ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ঈদের চিঠি

সিরাজুল,

তোমার ঈদের নেমন্তন্নের চিঠিটা এতো সুন্দর হয়েছে যে আমি অন্তত দশ বার পড়েছি। সত্যি, বিশ্বাস হচ্ছে না তো? ঠিক আছে এরপরে উত্তর পাড়ায় গঙ্গার ধারের চিলেকোঠায় এসে আমার চড়াই পাখিগুলোকে জিজ্ঞেস করো। ওরাও বলবে তোমার চিঠি পড়তে পড়তে আমি ওদের আটার গুলি দিতে ভুলে গেছি। ছাদে মাটির সরায় খাবার জল রাখতে ভুলে গেছি। তার জন্য সেই যে দুষ্টু কাকটা, যে সবার সাথে ঝগড়া করে বেড়ায় সেও আমার জানলার ধারে এসে একচোট কথা শুনিয়ে গেল। বুনো পায়রাটা গলা ফুলিয়ে ঘুরে ঘুরে বকম বকম করল। ভাবটা এমন যে কার চিঠি পড়ছি মন দিয়ে? যত বলি ওরে সিরাজুল লিখেছে সেই সুন্দরবনের পাখিরালা থেকে ওরা যেন বিশ্বাসই করতে চায় না।

ঈদের চিঠি

ও ভালো কথা তুমি আর আনন্দী যে এবার গরমের ছুটি পড়লেই ভিমবেটকা বেড়াতে গিয়েছিলে শুনেই আমার মনটা কেমন লাফিয়ে উঠলো। তোমার পাঠানো ছবি গুলোর সাথে আমিও যেন চলে গেলাম সেই সুদূর মধ্য প্রদেশের রায়সেন জেলায়, ভোপাল শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণ ঢালে। কী বলছো সিরাজুল? এই অঞ্চল আবার রাতাপানি ব্যাঘ্র অভয়ারণ্যের মধ্যে? যদিও আনন্দী আমাকে জানিয়েছে সে বাঘ দেখতে মোটেই যায়নি। তার সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার মাঝে মাঝেই যখন নদীর এপার ওপার করে সে দেখেছে বহুবার। মনে আছে? গফুর চাচার নৌকায় কাঁকড়া ধরতে গিয়ে আমরাও দেখেছিলাম। আর কী ভয়টাই না পেয়েছিলাম বলো? ও আচ্ছা বাবা সরি। তোমার চিঠির থেকে আবার অন্য গল্পে চলে যাচ্ছি। ঠিকই বলেছ- এই ভিমবেটকা আসলে মানুষ যায় অন্য আকর্ষণে; কারণ এখানেই পাহাড়ের গুহা গুলোতে পাওয়া গেছে প্রায় একলক্ষ বছর আগের পৃথিবী বসবাসকারী মানুষদের স্মৃতি।

ঈদের চিঠি

হাসলে যে বড়? হরিণভাঙা নদীর দিকে মুখ করে? স্মৃতির কথা বলেছি বলে? ওগুলো তো আমাদের কাছে এই পৃথিবীর স্মৃতির নিদর্শন সিরাজুল। পৃথিবীর বয়সের তুলনায় মানুষের সভ্যতার বয়েস যে বেশি নয়। কত কত বছর ধরে পৃথিবী আছে আর সেই তুলনায় মানুষ তো একটুখানি সময় জুড়ে। সেই মানুষের ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া আদিম রেখায় তারই যে বেঁচে থাকার গল্প পাওয়া যায় সিরাজুল। তুমি ঠিকই বলেছ এইসব গুহার গায়ে, এই পাহাড়ের ঢালে যে কত কত ছবি ছড়িয়ে আছে তার ইয়ত্তা নেই, যে গুলোর আনুমানিক বয়েস প্রায় তিরিশ হাজার বছর।

ঈদের চিঠি

তুমি যে ছবি গুলো আমাকে পাঠিয়েছো তার দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। যেন প্রত্যেকটা ছবি গল্প বলছে। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় সিরাজুল, মানুষ কবে থেকে গল্প বলতে শিখলো? সেই তখন থেকে কী? যখন তারা একসাথে গুহায় বসবাস করলো। আগুন জ্বালাতে শিখলো। গোল হয়ে ঘিরে বসে তাদের খাবার সংগ্রহের নানা অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করলো একে একে। ঠিক যেমন নানি তোমাদের ভাত খাওয়াতে খাওয়াতে গল্প করে তেমন। তারপর কেউ কেউ সেই গল্প গুলো, নিজের দেখা অভিজ্ঞতা গুলো গুহার গায়ে এঁকে রাখলো সুন্দর করে। যা আমরা আরও অনেক অনেক বছর পর দেখতে পেলাম। তুমি যে খুব ভালোভাবে জায়গাটার পড়াশুনো করে ঘুরতে গেছো তা তোমার চিঠি পড়েই বুঝতে পেরেছি। আর অবাক হয়েছি তুমি ইতিহাস নিয়ে পড়বে শুনে। কী যে আনন্দ পেয়েছি আমি বলে বোঝাতে পারবো না সিরাজুল।

ঈদের চিঠি

২০০৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের সম্মান দিয়েছে ভিমবেটকা কে। আর দেবে নাই বা কেন বলো? এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হওয়া এটাই ভারতের সবচেয়ে পুরনো সভ্যতার নিদর্শন। তুমি এই অঞ্চলটার আবিষ্কার হওয়ার যে গল্প শুনিয়েছো সিরাজুল, সেটাও বেশ মজার। আমার কেমন যেন তোমার এইসব গল্প শুনে বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গুলো আবার পড়তে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে আমিও ছুটে ছুটে, ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখি। শুনি। জানি। এরপরের বার আমি কিন্তু তোমার আর আনন্দীর সাথে যাবোই সিরাজুল। তখন যদি বলো ট্রেনের রিজার্ভেশান হয়নি তখন তোমার সিটে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকবো। আর তোমাকে বসিয়ে রাখবো নীচে। মনে থাকে যেন। তুমি লিখেছো ইউনেস্কোর প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতীয় পুরাতত্ত্বের নথিতে এই জায়গাটার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় ১৮৮৮ খ্রীষ্টাব্দে। সম্ভবত এখানে কোন বৌদ্ধ মঠ ছিল। কিন্তু তোমরা ঘুরতে ঘুরতে সেই মঠ দেখতে পাওনি। কী করে পাবে সিরাজুল? নিজেই তো বলেছ ভিমবেটকার যা গুহা আছে তার তিন ভাগের একভাগ শুধু সাধারণ মানুষদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। এখনও গভীর জঙ্গলের মধ্যে কত গুহা আবিষ্কার করা হয়নি। কাজ হয়নি। এখনও কত কত ছবি, কত কত স্থাপত্য, গল্প আমাদের অজানা। এই যে বৌদ্ধ মঠ ছিল সেটাও স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে জেনে তখন পরাধীন ভারতবর্ষের ইংরেজ সরকার নথিভুক্ত করেছিলেন বলে মনে হয়। এরও অনেক পরে ১৯৫৭ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক ভি এস ওয়াঙ্কর ট্রেনে করে এই অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার পথে অনেক গুলো গুহা দেখতে পান জঙ্গলের মধ্যে। গুহা গুলো তাঁর কাছে খুব সাধারণ বলে মনে হয়নি। এক নতুন পথ আবিষ্কারের নেশায় স্থানীয় মানুষ এবং পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের লোকজনের সাথে তিনি গুহা গুলো ঘুরতে শুরু করেন। এবং অবাক হয়ে যান প্রতিটা গুহায় ছবি গুলো দেখে, যা সেই বহুদিন আগের মানব সভ্যতার নিদর্শন বহন করছে। পৃথিবীর আরও কয়েকটি দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়ার কাকাড়ু জাতীয় উদ্যান, কালাহারি মরুভূমির বুশম্যান বা ফ্রান্সের লাস্কো গুহাচিত্রের ছবির সাথে ভিমবেটকার মিল দেখা যায়।

মানব সভ্যতার প্রত্যেকটা যুগের ছবি খুব সুন্দর করে পাওয়া যায় এখানে। জন্তুদের মধ্যে যেমন দেখা যায় বিশালাকায় হাতি। তেমনই হরিণ, বাইসন এদের ছবিও দেখা যায়। মায়ের কোলে শিশু থেকে শুরু করে শিকার করার দৃশ্য। আগুনের পাশে গোল হয়ে ঘিরে বসার দৃশ্য বা এক সাথে দলবদ্ধ হয়ে জীবন যাপনের অনেক ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বলে তুমি লিখেছো। আনন্দী নাকি একটা গুহার পাথরের নীচে গিয়ে চুপ করে বসেছিল? একটুও বাড়ি যেতে চাইছিল না? অনেক বড় বড় গাছ আর পাহাড় দেখে তোমারও নাকি খুব সুন্দর করে ছবি আঁকার ইচ্ছে করছিল? বেশ এরপর যখন আমরা একসাথে বেড়াতে যাবো সিরাজুল তখন এইগুলো না হয় মনের সুখে করব। তবে এবার যাব শীতের ছুটি বা পুজোর ছুটিতে। কেমন? তবে তোমার চিঠির এক জায়গায় এসে আমাকে থমকে দাঁড়াতেই হল। তোমাদের যিনি গাইড ছিলেন, মানে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন তিনি বলেছেন এখন আর তেমন করে কাজ হচ্ছে না প্রত্নখননের। অনেক কাজ থেমে আছে অর্থকরী অসুবিধের জন্য বা সরকারী আনুকূল্য না পাওয়ার জন্য। এটাও যেমন ঠিক তেমনি আমরাও কিন্তু সচেতন ভাবে এই পুরাকীর্তি গুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্য এগিয়ে আসছি না। শুধু নিজের শহরের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে স্বাধীনতার পর থেকে আমরা কত কত পুরোনো বাড়ি নষ্ট করেছি। এবং এখনও করছি যাদের অন্তত দেশীয় ঐতিহ্যে স্থান পাওয়ার দরকার ছিল। গোটা পৃথিবী জুড়ে এই নিদর্শনগুলো ধ্বংস করা মানে মানুষের স্মৃতিকে। তার পুরাতনী অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। আমরা এরকম যেন আর কোনও দিন হতে না দিই সিরাজুল।

ঈদের চিঠি

আরিব্বাস। এই ছবিটার কথা তো ভুলেই গেছি। দাঁড়াও ভালো করে দেখি আর একবার। এই তো বড় চাটুতে...পোহা। আমার যে কী লোভ হয়েছে ছবিটা দেখে তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। পোহা যে আসলে চিড়ের পোলাও এটা তো জানতাম না সিরাজুল? আচ্ছা এবার যখন ইদের ছুটিতে তোমার বাড়ি যাবো তখন আমরা সবাই মিলে নানির কাছে পোহা খাওয়ার বায়না করবো কেমন? ওই দেখো। দুষ্টু কাক আর গলা ফোলানো পায়রাটা আবার এসেছে। যাই ওদের মাটির হাঁড়ি ভর্তি করে জল দিই। না হলে চান করতে পারবে না বেচারারা। চড়ুই গুলোও বড্ড কিচির মিচির করছে। ওদের যে ভারি মিষ্টি দুটো ছানা হয়েছে সিরাজুল। আমি ওদের নাম দিয়েছি চকাই আর বকাই। কেমন, সুন্দর না? ভালো থেকো। আর আনন্দীকে গড়গড় করে আমার চিঠি পড়ে শুনিও। দেখা হচ্ছে খুব তাড়াতাড়ি।

কল্লোল।

ছবিঃ ব্যক্তিগত সংগ্রহ

undefined

এবারে নতুন কী কী?

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা