ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
গজুমামা আসলে রোগা

"জলখাবারে ফুলকো লুচি
যতই খাওয়াও, নেই অরুচি
সঙ্গে আলুরদম আর বোঁদে
থামলি কেন? দে, আরও দে।"

গাড়ি করে গজুমামার সঙ্গে বর্ধমান যাচ্ছিলাম। শক্তিগড়ে হাইওয়ের ধারে একটা হোটেলে ঢুকেছি, ব্রেকফাস্ট করতে। মামার খাওয়ার বহর দেখে হোটেলের ছেলেটাও ইতস্তত করছিল; আর লুচি দেবে কিনা ভাবছিল। এরপর লুচিগুলো গোগ্রাসে শেষ করে মামা যখন ইয়া বড় দুটো ল্যাংচা নিল, আমিও আর থাকতে না পেরে বলে ফেললাম, "মামা, অত খেয়ো না, আরও মোটা হয়ে যাবে।"

"আগে পদ্যটা কেমন মেলালাম বল!"
গজুমামা মুখে মুখে এরকম পদ্য বানায়। বললাম, "দারুণ, মামা। কিন্তু, বলছি..."
"বলছিসটা কী? আমি মোটা? আমাকে মোটা বলছিস?"
"মোটা নয়?"
"মোটেই না! আমাকে দেখতে এরকম মোটা লাগে, কিন্তু আসলে আমি রোগা। খুবই রোগা। দিনে দিনে আরও রোগা হয়ে যাচ্ছি। ভালোমন্দ খাওয়াটা তাই ভীষণ জরুরি।"
"দেখতে মোটা, আসলে রোগা মানে?"
"মানে, একে বলে নেগেটিভ রোগা। অনেকটা মাইনাসে মাইনাসে প্লাস-এর মতো ব্যাপার।"
"নেগেটিভ রোগা আবার কী জিনিস?"
"দাঁড়া, বুঝিয়ে বলছি, আগে চা বলি। ওরে ভাই, বড়ো গেলাসে ভালো করে দু'টো গরম চা দে তো দেখি। হ্যাঁ, এবার শোন। তুই কি জানিস আমি বাঁ হাতে লিখি?"
"হ্যাঁ, জানি তো! তুমি তো ন্যাটা।"
"অথচ ছোটবেলায় আমি কিন্তু মোটেই ন্যাটা ছিলাম না। ডান হাতে লিখতাম, ডান হাতে বল করতাম - রাইট আর্ম অফ স্পিন; ফুটবলে রাইট উইং-এ খেলতাম, ডান পায়ে শট মারতাম।"
"তারপর? ন্যাটা হয়ে গেলে কী করে?"
"আরে শোন না, সেটাই তো বলছি। ছোটবেলায় আমি রোগাই ছিলাম, মানে খুব রোগা নয়, আবার মোটাও নয়, যাকে বলে ঠিকঠাক। ক্লাস এইটে যেই না উঠলাম, ওমনি বাবা, মানে তোর দাদু বললেন, খেলাধুলো সব বন্ধ, এখন খালি পড়াশুনো, তিন বছর পর মাধ্যমিক। ব্যাস, সারাদিন ঘরে বসে শুধু পড়া আর পড়া, কোনও ক্যালোরি খরচা নেই, আমি মোটা হতে শুরু করলাম। মোটা হতে হতে, মোটা হতে হতে একদম ফুলকো লুচি হয়ে গেলাম, থলথলে একটা ফুটবলের মতো। স্কুলের বন্ধুরা মোটু বলে খেপায়, মাস্টারমশাইরা কুমড়োপটাশ বলেন, দৌড়তে পারি না, লাফাতে পারি না, একটু জোরে হাঁটলে হাঁপাই। ভাবলাম, ধুত্তেরি, যে করে হোক রোগা হতেই হবে ফের। একদিন, সোনাভাইয়ের আলমারি ঘাঁটতে ঘাঁটতে উপায়টা হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেললাম।"

সোনাভাই হলেন গজুমামার ঠাকুদ্দা, আমার বুড়োদাদু। তিনি ছিলেন জাঁদরেল কবিরাজ! গজুমামার কাছে শুনেছি, ইংরেজরা তাঁর কাছে ছাড়া চিকিৎসাই করাত না। ভারতের আবহাওয়ায় মানিয়ে নিতে না পেরে সাহেবরা নানারকম অসুখ বাধিয়ে বসত - পেটের ব্যামো, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, সর্দিকাশি – আর ছুটে ছুটে আসত সিধু কোবরেজের কাছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাহেবরা সোনাভাইকে লন্ডনে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। তখন হঠাৎ একদিন তিনি কোথায় উধাও হয়ে যান; ইংরেজদের আবদার থেকে বাঁচতে সন্ন্যাসী হয়ে গৃহত্যাগ করেন। মামাবাড়িতে সোনাভাইয়ের ঘরে তিন-চারটে বড়ো বড়ো কাঠের আলমারি আছে। তাতে নানারঙের কাচের বোতলে হরেকরকম ওষুধ, প্রচুর বইপত্র, খাতা, ডায়েরি, ওষুধ তৈরির যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ঠাসা।

"কী পেলে? রোগা হওয়ার ওষুধ?"

গজুমামা আসলে রোগা

"হ্যাঁ রে, শোন না! আমি মাঝে মাঝেই সোনাভাইয়ের আলমারিগুলো ঘাঁটতাম, তাঁর ডায়েরিগুলো পড়তাম। একদিন দুপুরে, সেরকমই একটা কালো চামড়ায় বাঁধানো ডায়েরি পড়ছি। ওতে নিজের তৈরি নানা ওষুধ-বিশুধ সম্পর্কে উনি লিখে রেখেছেন। পড়তে পড়তে একজায়গায় দেখি লেখা – 'কৃশকারক (শিশি #৫৪২) – মেদসংহারক আরক, স্থূলদেহ কৃশকায় হইবে।' তলায় ছোট্ট ছোট্ট করে ইংরেজিতে লেখা – 'ডোজ টু বি ফাইনালাইজ্‌ড্‌, এক্সপেরিমেন্ট পেন্ডিং' পরের দু'দিন তন্নতন্ন করে আলমারি ঘেঁটে ৫৪২ নম্বর শিশিটাও পেয়ে গেলাম। ছোট্ট সাদা শিশি, ভেতরে সবুজ রঙের একটা তরল। ব্যাস, আমায় আর পায় কে! ঢক করে পুরোটা খেয়ে ফেললাম।"

"সে কী! পুরোটা?"
"পুরোটা! রোগা হবার জন্য তখন আমি মরিয়া। ওষুধটা খেতেও দারুণ, তেতো নয় মোটেই।"
"তারপর?"

"সেটাই তো বলছি! সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা কেমন ঝনঝন করে উঠল, টাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে বসে পড়লাম, দরদর করে ঘামতে শুরু করলাম। বাড়িতে তখন কেউ ছিল না; দাদু-দিদা-বুড়োদিদা সবাই বেনারসে তোর মাসির কাছে গেছেন। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর ভুতোকাকা (মামাবাড়ির সবাইকে সারাবছর দেখেশুনে রাখার লোক) একতলায় ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছে। দু'ঘন্টার মধ্যে টের পেলাম আমি রোগা হতে শুরু করেছি। সন্ধ্যের মধ্যে একদম আগের মতো। রাত্তিরে যখন খাওয়ার সময় হল, তখন রোগা হতে হতে প্রায় একটা স্কেলের মতো সরু, চ্যাপ্টা হয়ে গেছি। ভুতোকাকা খাবার জন্য ডাকতে এসেছিল, দরজা না খুলে বলে দিলাম -খিদে নেই, তুমি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়। একটু ভয় ভয় লাগছিল, কিন্তু ভাবলাম, ভয় কী? রোগা হতে চেয়েছিলাম, রোগা হচ্ছি, মরে তো আর যাইনি! লাইট বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লাম।

"পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আমি ফের নর্মাল। মানে মোটা নয়, রোগাও না, খেলাধুলো বন্ধ হবার আগে যেমন ছিলাম তেমন। দারুণ ফুর্তি হল মনে। তাড়াতাড়ি মাঠে গিয়ে পাঁই পাঁই করে তিন পাক দৌড়ে এলাম। ভুতোকাকা তো আমায় দেখে অবাক। বললাম, হুঁ হুঁ বাবা, রোজ দরজা বন্ধ করে ঘরের ভেতর ডনবৈঠক দেই কিনা!

"কিন্তু এরপর পড়তে বসেই খেয়াল করলাম, আমি নিজের অজান্তেই বাঁ হাতে লিখতে শুরু করেছি। ডান হাতে লিখতেই পারছি না, যেন লিখিই নি কোনোদিন ডানহাতে। একটা সন্দেহ হতে ছুট্টে আয়নার সামনে গিয়ে জামাটা খুলে ফেললাম। দেখলাম, হ্যাঁ, যা ভেবেছি তাই! আমার বাঁ কাঁধের ওপর একটা তিল ছিল, সেটা চলে গেছে ডান কাঁধে। তার মানে কেসটা বুঝতে পারছিস?"

"না, কী করে হল?"

"বুঝতে পারলি না? রোগা হতে হতে, রোগা হতে হতে সরু চ্যাপ্টা একটা স্কেলের মত হয়ে ঘুমিয়েছিলাম, ঘুমের মধ্যে আরও রোগা হয়ে প্রথমে জিরো, তারপর নেগেটিভ হয়ে গেছি, রিভার্স হয়ে গেছে আর কি! ডান হাতটা বাঁদিকে চলে গেছে, বাঁ হাতটা ডানদিকে। আমি তখন আমারই একটা মিরর ইমেজ। ওষুধের ডোজটা কী ছিল সে তো আর জানি না ছাতা! ঝোঁকের মাথায় পুরোটা একবারে খেয়ে নিয়েছি। খুব কড়া ওষুধ! সে আরকের এফেক্ট এখনও পুরো যায়নি, অল্পস্বল্প কাজ করে চলেছে আজও।"

"কীরকম?"

"বুঝলি না? এই যে লোকে ভাবে আমি নাকি মোটা হচ্ছি, আসলে কিন্তু আরও রোগা হচ্ছি। চওড়ায় ক্রমশ বেড়ে চলেছি, তার মানে আমার ডান কাঁধ আর বাঁ কাঁধের মধ্যে দূরত্বটাও ক্রমে বেড়েই চলেছে। অর্থাৎ এখনও রোগা হয়ে চলেছি। চিন্তা কর! এক ওষুধের কী তেজ! সেই কবে খেয়েছিলাম, তারপর প্রতিদিন কত কত চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় খেয়ে চলেছি, খেয়েই চলেছি, তাও রোগা হওয়া আটকাতে পারছি না। তাই বলছিলাম, ভালোমন্দ খাওয়াটা আমার পক্ষে ভীষণ জরুরি। ওরে ভাই, কোথায় গেলি, দশটা জাম্বো ল্যাংচা প্যাক করে দে দেখি, নিয়ে যাব। চল ভাগনে, গাড়িতে ওঠা যাক।"

"মামা, আরও দশটা ল্যাংচা নেবে? এত খাবে কে?"
"তুই বেশি খাস না। একটা নয় টেস্ট করে দেখিস! তুই তো আর সেই আরক খাসনি, বেকার মোটা হয়ে যাবি। বাকিগুলো আমি মেরে দেব।"
"বাকি ন'টা তুমি একলা খাবে? মামা, সেই আরকের শিশিটা নেই? ওর তলায় কি একটুও সেই সবুজ সবুজ আরক আর লেগে নেই?"
"সে কী আর এখন খুঁজে পাওয়া যাবে? ঠিক আছে, তুই না হয় দু'টো ল্যাংচা খাস।"


ছবিঃ পার্থ মুখার্জি

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা