ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
 টিফিন টাইম আর ভ্যানিশিং ইঙ্কের গল্প

পটল ওরফে অর্চি ওরফে অর্চিষ্মান বাবু একজন ভাল মানুষ ।
তাকে যতই না কেন সবাই ;উফফ কী দুষ্টু , দুরন্ত দস্যি একেবারে,হতভাগা পাজি বাঁদর ইত্যাদি বিশেষণের মার্কা লাগাক, সে আসলে নেহাতই নিরীহ ভোলাভালা ছেলে একটা ।

একটু অন্যমনস্ক তাই লোকে গালি দেয়। ও যে ইচ্ছে করে পেজোমি করেনি , আন্টির অবাধ্য হবে বলেই পড়ানোর সময় অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে না; আসলে যে জানলার ফাঁকে নীল আকাশ দেখতে দেখতে কাল সন্ধ্যে বেলা টিভিতে দেখা নবিতা আর ডোরেমনকে দেখতে পাচ্ছিল সাদা মেঘের মধ্যে, তাই ভুলেই গিয়েছিল ও ক্লাসের মাঝে বসে আছে; এটা কেউ বোঝে না।

বলাও যাবে না তো এ সব। সবাই হ্যা হ্যা করে হাসবে। তাই আন্টির প্রচণ্ড বকুনি,মাঝে মাঝে মার, "স্ট্যান্ড আপ অন দা বেঞ্চ" ,সবই ঘাড় গুঁজে সয়ে যায় অর্চি ।
 
সেই যে সেবার সাইক্লোনের দিন ভর জৈষ্টী মাসে একজন দাড়িওয়ালা মিষ্টি মতন বুড়ো মানুষের সাথে দেখা হয়েছিল, সে কথাও কাউকে বলেনি সে। কী জানি, হয়ত স্বপ্নই দেখেছিল আপন মনে হেড ডাউন করে থেকে।

আজও একটা স্বপ্ন দেখতে পেলে ভালো হত। বিশ্রি ছিল টিফিনটা ।মা ব্যস্ত ছিলেন বেস্পতি বারের পুজোয়। রান্নার দিদি জ্যাম আর পাউঁরুটি ভরে দিয়েছে বাক্সে। রুটির ধারগুলো শক্ত শক্ত চৌকো । জ্যামের সঙ্গে মাঝখানটা প্যাতপ্যাতে। বিচ্ছিরি।

একটু একটু কামড়ে ক্লাসের ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের দিকে রুটিগুলো ছুঁড়ে দিচ্ছিল অর্চি। বাক্সে থেকে গেলে ঝামেলা।
--খাসনি কেন রে ?
-নষ্ট করিস এত দামের খাবার!
-পেটটা ত সারা দিন ফাঁকা রইল----
সাতসতেরো ঘ্যান ঘ্যান; ভাল্লাগে না বাপু আর।
আর এই সব ভাবনার মধ্যে ছুঁড়ে দেওয়া পাউঁরুটিটা শৌনকের পিঠে গিয়ে লাগল।

ধুত্তোর । অর্চি তো ওকে দেখতে পায়নি। ও দৌড়ে ঢুকেছে ঘরে। কিন্তু সে কথা বলবে কাকে ?
বাবা! শৌনক হল পাজির পাঝাড়া ,মিচকে পটাশ ।সেকেন্ড বয়। আন্টিদের আদরের ভাইস ক্যাপটেন।বড়দের কী তেল দ্যায় সব সময়, উফফ।
ওরই জামায় জ্যামের দাগটা লাগতে হল?
কী রকম চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, "সাদা শার্টে লাল জ্যাম। দাঁড়া না আন্টিকে দেখাই। দেখিস কি হয়।"
কাউকে নালিশ করে মার খাওয়াতে কী ভালই বাসে ছেলেটা ।অথচ এমন ভাব করে চোখ নিচু করে থাকবে যেন ভারি খারাপ লাগছে ওর ।

চুপ করে জানলার ধারে বেঞ্চির কোনাটায় বসে থাকে অর্চিষ্মান।
আবার আন্টি কিছু নোটবুকে লিখে দিলেই তো হল। বাড়ীতে মায়ের কাছেও মার খেতে হবে।
চোখটা জ্বালা করে।খিদে আর মন খারাপ মিশে মোচড় দেয় পেটের মাঝখানটা ।ভাল্লাগে না ।

ঠিক তখনই রঙিন রঙিন কুচি কুচি তারার মত কী যেন এক মুঠো জ্বলে উঠল জানালার সামনের চৌকো আকাশটুকুতে ।     
চোখ কচলে সোজা হয়ে বসল অর্চি। কী রে ?

গুঁড়ো গুঁড়ো অভ্রের মত সোনালি রঙের ধুলো ভেসে আসতে থাকল জানলা দিয়ে। অর্চি  পিছন ফিরে দেখল ক্লাসের সবাইকে আবছা দেখাচ্ছে। যেন কুয়াশায় ঢেকে গেছে সব কিছু। সামনে তাকাতেই গোলাপি , কমলা, লাল ডানাওয়ালা প্রজাপতিদের দেখতে পেল। জানলা দিয়ে উড়ে আসছে ওর নাক মুখের ওপরেই একেবারে। ইস।
ও মুখ ফিরিয়ে চোখ বুজতেই  হঠাত অনেক খানি  গরম হাওয়া লাগল গায়ে।
চোখ খুলে অবাক।

কোথায় এলাম রে?
রামধনু রঙের নরম নরম গদি জুতোর তলায় । কার্পেট ? হবেও বা।
একটা লম্বা প্যাসেজ। এগিয়ে গিয়ে একটা গোল ঘর দেখতে পেল অর্চিষ্মান। মাঝ খানে একটা গোল নিচু টেবিল ।তার চারপাশে ছোট ছোট গোল সোফা ।টেবিলের ওপর কি সুন্দর সব পলকাটা বাটি ।তাতে কিশমিশ দিয়ে সাজানো কাসটার্ড,লাল টুকটুকে ডালিমের কোয়া ছাড়ানো ,কাজু,কালো আঙুর –
পেটটা খিদেয় মোচড় দিয়ে উঠল ফের ।

"কই খাও পটল বাবু-"
সেই বুড়ো মানুষটি কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ।আগের বার দেখা হতে বলেছিলেন ,তারাদের যাতায়াতের রাস্তা ঘাট ,সময় সব সামলানো ওনার কাজ।
"আপনি ?"
"ভাবছিলে না আমার কথা ? একটু একটু ?"
"হ্যাঁ ,"জোরে ঘাড় নাড়ে অর্চি ।
"জ্যাম পাউঁরুটি টা –"
" ওসব থাক। ওই অঙ্কটা পরে কষে দেবো না হয়। আগে তো খেয়ে নিই চল ।"

দুজনে মিলে চামচ দিয়ে পাশে রাখা প্লেটে খাবার তুলতে থাকলো ।কাঁচের বাটিতে ভয়ে ভয়ে চামচ ঠেকায় অর্চি।একেই জিনিসপত্র ভাঙে বলে মা অলবড্ডে বলেন।

বুঝতে পারেন বুঝি বুড়ো মানুষটি ।রুপোলী ঝকঝকে দাড়ির ফাঁক দিয়ে হেসে বলেন , "কাঁচের নয় তো। ।কোন চিন্তা নেই ।আমরা চেষ্টা করলেও ভাঙতে পারব না।"

হাঁফ ছেড়ে নিশ্চিন্তে হাত লাগায় অর্চি।

 টিফিন টাইম আর ভ্যানিশিং ইঙ্কের গল্প

একটু পেটটা ঠাণ্ডা হতে মুখ তোলে ।  
"আপনি কোত্থেকে এলেন ?"
"খবর পেলাম আমাদের বিরোধী পক্ষের লোকজন ইস্কুলের মধ্যেও দল পাকাচ্ছে।বুদ্ধিমান, মিচকে, প্যাঁচালো মগজওয়ালা লোক খুঁজে নিয়ে নিজেদের দল ভারি করতে চায়। ঐযে তোমাদের শৌনক না কী যেন, সেও এর মধ্যেই"।
"সে কী! ওতো আবার ভাইস ক্যাপ্টেন ও ।"
"সেই জন্যেই ত ওকে আর ওর মত ছেলেমেয়েদের হিংসুটে দুষ্টু লোকেরা নিজেদের দলে চায়। সবাইকে ভয় দেখিয়ে ভীতু করে কুঁকড়ে রাখতে পারলে, অনেক অন্যায় কাজ অনায়াসে করা যায়। কেউ প্রতিবাদ করার থাকে না।"
"কী করবেন তা হলে?"
" তুমি, তোমার বন্ধুরা, তোমাদের স্বপ্নেরা, সব আছো কী করতে ?তোমরা আমার আলোদের সঙ্গে থাকবে না?"
"আপনি কী হ্যারি পটারের বইয়ের ডাম্বলডোরের মত কেউ?"
হো হো করে হেসে ফেললেন মানুষটি ।
"না গো ,তিনি তো মাষ্টার মশাই।আমি একজন ট্র্যাফিক কন্ট্রোলার ।সময়ের রাস্তা ঠিক রাখতে তোমাদের ও হেল্প চাই যে,তাই তোমার সঙ্গে আলাপটা ঝালিয়ে নিতে এসেছি।
পেট ভরল কি ?"
পাটু তাকিয়ে দেখে বাটি সব ফাঁকা ।পেটটা বেশ ভর্তি লাগছে। কেমন একটা টইটুম্বুর আরামে ফুরফুরে লাগছে চার দিক। খুশি হয়ে গেল ভিতরটা ।
"হ্যাঁ ,পেট ভরে গেছে ।কিন্তু—"
"কী ?"
"জামায় জ্যামের দাগ—"
"ভ্যানিসিং ইঙ্ক দিয়ে মুছে দিতে পাঠিয়েছি ।"
"কাদের ?"
"এই যে আমাদের ড্যামেজ কন্ট্রোল টিমের সব গেল না ? লাল কমলা ইউনিফর্ম পরে ।"
"ওঃ সেই প্রজাপতির ঝাঁক ?"
"প্রজাপতির ?না ঠিক প্রজাপতি নয়। তবে খুদে ডানা দেওয়া জামা তো , অনেকটা ওরকমই দেখায় বটে ।ওরা ঠিক মুছে টুছে দিয়ে আসবে। চল তোমায় ক্লাসে পৌঁছোই ।"

গরম হাওয়ার সঙ্গে ধুলোর ঝাপটার মত কী লাগল চোখে মুখে ।ফের চোখ খুলতেই ক্লাসরুম।বেঞ্চের কোনায় বসে আছে অর্চি। ঢং ঢং করে টিফিন শেষের বেল বাজছে। তাড়াতাড়ি উঠে নিজের সিটে গিয়ে বসল অর্চিষ্মান ।আর তক্ষুনি ক্লাসে ঢুকে পড়লেন ক্লাস টিচার ।

সবাই মিলে উঠে দাঁড়িয়ে ,গুড আফটারনুন আন্টি , বলতে বলতেই শৌনকের গলা ভেসে এল।
"আন্টি অর্চিষ্মান ওয়াজ থ্রোয়িং ফুড ডীউরিং টিফিন টাইম অন মাই ব্যাক।"
অর্চি সঙ্গে সঙ্গে বলে, "নো আন্টি ।"
আন্টি খুব স্ট্রিক্ট। চশমাটা কপালে তুলে গম্ভীর গলায় বললেন, "হোয়ার ডীড ইট ফল ?"  
"আন্টি ইট স্টেইন্ড মাই শার্ট ।মাই মাদার উইল স্কোল্ড মি ।"
নাটোক করে কান্না কান্না গলায় বলে শৌনক।
" টার্ন এরাউন্ড ।"

ওর পিছন দিকটা দেখতে পাচ্ছিল অর্চি। ধবধবে সাদা শার্ট । আন্টির কাছে প্রচন্ড ধমক খেল ভাইস ক্যাপ্টেন ।দশ মিনিট ধরে বকলেন।বিনা কারনে বন্ধুদের নামে নালিশ করা কত খারাপ,কত স্পাইটফুল,মিনমাইন্ডেডনেস ,সে তো বললেনই ,আর পাঁচ পাতা , "আই উইল নট বি মিন " হাতের লেখাও হোমওয়ার্ক দিয়েছেন।

খারাপ টিফিনের কষ্টটা একেবারে চলে গেল পাটুবাবুর।

আহা, ট্র্যাফিক কন্ট্রোল মশাই বড় ভালো লোক।   

 

ছবিঃ মঞ্জিমা মল্লিক

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা