ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
অভিযান
কিন্তু এলার্ম বাজার আগেই স্যাম আবার আমার ঘুম ভাঙাল, এবার হাতে একটা মাইনারদের ভাঙা হেলমেট, বলল- “তুমি ঘুমিয়ে পড়ার পরে অনেক ভেবে দেখলাম তোমার দেখা মানুষটা চোখের ভুল হতে পারে না, কেউ ইচ্ছে করেই আমাদের ঐ পোষাকে ভয় দেখাতে চেয়েছে, তারপর একটু খোঁজাখুঁজি করতেই মাটিতে এটা পেলাম।" স্যামকে হতাশ ও চিন্তিত দেখালো, সে আরো বলল এখনি বেরনোর পথ খুঁজে না পেলে বড় বিপদে পরব আমরা। আমি খুব অবাক হলাম এই ভেবে যে সকালে কোন লোক যদি আমাদের দেখে থাকে,আর সে যদি ভয় দেখিয়ে এখান থেকে তাড়াতে চায় তাহলে আমাদের খুঁজে পেতে তার বা তাদের এত দেরি হচ্ছে কেন, সে তো আমাদের গুহায় ঢুকতে দেখেছে নিশ্চই।

স্যামকে এ প্রশ্ন করায় সে জানাল এসব সম্ভাবনা সে ভেবে দেখেছে - “যেভাবে আমরা এইখানে এসে পরেছি সেটা একটা দুর্ঘটনা, একটা পরিত্যক্ত পথ, যারা এখানে গোপনে পাথর সরাচ্ছে তারা এটা জানে যে ঐ পথ বিপজ্জনক, বেঁচে ফেরার আশা কম। হটস্পট ছাড়াও বিষাক্ত বাষ্প ও কার্বন ডাই অক্সাইডের কথাটা নিশ্চই তারা জানে। আর সুরঙ্গপথের প্রচুর মুখ থাকা সম্ভব, সুতরাং আমরা কোনখান দিয়ে বেরোতে পারি হয়তো তারা বুঝতে পারছে না”।

আমি বললাম “তার মানে ওদের খপ্পরে যে কোনো সময় পরতে পারি”।
"-হুঁ, খুব সতর্ক থাকতে হবে, তবে এখনো একটা খটকা যাচ্ছে না। আচ্ছা যে লোকটাকে দেখেছিলে সে কি খুব লম্বা মনে হয়েছিল?”
"-তা হতে পারে দূর থেকে তো বুঝিনি।"
"-সেটাই তো কথা ঝোপঝাড়ের উপর দিয়ে তাকে অত স্পষ্ট দেখলে কিভাবে, আর সেখানে কোনো চিহ্ন পেলাম না কেন?"
"-আর গুহার ভিতরের মৃতদেহ কি তাহলে সাজানো?"
"-মনে হয় না, সে থেকেই এই দ্বীপ সম্পর্কে ভয়ের কাহিনীগুলো চালু হয়েছিল বলে মনে হয়, আর যারা সেগুলো খুঁজে পায় তারা সেটার সদ্ব্যবহার করেছে। এখন ভাবছি লোকটা কতো লম্বা হলে দেখা সম্ভব। ওরকম একটা ফিট আটেকের লোকের পাল্লায় যদি পরি তবে তো ভবলীলা সাঙ্গ।"
"-আর একটাই সম্ভাবনা যদি রনপা পরে থাকে, হ্যাঁ এটা হতেই পারে তাই হয়ত জমিতে মিনিমাম ড্যামেজ হয়েছে যেটা আমরা ধরতে পারিনি-আমি বলে উঠি। "
" - এটা তুমি ভালো ধরেছ, সত্যিই এরকম করতে পারে বিশেষত সমুদ্রে বোট থেকে দেখা যাওয়ার জন্যে এটা ভালো উপায়।"

কিছুক্ষণ পরে আবার চলা শুরু, তখন সূর্যোদয়ের সময় হয়েছে। ঘড়ি ধরে ৭ মিনিটের মাথায় আমরা আলো দেখতে পেলাম, উত্তেজনায় পথটা প্রায় দৌড়ে পার হব, সেই মোক্ষম মূহুর্তে আবার সবকিছু যেন অন্ধকারে ডুবে গেল। জ্ঞান ফিরতেই সমুদ্রের হাওয়ার গন্ধ নাকে এল, মাটিতে পড়ে আছি, হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধা, একজন লোক মাথার দিকে বন্দুক তাক করে আছে, একটু দূরে স্যাম হাঁটু গেড়ে মাথা নীচু করে বসে হাত বাঁধা ও একই রকমভাবে গানপয়েন্ট এ। ওরা তিনটে লোক, তিনজনের হাতেই রিভলবার, স্যামের সঙ্গে দু একটা কি কথা হচ্ছে ভাষাটা স্থানীয় হওয়ায় কিছু বুঝলাম না। স্যাম কিছু একটা বলে ওদের সঙ্গে সামঝোতায় আসতে চাইছে মনে হল। বুঝতেই পারছিলাম ওরা আমদের এখান থেকে যেতে দেবেনা, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারনে একেবারে মেরে ফেলতেও চাইছে না। এভাবে কিছুক্ষণ কাটলো, হঠাৎ স্যাম চোখের পলকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল আর তার জোড়া পা গিয়ে আঘাত করলো পিছনে দাঁড়ান লোকটার চিবুকে। আমি উত্তেজনায় স্প্রিং এর মতো লাফিয়ে উঠতেই একটা গুলি কাঁধের জামা ও ছাল উঠিয়ে বেড়িয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে চোখ বুজে গেলো কিন্তু আর্তনাদটা এল আমার মাথায় রিভলবার ধরে থাকা লোকটার মুখ থেকে, চোখ খুলে দেখি ধুন্দুমার কান্ড বেঁধেছে, জনা পাঁচেক লোক কালো ব্যাসল্ট পাথরের স্তম্ভের আড়াল থেকে গুলি ছুঁড়ে এদের কাবু করেছে, একজন হাত চেপে ধরে বসে পরেছে, বাকি দুজনেরও গুলি লেগেছে কোথায় বুঝলাম না তখনি। এই ফাইটিং দৃশ্যটা হিন্দি ফিল্মের মত আর বাড়িয়ে তোদের বোর করব না, বুঝতেই পারছিস বেঁচে বর্তে ফিরেছি। দাদু একটু থামলেন।

সমু বলল- যারা তোমাদের বাঁচালো তারা কারা?
"-যারা আমাদের বাঁচাল, তারা সামোয়ায় যার বাড়ি ছিলাম সেই ওহিয়া ও তার কিছু বন্ধু, জ্যাক আর ওহিয়া ছাড়া নাম আর মনে নেই, তারা কিভাবে ওখানে এলো সেটা বড় প্রশ্ন,একে বলে “রাখে হরি মারে কে,” আমরা দুদিনে ফিরে না আসায় ওরা একটু খোঁজখবর শুরু করে, তখন একটা মাছধরা নৌকা আমাদের দেখেছিল দ্বীপের দিকে যেতে, ওরা মানুষের পাল্লায় পড়েছি ভাবেনি,দ্বীপে না নেমে বোটে টহল দিচ্ছিল, তখন ওই দৃশ্য দেখে উদ্ধারে নামে।"

"এবার প্রশ্ন কেন ওরা আমাদের গুহার ভিতরে খতম করল না, স্যাম ওদের বলেছিল সে ন্যাশান্যাল জিওগ্রাফিক এর হয়ে কাজ করছে এবং সে কোথায় আছে কি করছে সব খবর তারা জানে। তাই মেরে ফেললে এই দ্বীপে প্রচুর ঝামেলা শুরু হবে। এতে ওরা দ্বিধায় পরে যায়, আমাদের মারলে বেশী সুবিধা নাকি না মেরে ছেড়ে দিলে।স্যামের সঙ্গে যে আই ডি ছিল যা তারা পরীক্ষা করে দেখে। "

তিতির প্রশ্ন করল, “আর লোকগুলো ওখানে দামী পাথর চুরি করছিল?”

দাদু বলল- চুরি বলতে পারো না, পৃথিবীর সর্বত্র ল এন্ড অর্ডার সমান নয়, তবে হ্যাঁ ওরা চায়নি আর কেউ জানুক। ওরা ছিল টোঙ্গান উপজাতির লোক, কিছু ফরাসী ব্যাবসায়ী ওদের দিয়ে কাজ করাচ্ছিল।

স্যামের পাওয়া পাথরটা হাই কোয়ালিটির আলেকজান্দ্রাইট প্রমাণ হয় পরে।

দুঃখের বিষয় স্যামের সেখান থেকে কোনো লাভ হয়নি, দ্বীপটা নিউজিল্যান্ড এর এরিয়ায় পড়ে, আইনি মারপ্যাঁচ সামলে কিছু করা স্যামের পক্ষে কঠিন হয়ে পরে। সেযাত্রা তাকে আমেরিকা ফিরে আস্তে হয়, পরে শুনেছি একটা টিম নিয়ে সে যায় দ্বিতীয়বার, খনির দুষ্প্রাপ্য পাথরগুলো ততদিনে প্রায় হাওয়া। একটা ক্রিস্টাল সে আমাকে পাঠায় তার সঙ্গী হওয়ার স্মৃতি হিসেবে।

“কোথায় কোথায়” রব ওঠে শ্রোতার দলে, দাদু ভেতর ঘরে খবর পাঠালেন। সুমিত্রাদির মারফত খবর এল দিদিমা একটু পরে আসছেন।

দেবু জিগ্যেস করল- তোমার সাথে স্যামের যোগাযোগ ছিল তারপর?

-বেশ কিছু বছর ছিল তারপর কমে আসে, তার কাজের ওপর লেখা বের হলে জানাতো। এতক্ষণ যে অভিজ্ঞতার গল্প শুনলি তা হয়তো ঘটনাবহুল, কিন্তু ফেরার আগে স্টিভেনসনের সমাধিতে দাঁড়িয়ে যে অসাধারন অনুভূতি হয়েছিল তা এই বুড়োবয়সেও মনে পড়ে। কথায় তা প্রকাশ করা যায় না।সবুজ ঘাসে ভরা মাউন্ট ভায়া তার উপরে সমাধি, যতদূর চোখ যায় নীল সমুদ্র, পাখির কাকলি ছাড়া শব্দ নেই, সমুদ্রের গন্ধ ছাড়া গন্ধ নেই, সে এক অপার্থিব শান্তির জায়গা, এক পৃথিবী বিখ্যাত কবি ও লেখকের নাম যশ থেকে বহুদূরে নির্জন শেষ ঘুম।”

দিদিমা এসময় একটা ছোটো বাক্স হাতে নিয়ে এলেন।দাদু তা থেকে জিনিসটা বার করতেই দিনের আলোয় ঝকমক করে ক্রিস্টালটি নীলচে সবুজ আলো ছড়িয়ে দিল।

অভিযান

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা