ২ টো। এর মধ্যেই অল্প অল্প ভোরের আলো ফুটটে শুরু করেছে।


রেইকাভিক শহর

একদিনের অল্প সময়ে বেশ লাগল আজ রেইকাভিক শহর আর তার আশেপাশের জায়গাগুলোকে। খুব বড় শহর না হলেও বেশ ছিমছাম আর রয়েছে আধুনিক জীবনের সব সুযোগসুবিধাও। আর মানুষগুলোকেও বেশ লাগল। খুব গায়েপড়া না হলেও মনে হল এরা বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ, সাদাসিধে আর কঠোর পরিশ্রমী। পরের দিন আবার সকালে ওঠা, আর তারপর শুরু পরের ৯ দিনের অনেক অ্যাডভেঞ্চার। ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে বিছানায় শুতেই ঘুমে চোখ লেগে এল।

(ক্রমশঃ)


ছবিঃ লেখক

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা