ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ইচ্ছামতীর দশ

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। চারিদিক ভরে ছিল কাঠ চাঁপার গন্ধে। আর আমি একটা খুব সুন্দর স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্নটা ছিল একটা বেড়ানোর। আমার পিঠব্যাগে ছিল একটা বই। ছোট্ট একটা ডায়রী। সবুজ রঙের একটা নিব পেন। আর ছিল একটা মজার টিফিন বক্স। সেখানে ছিল তিলের নাড়ু, আমসত্ত্ব, নারকেল নাড়ু আর মুড়ির মোয়া। আর ছিল এক ঠোঙা চানাচুর। যাচ্ছি যে অনেক দূর। অনেকটা পথ। কিন্তু কোথা থেকে যেন মোবাইল বাজতে শুরু করলো। আমি তো খুঁজেই পাই না। পিঠের ব্যাগে নেই। জানলার ধারে সিটের পাশে নেই। জামার পকেটে নেই। তাহলে কী হলো? এইসব সাত-পাঁচ যখন ভাবছি তখন হাতটা গিয়ে পড়লো বালিশের পাশে। আর ওমা, কী আশ্চর্য সেখানেই মোবাইল ছিল। আমার ঘুম ভেঙে গেল চাঁদের বুড়ির ফোনে। "দিলে তো আমার বেড়ানোর স্বপ্নটা এক্কেবারে নষ্ট করে। ভাবছিলাম এবার টিফিন বক্স খুলবো। নাড়ু আমসত্ত্ব খাবো আর তুমি কিনা ঠিক সেই সময় ফোনটা করলে?" আমার জানলার পাশ দিয়ে গঙ্গার হাওয়া শোঁ শোঁ করে বইলো। বুড়ো বটগাছটা ডালপালা নেড়ে সকালের আড়মোড়া ভাঙলো।

ইচ্ছামতীর দশ

চাঁদের বুড়ি মিটিমিটি হাসে। তার সামনে এখন আর চরকা নেই। খুব সুন্দর নীল রঙের ল্যাপটপ। তার মধ্যে থেকে সব কত লেখা, কত ছবি, কত গল্প বার করতে করতে বললো, "তোমার কি মনে নেই আজকের দিনটা কল্লোল? কী হয়েছিল আজ?" আমি মাথা চুলকাই। গালে হাত দিয়ে বসে ভাবি। দাঁত দিয়ে নখ কাটি। ঘরের মধ্যে পায়চারি করি। কিন্তু কেবল চোখের সামনে একটা বিশাল সর্ষে ফুলের ক্ষেত দেখতে পাই।

ইচ্ছামতীর দশ

তুমি কি জানো কখন সবাই চোখে সর্ষে ফুল দেখে? এই ধরো যখন অঙ্ক ক্লাসে ব্ল্যাক বোর্ডের সামনে স্যার উলটো একে চন্দ্র লিখতে বলেন। কিম্বা আঠেরোর নামতা গড়গড় করে মুখস্থ বলতে বলে্ন। ভূগোল ক্লাসে দিদিমনি উত্তর দিকটা দেখাতে বলেন। তখন আমি চোখে সর্ষে ফুল দেখি। মানে ঠিক বলতে না পারার ভয়টা যখন মনের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে।কিম্বা ভেবেই যখন কূল কিনারা করতে না পারা যায়। বাংলায় কেউ কেউ তাকে চোখে সর্ষে ফুল দেখা বলে। তা আমার তো তখন সেই অবস্থা। তারপর যখন থতমত খেয়ে মনে হয় সত্যি কেন ভয় পাচ্ছি? কাল রাতে অতো করে যে সব মুখস্থ করলাম। দাদা ছাদে নিয়ে গিয়ে তারায় ভরা আকাশের নীচে দাঁড় করিয়ে আমাকে দিক গুলো চিনিয়ে দিল।শুকতারা মিটিমিটি হাসলো।বঙ্কুদের তালগাছের ওপর বসে দুটো ভুতুম প্যাঁচা গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রইলো।শিউলি ফুলের গন্ধে বাতাস ভরে গেল।সব তো আমার শেখার জন্যেই।পরিবেশ পাঠ কি আর এমনি এমনি হয় নাকি? তখন আমি পটপট করে সব বলে দিই। সর্ষে ফুলটা চোখের সামনে থেকে তার বাংলার প্রবাদ প্রবচনের ভয় পাওয়া বিশাল বইটা নিয়ে কোথায় লুকিয়ে পড়ে। আর মনে পড়ে যায় মৌন’র বাড়িতে সর্ষে ফুল বাটা দিয়ে গরম গরম ভাত খাওয়ার কথা। আহা সে যে কী অমৃত তা যদি তোমাকে কোনদিন খাওয়াতে পারতাম। এদিকে চাঁদের বুড়ি আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছে।তার প্রশ্নের জবাব দিই-নি। কিন্তু অঙ্ক স্যারের গল্প শোনাতে শুরু করে দিয়েছি। ছাদে চলে গেছি তারা দেখতে। এইসব করলে মুশকিলে পড়তে হবে। তাই এবার চোখ কচলে, সকালের মিঠে শরতের আলো দেখে আমার মনে পড়ে গেল- সত্যিই তো! আজকে তো স্পেশাল দিন। আজ তো ইচ্ছামতীর জন্মদিন। শুধু তাই নয় গুগ্‌ল্‌ রিমাইন্ডার বলছে আজ থেকে দশ বছর আগে ইচ্ছামতী হাঁটতে শুরু করেছিল এই অন্তর্জালের পথে।

দশ বছর হয়ে গেল ইচ্ছামতীর বয়েস! আজ তাহলে ইচ্ছামতীর দশ?

এর আগে অঙ্ক খাতায় দশে দশ পেতে ভালো লাগতো। স্যারের মিষ্টিমুখ। বাড়িতে মায়ের কুমড়ো ফুলের বড়া। রাতে কোয়ালিটি আইসক্রিম। কিন্তু এগুলো কোনটাই হয়নি। কারণ কোনওদিন কোন পরীক্ষায় দশে দশ পাইনি আমি। এখনও না। অথচ ইচ্ছামতী দশ বছর ধরে পথ চলেছে। তার মানে আজ দশে দশ। তাই কি আজ ভোরে টিপ টিপ বৃষ্টিতে আমি বেড়ানোর স্বপ্ন দেখলাম? চাঁদের বুড়ি মুখে কিছু বলে না।খালি মিটিমিটি হাসে। আমার সামনে ধরে একটা ক্যান্ডিফ্লস। আর তার সেই গোলাপী মিষ্টি নরম তুলোর মতো স্বাদে আমার সকালটা কী মিঠেই না হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় অনেক কথাই।

ইচ্ছামতীর দশ

বংশু ছাতা মাথায় সংসার বাবুর বাসায় গিয়েছিল 'সহজ পাঠ' বইতে। কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি চলেছিল শুক্রবারে হাটের দিকে। ঘাটের ধারে স্টিমার যখন এসে দাঁড়িয়েছিল তখন পূর্নিমার চাঁদ উঠেছিল দূরে বাঁশবনে। এগুলো আমরা সবাই দেখেছিলাম। মনে মনে। কল্পনায়। কিম্বা আজ সকালে যেমন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখলাম ঠিক তেমন করেই। মা আঙুল ধরে ধরে একটা একটা শব্দের ওপর হাত বুলিয়ে দিতেন। আমরা বানান করে পড়তাম। তারপর একটা গোটা লাইন। একটা গোটা প্যারাগ্রাফ। একটা গোটা পাতা এবং সবশেষে একটা বই। ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীকে খুঁজে বেড়াতাম স্কুলের অন্ধকার কল ঘরের পাশে। কুল গাছের ছায়ায়। কিম্বা তেপান্তরের মাঠে। খুব গল্প শুনতে ইচ্ছে করতো। গল্প বলতে ইচ্ছে করতো। কিন্তু দেখা হতো কজনের সাথে বলো? আর দেখা হলেও যে অনেক অনেক গল্প হতো তেমনটা তো সুযোগ ছিল না। এদিকে তখন আমাদের সবার বাড়িতে এসে গেছে কম্পিউটার। তার সাথে ইন্টারনেট। নিজেদের হারিয়ে যাওয়া…এখনকার…সব গল্প করার সুযোগ সুবিধা চলে এল। শুধু তাই না ইউনিকোড ফন্টের সাহায্যে গুগল বাংলা ভাষাকে চিনতে পারলো। আমাদের কাছে আর ওয়েবে বাঙলা লেখালেখির অসুবিধে রইলো না। দূরকে নিকট করা গেল সহজেই। চাঁদের বুড়ির চিঠি এলো আমার কাছে "চলো এবার আমরা গল্প বলি। ছবি আঁকি। আড্ডা জমাই তাদের নিয়ে যাদের আমরা সাথে করেই ঘুরি।" ঠিক এখন যেমন তুমি আমার সাথে আছো। ঠিক তেমন।

ইচ্ছামতীর দশ

চাঁদের বুড়ি ইচ্ছামতী নামের এই ওয়েব ম্যাগাজিন খুলে বসলো। তার চরকা সরলো। সুতো ভ্যানিশ হলো। তার জায়গায় এলো ল্যাপটপ। প্রিন্টার। গোটা পৃথিবীর বন্ধুদের ঠিকানা। আমরা গল্প করতে শুরু করলাম। লিখতে শুরু করলাম। ছবি আঁকতে চেষ্টা করলাম। কোন এক এমনি শরতের সকালে। আমাদের চারপাশে আস্তে আস্তে জমা হতে শুরু করলো অনেক বন্ধু। যারা সত্যিই একদিন তেপান্তরে ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমীকে খুঁজে বেড়িয়েছিল।

ইচ্ছামতীর দশ

আমরা বেড়িয়ে পড়লাম। কাঁধে ছিল পিঠ ব্যাগ। হাতে ছিল ক্যামেরা। মনে ছিল গল্প করার অনেক দিনের ইচ্ছে। এই বেড়াতে বেড়িয়েই তো আমার সাথে পরিচয় হল সুন্দরবনের জঙ্গলে ঘেরা এক গ্রামে সিরাজুলের সাথে। তাকে লেখা আমার সব চিঠি নিশ্চই তুমি পড়ে ফেলেছো এতোদিনে। পরিচয় হলো রাজাভাতখাওয়া টাইগার রিজার্ভে চাকরী করা হাতি টারজানের সাথে। তার মাহুত রামদাস আর পাতাওয়ালা লক্ষ্মণের সাথে। ওরা আমাদের নিয়ে গেল রাভাদের গ্রাম আন্দুবস্তি। এইসব গল্প তোমার জানা। না জানলে চাঁদের বুড়ি ইচ্ছামতীর অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্‌ করেছে। ফোনে কিংবা ট্যাবে ডাউনলোড করে নাও এক্ষুনি। আর সব পড়ে ফেল চটপট। কী জানি হয়তো আগামী বছর তুমিই লিখবে ইচ্ছামতীতে তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা।নিজে হাতে করে এঁকে পাঠাবে শুভেচ্ছার কার্ড। কিম্বা পুজোতে বা শীতে বেড়াতে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে খুঁজে পাবে কোন গল্পদাদু বা স্টোরিটেলারকে। ঠিক আমি যেমন পেয়েছিলাম পুরুলিয়ায়।

ইচ্ছামতীর দশ

বড় বড় গাছের ছায়ায় বসে, তেল দিয়ে মুড়ি চানাচুর খেতে খেতে কত যে গল্প করেছি আর শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। এইবেলায় তোমাকে কানে কানে বলে রাখি তার সাথে অনেক গুলো ভূতের গল্পও আছে। আমি জানি তুমিও এমন খুঁজে পাবে কাউকে যে তোমাকে গল্প বলবে। তুমি তাকে। চারপাশের আদান প্রদান চলতে থাকবে। না হলে আমরা শিখবো কী করে? বড় হব কী করে? ইচ্ছামতী সেই আদান প্রদানের ব্যবস্থা করে দেয়। শিখতে সাহায্য করে। তাই তখন গল্প গুলো শুধু আর গল্প হয়ে থাকে না। জীবনে চলার এক পাঠ হয়ে দাঁড়ায়। যাদের কথা শুনিয়ে আজকের লেখা শেষ করবো তাদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল দক্ষিণ দিনাজপুরের ছোট্ট এক গ্রামে।ওরা মুখা নাচ দেখাচ্ছিল।

ইচ্ছামতীর দশ

বাংলার নতুন বছর আসার আগে সবার ঘরে ঘরে যখন নতুন ফসল ওঠে, গোলায় ভরা থাকে নতুন ধান; চারিদিকে যখন বসন্তের ঝলমলে পরিবেশ, সবাই খুশি হয়ে আনন্দে থাকে, তখন মুখা নাচ শুরু হয়। মুখোশ গুলো সব কাঠের তৈরী। এক একটা মুখোশ এক একটা দেবতা বা দেবীর। মন্দিরে পুজো হয়ে মুখোশ গুলো পরে যারা নাচে তারা কিন্তু এক একজন শিল্পী। মুখার নাচ তারা শিখেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। আমি যখন তাদের বললাম ইচ্ছামতীর কথা তখন তারা খুশি হয়ে ছবি তুলতে দিল।ফেরার পথে গঙ্গারামপুরের দইও চেখে নিলাম। কী জানি এরপর যদি আমার বন্ধু প্রদীপ্ত রাগ করে আমাকে আর নিয়ে না আসে। তুলাইপাঞ্জি চালের ভাত দিয়ে নদীর মাছ না খাওয়া হয়? কিম্বা চাঁদের বুড়ি আর চিঠিই না লেখে।

জানি এটার কোনটাই হবে না। আসলে এটা ভয় পাওয়া। এমন ভয়, যেটা পরীক্ষার আগে থাকে। একা অন্ধকারে পথ চলতে গিয়ে মনে হয়। তারপর একবার রাস্তায় নেমে পড়লে, হাঁটতে শুরু করলে থামা যায় না। যেমন থামেনি ইচ্ছামতী। অনেক বাধা, অনেক ভয়কে জয় করে আজ সে তোমার ল্যাপটপে। তোমার ডেস্কটপে। ট্যাবে…স্মার্ট ফোনে। ইচ্ছে করলে একবার সাঁই করে চক্কর কেটে নিতে পারো তার দশ বছরের আর্কাইভে। কথা দিচ্ছি পড়া শেষ হবার পর তুমি যেমনটা ছিলে আর তেমনটা থাকতে পারবে না। পিঠে ব্যাগ নিয়ে বেড়িয়ে পড়ার সাধ জাগবে। ইচ্ছে হবে আঁকতে। গল্প বলতে। তুমি ততক্ষণে একবার আর্কাইভে ঘুরে এসো। আর আমি গঙ্গারামপুরের দইয়ের হাঁড়ি গুলো সাজাই। তারপর না হয় একসাথে খাওয়া যাবে।

ইচ্ছামতীর দশ

 

ফটোগ্রাফঃ লেখক
চাঁদের বুড়ির ছবিঃ অনুভব সোম

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা