ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
মহাবিপদে ভুতুই

১.

এমন বিপদে কোনোদিনও পড়েনি বাবুই পাখি। শুধু বাবুই না, সব পশুপাখির ভেতরেই একধরনের চাপা আতঙ্ক। বেশ ক’দিন ধরে সূর্যিমামা থেকে যেন গনগনে আগুন ঝরাচ্ছে! সারা চরাচর কেমন তেতে উঠছে। প্রতিদিন সেটা একটু একটু করে বেড়েই চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে সব শুকিয়ে শ্মশানের মতো পোড়াভূমি হয়ে যাবে। কেউ বাঁচবে না। তা হলে কী উপায়? উপায় অবশ্য একটা খুঁজে পেয়েছে বাবুই পাখি। উপায়ের নাম—ভুতুই। তাদের প্রেত মহারাজ।

ক’দিন ধরে তাই বাবুই একমনে ভুতুইকে ডেকে যাচ্ছে। বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছে একমাত্র ভুতুই-ই পারে এমন বিপদ থেকে উদ্ধার করতে। ভুতুই নাকি সবই পারে। তাই, সব কিছু ভুলে দু’দিন ধরে সে এক নাগাড়ে ডেকেই যাচ্ছে ভুতুইকে। কিন্তু এত ডেকেও ভুতুইয়ের আর দেখা মেলে না। একসময় বাবুই বিরক্ত হয়ে ভাবে, ভুতুই বলে বোধ হয় নেই কিছু। থাকলে এতদিনে ঠিকই দেখা দিত।

কুমার নদের পাড়ে একটি গভীর বনের ভেতরে বুড়ো মতো তালগাছের মাথায় বাস করে বাবুই। সেখানে এখন কলসীর মতো উল্টো করা বাসার ভেতর বসে-বসে ঝিমোচ্ছে বাবুইয়ের অসুস্থ বৌ আর তিনটে ছানাপোনা। বৈশাখ পার হয়ে জ্যৈষ্ঠ এলো, দেখতে দেখতে আষাঢ় আসার সময় হয়ে গেল, অথচ কাঠফাটা রোদ আর কাঁঠাল-পাকা গরম যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তেই থাকলো। বাইরে বের হলেই শরীরের পালকে যেন আগুনের ছ্যাকা লাগে। আকাশে এক ফোঁটা মেঘ নেই, বৃষ্টির কথা তো ভাবাই যায় না।

দুপুর বেলা এই যখন অবস্থা, তখন বাবুই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পায়। বনের পুব-পশ্চিমে একটি লম্বা রাস্তা দিগন্তে মিলে গেছে। যতদূর দৃষ্টি যায় রাস্তার দুপাশে ডোবার মতো গর্ত। তার তলায় কোথাও একটুখানি ঘোলাজল, কোথাও শুকনো খটখটে। সেসব ডোবার ভেতর থেকে সারি সারি ব্যাঙ হঠাৎ রাস্তায় উঠছে পড়িমড়ি করে। অথচ সেই মহাসড়ক দাপিয়ে হুশ-হাশ করে ছুটে চলছে বড় বড় বাস-ট্রাক। আর সেসব চলন্ত যানবাহনের দুপাশে হুটোপুটি করছে হাজার হাজার ব্যাঙ।

রহস্যটা বুঝতে বাইরের প্রচণ্ড রোদ্দুরকে উপেক্ষা করে বাবুই ঘর ছাড়ে। উড়ে এসে কাছাকাছি একটি গাছের ডালে বসে। ঠুস-ঠাস শব্দে তার কানে তালে লেগে যায়। দেখে, ব্যাঙগুলো আত্মহত্যার মতোই যেন চাপা পড়ছে দুরন্ত বাসের তলে, ট্রাকের তলে। তাদের দেহ ফেটে যাচ্ছে দুড়দাড়। একি কাণ্ড! বাবুই ভয় পেয়ে যায়।

পাশের ডোবার দিকে বাবুই তাকিয়ে দেখে, ছোট্ট একটি ব্যাঙ একা-একা একটি গর্ত থেকে কিছুতেই লাফ দিয়ে ওপরে উঠতে পারছে না। আহা বেচারা। ওরও মরার শখ? উড়ে গিয়ে তার পাশে বসে বলে, ‘কী হয়েছে ব্যাঙ ভায়া? এমন পড়িমড়ি করে লাফ দিচ্ছ? গর্তে কি সাপ ঢুকেছে?’

ছোট্ট ব্যাঙ কটমট করে তাকিয়ে বলল, ‘ব্যাঙাই দাদা বলেছে তাড়াতাড়ি পালাও। ডাঙায় যাও।’
‘ব্যাঙাই দাদা?’
‘হ্যাঁ। ব্যাঙাই দাদা। চেনো না?’
‘নাহ্!’
ছোট্ট ব্যাঙ অতি বিস্ময়ে বলে, ‘তুমি ব্যাঙাই দাদাকে চেনো না?’
‘না চিনি না। কি হয়েছে তাতে? তুমি ভুতুই দাদুকে চেনো?’
ছোট্ট ব্যাঙ বলে, ‘নাহ্!’
‘তবে? তুমি ভুতুই দাদুকে চোনো না, আমিও বাঙাইকে চিনি না।’
ব্যাঙ বলল, ‘ব্যাঙাই দাদাকে সবাই চেনে।’

বাবুই বুঝলো, এ বড্ড বেয়াড়া ব্যাঙ। গোঁয়ারের একশেষ। তাই এ নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে বলল, ‘তোমাদের ব্যাঙাই এমন কথা কেন বলেছে?’
ছোট্ট ব্যাঙ লাফাতে লাফাতে হাঁপিয়ে গেছে। একটু বিশ্রাম নিয়ে বলল, ‘তুমি এমন ভেঙিয়ে কথা বললে আমি কোনো জবাব দেব না।’
‘কেন, আমি ভেঙালাম কী করে?’
‘ব্যাঙাই দাদাকে শুধু ব্যাঙাই বলছো কেন?’
‘সে তোমাদের ‘দাদা’ হতে পারে, কিন্তু আমার তো কেউ হয় না। ‘দাদা’ বলতে আমার বয়েই গেছে।’
ছোট্ট ব্যাঙ খুব রেগে গেল। বলল, ‘তোমার এত বড় সাহস! যাও তোমার সঙ্গে কথা নেই।’
‘ও। আমি ভাবলাম তোমাকে গর্ত থেকে একটু ওপরে উঠতে সাহায্য করবো। ঠিক আছে, যাই।’
‘যাও যাও। আর ত্রিশ চল্লিশবার চেষ্টা করলেই ওপরে উঠে যাবো। না হয় একশ বারই লাগবে। কিন্তু কারো সাহায্য আমার চাই না। আমাদের ব্যাঙাই দাদা আছে।’
‘বাব্বা। তোমার বড্ড অহংকার। তোমার ব্যাঙাই এতকিছু পারে, অথচ তোমাকে একটুখানি ওপরে তুলে দিতে পারে না?’
‘খবরদার ব্যাঙাই দাদাকে নিয়ে আর একটাও বাজে কথা বলবে না। ব্যাঙাই দাদা আমাদের দেবতা। তোমার ভুতুই-কে নিয়ে তো আমি খারাপ কিছু বলিনি।’
‘ভুতুই দাদু-কে তো তুমি চেনোই না।’ এ কথা বলে বাবুই নিজের মনে ভাবলো, আমিও তো ভুতুই দাদু-কে চিনি না, শুধু মুখেই শুনেছি যে হ্যান করতে পারে ত্যান করতে পারে।
‘বলো শুনি তোমার ভুতুই কি মুতুই করে?’
বাবুই চোখ লাল করে বলল, ‘সাবধান করে দিচ্ছি। ভুতুই দাদু হলো আমাদের মৃত-মহারাজ। পঞ্চাশ পুরুষ আগে তিনি আফ্রিকায় থাকতেন। মারা যাওয়ার পর তিনি ভুতুই হন। তার অসীম ক্ষমতা, বিপদে তাঁকে ডাকলেই তিনি এসে আমাদের উদ্ধার করেন। ভুতুই দাদুকে নিয়ে ইয়ার্কি করলে তোমার থুতুই... থুক্কু... থুতনা ভেঙে দেব বলে দিলাম। ’
‘এহ্। থুতনা ভেঙে দেবে। আমি এমন থুতু ছেটাবো যে চোখে ঘা হয়ে যাবে।’

বাবুই দেখলো, বেশি ঝামেলা হয়ে যাচ্ছে। বলল, ‘ঠিক আছে ভাই, সামনে সবার বিপদ, এসো মিলমিশ করে চলি।’ তারপরই ভাবলো, এদের বিপদটা আসলে কী?
বাবুই বেশ চিন্তিত মুখ করে বলল, ‘আচ্ছা, বিপদটা কীসের?’
ব্যাঙ আবার লাফাতে শুরু করেছে। লাফানোর ফাঁকে বলল, ‘ব্যাঙাই দাদা বলেছে, মাটির তলে দুই রাজ্যের ভেতরে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। সেই যুদ্ধ শুরু হলে পৃথিবীর খুব জ্বর হয়। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। আজ বিকেলে সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ পর সেই কাঁপুনি শুরু হবে। তখন সবাইকে ডোবা থেকে পালাতে হবে, নইলে মাটিচাপা পড়ে মরতে হবে।’
‘তার মানে ভূমিকম্প হবে?’
ব্যাঙ একমনে লাফাতে লাফাতে ছোট্ট করে ‘হু’ বলল।

বাবুই খুব দুশ্চিন্তায় পড়ল। সে অবশ্য কোনোদিন ভূমিকম্পের মুখে পড়েনি। কিন্তু অন্যসব দূরদেশের বন্ধু বাবুইদের কাছে শুনেছে, ব্যাপারটা অনেক সময় নাকি খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। মুশকিলের কথা হলো, তাদের তালগাছটা বেশ বুড়ো হয়ে গেছে। ভেতরটা ফাঁপা। অনেকদিনই ভেবেছে নতুন এটা বাসা বানাবে। ক’দিন সে আশেপাশে ভালো কিছু তাল, নারকেল আর খেজুর গাছ খুঁজেছে। পেয়েছেও বেশ ভালো কয়েকটি, কিন্তু এতদিনের তালগাছটির প্রতি তার ভারি ভালোবাসা জন্মে গেছে। এই বনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট কুমার নদ। পদ্মা নদীর একটি শাখা এটি। বিকেল বেলা রোদ্দুর থিতিয়ে এলে সে তালগাছটার মগডালে আরাম করে বসে। ভরাবর্ষায় এই কুমার নদের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে ফুরফুরে বাতাস বয়। সেই বাতাসে তার শরীরের পালকগুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে। দূরে সেসময় ছবির মতো ফুটে ওঠে পালতোলা নৌকা কিংবা দিগন্তে মেঘের নানা রঙের নিসর্গ। এমন নিসর্গসুধায় ভাগ বসাতে তার পাশে বৌ এসে বসে। হরেক খুঁনসুটিতে দু’জনের কত বিকেল পার করেছে ভারি আনন্দে! সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে এলে তারা তাদের খড়বিচুলির শান্তির নীড়ে ঢুকে পড়ে।

কিন্তু ভূমিকম্প আসছে যে! ফাঁপা তালগাছটা ভেঙে পড়বে না তো? তার এক চড়ুই বন্ধু পাশের গ্রামের এক বড়লোকের দোতলা বাড়িতে থাকে। পুরনো বাড়ি। চড়ুইকেও একটু সাবধান করে আসতে হয়।

এখান থেকে বাবুই উড়ে যাওয়ার একটু আগে দেখতে পেলো, ছোট্ট ব্যাঙটি অবশেষে ওপরে উঠতে পেরেছে। তবে এ জন্য তাকে কমপক্ষে শ’ খানেক বার লাফ দিতে হয়েছে।

এদিকে ভুতুই হন্যে হয়ে খুঁজছে বাবুই পাখিকে। সুন্দরবন ছাড়িয়ে আরো উত্তর দিকে উড়তে উড়তে সে পদ্মার পাড়ে একটি তালগাছের মাথায় বসে একটুখানি বিশ্রাম নেয়। মাঝ দুপুরে পদ্মাপাড়ে এমন অগ্নিগোলকের মতো রোদ ঝরছে যে মনে হচ্ছে সূর্যিমামা দিনদিন কেমন বেলুনের মতো ফুলে ফেঁপে বড় হয়ে উঠছে! চারদিকে বেশিক্ষণ তাকানোর পর ভুতুইয়ের মাথা কেমন ঝিম-ঝিম করতে থাকে। মনে মনে ভাবে, এত সুন্দর দেশ কত তাড়াতাড়ি নরক হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতির এমন বিদঘুটে লক্ষ্মণ তার একটুও ভালো ঠেকলো না।

লেখক পরিচিতি

অদ্বয় দত্ত

অদ্বয় দত্ত পেশায় সাংবাদিক, ঢাকার ইত্তেফাক পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
এসে গেল ইচ্ছামতীর শারদসম্ভার ২০১৭
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা