ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

মা'কে আমার পড়েনা মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে ভোরে শিউলি বনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে ফুলের গন্ধ আসে
তখন কেন মায়ের কথা আমার মনে ভাসে।
কবে বুঝি আনত মা সেই ফুলের সাজি বয়ে
পূজোর গন্ধ আসে যে তাই মায়ের গন্ধ হয়ে।

রবিঠাকুরের "শিশু ভোলানাথ স্মৃতি উসকে দিল আমার ছোটবেলার নষ্টালজিয়াকে আরো একবার। পুজো, দুগ্গাঠাকুর, আর আমাদের মা..... সেই নিয়ে মনে পড়ে গেল কতকিছু। বাবাকে কর্মসূত্রে অনেক ট্যুর করতে হত। আমার আর আমার চেয়ে ন'বছরের ছোট ভাইকে নিয়ে আমাদের মায়ের সর্বক্ষণের ওঠাপড়া। যত শাসন তত আদর। যত বকুনি তত সুস্বাদু খাবারদাবার। ভাদ্রমাস পড়লেই মায়ের শারদীয়-কর্তব্য। মানে যাকে বলে অটাম ক্লিনিং- ভাদ্রমাসের জামাকাপড় রোদ খাওয়ানো।

ভাদ্র-আশ্বিন মাসের আকাশের রংটা যেন কেমন নস্টালজিয়ায় ভরাট। নীল আকাশে সাদা গুচ্ছ গুচ্ছ পেঁজা তুলোর মেঘ। কখনো সেই মেঘ থেকে উত্তরে দু-এক পশলা বিষ্টি তো দক্ষিণে খটখটে রোদ! একটা ঝটিতি ঝমঝমে বৃষ্টির পরক্ষণেই পুবের আকাশে একচিলতে রামধনু আর পশ্চিম আকাশে আলতাগোলা সূর্যের পাটে যাওয়া।

ভাদ্রমাসে কাপড়চোপড় রোদে দিতে দিতে, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে মা বলতেন "ঐ দ্যাখ, আকাশের দিকে, জটাজুটধারী শিব তার চ্যালাচামুন্ডাদের নিয়ে বসে আর ঐদিকে দ্যাখ মা দুর্গা তার ছানাপোনাদের নিয়ে কৈলাস থেকে কলকাতায় আসার তোড়জোড় করছে"

আমিও আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্পনা করে নিতাম মেঘের আলপনায় শিব-দুর্গাকে। আকাশে এই সময় মেঘ গুড় গুড় করে ডেকে উঠলে মা বলতেন," শিব ঠাকুর মা দুর্গাকে ভয় দেখাচ্ছে, বলছে, পুজোয় তার যাওয়ার দরকার নেই" আমি বলতাম, না, না সেটা ঠিক হবেনা, তুমি বলে দাও শিবঠাকুরকে, আমাদের পুজোর সব মজাটা তাহলে নষ্ট হয়ে যাবে"

ভাই খুব ভালো ছবি আঁকত। দুর্গাপুজো এগিয়ে এলে তার ফি বছর সে খুব তৎপরতার সাথে ক্যালেন্ডারের পেছনে কিম্বা আমার প্র্যাকটিকাল খাতার পাতায় সুন্দর করে দুর্গাঠাকুর এঁকে রং করে ফেলত। কখনো মা দুর্গা একলা কখনো বা সপরিবারে। তাতে রং চড়ত দিনের পর দিন ধরে। তারপর মায়ের সেলাইবাক্স ঘেঁটেঘুঁটে, আমার জমানো কিছু ওয়ার্ক এডুকেশনের জিনিষপত্র থেকে চুমকি, পুঁথি, সলমা, বোতাম জরি সব আঠা দিয়ে লাগিয়ে মাদুর্গার ঝিনচ্যাক মুকুট হত। প্রতি শনিবার স্কুল থেকে ফিরে তার পুজো করার মহড়া চলত। আমি সাপ্লাই করতাম প্রসাদ। ভাগও পেতাম। তার মহা উৎসাহ ছিল ঠাকুরঘর থেকে ধূপ এনে জ্বালানো। আগুণ জ্বালাচ্ছি আমরা জানতে পারলে মা আমাদের পৃথিবী রসাতলে নিয়ে যাবে তবুও খুব সন্তর্পণে ঐটুকুনি ছেলে সব কাজ সারত একে একে । আরেকটা কাজ সে খুব ভালো পারত। তা হল পুজোয় ঢাক বাজানো। দক্ষিণেশ্বর থেকে কেনা একটা টিনের ড্রামে পটাপট কাঠি পড়তেই থাকত। চলতেই থাকত পুজোর ঢাক বাজানোর রিহার্সাল। ঝালাপালা কান সকলের আর উঁচুক্লাসের আমারো।

কত কম চাহিদা ছিল আমার আর ভাইয়ের। ভিডিও গেম চোখে দেখিনি তখন। আমার ছিল পুতুলের শখ আর ভাইয়ের ছিল ক্যাপ বন্দুক। ভাইয়ের ছিল ক্রিকেটের ব্যাট-বল আমার ছিল ফেব্রিকের রং-তুলি। ভাইয়ের ছিল ঘুড়ি-লাটাই আমার ছিল গান। সেও ভালো গান গায়। আর আমাদের দুজনের ছিল খুব নোলা। মায়ের যখন মন ভালো থাকত তখন বেশি করে অঙ্ক করব সেই ব্ল্যাকমেল করে আমরা মোগলাই পরোটা, মাটন রোল, আলু পরোটা এইসব মা'কে দিয়ে বানিয়েই ছাড়তাম। আমাদের দুজনের পড়াশুনোটা যেন অন্য রকম ভাবে ঘটে যেত সেই রসনা তৃপ্তিতে।

দিদি দ্যাখ্‌না একটিবার! ঘুমন্ত মায়ের টিকোলো নাকটার দিকে আঙুল দিয়ে ভাই বলত, মা দুর্গার নাকটাও ঠিক এমনি হয় , নারে দি? আর মা চোখ পাকিয়ে যখন আমাদের পড়তে বসতে বলে তখনো মায়ের মুখটা প্যান্ডেলের রাগী দুর্গার মত হয়, তাইনারে দিদি? মুকুটছাড়া দুর্গাঠাকুর, খোলা চুলে ঠিক আমাদের মায়ের মতন! কতো ঘরোয়া লাগে এমন প্রতিমাকে।

আমি ভাইয়ের আঁকার খাতাখানা টেনে নিয়ে বলতাম, তাই বলে তোর আঁকা এই দুর্গার নাকটা মোটেও মায়ের মত টিকোলো হয়নি। ভাই রাবার হাতে পুঁছতে বসত। তারপর দুর্গাকে নথ পরিয়ে বলত, ও মা তুমি কেন নাকে নথ পরোনা? মা বলত, ওমা! সোনার বেনেরা নাকে নথ পরে! আমাদের কস্মিনকালে কেউ নথ পরেনি। ভাই বলত মাদুর্গা কি তাহলে সোনার বেনে ছিল? মা একগাল হেসে ভাইকে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে বলত, মা দুর্গা হলেন "সোনার বৌ কোনা, বলদ বাজায় ঢোল, সোনার বৌ রাঁধতে পারে ইলিশ মাছের ঝোল!"

ভাই বলত, মা-দুর্গারা ইলিশমাছ খায় নাকি? মা বলত, কোথাও কোথাও খায় বৈকি! কৈলাসে তো আর পায়না, বাপের ঘরে এসে আশ মিটিয়ে দুটো মাছ ভাত খেয়ে যায় ক'দিন।

পুজোর কাছাকাছি কোনো এক ছুটির দুপুরে মা আমাদের দুর্গাঠাকুরের গল্প শোনাত। আমি আর ভাই দুপাশে মধ্যিখানে আমাদের মা। কখনো আমার প্রশ্ন, কখনো ভাইয়ের। গণেশের কলাবৌ থেকে চালচিত্র কিছুই বাদ যেতনা। মাদুর্গার কত কত নতুন নাম শেখাত মা আমাদের।

একজন দাপুটে মেয়ের কত নাম! এক অঙ্গে বহুরূপ। এক রূপে বহুনাম্নী আমাদের মা দুর্গা । শরতঋতুতে আবাহন হয় বলে দেবীর আরেক নাম শারদীয়া। এছাড়া মহিষাসুরমর্দিণী, কাত্যায়নী, শিবানী, ভবানী, আদ্যাশক্তি, চন্ডী, শতাক্ষী, দুর্গা, ঊমা, গৌরী, সতী, রুদ্রাণী, কল্যাণী, অম্বিকা, অদ্রিজা এমন কত নাম আছে মায়ের। ঠিক আমাদের ঠাম্মা যেমন আদর করে তোকে একটা নামে ডাকে, মামারবাড়িতে আদিখ্যেতা করে অন্য নামে ডাকা হয়। আবার বাবার দেওয়া একটা নাম, মায়ের দেওয়া একটা নাম, স্কুলের জন্য একটা ভালো নাম । মা দুর্গা তো আমাদেরি ঘরের মেয়ে বল্‌ ! তাই জন্যেই তো আমাদের পুজোর সময় এত আনন্দ হয়।

হ্যাঁরে দিদি? গণেশের কলাবৌ আছে কার্তিকের বৌ নেই কেন?
দুর পাগল, প্রতিবার ছেলের এই এক প্রশ্ন। মা প্রতিবছর বলে আর তুই ভুলে যাস কেবল। কলাবৌ আসলে মাদুর্গাই তো। আমরা সকলে ভুল করি।

মহাসপ্তমীর সূচনা হয় নবপত্রিকার স্নানপর্ব দিয়ে । নবপত্রিকা দেবীদুর্গার প্রতিনিধি । এই নবপত্রিকাই তো কলাবৌ। অতবড় মাটির মূর্তিকে নিয়ে কি গঙ্গায় স্নান করানো যায়? তাই তো কলাবৌ স্নান করানোর রীতি। সাদা অপরাজিতা লতা আর হলুদ মাখা সুতো দিয়ে ন’টি উদ্ভিদ .....কলা, কালো কচু,হলুদ,জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু, ধান– এসবের চারাকে একসাথে বেঁধে নদীতে স্নান করানো হয় । দেবীর প্রিয় গাছ বেল বা বিল্ব । নদীতে নবপত্রিকা স্নানের পূর্বে কল্পারম্ভের শুরুতে দেবীর মুখ ধোয়ার জন্য যে দাঁতন কাঠি ব্যবহার হয় তাও আট আঙুল মাপের বিল্বকাঠেরই; তাছাড়া মন্ত্রে সম্বোধন করে নবপত্রিকাকে দেবীজ্ঞান করা হয় । শস্যোৎপাদনকারিনী দেবী দুর্গা স্বয়ং কুলবৃক্ষদের প্রধান অধিষ্ঠাত্রীদেবতা ও যোগিনীরা দেবীর সহচরী । স্নানান্তে নতুন শাড়ি পরিয়ে তিনটি মঙ্গলঘটে আমপাতা, সিঁদুর স্বস্তিকা এঁকে জল ভরে একসাথে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ, ঘন্টা এবং উলুধ্বনি দিয়ে বরণ করে, মন্ডপে মায়ের মৃন্ময়ীমূর্তির সাথে স্থাপন করা হয় ।

মা'কে প্রতিবছর প্যান্ডেলের প্রতিমা দর্শন করতে গিয়ে জিগেস করতাম, মা ওঁরা তো পাঁচজন তবে তিনটি ঘটে পুজো হয় কেন গো?
মা বলেছিল, এই তিনটি ঘটের একটি মাদুর্গার ঘট, একটি গণেশের এবং তৃতীয়টি শান্তির ঘট । নবপত্রিকার পূজা একাধারে কৃষিপ্রধান ভারতবর্ষের বৃক্ষপূজা অন্যদিকে রোগব্যাধি বিনাশকারী বনৌষধির পূজা ।

দিদি দ্যাখ, সেবার কুমোরটুলি সার্বজনীনের ঠাকুরটা কেমন হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে ছিল আমাদের দিকে। আবার আমাদের অশোকগড়ের সবকটা প্যান্ডেলে মায়ের কেমন রাগী রাগী রণচন্ডী মুড! বনহুগলীর ঠাকুরগুলো মিলিয়ে মিশিয়ে একটু গম্ভীর, একটু হাসিহাসি। এমন কেন হয়রে দিদি?

আমি বলতাম, ঠিক আমাদের মায়ের মত আসলে মুডি মাদুর্গা। মা’কে কত কাজ একাহাতে সামলাতে হয় বল! ঠাম্মার দোকতা-পান-জর্দা, বাবার অফিসের টিফিন, আমাদের স্কুলের হোমওয়ার্ক করানো, আমাদের পিসির বিয়ের পাত্র খোঁজা, জ্যাঠামশাইয়ের জন্য চিনিছাড়া বাড়ির সন্দেশ বানিয়ে দেওয়া, ধোপা, কাগজওয়ালার হিসেব, অঘ্রাণে বড়িহাত, পৌষমাসে নতুন ধান দিয়ে লক্ষ্মীপুজো, মাঘমাসে কুলুই মঙ্গলচন্ডীর ব্রত করা, এতসব ঝক্কি তো মাকেই সামলাতে হয় ! ঠিক যেমন মাদুর্গাকে দশহাতে যুদ্ধ করতে হয়েছিল মহিষাসুর বধের সময়। সব দেবতারা অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল মাদুর্গাকে। কতগুলো দৈত্য, দানব, অসুরকে তিনি মেরেছিলেন জানিসতো?

না রে দিদি, আমি তো কেবল মহিষাসুরের নামটাই জানি।

রক্তবীজ, চন্ড, মুন্ড, শুম্ভ, নিশুম্ভ, ধূম্রলোচন, মধু, কৈটভ আর মহিষাসুর, মোট ন'জন অসুরকে মাদুর্গা বধ করেছিলেন।

এই এক একজন দুষ্টু অসুর আসলে সমাজের খারাপ লোকেদের প্রতীক। ধরে নে ন'জন অসুরের একজন চোর, একজন ডাকাত, একজন মিথ্যেবাদী, একজন হিংসুটে, একজন মেয়েদের ওপর অত্যাচার করে, একজন অসৎ, একজন খুনি, একজন প্রতারক আর একজন নিষ্ঠুর লোক। এরা সকলেই দুষ্টু আর সমাজের জন্য ক্ষতিকারক মানুষ। তাই বছরে একবার মাদুর্গাকে স্মরণ করে আমরা এইসব অশুভ শক্তির বিনাশ করার চেষ্টা করি।


ছবিঃ মহাশ্বেতা রায়, দাড়িদা

লেখক পরিচিতি

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

ইন্দিরা মুখার্জি নিয়মিত বিভিন্ন কাগুজে পত্রিকা এবং ওয়েবম্যাগাজিনে নিয়মিত লেখালিখি করেন। কবিতা-গল্প-ভ্রমণকাহিনী লেখা ছাড়াও, রসায়নশাস্ত্রের এই ছাত্রীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে ভাল বই পড়া, ভ্রমণ, সঙ্গীতচর্চা এবং রান্না-বান্না। 'প্যাপিরাস' ওয়েব ম্যাগাজিনের সম্পাদক ইন্দিরা মুখার্জির সম্প্রতি বেশ কয়েকটি বিভিন্ন স্বাদের বই-ও প্রকাশিত হয়েছে।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা