ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
কেংটুং-এর দৈত্য

ঝমঝমে বৃষ্টি আর কড়াৎ কড়াৎ করে বিদ্যুতের কান ফাটানো আওয়াজ। দুর্যোগ যে এত সাংঘাতিক হতে পারে এই পরিস্থিতিতে না পড়লে জানতেই পারতাম না। আমরা যে তাঁবুর ভিতরে আছি সেটা যেকোনো মূহুর্তে হয়ত উড়ে যাবে ঝোড় হাওয়ায়। পাহাড়ের ঢালে পায়ের নীচে দিয়ে কলকল করে জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ফ্লোর ম্যাট ভিজে চুপচুপ করছে। এরকম প্রলয়ঙ্কর বৃষ্টিতে মাথার উপর পাকা বাড়ি হলেও ভয় লাগত। বিশেষ করে এই অচেনা পাহাড়ি জঙ্গলের ভিতরে। আর এটা সামান্য কাপড়ের তাঁবু। আমরা জবুথবু হয়ে চেয়ারের উপরে পা তুলে বসে আছি। বৃষ্টির ছাঁট আসছে তাঁবুর ফাঁক গলে। ব্যাটারিতে একটা আলো আর ল্যাপটপটা চলছে কোন রকমে। টেবিলের উপর স্থানীয় ইতিহাসের উপর একটা বই। কাজের ফাঁকে এই অবসর সময়ে ওটাই এখন আমার সঙ্গী।

জন বলল, "এ্যানিমেষ, আর দিজ্‌ অল ম্যালেরিয়ান মসকুইটো?"
আমি হেসে বললাম, "বিলক্ষণ! সাবধানে থাকবে। বর্ষার ম্যালেরিয়া খুবই ডেঞ্জারাস হয়।"

সে ফটাস করে একটা চাপড় মারল মশা মারার জন্য। কিন্তু মশাটা উড়ে গেল। মারতে না পেরে আরও রেগে গেল। "বৃষ্টিটা থামলেই আমি পালাব। এখানে আর এক দিনও আমার থাকার ইচ্ছা নেই।" মুখটা দেখে মনে হল এখুনি বেচারা চেঁচিয়ে কাঁদতে শুরু করবে।

তবে এখান থেকে তাড়াতাড়ি পালাবার অন্য কারণ আছে। ও খুব ভয় পেয়েছে। গত কাল ভোরবেলা, মুষল ধারায় বৃষ্টি শুরু হবার ঠিক আগে, ও হাঁটতে হাঁটতে একাই সামনের পাহাড়ে উঠেছিল। ঘণ্টা তিনেক পর ছুটতে ছুটতে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল তাঁবুর মধ্যে। মুখটা একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। জল খেয়ে একটু ধাতস্থ হবার পর বলল, স্থানীয় এক লোকের কাছ থেকে শুনে ছিল এই পাহাড়ের মাথা থেকে নাকি দারুণ সান রাইজ দেখা যায়। তাই সে ভোর ভোর বেরিয়েছিল। অনেক কষ্ট করে উঠে দেখল, অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। পাহাড়ের ওপাশে খাড়াই খাদ নেমে গেছে। একটা বড় জলের স্রোত পড়ছে উপর থেকে নীচে। জল কণা গুলি গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে কুয়াশা হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্যের প্রথম আলো তার উপর পড়তেই সাতরঙা রামধনু ছড়িয়ে পড়ল আকাশ জুড়ে। পর মূহুর্তেই কালো মেঘে ঢেকে গেল সূর্য। খাদের ভিতরটা অন্ধকার হয়ে গেল। তারপরেই একটা অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পেল। একটা জন্তুর প্রচণ্ড চিৎকার। ভয়ঙ্কর সেই চিৎকার শুনে দৌড়াতে দৌড়াতে ফিরে এসেছে তাঁবুতে। ওরকম আওয়াজ সে জীবনে কোন দিন শোনেনি। যেন কোন দৈত্য চেঁচাচ্ছে।

আমি শুনে বললাম, "থাকার ইচ্ছা কি আমারও আছে? কাজের দরকারেই তো থাকতে হচ্ছে। তবে এটা নিম্নচাপের বৃষ্টি। আসল বর্ষা আসতে দেরি আছে। আর ঐ আওয়াজটা তোমার মনের ভুল। আগের দিন রাতে সুংলুর কাছ থেকে যে গল্প শুনছিলে, এটা তারই এফেক্ট। অবচেতন মনে ওটাই ঘুরছিল তোমার মাথার ভিতরে।"

সে রেগে গিয়ে বলল, "আমি শুনলুম নিজে কানে। আর তুমি বলছ মনের ভুল?"

"শোন জন, মাথা ঠাণ্ডা করে বস। কদিন হল এমনিতেই শরীর ভালো যাচ্ছে না। এ দেশের খাওয়া, জল হাওয়া কিছুই সহ্য হচ্ছে না তোমার। ভোর বেলা উঠে খালি পেটে এতটা পাহাড়ে চড়া তোমার উচিৎ হয়নি। আর পাহাড়ের গায়ে কোন গুহার ফাঁকের মধ্যে খুব জোরে হাওয়া ঢুকলে অনেক সময়ে ওরকম আওয়াজ তৈরি হয়। ওতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।"

এখানে বলে রাখি, আমরা আছি বার্মা বা মায়ানমারের উত্তর পূর্বে চীন সীমান্তের কাছাকাছি সান প্রদেশে কেংটুং শহরের কাছাকাছি একটা জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের সানুদেশে। রাজধানী 'ন্যায়পিদাও' থেকে ডোমেস্টিক ফ্লাইটে এক ঘণ্টা লাগে। কেংটুং শহর হিমালয়ের প্রায় শেষ সীমান্তে। চারিদিকে হাজার কিলোমিটার এরিয়া পুরোটাই প্রায় পাহাড় আর ঘন ট্রপিকাল রেন ফরেস্ট। এখানে পাহাড়ের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুহা আবিষ্কার হয়েছে কিছুদিন আগে। তার মধ্যে তিনটি গুহাতে বেশ কিছু নতুন গুহাচিত্র পাওয়া গেছে। গুহাচিত্র গুলির ছবি তোলা ও কার্বন টেস্টের জন্য লন্ডন থেকে যে আর্কিওলজির দলটা এসেছে তার মধ্যে আমি আছি। এর আগে মায়ানমার সরকারের একটি দল এসে দেখে গিয়েছে। প্রায় চার লক্ষ বছর পূর্বে, মানুষের পূর্ব পুরুষ 'হোমো সেপিয়েন্স'-এর আগে 'হোমো ইরেক্টাস' নামে যে প্রজাতি পৃথিবীতে বিচরণ করত তাদের খোঁজ পাওয়া গেছে এই অঞ্চলে। প্রস্থর যুগ, লৌহ যুগের নিদর্শন ছাড়াও পাথরের গায়ে এমন কিছু জন্তুর পায়ের ছাপ দেখা গেছে, যারা কয়েক কোটি বছর আগে চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে।

আমাদের বেস ক্যাম্প থেকে দুশো মিটার দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা গুহা আছে। তার সামনের মুখটা খুব বড়। তারপর ভিতরটা আসতে আসতে সরু হয়ে দুটো পথ তৈরি হয়েছে। কিছু দিন আগে এই অঞ্চলে একটা বড় সড় ভূমিকম্প হয়েছিল। তার ফলে গুহার একটা নতুন মুখ আবিষ্কার হয়েছে। তার ভিতরেই পাথর সরিয়ে খোঁড়া খুড়ি চলছে। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হল, সেই গুহার ভিতর থেকে পাওয়া গেছে একটা মানুষের কঙ্কাল। আর একশ বছরের পুরানো একটা জার্মান রাইফেল। তার মানে ঐ গুহার ভিতরে এর আগেও সভ্য মানুষের পা পড়েছে। এখন আর কি কি পাওয়া যায় সেটাই দেখার।

কিন্তু এই ভয়ঙ্কর বৃষ্টি আমাদের প্ল্যান পুরো তছনছ করে দিল। গত দুদিন ধরে টানা ভারি বৃষ্টিতে কাজ কর্ম সব লাটে উঠেছে। সামনে দিয়ে বয়ে চলা শান্ত একটা জলের স্রোত রাতারাতি বিশাল আকার নিয়ে ফুঁসছে। বাধ্য হয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ক্যাম্প উঠিয়ে ঐ বড় গুহার ভিতরে যেতে হবে। না হলে জলের তোড় যে হারে বাড়ছে আমাদেরকেও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। দিনের আলো থাকতে থাকতে মাল পত্র সরান শুরু হয়েছে। ভাবছি আজকের রাতটা কোন রকমে গুহার মধ্যে মাথা গোঁজার আশ্রয় হয়ে গেলে, যদি কাল বৃষ্টি একটু কমে তাহলে বেরিয়ে পড়ব এখান থেকে। বর্ষা শেষ হলে, পরে আবার আসা যাবে। এমনিতেও আমার জুনিয়ারের মানসিক আর শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ।

সারাদিন কেটে গেল বৃষ্টি কমার কোন লক্ষণ নেই। গুহার ভিতরে চুপ চাপ বসে বসে সময় যেন এগোচ্ছে না। গুহার ঠিক বাইরে একটা সুগন্ধি ফুলের গাছ আছে। থোকা থোকা সাদা সাদা কলকে ফুলের মত ফুল ফুটেছে। আর সন্ধ্যার পর থেকেই তার উগ্র মিষ্টি গন্ধে যেন নেশা লেগে যাচ্ছে। রাতে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। রাত তখন দুটো আড়াইটে হবে, আমরা ক্যাম্প চেয়ারে বসে ঢুলছি। বাইরে সেই নাগাড়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ঘুমের মধ্যে হঠাৎ একটা বজ্রপাতের খুব জোর আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম। বিদ্যুতের রেখাটা একদম গুহার সামনে একটা লম্বা দেবদারু গাছে এসে পড়েছে। দপ করে আগুন লেগে গেল গাছটাতে। তারপর একটা অদ্ভুত জিনিস হল। একটা উজ্জ্বল সাদা আলোর বল গড়িয়ে এগিয়ে এলো আমার দিকে। চোখটা যেন ঝলসে গেল। মাথার মধ্যে কি হল কে জানে, লোডশেডিং-এ আলো চলে যাওয়ার মত ঝপ করে সব অন্ধকার হয়ে গেল।

যখন চোখ খুললাম, দেখি আবার তাঁবুতে ফিরে এসেছি। কিন্তু এটা আমাদের তাঁবু নয়। আর আমিও যেন অনিমেষ হালদার নয়। বহু দিনের না কাটা বড় বড় চুল দাড়ি। গায়ের পোশাকটাও আমার অচেনা। এরকম খাকি রঙের মোটা কাপড়ের পোশাক আগেকার দিনে সরকারি কর্মচারীরা পরত। কিন্তু এই পোশাক, আমার গায়ে এলো কি করে। তাঁবুর ভিতরে বিছানা সমেত একটা কাঠের ফোল্ডিং ক্যাম্প খাট, পাশে টেবিল চেয়ারে কিছু কাগজ পত্র, জমির নক্সা, কম্পাস প্রভৃতি রাখা রয়েছে। কাগজ গুলি উল্টেপাল্টে দেখলাম "ব্রিটিশ বার্মিয়ান টেরিটরি" লেখাটা চোখে পড়ছে বার বার। সাল ১৯১০! উনিশশো দশ!! আশ্চর্য!

মাথাটা বোঁবোঁ করে ঘুরছে। কিছু দিন আগে টাইম টানেলের কথা পড়ছিলাম একটা মনস্তাত্ত্বিক জার্নালে। তাহলে কি আমি সে রকম কোন টাইম টানেলের মধ্যে ঢুকে পড়েছি! বজ্রপাতের পর সেই আলোর বলটা আমার দিকে এগিয়ে এলো, আর তার মধ্যে দিয়ে আমি পৌঁছে গেলাম একশ বছর পিছনে। শুনতে অবাস্তব লাগলেও সামনের কাগজপত্র গুলি তার প্রমাণ। কাগজ পত্রের মধ্যে একটা ডায়রি পেলাম। কালির পেনে ইংরাজিতে লেখা। এই লেখার স্টাইল এখন আর কেউ ব্যাবহার করে না। নাম শ্রী অজিত হালদার। বাঙালি? আবার হালদার টাইটেল? যেন শোনা শোনা লাগছে নামটা। আমার দাদুর মুখে শুনেছিলাম তাঁর দাদু নাকি ইংরেজ আমলে রেঙ্গুনে কাজে গিয়েছিলেন। পরে আর ফিরে আসেন নি। ইনিই কি সেই? আমি আবার একশ বছর আগে টাইম টানেলের মধ্যে দিয়ে তাঁর শরীরেই ফিরে গেছি। জিনের একটা লিঙ্ক যদিও রয়েছে। ডায়রির পাতা ওলটালাম। বাড়ির ঠিকানাটা দেখে মনের সংশয়টা আরও কেটে গেল। এ তো আমাদেরই পুরানো গ্রামের বাড়ির ঠিকানা। চেয়ারে বসে পড়লাম ধপাস করে। পাতা ওলটাতে ওলটাতে শেষের দিকে একটা জায়গায় চোখটা আটকে গেল।

"পাশে মহেন্দ্র ঠকঠক করে কাঁপছে, আর ইষ্ট নাম জপ করছে। ও আজকে সন্ধ্যার মুখে জঙ্গলের ভিতরে গিয়েছিল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে। তারপর একটা বিকট আওয়াজ শুনে পিলে চমকে যায়। গত কয়েক সপ্তাহে জনা দশেক কুলি আর বেশ কিছু সেপাই নিরুদ্দেশ হয়েছে। অনেক অনুসন্ধান করেও কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা কি পালিয়ে গেছে? না মারা পড়েছে? সবার মনেই একটা আতঙ্ক জমাট বাঁধছে।

তাহলে কি কুলিদের কথাই ঠিক। এ জঙ্গলে সত্যিই দৈত্য আছে? সেই নিয়ে স্থানীয় উপকথাও শুনিয়েছিল কুলি সর্দার মংকু। বার্মা আর চীনের বর্ডারে দুর্গম জঙ্গলে ঘেরা পাহাড়ের মধ্যে কিছু গুম্ফায় বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা তন্ত্র সাধনা করে। তাদের অনেক অলৌকিক ক্ষমতাও আছে। মানুষকে দানব আর দানবকে মানুষ বানাতে পারে। শেষ বার্মার রাজা 'থাইবাও মিন' ইংরেজদের হাতে পরাজিত হবার পর রাজার ভাই 'সিমাও মিন' এই বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের শরণাপন্ন হন। তিনি নিজেও তান্ত্রিকদের সাথে কঠোর তন্ত্র সাধনা শুরু করেছেন। স্থানীয় মানুষদের সংগঠিত করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনিতেও ইংরেজরা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি খুবই অবজ্ঞা প্রকাশ করে। গুম্ফা গুলিতে ওরা জুতো পরে ঢুকে যায়। অকথ্য অত্যাচার করে স্থানীয় মানুষ আর সন্ন্যাসীদের উপর। তাই নিরীহ মানুষদের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে। এলবার্ট সাহেবের আন্ডারে এখানে মাস খানেক হল জরিপের কাজ চলছে। সঙ্গে আছে প্রায় পঞ্চাশ জন কুলি আর কুড়ি জনের মত সরকারি পুলিশ। এদের মধ্যে কিছু ভারতীয় আর বেশির ভাগই স্থানীয় বার্মিস। জরিপের কাজটা আসলে চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য। আসল উদ্দেশ্য 'সিমাও মিন'-কে যে ভাবেই হোক ধরতে হবে। উপর তলার অর্ডার।

আমরা সাধারণ জরিপের কর্মচারী। জুন জুলাই মাসের ভরা বর্ষায় পাহাড়ি অঞ্চলে জরিপের কাজ করা এক রকম অসাধ্য ব্যাপার। তাও এলবার্ট সাহেবের জেদ, যে করেই হোক এই কাজ তিন চার মাস চালিয়ে যেতে হবে। তার মধ্যেই ওরা ফাঁদ পেতে বিদ্রোহীদের গ্রেপ্তার করবে।

১৮২৪ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত তিন তিনটে যুদ্ধ শেষ করে ইংরেজরা পুরো বার্মা দখল নিয়েছিল। নতুন করে তৈরি করছে "ব্রিটিশ বার্মিয়ান টেরিটরি"। ঢেলে সাজাচ্ছে রেল ও সড়ক পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা। এদেশের মানুষরা এতদিন শিক্ষার মুখ দেখিনি। তাই ভারত থেকে শিক্ষিত ছেলেদের নিয়ে এসে ইংরেজরা কাজে লাগাচ্ছে এখানে। আমি ১৯০৫-এ এন্ট্রান্স পাশ করার পরে চাকরির তাগিদে রেঙ্গুনে ছিলাম বেশ কিছুদিন। তারপর কোম্পানি জরিপের কাজ দিয়ে রেঙ্গুন থেকে প্রায় হাজার মাইল দূরে এই জনশূন্য জঙ্গলের মধ্যে পাঠিয়েছে। এখানে এসে মহেন্দ্রর সাথে আলাপ হয়। ও আমার মতই সাধারণ গরীব ছেলে। পেটের তাগিদে এই চাকরি নিয়েছে। এই জঙ্গল ওর একে বারেই ভালো লাগেনা। তা এলবার্ট সাহেবের তত্ত্বাবধানে কাজ ভালোই এগুচ্ছিল। বাধ সাধল এই ভয়ঙ্কর বর্ষা। কিন্তু সাহেব কিছুতেই পিছু হটবে না।"

কেংটুং-এর দৈত্য

হঠাৎ ভূমিকম্পের মত মাটিটা কাঁপতে লাগল। তারপর বাইরে থেকে একটা প্রচণ্ড আর্ত চিৎকার। আর পরপর দুটো গুলির শব্দ। এতো সাহেবের বন্দুক। মহেন্দ্র হুড়মুড় করে তাঁবুর ভিতরে ঢুকল। "এসে গেছে!!" তার চোখ দুটো যেন ভয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসছে।

"কে এসেছে?" আমার গলা দিয়ে যে স্বরটা বের হল সেটাও আমার নয়।
"সেই দৈত্যটা এসে গেছে অজিত। চলো পালাই।"

মহেন্দ্রর অনেক আপত্তি সত্ত্বেও আমি বড় টর্চ আর আমার ম্যানলিকার রাইফেলটা নিয়ে রেন কোর্টটা গায়ে চাপিয়ে বের হলাম। বাইরে বেরিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কিছুই বুঝতে পারছিনা। সাহেবের তাঁবুটা আমাদের পাশেই ছিঁড়েখুঁড়ে একসা। ভিতরে বিছানা পত্রের উপরে যেন এক তাণ্ডব চলে গেছে। তার উপরে বড় বড় অতি দানবিক পায়ের ছাপ। হাড় হিম হয়ে গেল সেটা দেখে। কিন্তু সাহেব কোথায়? আমি চেঁচিয়ে ডাকলাম সাহেবের নাম ধরে। কোন সাড়া পাওয়া গেল না। কর্মচারী আর কুলিদের তাঁবু গুলি একটু দূরে। গিয়ে দেখি সব কটা তাঁবুই ফাঁকা। জিনিস পত্র কিছু পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সবাই পালিয়েছে। অনেক ডাকা ডাকি করেও কারোর প্রত্যুত্তর পাওয়া গেল না।

মহেন্দ্র আরও ভয় পেয়ে গেল। তাঁবুর মধ্যে ফিরে এসে বলল, "এখন কি হবে? সেই দৈত্য কি আমাদেরকেও মেরে ফেলবে? এখন আমরা কি করব?"
"জানি না। তবে আমি এর শেষ না দেখে যাব না।" আমি বললাম।
সে প্রয়োজনীয় জিনিস গুলি ব্যাগের মধ্যে গুছাতে গুছাতে বলল, "কি করবে তুমি? এই অসম শক্তির সাথে পাল্লা দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।"
"দুজনের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র আছে। যত বড় দৈত্যই হোক না কেন এর গুলি লাগলে ঘায়েল হবেই। আর সাহেব কোথায় গেল? যদি বেঁচে থাকে? তাকে না খুঁজেই চলে যাব?" আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
"আমার তো মনে হয় না সে বেঁচে আছে। আর ঐ দৈত্য হচ্ছে একটা অলৌকিক শক্তি। আমি ওর চোখ দুটো শুধু দেখেছি। ভয়ঙ্কর লাল টকটকে। সাক্ষাৎ যম। ঐ শয়তানের মুখমুখি হওয়ার ক্ষমতা আমার নেই।" মাথা নেড়ে বলল মহেন্দ্র। "তবু তুমি যখন বলছ খুঁজে দেখা যাক সাহেবকে, চল।"

আবার বৃষ্টির মধ্যে বের হলাম আমরা। সেই দৈত্যাকার পায়ের ছাপ লক্ষ করে টর্চের আলোয় এগোতে থাকলাম। বেশ কিছুটা চড়াই উৎরাই যাবার পর পায়ের ছাপটা আর খুঁজে পাওয়া গেল না। তখন অনেকটা জঙ্গলের গভীরে চলে গেছি। রাস্তা গুলিয়ে গেছে। সঙ্গের কম্পাসটা বজ্রাঘাতে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যে ভিজে আরও দিশেহারা অবস্থা। কোন দিকে এগোবো কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ মহেন্দ্র টর্চের আলোয় আমাকে দেখাল একটা মেহগনি গাছের নীচে সাহেবের রাইফেলটা পড়ে রয়েছে। আরও কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা ঝোপের আড়ালে রক্তাক্ত শরীরটা ছটফট করছে। মনে হল যেন বিশাল বড় একটা জন্তু সাহেবের বুকের উপর পা দিয়ে থেঁৎলে দিয়েছে। নাড়িভুঁড়ি ফেটে বেরিয়ে পড়েছে। সে দৃশ্য চোখে দেখা যায় না। আমাদের সামনে কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রাণ ত্যাগ করলেন। আমাদের শিরদাঁড়া পর্যন্ত ভয়ে কেঁপে উঠল।

তারপর জঙ্গল কাঁপিয়ে একটা বিকট আওয়াজ কানে এল। কোন মানুষের পক্ষে এ আওয়াজ করা সম্ভব নয়। যেন হাজারটা হাতি এক সাথে ডাকছে। ভয়ে মহেন্দ্র থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল, "সেই ডাক! সন্ধ্যাবেলা যেটা শুনেছিলাম।"

তারপর মড়মড় করে গাছপালা ভাঙতে ভাঙতে কি যেন ছুটে আসছে আমাদের দিকে। ধপাস ধপাস করে মাটিটা কাঁপছে। আমি বললাম, "দৌড়াও! এই দিকে।" প্রাণপণে দৌড়াতে শুরু করলাম। বড় বড় গাছপালাদের ফাঁক দিয়ে, ফার্ন আর গুল্ম লতাদের মধ্যে দিয়ে দৌড়। পিছনে সেই দৈত্যটাও সমানে তাড়া করে আসছে। এখনও পর্যন্ত দেখতে পাইনি তাকে। কিন্তু উচ্চতায় আনুমানিক কুড়ি ফুট হবে। যে হারে বড় বড় গাছ গুলি মড়মড় করে ভাঙছে, তাতে সে রকমই মনে হয়। বৃষ্টির মধ্যে পিচ্ছল পথ। পাহাড়ের ঢালে উপরে উঠতে উঠতে কতবার যে আমরা আছাড় খেলাম তার ইয়ত্তা নেই। বার দুই রাইফেল থেকে সে দিকে গুলিও চালালাম। তাতেও তার কোন হেলদোল হল বলে মনে হয় না। হঠাৎ পাহাড়টা শেষ হয়ে গেল। সামনে বিশাল খাদ। অন্ধকারের মধ্যে কতটা গভীর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে বিশাল বড় কোন জলপ্রপাতের গর্জন কানে আসছে। নীচে পড়লে বাঁচার সম্ভাবনা মনে হয় এক চুলও নেই। তবু আমরা দুজন পাহাড়ের গা দিয়ে ডাল পালা খামচে ধরে নামা শুরু করলাম। ঐ দৈত্যটা থেকে যতটা দূরত্ব বজায় রাখা যায়।

উপর থেকে প্রায় ফুট দশেক নেমে গেছি নীচে। এমন সময় অন্ধকারের মধ্যে আবছা দেখলাম বিশাল একটা জানোয়ার খাদের উপর দিয়ে লাফ দিল। মূহুর্তের মধ্যে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ওটা কি ধরনের জন্তু এটা চিন্তা করার আগেই, মহেন্দ্র ঝুলন্ত গাছের ডাল থেকে হাত ফসকে পড়ে গেল খাদে। একটা আর্তনাদ কানে এলো। তারপর ঝপাং করে একটা জলে পড়ার আওয়াজ। "বাঁচাও.. বাঁচাও.." করে চিৎকার। আমিও ঝাঁপ দিলাম অন্ধকারে। যা আছে কপালে। গিয়ে পড়লাম প্রবল একটা স্রোতের মধ্যে। হাঁটুটা ঠুকে গেল একটা পাথরের উপর। চিৎকার করে উঠলাম প্রচণ্ড যন্ত্রণায়। স্রোতের টানে আমি জলের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে তীর বেগে এগিয়ে চললাম।

কতদূর ভেসে গেলাম জানি না। অনেকক্ষণ পর একটা গাছের ডালপালা পেয়ে আঁকড়ে ধরে পাড়ে উঠলাম। কিন্তু যন্ত্রণায় সারা শরীর শিউরে উঠল। হাঁটুর মালাইচাকি ভেঙে গেছে বোধ হয়। অনেক কষ্ট করে শরীরটাকে টেনে টেনে এগিয়ে চললাম জঙ্গলের দিকে। মহেন্দ্রর নাম ধরে ডাক দিলাম বেশ কয়েক বার। কিন্তু কোন উত্তর এলো না। এদিকে এই ঝমঝমে বৃষ্টিতে সারা রাত ভিজতে থাকলে বাঁচার কোন আশাই থাকবে না। খুব কষ্ট করে ধীরে ধীরে ভাঙা পা নিয়েই এগিয়ে চললাম পাহাড়ের কোলে। অনেক দূর যাবার পর একটা বড় গুহার মুখ দেখতে পেলাম। গুহার ভিতরে ঢুকে বৃষ্টি থেকেও বাঁচলেও এই ভাঙা পায়ের জন্য এই জনহীন অরণ্যে বিনা চিকিৎসাতেই হয়ত মারা যাব। পা ফুলে গেছে। যন্ত্রণায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। আর সহ্য করতে পারছিনা.....।

ঘুমটা ভেঙে গেল। কে এক জন ধাক্কা দিচ্ছে গায়ে। চোখের পাতাগুলি যেন এঁটে গেছে। খুলতে চাইছে না কিছুতেই। অনেক কষ্টে চেয়ে তাকালাম। "ওয়েক আপ স্যার! ওয়েক আপ!" সুংলু ধোঁয়া ওঠা গরম চা তৈরি করে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টিটা থেমে গেছে। যাক ভালোই হয়েছে টিফিন করে বেরিয়ে পড়ব এবার। এখান থেকে ঘণ্টা তিনেক জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটার পরে বড় রাস্তা পড়বে। সেখান থেকে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে কেংটুং পৌঁছাতে পারলে আর কোন চিন্তা নেই।

চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বললাম, "থ্যাঙ্ক ইউ! জন সাহেব কোথায়? তাকে চা দিয়েছ?" আড়মোড়া ভেঙে জিজ্ঞাসা করলাম।
"না স্যার, ভোর বেলা থেকেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আসে পাশে সব জায়গা দেখে এসেছি আমি।" সুংলু হাত ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখিয়ে বলল।
"পাহাড়ের উপর দিকটা গিয়ে ছিলে?"
সে মাথা নাড়ল।

আমি তাড়াতাড়ি চায়ে দু চুমুক দিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পায়ে চলা সরু একটা পাকদণ্ডি রাস্তা উঠে গেছে উপরে। বেশ খাড়াই। উঠতে যথেষ্ট দম লাগছে। এ জঙ্গলে মোটা মোটা শাল, সেগুন, মেহগনি, দেবদারু, পাইন আর চেস্টনাটের গাছ আছে অনেক। কত রকমের রঙিন অর্কিড ফুল ফুটে রয়েছে। বৃষ্টিতে ধোয়া সবুজ পাতা গুলি ঝকঝক করছে একেবারে। ভিজে জঙ্গলের একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ নাকে আসছে। এই জায়গা যেন আমার বহু কালের চেনা। কালকে রাতের সেই বিদঘুটে স্বপ্নটা মনে পড়তে নিজের অজান্তেই হাসি পেয়ে গেল। ভাবলাম সেই গুহার ভিতরে পাওয়া নর কঙ্কাল আর 'বার্মিয়ান হিস্ট্রি' বইটা মাথার মধ্যে ঢুকে, ছোট বেলায় দাদুর কাছে শোনা গল্পটার সাথে মিশে গিয়ে একটা খিচুড়ি বানিয়েছে। অনেকে একেই হয়ত পূর্বজন্ম বলে চালিয়ে দেবে।

কেংটুং-এর দৈত্য

গুহা ছেড়ে অনেকটা উপরে উঠে দেখলাম একটা মোটা বহু পুরানো মেহগনি গাছের পাশে একটা ঝোপের মধ্যে থেকে দুটো পা বেরিয়ে আছে। ঐ তো জন! দুজনে মিলে ঝোপ ঠেকে টেনে বের করলাম শরীরটা। শ্বাস প্রশ্বাস চলছে। ভালো করে পরীক্ষা করলাম, শরীরে কোন আঘাত বা ক্ষত নেই। শুধু অজ্ঞানের মত শুয়ে আছে। সুংলু দৌড়ে গিয়ে কিছুটা দূর থেকে জল নিয়ে এলো। চোখে মুখে ছিটিয়ে দিয়ে, ভালো করে বুকে আর হাতে পায়ে মালিশ করতে আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরে এলো।

আমাদের কে দেখে হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠে বলল, কালকে রাতে নাকি তাকে বিশাল একটা জন্তু তাড়া করেছিল। অন্ধকারের মধ্যে জন্তুটার চেহারা সে বুঝতে পারেনি। তবে সেটা পাঁচটা হাতির সমান বড়। আর প্রচণ্ড হিংস্র লাল চোখ। এই ঝোপের মধ্যে ওকে ফেলে পা দিয়ে থেঁৎলে চলে গেল।

আমি বললাম, "তোমার সারা শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। ভয়ের কোন স্বপ্ন দেখেছিলে হয়ত। এখন আমাদের কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে নামার চেষ্টা কর। বৃষ্টিটা থেমেছে। আপাতত ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে।"
ওকে ধরে পাহাড়ি রাস্তায় নামতে নামতে কি মনে হল জিজ্ঞাসা করলাম, "আচ্ছা তুমি ক্যাপ্টেন জন এলবার্ট ডিকস্টারের নাম শুনেছ? ইনি একশ বছর আগে এই ব্রিটিশ বার্মায় পোস্টেড ছিলেন।"
নামটা শুনে সে চমকে উঠল। "হ্যাঁ, ইনি তো আমাদের পঞ্চম পূর্ব পুরুষ। তুমি কি করে জানলে?"

আমি কি করে জানলাম সেটা আর ওকে বলিনি। শুধু একটা মুচকি হেসে বললাম, "সম্ভবত আমার এক পূর্ব পুরুষ ঈশ্বর অজিত হালদার ওনার আন্ডারে এই অঞ্চলেই কাজ করতেন।" ভাবলাম ইতিহাসের এ এক অদ্ভুত সমাবর্তন।।


ছবিঃ শিলাদিত্য বসু

লেখক পরিচিতি

পুষ্পেন​ মন্ডল

পেশায় ফ্যাশন ডিজাইনার পুষ্পেন মন্ডল বজবজের বাসিন্দা। ছবি আঁকতে ভালবাসেন। বিভিন্ন ছোটদের পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হচ্ছে।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা