ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
শ্রীনিকেতনে হলকর্ষণ ও বৃক্ষরোপণ-উৎসবে কথিত

হ্যারি পটারের প্রফেসর ট্রিলনিকে মনে আছে? ওই যে, ডিভিনেশন পড়াতেন যিনি। সিনেমায় বিশাল বড় বড় মোটা পাওয়ারের চশমা পড়তেন, চোখগুলো বিশাল বড় দেখাত। সেই ট্রিলনি একদিন হ্যারিদের চা বানাতে বললেন। হগওয়ার্টস তো জাদু শেখার ইস্কুল, তা বলে চা তৈরী করাটাও যে ম্যাজিক করে হবে, তা নয় কিন্তু। পাতি স্টোভে বসিয়ে জল গরম-টরম করে সেটা টীপটে চা পাতার ওপর ঢেলে মিনিট তিনেক কাটাকুটি খেললেই বাজিমাত, চায় তৈয়ার। আমরা মাগলরাও ঠিক এভাবেই চা করে খেতে পারি, অলিভ্যান্ডারের ওয়্যান্ড লাগবে নে।

তবে হ্যাঁ, শর্ত আছে। দুধ-চিনি এসব মেলালে চলবে না। চা-টা চোঁ করে খেয়ে ফেলে কাপটা ঠক করে টেবিলে রাখতে হবে। তারপর সেই চায়ের পাতার দিকে মিনিট পাঁচেক বোকার মত তাকিয়ে থাকলেই নাকি ভবিষ্যতে কী হবে সেসব জানা যাবে।

হ্যারি পটার কল্পনার জগতের গল্প। আর ভবিষ্যত দেখা তো একেবারেই অসম্ভব। জ্যোতিষীরা যে বলে হাত দেখে বা কোষ্ঠি করে ভবিষ্যত বলে দেব, এর পক্ষে কোন প্রমাণ বিজ্ঞান আজ অবধি পায় নি। এইসব ভণ্ডামির থেকে দূরে থাকাই ভাল।

হ্যারিপটারের এই ব্যাপারটা পড়তে পড়তে আমার কেন জানি ভীষণ চা খেতে ইচ্ছে করে। আজ খাচ্ছিলুমও। টীপটে চা-পাতা ভিজিয়ে উপাদেয় চা। পটারও শেষ, চা-ও শেষ, এবার চায়ের পাতাটা ফেলে দিয়ে টীপটটা মেজে রেখে দি বরং...

"এই এই কী করছিস কী করছিস মাটি করলে..."

হাহাকার মেশানো হম্বিতম্বি শুনে পিছন ফিরে দেখি, গেছোদিদি হাঁফাতে হাঁফাতে আমার দিকে ছুটে আসছে। গেছোদিদি তো ঠিক আমাদের মত সাধারণ মানুষ নন, তাই উনি তো আর সবার মত মেঝের ওপর পা ফেলে ছুটে আসবেন না। উনি মহাকালের বাসিন্দা, সময়ের মধ্যে ভেসে ভেসে...

"দুত্তোর তোর সময়ের মধ্যে ছুটোছুটি, টীপটটা এক্ষুণি রেখে জলের কলটা বন্ধ কর। অভী। ইসি ওয়াক্ত!"

বুঝলাম সিরিয়াস ব্যাপার। কথামত কাজ করে একটা খালি চেয়ারে বসে শুধোলাম,

সোঘো ।। কী গো গেছোদিদি, ব্যাপার কী? হাঁপাচ্ছ কেন?

গেছোদিদি (আর একটা খালি চেয়ার টেনে পা তুলে বসে) ।। হাঁপাচ্ছি কী আর সাধে হতভাগা। ছিলুম বেশ ১৫৩৭ সালে, ইংল্যান্ডে, রাজা অষ্টম হেনরির আদেশে দেশের ক্যাথলিক ক্রিষ্টান মঠ সব একের পর এক ভাঙা হচ্ছে, রিফর্মেশনের যুগ, সেখান থেকে টাইমোকুলারে তোর কাণ্ড দেখে পড়ি-কি-মরি ছুটে এসেছি। আরেকটু হলেই কেলো করেছিলি।

সোঘো ।। কেন গো গেদি, কী কেলো করেছিলাম? আর টাইমোকুলারটাই বা কী?

গেছোদিদি ।। শোন, আমাকে যদি আরেকবার গেদি বলেছিস কানের গোড়ায় এমন একটা দেব যে সোজা ১৪১৫ সালের ২৫ অক্টোবরে এঝিনকুরে ফরাসি সৈনিকের দলে গিয়ে নাম লিখিয়ে বসে থাকবি।

সোঘো ।। না না, আমি এঝিনকুরে যেতে চাই না, কলকাতায় বসে আম আর ফুচকা খেতে চাই। গেছোদিদি বলেই ডাকব।

গেছোদিদি ।। হুঁ,গুড বয়। কী যেন বলছিলাম যেন...?

সোঘো ।। টাইমোকুলার। আর আমি কী একটা যেন কেলো করছিলাম...

গেছোদিদি ।। ঠিক ঠিক। টাইমোকুলার ওই তোদের বাইনোকুলারেরই মত। বাইনোকুলারে যেমন দূরের জিনিস স্পষ্ট দেখা যায়, চোখে টাইমোকুলার লাগালে পাস্ট-প্রেজেন্ট-ফিউচার, সবকিছু সামনে বায়োস্কোপের মত ভেসে ওঠে।

সোঘো ।। ফিউচারও?

গেছোদিদি (গলা খাঁকড়ে) ।। হ্যাঁ, মানে, না, ঠিক সেরকমভাবে যায় না। ব্যাপারটা একটু প্যাঁচালো। সময় জিনিসটাই এমন একটা গোলপ্যাঁচানো রবারের উলের বলের মত যে...

সোঘো ।। গেছোদিদি! থাক, বোঝাতে হবে না। কেলোটা কী করছিলাম সেটা বোঝাও বরং।

গেছোদিদি ।। হ্যাঁ, রাইট। কী ডেঞ্জারেস। তুই নাকি চায়ের পাতা ফেলে দিচ্ছিলি! জানিস, ওই চায়ের পাতা দিয়ে কী করা যায়?

সোঘো ।। কী আর করা যাবে? বেশির চেয়ে বেশি মাটিতে মিশিয়ে দিলে গাছ ভাল হবে। সুযোগ পেলেই আমরা আমাদের ছাদের টবের মাটিতে চায়ের পাতা মিশিয়ে থাকি। মানে, চা করা হয়ে গেলে ভিজে চা পাতাটা শুকিয়ে নিয়ে তারপর দি। নয়তো উল্টো ফল হবে।

গেছোদিদি ।। বাঃ, ভেরিগুড। কিন্তু হে সোঘো, তুমি কি জানো, এই চায়ের পাতা ব্যবহার করে ক্যান্সারের ওষুধ তৈরী করা যায়?

সোঘো ।। অ্যাঁ!

গেছোদিদি ।। অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ। Zaনতি পারো না?

সোঘো ।। না মানে...ক্যান্সারের ওষুধ বেরিয়ে গেছে? মানুষের ক্যান্সার?

গেছোদিদি ।। না, তা বেরোয়নি। তবে বেরোতে কতক্ষণ? ওয়েল্স দেশের সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষকরা যদি তাদের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলে ওষুধ বেরোতে পারে বৈকি।

সোঘো ।। আমার মাথা ভোঁভোঁ করছে। গেদি...মানে, গেছোদিদি, ব্যাপারটা একটু খুলে বল দিকি। আমি ততক্ষণ আরেকটু চা বানিয়ে খাই---আচ্ছা, এই চা বানিয়ে খেলে কি ক্যান্সার সারবে? নাকি কাঁচা কাঁচা চায়ের পাতা চিবিয়ে খেতে হবে?

গেছোদিদি ।। ওফফ, ছাগল নাকি যে পাতা চিবিয়ে খাবি? আর না, পেয়ালার পর পেয়ালা চা খেলে বেশির চেয়ে বেশি ছোট বাথরুমে বেশিবার ছুটতে হবে, ক্যান্সার অত সহজ নাকি? নে, চা-টা করে ফেল, আমার জন্য দার্জিলিঙ, তুই আর্লগ্রে তো? হ্যাঁ হ্যাঁ, ভাল করে চা কর, আমি গপ্পোটা বলি।

ওয়েল্স (Wales) দেশটা কোথায় জানিস তো? ইংল্যান্ড জানিস নিশ্চয়, ওই ইংল্যান্ডেরই পশ্চিমে অনেকটা গুজরাতের মত সেঁটে বসে আছে ওয়েল্স। রাজধানী কেয়ারদিদ (Caerdydd), যদিও ইংরেজ ভাষায় উচ্চারণ কারডিফ (Cardiff)। ওয়েল্স দেশটার নামও তো ওয়েলশ ভাষায় কিমরি (Cymru)। ইংরিজি বানান দেখে কিমরু মনে হলেও উচ্চারণ কিন্তু কিমরি। যাই হোক, কিমরির সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ে (Swansea University) এক ভারতীয় গবেষক কোয়ান্টাম ডট নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিলেন। এই ডঃ সুধাগর পিচাইমুথু (Sudhagar Pichaimuthu) অবশ্য একা নন, তাঁকে সাহায্য করেছেন ভারতের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। ব্যাপারটা কী খুলেই বলি, কী বলিস, সোঘো?

(সোঘো গেছোদিদির হাতে দার্জিলিঙ চায়ের কাপটা ধরিয়ে দিয়ে বসল। গেছোদিদি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একটা "আঃ" শব্দ করে ফের বলতে শুরু করলেন)

কোয়ান্টাম ডট ব্যাপারটা আগে বোঝাই। স্ফটিক কাকে বলে জানিস তো? পুরনো পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় তীরন্দাজের ছবিগল্পে স্ফটিক ছিল। ইংরিজিতে একে ক্রিস্টাল (crystal) বলে। বাড়িতে যে চিনি আছে, সেটা ক্রিস্টাল। নুন, তাও ক্রিস্টাল। বাড়িতে স্টিলের আলমারী আছে? সেই স্টিলও ক্রিস্টাল। যেকোন ধাতু ক্রিস্টাল। প্রফেসর ট্রিলনি যে স্ফটিক বলে ভবিষ্যৎ দেখতেন, বা দেখার চেষ্টা করতেন, সেটাও ক্রিস্টাল। আমার টাইমোকুলারেও ক্রিস্টাল আছে। মনে রাখবি, কাঁচ কিন্তু ক্রিস্টাল নয়।

এই সব জিনিস, নুন-চিনি-স্টিল ইত্যাদি, এগুলো চোখে দেখা যায়। মানে সাইজে এগুলো যথেষ্ট বড়। এবার ধর, একটা হাতুড়ি নিয়ে এসে---না না, থরের হাতুড়ি আনতে হবে না, ওটা ভেঙে গেছে, আর থাকলেও তুলতে পারতি না, হরধনুর মত ব্যাপার কিনা---ওই চিনিটাকে গুঁড়ো কর। যতটা পারিস গুঁড়ো কর, একেবারে মিহি পাউডারের মত করে ফেল। এবার আর অত সহজে আলাদা আলাদা দানাগুলো দেখতে পাবি না, দেখার জন্য আতসকাঁচ লাগবে...

[[সোঘো (চশমা নাড়িয়ে) ।। আতসকাঁচ ইজ হোয়াট?]]

উফফ, কী বিলিতি লোক মাইরী। ম্যাগনিফাইং গ্লাস রে বাবা, ম্যাগনিফাইং গ্লাস। শার্লক হোমস যা দিয়ে তদন্ত করেন। সেইটে নিয়ে এসে দেখ, দেখবি ছোট দানাগুলো দেখা যাচ্ছে। তার সাইজ কত? স্কুলের স্কেল দিয়ে মাপতে পারবি? পারবি না।

স্কেলে সেন্টিমিটার মিলিমিটার থাকে। ১ মিটারে ১০০ সেন্টিমিটার, ১ সেন্টিমিটারে ১০ মিলিমিটার। কিন্তু এই গুঁড়োর সাইজ তো আরও ছোট। মিলিমিটারের চেয়ে ছোট কী? মাইক্রোমিটার! ১ মিলিমিটারে ১০০০ মাইক্রোমিটার। মানে এক মিটারে দশ লাখ মাইক্রোমিটার, এক সেন্টিমিটারে ১০০০০ মাইক্রোমিটার! বাপরে। অত ছোট জিনিস দেখবি কী করে? আতসকাঁচেও দেখতে পাবি?

পাবি পাবি, মাইক্রোমিটার মানেই যে চোখে দেখা যাবে না কে বলল? মাথার চুলই তো ৬০-৮০ মাইক্রোমিটার চওড়া, তা বলে একেকটা চুল কি দেখতে পাওয়া যায় না নাকি? হ্যাঁ, আতসকাঁচে বড় দেখায়, আর মাইক্রোস্কোপ আনলে তো একেবারে মোটা মোটা দড়ির মত দেখাবে। ওই যে চিনি গুঁড়ো করলি, ওই পাউডারও দেখবি ওইরকম মাইক্রোমিটার মাইক্রোমিটার লেভেলে পৌঁছে গেছে।

শ্রীনিকেতনে হলকর্ষণ ও বৃক্ষরোপণ-উৎসবে কথিতকোয়ান্টাম ডট্‌স্‌

তা বলে স্ফটিক কি এর চেয়ে ছোট হতে পারে না? অবশ্যই পারে। স্ফটিক মানে কী? অনেকগুলো পরমাণু বা অ্যাটম ঠিকঠাক পরপর সাজালেই কেল্লাফতে---এই এই না না ঠিকঠাক সাজাতে হবে, যেমনতেমন করে করলে...উফফফ। মিলিটারি সৈনিকরা যেমন সার বেঁধে ডিসিপ্লিন মেনে দাঁড়িয়ে মার্চপাস্ট করে, ঠিক সেভাবে সাজাতে হবে, নইলে স্ফটিক হইব না। আর এ কাজ তো হাত দিয়ে হবে না, অণু-পরমাণুরা যে বড়ই ছোট। কত ছোট? ন্যানোমিটার লেভেলের ছোট।

আজকাল ন্যানো গাড়ি আছে দেখেছিস? নাম নিয়েছে তো ন্যানোমিটার থেকেই। ১০০০ ন্যানোমিটারে ১ মাইক্রোমিটার। কাণ্ডটা ভাব। মানে এক সেন্টিমিটারে ১০,০০০,০০০ ন্যানোমিটার, এক কোটি! মিটারে একশ কোটি। অণু-পরমাণুর মত অত ছোট জিনিস আতসকাঁচ বা এমনি আটপৌরে মাইক্রোস্কোপেও শাণাবে না, ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ লাগবে।

তো এই গোটা দশ-বিশটা কি পঞ্চাশটা পরমাণু পরপর সাজিয়ে হল একটা স্তর। এরকম দশ-বিশটা কি পঞ্চাশটা স্তর তৈরী করে স্যান্ডুইচের মত পরপর সাজিয়ে ফেললেই কেল্লা ফতে, কোয়ান্টাম ডট!

[[সোঘো (হাতপা ছুঁড়ে ভীষণ আপত্তি জানিয়ে) ।। অসম্ভব, হতেই পারে না, কোয়ান্টাম ডট এত সহজে হয় নাকি? আম-পচে-বেল ব্যাপার...]]

চোপ্! আমি বলছি হয়, হয়। মানে, গিলিগিলি-অ্যাব্রাকাডাব্রা বলে ছুমন্তর দিলেই হবে না, এর বিশেষ কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়া আছে, রন্ধনপ্রণালী আছে, ঠিকঠাক জিনিসপত্রের কাঁচামালের সাপ্লাইয়ের ব্যাপার আছে, বোর আছে, ক্যালিবার আছে...

[[সোঘো (ফের হাতপা ছুঁড়ে) ।। ওটা সোনারকেল্লার ডায়লগ, ফেলুদার কোল্ট বন্দুকের বোর-ক্যালিবার, তার সঙ্গে কোয়ান্টাম ডট...?]]

কোয়ায়েএএট! শান্ত্! হম বোলতা, ঠিক বোলতা, ভিমরুল নেহী বোলতা। যাই হোক, তো এই কোয়ান্টাম ডট আদপে হল হাজারখানেক পরমাণুর একটা ন্যানোলেভেলের স্ফটিক। এত ছোট, কিন্তু কাজে ম্যাজিক। প্রথমত, এটা একটা সেমিকন্ডাক্টর...

[[সোঘো ।। সেটা কী বোঝাবে তো, না কী?]]

হাফবাসে উঠেছিস কখনও? তাতে যে কন্ডাক্টর থাকে, তারাই সেমিকন্ডাক্টর।

[[সোঘো ।। উফফ, দার্জিলিং চা খেয়ে গেছোদিদিকে কথার খেলায় পেয়েছে। ওগো, ঠিক করে বোঝাও। পিলিজ। ]]

পিলিজ বললি যখন...বাংলায় এদের নাম অর্ধপরিবাহী। মানে স্কুলের বইতে অর্ধপরিবাহী বলে কিনা জানি না, এক্ষুণি গুগল ট্রানস্লেটে ফেলে দেখলাম, তাই বলছে। যাই হোক, ইলেক্ট্রিকের তার ধাতুর হয় তো? তামার তার। তার মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ আরামসে যায়, তাই তো। এদেরকে বিদ্যুৎপরিবাহী বা ইলেক্ট্রিকাল কন্ডাক্টর বলে। কিন্তু ধর কাঠ? বা রবার? তার মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ যেতে পারে না। তাই ইলেক্ট্রিকের কাজ করতে হলে পায়ে রবারের চটি পরে করা উচিত। এদেরকে বলে অপরিবাহী বা ইনসুলেটর।

এর মাঝামাঝি এক ধরনের বস্তু আছে, তাদেরকে অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর বলে। এমনিতে এরা ইনসুলেটর, কিন্তু তাপমাত্রা বাড়লে এদের মধ্যে দিয়ে দিব্যি কারেন্ট যেতে পারে। এই সেমিকন্ডাক্টর ব্যবহার করে ডায়োড ও ট্রাঞ্জিস্টর তৈরী করা হয়। ট্রাঞ্জিস্টর মানে তোর বাবার ওই ছোট ট্রাঞ্জিস্টর রেডিও নয় রে সোঘো, ইলেক্ট্রনিক্সের ব্যাপার, কম্প্যুটারের মাইক্রোচিপে থাকে। এই যে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্প্যুটার ফেসবুক টুইটার ইউট্যুব...শকলি, বার্ডিন ও ব্র্যাটেনের এই আবিষ্কার না থাকলে কিছুই হত না।

যাই হোক, কোয়ান্টাম ডটে ফিরে আসি। বাংলায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অর্ধপরিবাহী স্ফটিকফুটকি বললে হেডমাস্টারমশাইরা খুশি হবেন। কিন্তু রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman) বলে গিছলেন, নাম জানার চেয়ে কাজ জানলে বেশি কাজ দেয়। তাও, নামটা একটু বিশ্লেষণ করলে ক্ষতি নেই। ডট, অর্থাৎ বিন্দু, ফুটকি। অর্থাৎ খুবই ছোট একটা কিছু। আর কোয়ান্টাম? এর মানে এর সঙ্গে কোয়ান্টাম মেকানিক্স জড়িত। মানে ওই ইলেক্ট্রন প্রোটন ইত্যাদির কাজকারবার, হারদানাহাল্লি কাণ্ডকারখানা। সেদিকে গিয়ে কাম নাই।

তার চেয়ে বরঞ্চ তোর ফোনটা দেখি। বাঃ, বেশ ভাল আধুনিক মোবাইল ফোন তো। স্ক্রিনটাও তো বেশ। কত রঙ! কী পরিষ্কার। মোবাইল স্ক্রিনে এত রঙ ফোটে কীকরে রে সোঘো?

[[সোঘো ।। ওটা অ্যামোলেড (amoled) স্ক্রিন গো]]

অ, তাই এত জৌলুস। AM-OLED, অর্থাৎ কিনা active matrix organic light emitting diode...

[[সোঘো ।। গেছোদিদি, রক্ষে কর। তার চেয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অর্ধপরিবাহী স্ফটিকফুটকি অনেক সভ্যভদ্র ব্যাপার।]]

হুম। যাই হোক, এই কোয়ান্টাম ডট...বা স্ফটিকফুটকি (নামটা বেশ) কিন্তু একই কাজ করতে পারে। এর ওপর আলো ফেললে (বা এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ চালালে) এরা সেই আলোর শক্তিটা, মানে ফোটনকণাগুলোকে শুষে নেয়। নিয়েটিয়ে তারপর অবিশ্য নতুন ফোটনকণা ফেরত দেয়, কিন্তু তার রঙ কী হবে সেটা নির্ভর করে স্ফটিকফুটকিগুলোর সাইজের ওপর। যত ছোট স্ফুটকি...ওরে, ভাল নাম পেয়েছি রে, স্ফুটকি!

[[সোঘো ।। ওটাকে স্ফুটকি কর, দিব্যি হবে।]]

আচ্ছা বেশ, স্ফুটকি। যত ছোট স্ফুটকি, তত আলোর রঙ নীলবেগুনি হবে। মানে ধর, স্ফুটকির ব্যাস যদি ২-৩ ন্যানোমিটার হয়, আর এর ওপর যদি আলো (যেকোন রঙের) ফেলা হয়, তাহলে স্ফুটকিটার ভেতর থেকে বেগুনি বা নীল রঙের আলো বেরোবে। আরেকটু সাইজ বাড়ালে, ধর ৪-৫ ন্যানোমিটার, তাহলে এর রঙ হলদে-সবুজ হবে। এর চেয়ে বড় স্ফুটিকের আলোর রঙ লালকমলা হবে। যত বড় স্ফুটকি, তত লালের দিকে রঙ। রামধনুর সাতটি রঙ শুধু নয়, সাইজের ছোটছোট অদলবদল ঘটিয়ে এদেরকে দিয়ে যেকোন রঙ বানানো যায়। তাই তো আজকাল মোবাইলের স্ক্রিন, বা ল্যাপটপ কম্প্যুটারের স্ক্রিন, বা টিভিও এই কোয়ান্টাম ডট দিয়ে তৈরী করা শুরু হয়েছে।

শুধু তাই নয়। আজকাল স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষেত্রেও এই স্ফুটকিকে ব্যবহার করা হয়। শরীরের মধ্যে তো আর মোবাইল ক্যামেরা ঢুকিয়ে সেল্ফি তোলা যায় না। হ্যাঁ, এক্স-রে ক্যাট স্ক্যান এমআরআই ইত্যাদি দিয়ে কিছু একটা আইডিয়া করা যায় বটে, কিন্তু এদের কার্যকারিতা যথেষ্ট সীমিত। স্ফুটকি ব্যবহার করে শরীরের ভেতরে হাই রেজোল্যুশান স্পষ্ট ছবি তোলা যায়।

মুশকিলটা হল, স্ফুটকি তৈরী করতে যেসব রাসায়নিক প্রক্রিয়া লাগে, এবং যেসব কেমিক্যাল লাগে, সেইসব রাসায়নিক পদার্থের বেশিরভাগই বিষাক্ত। শরীরের মধ্যে এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরী কোয়ান্টাম ডট ঢোকালে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল। শুধু শরীর কেন, পরিবেশের পক্ষেও এই রাসায়নিক কোয়ান্টাম ডট খুবই ক্ষতিকারক।

সেইজন্যই সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন গবেষক, এবং ভারতের কোইম্বাতুরের ভারাতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও তামিলনাড়ুর কে. এন. রঙ্গাস্বামী কলেজ অফ টেকনলজি থেকে মোট চারজন সহগবেষককে সঙ্গে নিয়ে সুধাগর পিচাইমুথু এক নতুন উপায়ে স্ফুটকি তৈরী করেছেন।

[[সোঘো ।। এবং তাতে চা-পাতা লেগেছে, তাই তো?]]

ঠিক তাই। চা-পাতা জলে ধুয়ে ছায়ায় রেখে শুকিয়ে নিতে হবে। তারপর ৩০ মিলিলিটার মেথানলে ৩ গ্রাম চা-পাতা মিশিয়ে সারারাত রাখতে হবে, যাতে...

[[সোঘো ।। উফফ, এখন রেসিপি শুনতে পারছি নে, মেঝেতে বসে বসে পায়ে ঝিঁঝি ধরে গেছে। ওই চা-পাতার জল বা সল্যুশন করে সেটার মধ্যে কোয়ান্টাম ডট তৈরী করা হয়েছে, তাই তো?]]

হুঁ। তাই। বেশ বলছিলুম, দিলি ফ্লোটাকে কেঁচিয়ে। যাগ্গে, তো সেই কোয়ান্টাম ডট দিয়ে অনেক মজার মজার জিনিস করা যায়। শরীরের ভেতরের কোষফোষের স্পষ্ট ছবি তো তোলাই যায় বলেছি। এদের দাপটে ব্যাক্টেরিয়াও মরে...

[[সোঘো ।। আরিব্বাপ, অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই...?]]

অবশ্যই। কিন্তু শুধু ব্যাক্টেরিয়া কেন, যেকোন কোষের ওপরেরই এই কোয়ান্টাম ডট চড়াও হতে পারে। কোষের একটা আবরণ থাকে, cell wall বা cell membrane, সেগুলো ভেদ করে এই স্ফুটকিরা টুক করে কোষের মধ্যে ঢুকে মারকাটারি করতে পারে...

[[সোঘো ।। দাঁড়াও দাঁড়াও, রোয়েট। মারকাটারি মানে? স্ফুটকিরা জ্যান্ত নাকি?]]

না, মানে, রাসায়নিক মারকাটারি। জেটলি জ্যাকিচ্যান ব্রুসলির মত তো আর কুংফু-ক্যারাটে করবে না, রাসায়নিক মার্শাল আর্ট দিয়ে কোষগুলোকে শুইয়ে দেবে। ব্যাক্টেরিয়া যেমন কোষ, ফুসফুসের ক্যান্সারের তেমন কোষ।

[[সোঘো ।। বলো কী! লাং ক্যান্সার...?]]

একটা পেট্রিডিশে ফুসফুসের টিউমারের কোষ নে, তার মধ্যে কোয়ান্টাম ডট ছেড়ে দে। ঘন্টাচব্বিশ অপেক্ষা কর। দেখবি প্রায় ৮০% টিউমারের কোষ শেষ। খেল খতম্!

ক্যান্সার হলে আজকাল ডাক্তাররা কেমোথেরাপি করায়। কেমোথেরাপির ওষুধের কাজই হল ক্যান্সারের টিউমারের কোষগুলোকে মেরে ফেলা। মুশকিল হল, তার সঙ্গে প্রচুর ভাল কোষও মরে যায়। ফলে যার চিকিৎসা চলছে তার অবস্থা হয় সঙ্গীন।

কেমোথেরাপির প্রধান এক ওষুধের নাম হল সিসপ্ল্যাটিন। সিসপ্ল্যাটিনের সঙ্গে চা-পাতার সল্যুশন দিয়ে তৈরী কোয়ান্টাম ডটের কম্পিটাশান করিয়ে দেখা গেছে, চব্বিশ ঘন্টায় সিসপ্ল্যাটিন ৭০% টিউমার কোষ ধ্বংস করেছে। ওদিকে কোয়ান্টাম ডট ৮০% তো বললামই।

সোঘো ।। তাহলে...তার মানে...কোয়ান্টাম ডট দিয়ে ক্যান্সার সারানো যাবে? কেমোথেরাপি লাগবে না?

গেছোদিদি ।। দাঁড়া দাঁড়া, লাফাস না। অত সহজ নয়। প্রথমত, যেকোন স্ফুটকি নয়, এই চা-পাতার কোয়ান্টাম ডট দিয়েই কাজটা করতে হবে। অন্যভাবে তৈরী করা স্ফুটকি বিষাক্ত, ওদের দিয়ে কাজ চলবে না। দ্বিতীয়ত, এখনও অবধি এটা শুধুমাত্র ল্যাবে পেট্রিডিশেই পরীক্ষা করা হয়েছে, মানুষের শরীরের ফুসফুসের ক্যান্সারে পরীক্ষা এবং তার পরে চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহার হতে হতে কম-সে-কম পনের থেকে বিশ বছর লাগবে। তাও যদি সমস্ত পরীক্ষায় এই চা-স্ফুটকি পাশ করে, তবেই। মানুষের প্রাণ তো, নেহাত ফেলনা নয়, সস্তাও নয়। তাই দেখেশুনে সাবধানে এগোন হবে।

সোঘো ।। হ্যাঁ, সে তো বটেই। বিজ্ঞানের গবেষণা মানেই তাই। একবার দু'বার তিনবার দশবার হাজারবার পরীক্ষা করে তবেই এর আসল গুণমান বোঝা যাবে। তাও, যদ্দিন না এটা হচ্ছে, তদ্দিন আশা করতে আপত্তি নেই, বল?

গেছোদিদি ।। আশা সবসময়ই রাখবি রে। মনে আশা না থাকলে সব শেষ। গানটা মনে অাছে তো? আশা মানেই ভালবাসা। অাশাবাদী হ, অপ্টিমিস্টিক হ। দেখবি, মন-প্রাণ ভাল হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ, পরিবেশটারও দিকে একটু নজর দিস। মনে রাখবি, পৃথিবী একটাই। আর বই বাসা নেই মোদের।

সোঘো ।। আর ক’দিন বাদেই বিশ্বপরিবেশদিবস না?

গেছোদিদি ।। তা তো বটেই। বিশ্বপরিবেশ দিবস তো এসে গেল। এটা কোন সাল, ২০১৮ তো? তার মানে ৫ জুন। একটু মন দে বাবা। তোরা নতুন ইয়াং জেনারেশন, এই বুড়ি গেছোদিদিটার মুখে হাসি ফোটা, পরিবেশটাকে গোল্লায় যেতে দিস না। চাষবাসে কত রাসায়নিক সার ব্যবহার হয় জানিস? সেই চালগম খেয়ে মানুষপশুপাখি সবার স্বাস্থ্য গোল্লায় যেতে বসেছে। তার চেয়ে জৈবিক সার অনেক ভাল নয় কী? এই যে তোরা ছাতের টবে চা-পাতা দিস, ওটাই তো জৈবিক সার, ওতে তো আর বিষাক্ত খারাপ কেমিক্যাল দিতে হয় না, তাই না? রাসায়নিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার যত কমবে, তত ভাল। আমাদের বাসাটা, মানে এই পৃথিবীটা, সবুজ পৃথিবী। সবুজই থাকলে ভাল। একটু ভেবে দেখ।

 

রেফারেন্স

মূল পেপার : Shivaji et al., Green-Synthesis-Derived CdS Quantum Dots Using Tea Leaf Extract: Antimicrobial, Bioimaging, and Therapeutic Applications in Lung Cancer Cells, Applied Nano Materials (2018)

প্রেস রিলিজ : Swansea University, Nanoparticles derived from tea leaves destroy lung cancer cells: Quantum dots have great potential।

ছবিঃ পিক্সাবে 

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা