খেলাঘরখেলাঘর

বুলু-পুকুরে-যাও

একবার সেজদার মাথায় ম্যাজিক ভর করল। আমার তখন কতই বা বয়স? ক্লাস টু বা থ্রি-তে পড়ি। আজ থেকে প্রায় বছর কুড়ি-বাইশ আগেকার কথা। যাই হোক, সেবার গ্রামের বাড়ি গিয়েই সেজদার পাল্লায় পড়লাম। আমায় পাকড়াও করে নিয়ে এল নিজের ঘরে – “এই দ্যাখ।” একটা দু’টাকার নোট তুলে দেখালো সেজদা – “এটাকে আমি ভ্যানিশ করে দেব।” উৎসুক চোখে দেখলাম সেজদা বিছানার ওপর একটা পরিস্কার সাদা কাগজ মেলে তার ওপর নোটটা রাখল। তারপর পাশের টেবিল থেকে একটা কাচের গ্লাস তুলে নিল – “এইবার...” সেজদা একটা ওস্তাদি হাসি হেসে বলল – “বল গিলি গিলি ছু।” আমিও দারুণ কিছু একটা ঘটবে এমন আশায় একদমে বললাম – “গিলি গিলি ছু।” আমার কথা শেষ হতে না হতেই সেজদা দু’টাকার সেই নোটের ওপর থপ করে গ্লাসটা উপুড় করে রাখল। আর কী আশ্চর্য! কাচের গ্লাসের নিচে নোটটা দেখাই যাচ্ছে না। একেবারে উধাও। বাইরে থেকে দেখছি গ্লাসের নিচে শুধু সাদা কাগজ। সেজদা এবার তাড়া দিল – “তাড়াতাড়ি বল গিলি গিলি ছু। নাহলে টাকাটা আর ফেরত পাওয়া যাবে না।” আমি আবার এক নিশ্বাসে বললাম – “গিলি গিলি ছু।” সেজদা গ্লাসটা উঠিয়ে নিল এবং বহাল তবিয়তে সেজদার সেই নোংরা দু’টাকার নোট সাদা কাগজের ওপর হাসছে।
আমি হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা দেখার চেষ্টা করতেই সেজদা গ্লাসটা উঠিয়ে টেবিলে রেখে দিল – “ম্যাজিকের সরঞ্জামে অন্য কারোর হাত দেওয়ার নিয়ম নেই। গুরুর বারণ।” আমার তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। সেজদা নিজেই একটা পি. সি. সরকার হয়ে উঠেছে; তারও আবার গুরু আছে! সেজদা তার দাড়িতে একবার হাত বুলিয়ে নিয়ে উত্তর দিল – “সব ম্যাজিশিয়ানেরই গুরু আছে। আমার গুরুরও গুরু আছেন। তিনি এই মূহুর্তে গঙ্গার তলায়। গত দু’মাস ধরে আছেন।” সেজদার গুরুর গুরু জলের তলায় দু’মাস ধরে কী করছেন? পরে জনিদার মুখে জানা গেল বড় বড় ম্যাজিশিয়ানরা ঐভাবে নাকি দম ধরে রাখা প্র্যাকটিস করে। এই তো গতমাসেই আমাদের গ্রামে এক ছোটোখাটো জাদুকর মাটির তলায় নিজের মাথা প্রায় একঘন্টা ঢুকিয়ে রেখছিল। শুনে আমি হাঁ। একঘন্টা! জনিদা বিজ্ঞের গলায় বলল – “টিনের চালের ওপর ঐ কুমড়োটা দেখছিস?” ৫ নম্বর ফুটবল সাইজ কুমড়োর দিকে আঙুল তাক করে জনিদা বলল – “সেই জাদুকরের কাছে অমন বড় একটা মাথার খুলি ছিল।” ব্যাপারটা এবার বোধগম্য হল। যে জাদুকরের কাছে ফুটবল সাইজের মাথার খুলি আছে, সে মাটির নিচে একঘন্টা কেন, দশ ঘন্টা মাথা গুঁজে রাখলেও মরবে না। কিন্তু সে সব বাইরের ম্যাজিশিয়ানদের ব্যাপার। আমাদের বাড়িতেই যে সেজদার মত ম্যাজিশিয়ান আছে, সেটা কী কম আশ্চর্যের!
জনিদা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল – “ওসব ম্যাজিক আমিও দেখাতে পারি।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল – “বিশ্বাস করছিস না মনে হচ্ছে। আয় তা হলে।” জনিদা আমায় ধরে নিয়ে গিয়ে হাজির করল বড়কাকুর ঘরে। তারপর বড়কাকুর আলমারি ঘেঁটে একটা রুমাল বের করে আমায় বলল – “খাওয়ার পর এই রুমাল দিয়ে তোকে এমন একটা ম্যাজিক দেখাবো যে হাঁ হয়ে যাবি।”
জনিদা কী ম্যাজিক দেখাতে পারে তাই ভাবতে ভাবতেই কোনওরকমে নাকে-মুখে গুঁজে খাওয়া শেষ করলাম। খুব বড় ম্যাজিশিয়ান হলে হয়ত উড়ুক্কু কার্পেটের মত সেই রুমালের ওপর চড়ে এদিক ওদিক উড়ে বেড়ানোর ম্যাজিক দেখাতেন। কিন্তু জনিদা তো আর অতবড় ম্যাজিশিয়ান নয়, এই সবে তার ক্লাস ফাইভ। হয়ত জনিদা রুমাল ঝেড়ে পায়রা উড়িয়ে দেখাবে। গাবলুর কমিক্সে এমন একটা ম্যাজিক ছিল। যাই হোক, খাওয়া শেষ করে ছোটমেজদার ঘরে আমি আর জনিদা হাজির হলাম। ছোটমেজদা এই সময় স্কুলে থাকে, তাই দুপুরে তার ঘরটা আমাদের দখলেই থাকে।
জনিদা বিছানার ওপর সোজা হয়ে বসে একটা দেশলাই কাঠি ধরল আমার সামনে – “হাতে নিয়ে দেখে নে। কোথাও কোনও কিছু ভাঙা নেই তো?” সতর্কভাবে পরীক্ষা করে কাঠিটা ফেরত দিলাম। নাঃ! গোটাগুটি একটা দেশলাই কাঠি। এবার সেই কাঠিটা রুমালের মাঝে রেখে জনিদা রুমালটা ভাঁজ করে আমার হাতে দিল। রুমালের মধ্যে কাঠিটা শক্ত হয়ে আছে। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা বিড়বিড় করে পড়ে নিয়ে জনিদা বলল – “এবার কাঠিটা ভেঙে ফেল।” আমি রুমালে জড়ানো সেই দেশলাই কাঠিটাকে ২-৩ জায়গায় ভেঙে দিলাম। আমার হাত থেকে রুমালটা ফেরত নিয়ে জনিদা আবার চোখ বন্ধ করে কিছু একটা বিড়বিড় করে বলে রুমালটা খুলে ফেলল। এবং সত্যিই ম্যাজিক। রুমালের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল অক্ষত একটা দেশলাই কাঠি। তাহলে আমি যে রুমালের মধ্যে ভেঙে দিলাম কাঠিটা? জনিদা বিজ্ঞের হাসি হেসে বলল – “তোর কী মনে হয় এই যে চোখ বন্ধ করে মন্ত্র পড়লুম, সেটা কিছু নয়? এগুলো কি ভাঁওতা?”
আমি গদগদ স্বরে বায়না ধরলাম – “আর একটা ম্যাজিক দেখাও।” জনিদা একটা হাই তুলে বলল – “একসাথে বেশি ম্যাজিক দেখালে মুশকিল। রাতে ঘুম হবে না ভালো করে। তোকে বরং কাল একটা ম্যাজিক দেখাবো। পাকা কলা না ছাড়িয়ে খোসার মধ্যেই দেখবি টুকরো হয়ে গেছে। কিন্তু তার জন্যে তোকে আমার একটা কাজ করতে হবে।”
কী কাজ?

আগামী পরশু থেকে আমাদের গ্রামের ক্লাবের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হবে। আমি গ্রামের বাড়ি এসেছি সেই অনুষ্ঠান দেখব বলেই। আগের বার আসতে পারিনি। শুনেছিলাম দারুণ সব ব্যাপার হয়েছিল। তাই এবার বায়না করে বাপি-মাকে ছেড়ে একাই নদার সাথে এসেছি। বড়দিনের ছুটিতে স্কুলও বন্ধ। তাই নিশ্চিন্তে ৩ দিনের অনুষ্ঠান দেখে আবার বাগনানে ফেরা যাবে।
যাই হোক, জনিদা আমাকে আমার কাজ বোঝাতে আরম্ভ করল। অনুষ্ঠানের প্রথম দিন স্পোর্টস হয়। সারাদিন খেলাধুলোর পর বিকালে শুরু হয় গো এ্যজ ইউ লাইক – যেমন খুশি সাজার প্রতিযোগিতা। জনিদা এর আগের বছর কচ্ছপ সেজে ফার্স্ট হয়েছিল। জনিদা কচ্ছপ সাজল কী ভাবে? প্রথমে ভাঁড়ার ঘরে পড়ে থাকা পুরানো এক টিন আলকাতরা আর চুনকামের জন্যে ভিজিয়ে রাখা চুন জোগাড় করেছিল। তারপর মেজোকাকীমার মুরগির বাচ্চা চাপা দেওয়ার জন্যে একটা বড় ঝোড়া (বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বোনা বড় ঝুড়িকে আমরা ঝোড়া বলি) সেই আলকাতরা আর চুন দিয়ে কচ্ছপের খোলের মত রঙ করেছিল। তারপর জনিদা একটা থলের মধ্যে ঢুকে শুধু মুখটা বের করে ঝোড়ার নিচে গুটিশুটি মেরে ঢুকে পড়েছিল। ছোড়দি একটু কায়দা করে গুণ সূচ আর থলে সেলাই করা দড়ি দিয়ে ঝোড়াটাকে থলের সাথে আটকে দিয়েছিল। থলের চারটে কোণ কেটে দিতেই বেরিয়ে এল কচ্ছপের ছোট ছোট হাত-পা। তারপর আর কী, জনিদা গো এ্যাজ ইউ লাইকে কচ্ছপের মত হামাগুড়ি দিয়ে ফার্স্ট হয়ে গেল।
তা এবারও জনিদার মাথায় দারুণ একটা প্ল্যান ঘুরঘুর করছে। সেটা ঠিকঠাক করতে পারলে ফার্স্ট প্রাইজ ঠেকায় কে। কিন্তু সেটার জন্যে সাথে আর একজন দরকার। আর জনিদা আমাকেই সেই সুযোগটা দিতে চায়। আমি কখনও স্কুলের স্পোর্টসে কোনও প্রাইজ পাইনি। এবার জনিদার পাল্লায় পড়ে হয়ত একেবারে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে যাব। আমি তো একপায়ে খাড়া। তা কী সাজতে হবে?
জনিদা সাজবে গুন্ডা। আর আমি নিরীহ পথচারী। জনিদা একটা ছুরি বের করে আমার থেকে টাকা চাইবে। আমি টাকা দিতে চাইব না। আর জনিদা আমার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেবে। আমার পেট থেকে গলগল করে রক্ত বের হবে। শুনেই তো আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। রক্ত বের হবে মানে? “আহ! সত্যি করেই রক্ত বের হবে নাকি? জামার নিচে তোর পেটের সাথে একটা বেলুনে আলতা গোলা জল থাকবে। আমি ছুরি দিয়ে বেলুনটা ফুটো করে দিলেই ফিনকি দিয়ে লাল জল বের হবে। দেখে মনে হবে সত্যি রক্ত। তুই শুধু পেটটা চেপে ধরে একটু কাতরাবি।”
বাহ! জনিদার মাথা বটে একখানা। খাসা প্ল্যান। শুনে মনে হচ্ছে আমরা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েই যাব। কিন্তু এই রক্তারক্তি আমরা বেশিক্ষণ চালাব কীভাবে? আমাদের স্কুলের স্পোর্টসে মাঠের মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গায় গো এ্যাজ ইউ লাইক হতে দেখেছি। সেখানে যে যা খুশি সেজে মোটামুটি আধ ঘন্টা মত এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। বিচারকরা ঘুরে ঘুরে দেখে মার্কস দেন। কিন্তু জনিদার এই প্ল্যান তো খুব বেশি হলে ১-২ মিনিটে শেষ। তাহলে?
জানা গেল আমাদের ক্লাবের গো এ্যাজ ইউ লাইকটা একটু অন্যরকম। তুমি নিজের সাজ দেখানোর জন্যে এক মিনিট সময় পাবে। একটা ছোট্ট জায়গার মধ্যে এসে প্রতিযোগীরা নিজের নিজের সাজ দেখাবে একের পর এক। “যেমন আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় হয় আর কী।” – আমার বোঝার সুবিধার জন্যে জনিদা বলল।
যাই হোক, আমাদের সাজের জন্যে প্রস্তুতি দরকার। একটা ছুরি, একটা বেলুন, একটা আলতার শিশি আর লিউকোপ্লাস্ট। লিউকোপ্লাস্ট কেন? বেলুনটা পেটের সাথে ভালো করে আটকে রাখতে হবে। লিউকোপ্লাস্ট পাওয়া যাবে মেজদার ফার্স্ট এইড বক্স থেকে। সেটা সরানোর দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। ২টো বেলুন কেনা হল মানিক কাকুর দোকান থেকে (যদি একটা কোনও কারণে নষ্ট হয়ে যায়)। বেলুনের ২০ পয়সা গেল জনিদার পকেট থেকে। তার বদলে মেজোকাকীমার আলমারি থেকে আলতার শিশি হাতাতে হল আমায়। আর বড়কাকুর দেরাজ থেকে ফল কাটা ছুরি সরালো জনিদা। স্পোর্টসের একদিন আগেই সব সরঞ্জাম মজুদ, অথচ কেউ কিছু টেরও পেল না।
আসলে জনিদার কড়া নিষেধ আমরা কী করছি তা কাকপক্ষীতেও যেন টের না পায়। কারণ সেজদা নিজেও গো এ্যাজ ইউ লাইকে কিছু একটা করবে। কী করবে আমাদের বলছে না। অতএব আমরাও কাউকে বলব না। বলা তো যায় না, আমাদের প্ল্যান শুনে আর যদি কেউ নকল করে দেয়? আমরা ছোট মেজদার বিছানায় সারা দুপুর রিহার্সাল দিলাম। জনিদা পাকা পরিচালকের মত বোঝাতে লাগল – “মুখটা আর একটু বাঁকা। পেটে ছুরি ঢুকলে অত কম যন্ত্রণা হয় নাকি?” আমার পেটে ছুরি ঢোকার কোনও অভিজ্ঞতা নেই। তাও প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগলাম।

পরদিন দুপুরের খাওয়ার একটু পরেই আমরা তৈরি হয়ে নিলাম। নীল দেওয়ার বালতিতে আলতা গুলে তার মধ্যে ফোলানো বেলুন ডুবিয়ে লাল জল ভরা হল। তারপর কষে বেলুনের মুখ বেঁধে আমার পেটে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে সেটা সেঁটে দেওয়া হল। বলাই বাহুল্য, পুরো কাজটাই করল জনিদা। তারপর বেলুনের ওপর জামা পরতেই দেখা গেল আমার পেটে একটা সন্দেহজনক ভুঁড়ি। জনিদা একটু ভেবে নির্দেশ দিল – “কুঁজো হয়ে হাঁট। ভুঁড়ি লুকিয়ে পড়বে। আর কুঁজো হয়ে হাঁটলে তোকে বেশ গরীব-গরীবও লাগবে।” এমনিতে জনিদার একটা পুরানো রঙ ওঠা স্কুল ইউনিফর্মের জামা-প্যান্ট পরেছি। এবার কুঁজো হয়ে আয়নার সামনে হেঁটে দেখতে লাগলাম যথেষ্ট গরীব লাগছে কিনা।
জনিদার বেশভূষা অবশ্য বেশ সুন্দর। ঈদে রাঙাকাকুর দেওয়া একটা নতুন জামার সাথে জিনসের প্যান্ট পরেছে। দেখে মোটেও গুন্ডা মনে হচ্ছে না। কিন্তু জনিদার মাথায় অদ্ভূত সব প্ল্যান খেলা করে। আমাদের গ্রামের রাস্তায় পিচ হচ্ছে তখন। ঠান্ডা হয়ে গেলে আলকাতরার বড় বড় ড্রামের গায়ে রাবারের মত পিচ আটকে থাকে। জনিদা কোত্থেকে সেই পিচ একটু জোগাড় করে এনেছে। হাতে গুলির মত করে পাকিয়ে বাম গালে থেবড়ে আটকে দিল। বাম গালে পিচের তৈরি আঁচিল নিয়ে জনিদাকে এক নিমেষে পাক্কা বদমাশ লাগছে এবার। পকেটে ছুরিটা ঢুকিয়ে আমায় বলল – “চল।”
গো এ্যাজ লাইক হবে হাই স্কুলের মাঠে। আমাদের বাড়ি থেকে একটুখানি। জনিদা আগে থেকেই নাম লিখিয়ে এসেছিল। জানা গেল আমরা ৬ নম্বর প্রতিযোগী। বুকে ধুকপুক নিয়ে দেখছি আর কে কী সেজেছে। মাঠের মধ্যে ছোট্ট একটা জায়গা বাঁশ আর দড়ি দিয়ে ঘেরে দেওয়া হয়েছে। ওর মধ্যে প্রতিযোগীরা নিজেদের সাজ দেখাতে ঢুকবে। তার চারপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে দর্শক। প্রথমে এল একজন রাখাল। তার ২টো ছাগলের একটা চারদিকে এত ভিড় দেখে ‘ম্যা গো’ বলে ছুট দিল। বেচারা রাখাল নিজের সাজ দেখাবে কী, ছাগলের সাথে সেও ছুটলো। পরের জন বড় একটা দাড়ি মুখে এল, পিঠে লেখা রবীন্দ্রনাথ। তার পরের জন সেজেছে পাগল ভিখারি। একটা ছেঁড়াখোড়া লুঙ্গি পরে কালি মাখা গায়ে দর্শকদের দিকে তেড়ে এল।
একসময় আমাদের নাম ঘোষণা করা হল। প্রতিযোগিতার ঘেরা জায়গাটাতে ঢুকতেই জনিদা আমার কলার ধরে চেঁচাতে আরম্ভ করল আর আমি একটা ঢোক গিলে বেচারার মত মুখ করে বললাম – “আমার কাছে টাকা নেই।” আমায় ২-১ বার ঝাঁকুনি দিয়ে জনিদা পকেট থেকে ছুরিটা বের করে আমার পেটের বেলুনে খোঁচা দিল। কিছুই হল না। ছুরিটার ধার পরীক্ষা করা উচিত ছিল। নেহাতই ফল কাটা নিরীহ ছুরি সেটা। জনিদা আবার চেষ্টা করল। পেটে ছুরি মারার পরও কিছু হচ্ছে না দেখে দর্শকরা কেউ কেউ চেঁচাতে আরম্ভ করেছে। মরিয়া জনিদা কলার ছেড়ে দিয়ে আমার পেটে এক মোক্ষম ঘুষি দিল। আচমকা এমন ঘুষিতে আমি ২-৩ ফুট দূরে গিয়ে মাটিতে পড়লাম। আর ব্লগাস শব্দে পেটের বেলুন ফেটে একেবারে রক্তারক্তি ব্যাপার। আমি উঠে জনিদাকে পালটা একটা ঘুষি লাগাব কিনা ভাবছি। এর মধ্যে দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়ল। আমি নিশ্চিত হিন্দি সিনেমাতেও কেউ কারও পেটে ঘুষি মেরে রক্ত বের করতে পারেনি। যেহেতু সবাই প্রশংসা করছে আমিও জনিদার ঘুষি হজম করে উঠে পড়লাম। আমাদের কাজ শেষ।
এবার দেখতে হবে আর কে কী করছে। “আমরাই ফার্স্ট হব কী বলো?” জনিদা তার গাল থেকে আঁচিল ছাড়াতে ছাড়াতে বলল – “চিন্তা করিস না। যেভাবে লোকে চেঁচিয়েছে, তাতে জাজেরা আমাদেরই ফার্স্ট করে দেবে।” আরও কয়েকজন প্রতিযোগীর পর এল সেজদা। কিন্তু নেহাতই ভদ্রলোকের মত ফিটফাট সেজে। সেজদা কী সেজেছে?
ম্যাজিশিয়ান। জামা খুলে একটা শতরঞ্জি পেতে তার ওপর সেজদা উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। কোত্থেকে সে একটা এ্যাসিসটেন্ট জোগাড় করেছে। জনিদার কাছে শুনলাম, ছেলেটার নাম মন্টু। সাইকেল দোকানে কাজ করে। একটা খবরের কাগজ পাকিয়ে মন্টু সেটাতে দেশলাই জ্বেলে আগুন ধরালো। তারপর সেই জ্বলন্ত খবরের কাগজটা মশালের মত সেজদার পিঠে আলতো করে ছুঁইয়ে দিল। সেজদার পিঠটা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। অথচ সেজদা নির্বিকার শুয়ে আছে। হাততালিতে ফেটে পড়ল গোটা মাঠ। আমি তখন হা-হুতাশ করছি। ইস! কেন যে সেজদার এ্যাসিসটেন্ট না হয়ে জনিদার পাল্লায় পড়লাম। ফার্স্ট প্রাইজ তো এখন সেজদারই বাঁধা।
কুড়ি-তিরিশ সেকেন্ড পর সেজদা হাত নাড়তেই তার এ্যাসিসটেন্ট এসে একটা বোতল থেকে জল ঢালতে লাগল সেজদার পিঠে। উদ্দেশ্য আগুন নেভানো। কিন্তু পরে জানা গিয়েছিল সেজদা পিঠে যে রাসায়নিক পদার্থটা ব্যবহার করে ম্যাজিক দেখাচ্ছিল, তাতে নাকি জল ব্যবহার করা উচিত নয়। কম্বল জাতীয় ভারী কোনও কাপড় চাপা দিয়ে আগুন নেভানো উচিত ছিল। যাই হোক, জল ঢালতেই আগুন নেভার বদলে নতুন উদ্যমে দপ করে জ্বলে উঠল। আর সেজদাও ম্যাজিক ভুলে ‘বাবা-রে মা-রে’ করে তিড়িং-বিড়িং নাচতে আরম্ভ করল। প্রায় সন্ধ্যের মুখে আলো-আঁধারিতে সেজদার আগুন পিঠে সেই নাচ অদ্ভূত সুন্দর লাগছিল। আগুন নেভানোর কথা ভুলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় সবাই দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। তারপর “জল আন”, “মাটিতে গড়াগড়ি দে”, “শতরঞ্জিটা চেপে ধর” ইত্যাদি হাজারো উপদেশ ভেসে আসতে লাগল। এদিকে আগুনের জ্বালায় সেজদা মাঠের মধ্যে ছুটতে আরম্ভ করেছে। নিজের গা বাঁচাতে জনতা ছত্রখান।
এমন সময় মাইকে ভেসে এল ক্লাবের জেনারেল সেক্রেটারি মালেক কাকুর গলা। সেজদাকে উদ্দেশ্য করে মালেক কাকু তারস্বরে চেঁচাচ্ছে – “বুলু পুকুরে যাও। বুলু পুকুরে যাও।” এবং এই উপদেশটা কাজ লাগল। স্কুল মাঠের লাগোয়া পুকুরে আগুন পিঠে সেজদা ঝাঁপ দিল। পুকুরে পড়ে আগুন নেভার সাথে সাথে আরও কয়েকজন ঝপ-ঝপাং করে ঝাঁপ দিল সেজদাকে টেনে তুলে আনার জন্যে।

সেই ঘটনার পর কত বছর কেটে গেছে। পিঠ পুড়িয়ে সেজদাও সেই কবেই ম্যাজিক দেখানো ছেড়ে দিয়েছে। বড় হওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে ছোটবেলার সব ম্যাজিকগুলো হারিয়ে গেছে এক-এক করে। কিন্তু সব কিছুই যে একেবারে পালটে গেছে তা নয়। এতগুলো বছর পরও আড়াল থেকে গম্ভীর স্বরে “বুলু পুকুরে যাও” হাঁক দিলেই সেজদা বিলক্ষণ রেগে যায়।

রোহণ কুদ্দুস
কলকাতা

লেখক পরিচিতি

রোহণ কুদ্দুস

এই লেখকের অন্যান্য রচনা