ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
 বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়াম

ঝকঝকে কাঁচের আয়তাকার বাক্সের মধ্যে টলটলে জলে তিড়িং বিড়িং খেলে বেড়ানো লাল, নীল, হলুদ,কালো, রূপোলি, সোনালি ...কত রঙের,কত রকমের মাছ -ছোট, বড়, বাচ্চা, বুড়ো, রোগা, মোটা ! তিরতিরে জলে, গোলগাল নুড়ি পাথরের খাঁজে খাঁজে লকলকিয়ে দুলে চলেছে সবুজ জলজ উদ্ভিদের শরীর; বুড়বুড় করে জল ঠেলে ঠেলে উঠছে বিন্দু বিন্দু বাব্‌লের খুশি -কিসের কথা বলছি জিজ্ঞেস করলে তুমি এক্ষুনি চিৎকার করে উঠবে -- 'অ্যাকোয়ারিয়ামমমম' ! কিন্তু তুমি কী জানো, এমন 'অ্যাকোয়ারিয়াম'ও আছে যা একটা পাঁচতলা বাড়ির সমান বড়ো, যার প্রতিটি তলায় ছড়ানো ছিটানো রয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা জলচর ও উভচর প্রাণীর সম্ভার ,যার পেটের ভেতর থই থই করছে ৮,৩০০,০০০ লিটারেরও বেশী জলের বিস্তার, যার আশ্রয়ে রয়েছে ৭৫০ প্রজাতির জলজ প্রাণীর প্রায় ১৭০০০ এরও বেশী নমুনা ! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়াম এমনই একটি অ্যাকোয়ারিয়াম যার ভিতরে ছড়ানো-ছিটানো টুকরো টুকরো অ্যাডভেঞ্চারের নির্মল ভালোলাগা আজ আমি তোমার সাথে ভাগাভাগি করে নেবো !

 বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়াম
দিনের আলোয় বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়াম

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ইনার হার্বরে অবস্থিত বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়ামটির উদবোধন হয়েছিল ১৯৮১ সালের আগস্ট মাসে। এই অ্যাকোয়ারিয়ামটির প্রধান ও প্রথম উদ্দেশ্যই হল পৃথিবীর জলজ সম্পদের সংরক্ষণকে উৎসাহিত করা । কিভাবে ?এই অ্যাকোয়ারিয়াম তার বিভিন্ন কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে এই সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করে চলেছে - যেমন চেসাপীক বে জলাভূমিকে পরিচ্ছন্ন রাখা, MARP অর্থাৎ মেরিন অ্যানিমাল রেস্কিউ প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে সমুদ্রোপকূলে এসে আটকে পড়া অসহায় , আহত সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের উদ্ধার করে,তাদের সুস্থ করে আবার তাদের সমুদ্রে ফিরিয়ে দেওয়া ।মেরিন অ্যানিমাল রেস্কিউ প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়াম অগুনতি সীল, ডলফিন,পাইলট তিমি, ম্যানাটী বা বিশাল আকারের শুশুক বিশেষ ,সামুদ্রিক কচ্ছপকে উদ্ধার করে, তাদের চিকিৎসা ও সঠিক দেখভালের মাধ্যমে সুস্থ করে তুলে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছে । এছাড়াও অ্যাকোয়ারিয়ামটি তার এই সুবিশাল প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে বহু বিপদগ্রস্থ প্রাণীর চিরদিনের মত পৃথিবীর কোল থেকে হারিয়ে যাওয়া রুখতে সক্ষম হয়েছে ।

অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে
অ্যাকোয়ারিয়ামের ভেতরে

অ্যাকোয়ারিয়ামটিতে পাঁচটি লেভেল বা তলা রয়েছে যার প্রতিটি এক একটি নির্দিষ্ট থীমকে তুলে ধরেছে । যেমন 'পিয়ার থ্রি প্যাভিলিওনে'র প্রথম লেভেলে রয়েছে 'ব্ল্যাকটিপ রীফ' যা ভারত - প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবাল দুনিয়াটার এক হুবহু প্রতিরূপ ,৬৫-৭০ প্রজাতির মাছ, 'ব্ল্যাকটিপ রীফ হাঙ্গর', গ্রীণ সি টার্টল -সব মিলিয়ে সে এক 'কাকে দেখি আর কাকে রাখি' অবস্থা !দ্বিতীয় তলায় রয়েছে 'মেরিল্যান্ডঃ মাউন্টেন টু দ্য সি', যেখানে মেরিল্যান্ডের বিভিন্ন জলজ প্রাণী যেমন বুলফ্রগ, ডায়মন্ডব্যাক টেরাপিন ( ছোট প্রজাতির কচ্ছপ) স্বচ্ছন্দে চলেফিরে বেড়াচ্ছে । তৃতীয় তলায় রয়েছে 'সার্ভাইভিং থ্রু আড্যাপ্টটেশন' অর্থাৎ পৃথিবীর বদলে যাওয়া পরিবেশের সঙ্গে খাপ কাইয়ে নিয়ে যেসব প্রাণীরা টিঁকে গেছে, তাদের গল্পই বলা হয়েছে এই লেভেলে- যেমন 'ইলেক্ট্রিক ইল' মাছের শিকারকে তড়িতাহত করার করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে যা তাদের 'অভিযোজন'-এর এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

 ব্লু পয়সন ডার্ট ফ্রগ
ব্লু পয়সন ডার্ট ফ্রগ

চতুর্থ লেভেল অর্থাৎ 'সি ক্লিফস, কেল্প ফরেস্ট, প্যাসিফিক কোরাল রীফ,আমাজন রিভার ফরেস্টে' রয়েছে বহু বৈচিত্র, নাম শুনেই বুঝতে পারছ-এখানে রয়েছে নানা ধরনের জলজ প্রাণীর সম্ভার, রয়েছে একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি খাড়াই'সি ক্লিফ' যেখানে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা সামুদ্রিক পাখীর দল, জলের তলায় আর জলের উপরে সবুজ গাছপালার জঙ্গলের মাঝে নিশ্চিতে চরে বেড়ানো কতশত প্রাণীর বসবাস। পঞ্চম লেভেলএ 'ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট' ক্রান্তীয় অঞ্চলের বহুবিধ দুষ্প্রাপ্য গাছ ও বিপন্ন প্রাণীর বাসভূমি-বিষাক্ত ব্লু পয়জন ডার্ট ফ্রগ,বিপদগ্রস্ত গোল্ডেন লায়ন ট্যামারিন,ভয়ঙ্কর ট্যারেন্টুলা তাদের মধ্যেই কয়েকটি চমকে দেবার মত প্রাণী। এছাড়া 'আটলান্টিক কোরাল রীফ' , আর 'শার্ক অ্যালি'র আকর্ষণও কিন্তু মোটেই হেলাফেলার নয় !

 ডলফিন ডিসকভারি
ডলফিন ডিসকভারি

এই বিল্ডিংটির সঙ্গে সংযুক্ত অপেক্ষাকৃৎ ছোট 'পিয়ার ফোর প্যাভিলয়ন'টিতে রয়েছে 'ডলফিন ডিসকভারি'-সুবিশাল নীল জলের জলাধার বা পুলে খেলে বেড়াচ্ছে আটটি আটলান্টিক ডলফিন ।

 জেলিফিশ
জেলিস ইনভেজন

রয়েছে 'অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট অস্ট্রেলিয়া' আর রয়েছে- 'জেলিস ইনভেজন' যা তোমার সাথে আলাপ করিয়ে দেবে নয়টি বিভিন্ন প্রজাতির অদ্ভুত, রহস্যময়,প্রাগঐতিহাসিক জেলিফিশের আশ্চর্য সুন্দর উপস্থিতির সঙ্গে। এটা নিশ্চই জান তুমি যে জেলিফিশের শরীরে কোন হাড়, হৃৎপিন্ড বা মস্তিস্ক নেই, অবশ্য স্নায়ুর এক নেটওয়ার্ক রয়েছে যা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোন এই 'মাল্টি-অর্গ্যান অ্যানিমালে'র শরীরবৃত্তীয় কাজগুলি সম্পন্ন করছে ।

ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট
ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট

সবার শেষে একটা কথা মনে পড়ে গেল-বাল্টিমোর ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়ামের মোম পিছলানো দেওয়ালে বিখ্যাত আমেরিকান নৃতত্ববিদ লোরেন আইজলির কয়েকটা কথা বড় বড় অক্ষরে জ্বল জ্বল করছে--'if there is magic on this planet, it is contained in water' -সত্যিই তো তাই, তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থলে তৈরি পৃথিবীর কোথাও যদি ম্যাজিক থেকে থাকে, তো তা রয়েছে এই জলেই। আমাদের কাজ শুধু সেই ম্যাজিকটুকুর সন্ধানেই এগিয়ে চলা ,অতলান্ত ,অনন্ত গভীরে !


ছবিঃ লেখকের সংগ্রহ থেকে

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা