ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

কোন বাধাই বাধা নয়

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক জায়গায় কাকাবাবু সম্বন্ধে লিখেছিলেন, 'একবার আমি একজন খোঁড়া মানুষকে খুব উঁচু পাহাড়ে উঠতে দেখেছিলাম। তাঁর যেন একটুও কষ্ট হচ্ছিল না। তখন আমি ছোট, সন্তুরই বয়সী। সেই মানুষটিকে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম, অসাধারণ তাঁর মনের জোর, আর এরকম মনের জোর থাকলে মানুষ যেকোন বাধাকেই জয় করতে পারে। সেই মানুষটিই কাকাবাবু।'

কাকাবাবু হয়তো বইয়ের চরিত্র কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরাও দেখতে পাই সেই সব মানুষদের যাঁদের সমাজ হয়তো প্রতিবন্ধী বলে চিহ্নিত করেছে কিন্তু তাঁরা তাঁদের অদম্য মনের জোরে সেই বাধাকে পেছনে ফেলে সকলের সঙ্গেই এগিয়ে চলেছেন। কত বাধা-প্রতিকূলতা পার হয়ে তাঁদের চলতে হয় সাফল্যের জন্য। কিছু মানুষ তাঁদের ছোট করে দেখলেও তাঁদের জীবনসংগ্রামের গল্প আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। খেলার মাঠেও এর ব্যাতিক্রম নেই।

এই তো কিছুদিন আগে ব্রাজিলের রিওতে বসেছিল অলিম্পিকের আসর। সেই নিয়ে কত মাতামাতি, কাগজে লেখালেখি, টিভির চ্যানেলে সম্প্রচার। বিভিন্ন বিভাগের খেলোয়াড়দের নিয়ে অনুষ্ঠান, তাঁদের সাক্ষাৎকার। পদক জিতে নজর কেড়েছেন সাক্ষী মালিক এবং পুসারলা সিন্ধু, একটুর জন্য পদক মিস করলেও সকলের মন জিতে নিয়েছেন দীপা কর্মকার। তাঁরা পেয়েছেন বিভিন্ন সন্মান, বহু পুরস্কার।

তার কদিন পরেই সেই রিওতেই বসেছিল আর একটি খেলাধুলোর আসর। কিন্তু কজন তাঁর খবর রেখেছেন! প্যারালিম্পিক গেমস বা প্রতিবন্ধীদের অলিম্পিক্সের কথা বলছি। ১৯৬০ সালের রোম অলিম্পিকের সময় থেকেই বসছে এই বিশেষ খেলার আসর। এখানে প্রতিযোগীরাই সকলেই কোন না কোন শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতা দ্বারা প্রভাবিত কিন্তু সেই সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে জয়ের আনন্দে মেতে ওঠেন তাঁরা। ভারত ১৯৬৮ সাল থেকে মোটামুটি নিয়মিতভাবে অংশ নিয়েছে এই খেলায়। এ বছরও ভারত থেকে রেকর্ড সংখ্যক মোট ১৯ জন প্রতিযোগী যোগ দিয়েছিলেন পাঁচটি খেলায়।

মোট চারটি পদক জিতে ফিরছেন তাঁরা। প্যারালিম্পিকের ইতিহাসে এটিই ভারতের শ্রেষ্ঠ প্রদর্শন। এর আগের সব কটি প্যারালিম্পিক মিলিয়ে ভারতের ঝুলিতে ছিল মোট আটটি পদক। দুটি সোনা এবং তিনটি করে রুপো এবং ব্রোঞ্জ। আর এ বছরে ভারতীয় খেলোয়াড়েরা জিতেছেন দুটি সোনা এবং একটি করে রুপো এবং ব্রোঞ্জ। প্রতিবন্ধকতা থেকে প্যারালিম্পিকের পোডিয়াম পর্যন্ত তাঁদের যাত্রা যেন গল্পকেও হার মানায়।

গেমসের দ্বিতীয় দিনেই ভারতের জন্য আসে জোড়া সুখবর। ছেলেদের হাই জাম্প টি-৪২ ইভেন্টে সোনা এবং ব্রোঞ্জ দুটোই আসে ভারতের ঝুলিতে। ২১ বছরের মারিয়াপ্পান থাঙ্গাভেলু এনে দেন প্যারালিম্পিকের ইতিহাসে ভারতের তৃতীয় সোনা।


কোন বাধাই বাধা নয়
মারিয়াপ্পান থাঙ্গাভেলু এবং বরুণ সিং ভাটি

ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ড লড়াই করেছেন মারিয়াপ্পান। খুব ছোটবেলাতেই বাবা ছেড়ে চলে যান। মা কিছুদিন ইঁটভাটিতে কাজ করেছেন, তারপর সবজি বিক্রি করে পাঁচ ছেলে মেয়েকে বড় করে তুলেছেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্কুলে যাওয়ার পথে হঠাৎ এক বাসের চাকার তলায় চলে যায় মারিয়াপ্পানের ডান পা। চিরকালের জন্য নষ্ট হয়ে যায় ওই পা। তাতেও কিন্তু দমে যাননি তিনি। যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবেই বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন। স্কুলের শিক্ষকদের উৎসাহে মারিয়াপ্পান আসেন হাই জাম্পে। এরপর ধাপে ধাপে উঠে এসে জাতীয় প্যারা অ্যাথলেটিক মিটে তিনি নজরে পরেন তাঁর বর্তমান কোচ সত্যনারায়ণের। এর পরের দু বছরের কঠিন পরিশ্রমে জোটে প্যারালিম্পিকের টিকিট আর সেখানে ১.৮৯ মিটার লাফিয়ে মারিয়াপ্পান দেশকে এনে দেন সোনা।

তামিলনাড়ু সরকারের ২ কোটি টাকার পুরষ্কারের মধ্যে ৩০ লক্ষ টাকা নিজের ছোটবেলার সরকারী স্কুলের উন্নতির জন্য দান করেছেন মারিয়াপ্পান। প্রমাণ করেছেন শুধু দারুণ খেলোয়াড়ই নন তিনি একজন বড় মনের মানুষও।

ঐ একই ইভেন্টে ভারতের দ্বিতীয় পদকটি এনে দেন মারিয়াপ্পানের বন্ধু বরুণ সিং ভাটি। ছোটবেলায় পোলিওতে হারিয়েছিলেন একটি পা। কিন্তু তাতে দমে না গিয়ে জোর কদমে নিজের পড়াশুনো আর খেলাধুলো চালিয়ে গেছিলেন বরুণ।

২০১২তে মাত্র ১৭ বছর বয়সেই ঐ বছরের প্যারালিম্পিকের যোগত্যামান পেরোন বরুণ কিন্তু ভারতের গোনাগুনতি স্লটের জন্য যেতে পারেননি সে বছর। এর পরের চার বছর একের পর এক টুর্নামেন্টে দারুণ পারফর্মেন্স করে গেছেন বরুণ। শেষ অবধি রিও প্যারালিম্পিকে জিতে নিয়েছেন ব্রোঞ্জ। মাত্র একুশ বছরের বরুণ যে দিনে দিনে ভারতীয় প্রতিবন্ধী ক্রীড়ার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠবেন সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রায় সব বিশেষজ্ঞই।

ভারতের পরবর্তী পদক বিজয়ী ছেচল্লিশ বছর বয়সী দীপা মালিককে নিয়ে আর কী বলব। গত দশ বছরের বেশী সময় ধরে হুইল চেয়ার বন্দী হয়েও তাঁর যা কৃতিত্ব সেটা যেকোন মানুষকে প্রেরণা জোগাবে। এই প্যারালিম্পিকের আগেই দীপার ঝুলিতে ছিল শট পাট, সাঁতার এবং জ্যাভলিন থ্রোয়ে জাতীয় স্তরে সাতচল্লিশটি সোনা, পাঁচটি রুপো এবং দুটি ব্রোঞ্জ মেডেল। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে অসংখ্য পুরষ্কার। এর সঙ্গে আছে দীপার মোটর স্পোর্টসে নতুন এক দিগন্ত খুলে দেওয়ার দিকটি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর দীপা প্রথম প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে পান মোটর র‍্যালির লাইসেন্স। এবং সেখানেই না থেমে ২০০৯ সালে অংশ নেন ভারতের কঠিনতম মোট রেস 'রেইড ডি হিমালয়া'তে। শূন্য'র অনেক কম তাপমাত্রায় আট দিনের হিমালয়ের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ১৭০০ কিলোমিটার র‍্যালি হল এই 'রেইড দি হিমালয়া'। মোটেই সহজ নয় সে লক্ষ্য। এর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পেয়েছেন অর্জুন পুরষ্কার সহ বহু সন্মান। শুধু তাই নয়, 'হিমালয়ান মোটর স্পোর্ট অ্যাসোসিয়েসান'এবং 'ফেডারেশন অফ মোটর স্পোর্টস ক্লাবস অফ ইন্ডিয়া'র সদস্য দীপা। এই মুহূর্তে দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় খেলাধুলোর উন্নতির দিকটি যে কমিটি দেখছে তার সদস্য তিনি।


কোন বাধাই বাধা নয়
দীপা মালিক

এর পরেও আরো লেখা বাকি। প্যারালিম্পিক নিয়ে লেখার আগেই এতটা লিখে ফেললাম। এর সঙ্গে এবার যোগ করি এ বছরের প্যারালিম্পিকে শট পাটে পাওয়া রূপোর কথা। প্রথম ভারতীয় প্রতিবন্ধী মহিলা হিসেবে প্যারালিম্পিকে সোনা জিতেছেন দীপা। হয়ে উঠেছেন কোটি কোটি ভারতীয়'র অনুপ্রেরণা। বেশ কিছুদিন আগে দীপা এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন যে, প্রতিবন্ধকতা কিভাবে তাঁর জীবনকে বদলে দিয়েছে। কিভাবে তাঁকে বুঝিয়েছে যে, জীবনে কোন কিছুকেই সহজে পাওয়া যায় না। কিভাবে তিনি নিজেকে দিনের পর দিন বুঝিয়েছেন যে এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। আজ সত্যিই নিজেকে এক অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন দীপা। এগিয়ে চলুন তিনি।

আর দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া তো জ্যাভলিন ছোঁড়ার ক্ষেত্রে একজন লিজেন্ড। প্রথম ভারতীয় যিনি প্যারালিম্পিকের দুটো সোনা জিতেছেন। এর আগে জিতেছিলেন ২০০৪ এর আথেন্স ওলিম্পিকে আর এবার নিজের বিশ্বরেকর্ড ভেঙ্গেই সোনা জিতেছেন জ্যাভলিনের এফ-৪৬ ইভেন্টে। এ এক অবিস্মরনীয় কীর্তি।


কোন বাধাই বাধা নয়
দেবেন্দ্র ঝাঝারিয়া

ছোটবেলায় মাত্র আট বছর বয়সে গাছে উঠতে গিয়ে বিদ্যুতের তার ছুঁয়ে ফেলেন দেবেন্দ্র। ডাক্তাররা চিকিৎসার সময় তাঁর বাঁ হাত বাদ দিতে বাধ্য হন। কিন্তু তিনি তবু নিয়মিত খেলাধুলো চালিয়ে গেছেন। এইভাবেই ১৯৯৭ সালে নজরে পড়েন দ্রোণাচার্য্য পুরষ্কার জয়ী কোচ রিপুদমন সিং-এর। ওনার ছত্রছায়াতেই নিজেকে ধীরে ধীরে আরো তৈরী করে তোলেন।

প্রথমে জাতীয় স্তরে নজর কারেন দেবেন্দ্র। এরপর বিভিন্ন বিদেশী মিটে নিজেকে প্রমান করে ২০০৪ এর প্যারালিম্পিকের যোগ্যতা অর্জন করেন তিনি। জেতেন সোনা। এর পরেও একের পর সাফল্য পেয়েছেন দেবেন্দ্র। বিশ্ব প্যারালিম্পিক চ্যাম্পিয়ানশিপে ২০১৩ তে জিতেছিলেন সোনা, ২০১৫তে রুপো। তার মধ্যেই ২০১৪ তে এশিয়ান প্যারা চ্যাম্পিয়ানশিপে জেতেন রুপো। তবে তাঁর এই সমস্ত সাম্প্রতিক কৃতিত্বকে ছাপিয়ে গেছে প্যারালিম্পিকের সোনার পদক।

এছাড়া একটুর জন্য পদক হারিয়েছেন ফারমান বাশা (পাওয়ার লিফটিং), অমিত কুমার সারোহা (ক্লাব ছোঁড়া)এবং সন্দীপ (জ্যাভলিন)। তাই বলতেই হবে এবছরে প্যারালিম্পিকে ভারতের পারফর্মেন্স সত্যিই চোখে পড়ার মতই। আর মনে রাখতে হবে, অন্যান্য খেলোয়াড়দের মত জনপ্রিয়তা বা সমর্থন কোনটাই পাননি এরা। ভারতে প্যারালিম্পিকের কোন লাইভ টেলিকাস্ট হয়নি। আমরা দেখতে পাইনি এঁদের জয়ের মুহূর্তগুলি যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।

তবু বলি, পরিস্থিতি কিন্তু এখন অনেক বদলেছে। সরকার যথাযথ সাহায্য করেছেন। এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থাও। স্পন্সরশীপ এবং গাইডেন্সের দিক থেকে দীপা এবং দেবেন্দ্র দুজনেই পাশে পেয়েছেন 'গো স্পোর্টস ফাউন্ডেশান'কে। এবং জাতীয় মিডিয়াতেও প্রচার বেড়েছে অনেকটাই। ফেসবুক-টুইটারের মত সোশাল মিডিয়ার ভূমিকাও এখানে অনস্বীকার্য। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এঁদের জয়ের খবর বহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে ফেসবুকের শেয়ার অপশন। দেবেন্দ্র নিজেই এক সাম্প্রতিক কথোপকথনে বলেছেন এই পরিবর্তনের কথা। জানিয়েছেন, ২০০৪ এর সোনা জেতার পর যে পরিমান হইচই হয়েছিল তার চেয়ে বেশ কয়েকগুন বেশি হইচই হয়েছে এ বছর।

আরো অনেক খেলাতেই কিন্তু এই একটু অন্যরকম খেলোয়াড়রা নজর কেড়েছেন। ভারতের ব্লাইন্ড ক্রিকেট দল কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব চ্যম্পিয়ান। ২০১৪ সালে কেপ টাউনে পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনাল জিতেছিলেন তাঁরা। তার আগেও জিতেছেন ২০১২ সালের টি-২০ বিশ্বকাপ।


কোন বাধাই বাধা নয়
অরুণিমা সিনহা

রাজ কুমার তিওয়ারির কথা কজন জানেন। ২০১৩ এর স্পেশাল অলিম্পিকে ফিগার স্কেটিং বিভাগে সোনা জিতেছিলেন রাজ। কিন্তু শুধু 'হাইপারঅ্যাক্টিভ ডিসর্ডার' নয় আরো বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছে অর্থ। বাবার সামান্য দোকানের উপার্জনে ফিগার স্কেটিঙয়ের মত খেলা নিয়মিত প্রাক্টিশ করে যাওয়াই রাজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এইভাবেই অরুণিমা সিনহা, বিশ্বের প্রথম মহিলা যিনি একটি পা না থাকা সত্ত্বেও মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন বা প্যারা ব্যাডমিন্টন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানশীপে পদক জয়ী মানসী জোশীরা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন আর দেশকে এনে দিচ্ছেন বহু সন্মান।

এবার আমাদের কাজ একটাই। এঁদের সমর্থন আর উৎসাহ যোগানো। ওঁদের বুঝিয়ে দেওয়া যে, ওঁদের এই লড়াইয়ে দেশের মানুষ ওঁদের সঙ্গেই আছেন।


ছবিঃ বিভিন্ন ওয়েবসাইট

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা