ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
তিন্নি ও তার বন্ধুরা

অনেকদিন তিন্নিকে নিয়ে কোন গল্প লিখিনি। আসলে মনে হচ্ছিল তিন্নি বোধহয় বড় হয়ে গেছে। তিন্নির বয়স এখন বারো, ক্লাস সেভেনে পড়ে। এবারে আই-পি-এল এর পুরো সিজনটাতেই বাবা-মার বকুনি গ্রাহ্য না করে বিকেলে পড়া ফাঁকি দিয়ে কী রাত জেগে প্রায় সবকটা খেলাই দেখেছে। বাড়িতে টেলি কিডস্ আসা বন্ধ হওয়ার পর ইদানীং টেলিগ্রাফের টি টু পড়ছে আর নানা বিষয়ে মায়ের অজ্ঞতা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে। মা যে কেন আনন্দবাজারের পাতা ওল্টায় আর ইংরেজি কাগজের মেন শিটটা পড়ে ওর মাথায় ঢোকেনা। কাগজেতো এক পড়ার মতো আছে খেলার খবর, মার আবার তাতেও ইন্টারেস্ট নেই। সত্যি, মা টা বড্ড ছেলেমানুষ!

তিন্নি আজকাল মাঝে মাঝে এইসব কথা বলছে বলেই ভাবছিলাম বোধহয় ও বড় হয়ে গেল। মুশকিল হচ্ছে যে এখন ওর বেব্লেড ফেজ চলছে। রোজ রাতে নতুন গ্যালাক্সি পেগাসাস বেব্লেড হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘুমোতে যাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই তিন্নির একেকসময় একেকটা ফেজ চলেছে। ও যে বয়েসে পৌঁছেছে তাতে হ্যারি পটার কিম্বা হানা মন্টানা ঠিকই ছিল, কিন্তু বেব্লেড! সেদিন মায়ের বকুনি শুনে তিন্নি সবে বলেছে যে ওর বন্ধু তিতাসের ভাই বাবলুরও বেব্লেড পছন্দ, মা বলে কীনা তাতেই বোঝা যাচ্ছে যে তিন্নির বয়সটা আসলে কত। বাবলুতো মোটে ওদের থেকে তিন বছরের ছোট। মা আবার বলে, ও হরি, এতো প্লাস্টিকের লাট্টু। এর থেকে এমনি লাট্টুই ঢের ভালো। হুঁ, মা আর বুঝবে কী, বেব্লেড মেটাল মাস্টার্স, মেটাল ফিউশন একটাও শো দেখেছে? পারবে জিঙ্গার মতো ব্যাটেলে নাম্বার ওয়ান হতে? আর ও বুঝি মায়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে বেব্লেড মেটাল ফিউশনে ক্লিক করে দেখেনি যে তাতে দু হাজার সাতশ পঁচাত্তরটা লাইক আছে? তারা সবাই বুঝি তিন্নির থেকে ছোট? তিন্নিরতো ফেসবুকে কোন অ্যাকাউন্টই নেই। মাকে কত করে ও বলল একটা লাইক দিয়েই দাওনা, মা কিছুতেই রাজী হলনা। বলল, বার্বিতে লাইক দিয়েছি ব্যস ওই পর্যন্তই, তাই বলে বেব্লেড! আমিতো আর পাগলটাগল হয়ে যাইনি! মাটা সত্যি একেবারে যা তা, ওদিকে দেখনা হ্যারি পটারের যতগুলো পেজে পেরেছে লাইক দিয়ে রেখেছে...নাঃ বাবাকেই বলতে হবে বেব্লেডে লাইক দেওয়ার জন্য। বাবার সঙ্গেই যা শোগুলো নিয়ে খানিক আলোচনা করা যায়। আর কার্টুন নেটওয়ার্কের লোকগুলোরই বা কী আক্কেল, দিবিতো দে একেবারে সন্ধ্যাবেলায় পড়ার সময় রোজ শো! কোন বাবা-মা দেখতে দেবে! তিন্নি কী আর করে ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে উঠে ইন্টারনেটের ফ্রি পিরিয়ডে গোটা পঞ্চাশেক শো ডাউনলোড করে মাত্র পঁচিশটাই না দেখেছে। তাওতো কানে ওয়াকম্যান গুঁজে, কাউকে ডিসটার্ব না করেই...। তারপর অবশ্য সারাদিনে বেশ কয়েকবার বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়ছিল। তাও বাবা খামোখাই বকল ইউনিট টেস্ট চলছে বলে, আর মা ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পড়াশোনার জন্য যদি কোনদিন অত সকালে উঠতিস! যেন ও পড়াশোনা করেনা! তবে মায়ের কথা মোটামুটি অত গায়ে না মাখলেই চলে যায়...সব মায়েরাই সমান। এইতো সেদিন স্কুলে প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে আলোচনা করছিল যে দুজনের মাই খালি সারাদিন ধরে এটা খা ওটা খা করবে আর পড়তে বস, পড়তে বস বলে মাথা ধরিয়ে দেবে। ওইসব ছাতু, চিঁড়ে, মুড়ি কাঁহাতক আর খাওয়া যায়...সে যদি এরা বুঝত! যাক্ গে। অবশ্য দেরী করে ঘুম থেকে উঠলে বা পড়ার বইয়ের নীচে গল্পের বই রেখে পড়লে মা বিশেষ বকেনা...ওইসব কাজ নাকি মাও করেছে। বাবা অবশ্য এসব নিয়ে মাঝে মাঝে বকাবকি করে, তবে আবার তিন্নির জন্য গ্যালাক্সি পেগাসাস বেব্লেড কিম্বা চারবাটনের পেন্সিল বক্স কিনে আনেন, কীভাবে শো ডাউনলোড করতে হয় দেখিয়ে দেন। ফলে বাবা-মাকেও মোটামুটি বন্ধুর মধ্যেই ফেলা যায় বলে তিন্নির মনে হয়।

গল্পের বইয়ের মানুষজন বা মা-বাবা ছাড়াও তিন্নির অবশ্য এখন বেশ কয়েকজন বন্ধু হয়েছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে কাছের তিনজন বোধহয় ব্ল্যাক বিউটি, হোয়াইট বিউটি আর ব্রাউন বিউটি। পাড়ার এই তিনরঙের নেড়ি কুকুরগুলো তিন্নিকে একতলার কোলাপসিবেল গেট দিয়ে বেরোতে দেখলেই ভয়ানক লেজ নাড়ে, তিন্নির কাছ ঘেঁষে আসে। আর তিন্নির হাতে বিস্কুট থাকলেতো কথাই নেই। মায়ের ভুরুটা একটু কুঁচকে গেলেও তিন্নি মাঝে মাঝেই ওদের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। এরা নাকি ওর নিজস্ব কুকুর, একেবারে নিজস্ব মা, বাবা আর দিদামার মতই। আসলে তিন্নির খুব কুকুর পোষার শখ কিন্তু মায়ের ভীষণ আপত্তি। তিনি বলেন, তুমিতো স্কুলে চলে যাবে, তারপরে ওকে নাওয়াবে খাওয়াবে কে? কোথাও বেড়াতে গেলে কোথায় রেখে যাব? তিন্নি বহুবার গল্প করেছে যে ওদের ক্লাসের তিয়াসাদের দুই বোনের দুটো কুকুর আছে। ওরাওতো স্কুলে আসে। তার ওপর তিয়াসার বোনতো একেবারে ছোট্ট, ক্লাস ওয়ানে পড়ে। তারও যদি কুকুর থাকতে পারে তাহলে ওর থাকবেনা কেন? মা বলেন, তোকেই এখনো মানুষ করে উঠতে পারলামনাতো আবার একটা কুকুর! তিন্নি যত বোঝাতে যায় যে কুকুরকে কি কেউ কোনদিনও মানুষ করতে পেরেছে? কীযে বলেনা মা...কিছুতেই বুঝতে চায়না। আসলে তিন্নির মা জুওলজি নিয়ে পড়াশোনা করলেও জীবজন্তুদের থেকে সাতহাত দূরে থাকতেই ভালোবাসেন। আরশোলা দেখে তিতাসের মায়ের মতো তিনহাত লাফিয়ে না উঠলেও তিনি নাকি এ জীবনেই বিনা দোষে মুখ বুজে কুকুরের কামড়, আঁচড়, গরুর গুঁতো, খরগোশের ভয়ঙ্কর উৎপাত এইসবই সহ্য করেছেন। তবে সে তো অন্য গল্প। মোদ্দা কথা, কুকুর পোষা নৈব নৈব চ।

তিন্নি মাকে বোঝায়, সব কুকুর একরকম নয়। এই যে ব্ল্যাক, হোয়াইট আর ব্রাউন, ওরাও কিন্তু তিনজনেই একেবারে আলাদা। আমি যখন বিস্কুট দিতে যাই তখন চেষ্টা করি সবাইকে সমান দিতে, অথচ দেখ, ব্ল্যাকটা এমন দুষ্টু সবসময় চেষ্টা করে অন্যদের সরিয়ে কত আগে বেশি বিস্কুট খাবে। ব্রাউনটা তাও যা একটু চেষ্টা করে ওর সঙ্গে লড়ে যাওয়ার, হোয়াইটতো সাতহাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকবে। এদের হাত থেকে বাঁচিয়ে ওদের বিস্কুট খাওয়ানো যা শক্ত না...কোনমতে অন্যগুলোকে তাড়িয়ে ওকে আলাদা ডেকে নিয়ে খাওয়াতে হয়। নইলে না খেয়েই চলে যাবে, কিচ্ছুটি বলবেনা। মা শুনে বলেন, হুঁ, একেবারে তোমার মতোই, লোকেতো বাসে তোকে ঠেলে তোর সামনের সিটে বসে পড়লেও কিচ্ছু বলিসনা। তিন্নি বিজ্ঞের মতো জবাব দেয়, ছাড়তো, সামান্য একটা সিট নিয়ে কেউ ঝগড়া করে? নাহয় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়েই থাকলাম। মা চুপ করে তাঁর এই অসামান্য মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন, কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাননা।

বাড়িতে তিন্নির আরেক বন্ধু শঙ্করী মাসি। মাসি রোজ ভোরবেলায় উঠে ট্রেনে-বাসে চেপে সেই নিউ-ব্যারাকপুর থেকে এসে ভোর ছ’টার সময় কলিং বেল বাজায়। আর তাতেইনা বাবা-মা আর তিন্নির ঘুম ভাঙ্গে। যেদিন মাসি কোন কারণে ছুটি নেয় তিন্নিরতো বেশ চিন্তাই হয় যে সবাই মিলে এমন ঘুমাবে স্কুলের গাড়ি হর্ন দিয়ে দিয়ে চলে যাবে। সত্যি বলতে কী এমন ঘটনা এযাবত বারদুয়েক হয়েছে বৈকী। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই শীতকালে ঠাণ্ডা আর গরমকালে প্রচণ্ড গরম হাতটা মাসির পেটে দেওয়া চাই। মার গায়ে রাখলে মা কেবল বকে, মাসি চমকে চমকে ওঠে বটে, কিন্তু হেসে ফেলে। তিন্নি যত আবোল-তাবোল বকে অর্থাৎ মার ভাষায় আবোল-তাবোল আরকী, সেইসব কেমন তাল দিয়ে যায় মাসি, এমনকী দু'চারজায়গায় এমন যোগ করে যে তিন্নিও হাসতে হাসতে একাকার হয়ে যায়। মা বলে, তোদের জমেছে ভালো, একেবারে মেড ফর ইচ আদার।

তিন্নির কুকুর বন্ধুদের মতোই শঙ্করী মাসিরও বন্ধু আছে, কিন্তু তারা সংখ্যায় অনেক, হয়তোবা পাড়ার সবাইই। না না মানুষের কথা বলছিনা, এপাড়ার যত কাক আছে, সবাই মাসীমার বন্ধু। এই ডায়লগটা অবশ্য তিন্নির মায়ের। তাঁর কথায়, রোজ সকালে রান্নাঘরের জানলার পাশে শঙ্করীদিকে দেখলেই কাকেরা জিজ্ঞেস করে, ব্রেকফাস্ট রেডি মাসীমা? কারণ সকালে এসে বাসন মাজতে মাজতেই শঙ্করীর কন্ঠস্বর শোনা যায়, দাঁড়া, দিচ্ছি দিচ্ছি, এত তাড়া কীসের? এই কথোপকথন চলতে থাকে সারাদিনধরে। এইতো গত একমাস ধরে গরমের ছুটি চলার পর তিন্নির সবে স্কুল খুলেছে। তাই একটা-দেড়টায় খাওয়ার রুটিনটা আবার ফিরে গেছে বেলা তিনটে-সাড়ে তিনটেয়। মুশকিল হচ্ছে যে এতে কাকেদের লাঞ্চ টাইমটাও পিছিয়ে গেছে। তাই গত কয়েকদিনধরেই দুপুরবেলায় প্রায়শই ওরা জিজ্ঞেস করছে, মাসীমা, তিন্নিদিদি ইস্কুল থেকে ফেরেনি বুঝি? একদিনতো শঙ্করীমাসি বেশ বকছিলই ওদের – তোদের বড্ড বাড় বেড়েছে, তখন থেকে বলছি তিন্নির এখনো খাওয়া হয়নি আর তোরা কা কা করে মাথাটা ধরিয়ে দিচ্ছিস। আরেবাবা আমি খাওয়ার আগেই তোদের দেব। দেখোনা বৌদি, রাগ করে আবার রান্নাঘরের সব ন্যাকড়াগুলো ঠোঁট দিয়ে টেনে টেনে জানলা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে। সেদিন আবার দুপুরবেলায় তিন্নি মাকে দৌড়ে ডাকতে এল। মা তখন কম্পিউটারে বসে কীসব কাজ করছিলেন। তিন্নি এসে বলল, শিগ্গির চলো মা, 'তীর্থের কাক' দেখবে। তিন্নি এখন বাংলায় বাগ্ ধারা নতুন নতুন শিখছে। তাই সারাক্ষণই চেষ্টা করে 'আমড়া কাঠের ঢেঁকি', 'বাঁশ বনে শেয়াল রাজা' এসব কথার মধ্যে ব্যবহার করতে। মা রান্নাঘরে গিয়ে দেখেন, জানলায় একটা কাক চুপ করে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সেদিন ছিল রবিবার। তিন্নির বাবা কী কাজে বেরিয়েছিলেন, তাই খেতে বসতে একটু দেরী হচ্ছিল। শঙ্করী বলল, দেখো বৌদি যতক্ষণনা ওকে খেতে দেব ততক্ষণ হত্যে দিয়ে বসে থাকবে। মা বলেন, এখন এই বলছ, আবার বর্ষার জন্য একদিন সকালে ওরা আসেনি, তুমিতো মন খারাপ করেই রইলে সারাদিন। ওরাও ঠিক তাই, তুমি না থাকলে আবার সেদিন জানলার ধারেকাছেও আসবেনা। বল, চাইলে কী আর আমি খেতে দিতুমনা? মনে হয়, ঠিক কেউ একটা উঁকি মেরে দেখে নিয়ে রটিয়ে দেয়, ওরে মাসীমা আসেনিরে, আজ বৌদি। বাকীরা বলে, তবে থাক, আজ অন্য কোথাও দেখি। পিছন থেকে ফোড়ন কাটে তিন্নি, বুঝলে মা ওরাও মানুষ চেনে। মা চোখ গোলগোল করে বলেন, কী বললি? তিন্নি তাড়াতাড়ি সামলে নেয়, বলে, না না, তোমায় খারাপ বলিনিতো। তুমিতো বারান্দার বাগানে চড়াইদের জন্য মগে করে জল রাখ। অবশ্য, চড়াইগুলো যখন বারান্দাজুড়ে আড্ডা মারতে গিয়ে তোমার কচি কচি গাছ খাচ্ছিল আর মাটি ছড়িয়ে বারান্দা নোংরা করছিল, তখনতো তুমি ওদের জল বন্ধ করে দিয়েছিলে, সে কথাতো আমি ধরছিইনা। অমন কতকিছু তুমি আমার সঙ্গেই কর, ওরাতো চড়াই মাত্র। ইউনিট টেস্টের সময় তোমার মোবাইলে একটু গেম খেলেছিলাম মাত্র, ওমনি তুমি সব গেম ম্যয় হ্যারি পটারের ওয়ালপেপারগুলো পর্যন্ত ডিলিট করে দিলে! সেসব কথাও নাহয় বাদই দিচ্ছি, আসলে বলছিলাম যে তুমি জীবজন্তুদের ভয় পাওতো তাই ওরাও তোমার কাছে আসেনা – মাকে উত্তর দেওয়ার কোন সুযোগ না দিয়ে ও এবার চট করে নিজের ঘরে চলে যায়।

তিন্নি ও তার বন্ধুরা


এই পাড়ায় তিন্নির একটা নতুন বন্ধু হয়েছে – সেই বেব্লেড প্রিয় বাবলুর দিদি তিতাস। অবশ্য বাবলুর সঙ্গে তিন্নির পরিচয় তিতাসের সূত্রেই। বাবলুকে ও স্নেহই করে, ছেলেমানুষ, ওই যা একটু কখনোসখনো বেব্লেড নিয়ে কথা হয়। তিতাস অবশ্য বেব্লেড, হ্যারি পটার, হানা মন্টানা কিছুই জানেনা...ও বইই পড়েনা...কেবল পাঁইপাঁই করে সাইকেল চালায় আর পাড়ায় সমবয়সী ছেলেদের সাথে ধাঁইধাঁই করে ক্রিকেট খেলে। তিন্নি বলে, তোর সঙ্গে আমার দিদামার খুব মিল, তোকে দিদামার সাথে আলাপ করিয়ে দেব। দিদামা আমার খুব ভাল বন্ধু, সব সিক্রেট শেয়ার করা যায়। আমাকে এখনো কত গল্প বলে... আমাদের মতো বয়সে দিদামা লাট্টু ঘোরাতো, সাঁতরে গঙ্গায় এপারওপার করত, এক বাড়ির ছাদ থেকে আরেক বাড়ির ছাদে লাফিয়ে লাফিয়ে যেত। দিদামার মা একটা মস্ত বড় পাখার বাঁট দিয়ে দিদামাকে কত মারত কিন্তু দিদামা কাঁদতইনা। আরো কী মজার জানিস, তোর আর বাবলুর মতো দিদামারও এসব কাজে সঙ্গী ছিল ছোটমামাদাদু। শুনেই তিতাস বলে আর বলিসনা সেদিন কী কাণ্ড হয়েছে শোন, আমি আর বাবলু একটু বেলার দিকে পাশের বাড়ির পাঁচিল টপকে ওদের গাছ থেকে বেশ বড় দেখে একটা বাতাবী লেবু পেড়ে নিয়ে এলাম। কী আশ্চর্য ওদের চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে এলাম তাও কিছু বললনা। বাড়িতে এসে লেবুটা কেটে দেখি একেবারে কাঁচা। বাবলু বলে কী, আঠা দিয়ে আবার ওদের গাছে আটকে দিয়ে এলে হয়না, পাকবে?

তিন্নির সঙ্গে ভাব হবার পর তিতাসের কেবল একটাই দুঃখ – তিতাসের বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুমা তিতাসকে কক্ষনও কেউ একা ছাড়েননা, বন্ধুরা থাকলে তাও ঠিক আছে, নয়ত এইতো পাশের গলিতেই তিন্নির বাড়ি, সেখানে পর্যন্ত ওর বাবা এসে পৌঁছে দিয়ে যায়। অথচ তিন্নির বাড়িতে বাবা-মা ছাড়া কেউ নেই বলে, ও কেমন একা একা পড়তে যায়, এমনকী দু’একবার বাসস্ট্যান্ড থেকে একা একা বাড়িও ফিরেছে। সেসব কথাতো তিতাসের বাড়িতে কেউ চিন্তাই করতে পারবেনা। তিন্নির মনে হয় আসলে ওরা কেউ তিতাসের বন্ধু নয়, স্রেফ বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুমা।

তিন্নির অবশ্য তেমন কোন মুশকিল নেই। ওই যা পড়াশোনা না করার জন্য একটু বকুনি খায়। তবে সেসব গায়ে না মাখলেই চলে...গল্পের বইগুলো যদি বেশি ভালো হয় তাহলে ও আর কী করতে পারে? অমন সুন্দর সুন্দর বই পাঠ্যে রাখলেই পারত। এইতো ওকে হ্যারি পটারের অতগুলো বইয়ের যেকোন জায়গা থেকে যেকোন প্রশ্ন করনা কেন সব বলে দেবে। আর তা না দিয়ে কী দিয়েছে, না রবীন্দ্রনাথের 'গোবিন্দস।।ডিসাইপেল'!তাও বাংলায় দিলেই পারত, খামোখা ইংরেজিতে দেওয়ার মানেটা কী? সেসব আর যারা সিলেবাস বানায় তারা বুঝলেতো, যতসব বোরিং জিনিসই পড়তে দেবে। তবে বাবা-মাতো ম্যানেজ হয়েই আছেন, তাই তিন্নির দিব্বি চলে যাচ্ছে তার বইপত্র, গেমস্, রাস্তার কুকুর, শঙ্করী মাসি, পাড়ার বন্ধু সব্বাইকে নিয়ে। বাবাতো উলটে মাঝে মাঝে আফশোসই করেন যে এই বয়সে আমরা বাইরে কত খেলাধুলা করেছি, ওতো সেসব সুযোগই পেলনা। এই বলে ব্যাগ থেকে আরও দুটো গল্পের বই বের করে দেন কিম্বা কম্পিউটারে আরও দুটো সিনেমা আপলোড করে দেন। মা হাঁ হাঁ করে উঠলেই বলেন, এখনো কিছুই বোঝার মতো হয়নি, আমাদের স্কুলেই কত ছেলে ছিল সাধারণ রেজাল্ট করেছে, এখন তারা কত বড়বড় চাকরি করে। অগত্যা মাও সায়ই দেন।

তবে তিন্নির বাবা-মা যাই ভাবুকনা কেন, ওর কিন্তু মোটেই একা একা লাগেনা। তার এতরকমের এত বন্ধু আছে যে এদের থেকে ফাঁক পেলে তবেনা কিছুটা সময় ও পড়তে বসতে পারে। অবশ্য এসব ব্যাপার বড়রা যত কম বোঝে ততই ভালো।

ছবিঃ বৃষ্টি প্রামাণিক

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা