ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
জাদুনগরী

সূর্য ডুবে গেলেও পশ্চিমের আকাশে এখনও গোলাপি আলোর রেশ লেগে আছে। মেঘমুলুক চা বাগানে দিনের আলো যত নিভে আসছে আলোর চাইতে অন্ধকারের ভাগ বেশী হচ্ছে ক্রমশ। কানে আসছে বিচিত্র সব পাখির ডাক। ভুটান পাহাড়ের দিক থেকে ঘরে ফিরছে একঝাঁক টিয়া। তাদের কলরব যেন আকাশ ছাপিয়ে যাচ্ছে। রোদ্দুর খেলার মাঠ থেকে অন্যদিন আগেই ফিরে আসে। আজ আসেনি এখনও। বাংলোর কাঠের রেলিংয়ে কনুই রেখে ঝুঁকে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন রোদ্দুরের মা।

রোদ্দুরের বাবা ডক্টর মুখার্জি নামী চিকিৎসক । তিনি যে কোম্পানিতে চাকরি করেন সেই কোম্পানি তাদের গ্রুপের বাগানগুলির ম্যানেজারদের মতো বাগানের ডাক্তারদেরও বদলি করে এক বাগান থেকে অন্য বাগানে। মেঘমুলুক বাগানে আসার আগে কয়েকটা বাগানে ছিলেন তাঁরা। কিন্তু জলপাইগুড়ি জেলার পূর্ব ডুয়ার্সের এই বাগানে আসার আগে কেউ অনুমান করতে পারেননি এদিকের প্রকৃতি এত সুন্দর হতে পারে।

জায়গাটা ভারি চমৎকার। মেঘমুলুকের উত্তরে ভুটান পাহাড়। দক্ষিণে ডিমা নদী পার করে আলিপুরদুয়ার। পশ্চিমে আদিগন্ত সবুজ গালচে পাতা চায়ের বাগান। পুব দিকে শ্রমিকদের বাসস্থান ছাড়িয়ে ছিপছিপে এক নদী বয়ে গিয়েছে। সেই ক্ষীণকায়া নদীর ওপারে যতদূর চোখ যায় শুধু অরণ্য আর অরণ্য। এখানকার আকাশের সঙ্গে কলকাতার আকাশের কোনও তুলনা হয় না। এখানকার আকাশ যেন একটু বেশীই নীল।

মেঘমুলুক জায়গাটাকে ভালোবেসে ফেলেছেন রোদ্দুরের বাবা-মা। এখানকার আদিম অরণ্য, মাদলের শব্দে আদিবাসি যুবক-যুবতীদের নাচ, ঢোলকির সঙ্গে নেপালি শ্রমিকদের ঝাউরে, মারুনি, ডংফু নাচ আর গান মুগ্ধ করেছে তাদের। কান পাতলেই তাঁরা শুনতে পান ডুয়ার্সের আলৌকিক বাজনা। ছুটির দিন জলপাই রঙের জিপটা নিয়ে সপরিবারে বেরিয়ে পড়েন রোদ্দুরের বাবা। কান পেতে শোনেন অরণ্যের গান।

এদিকের নদীগুলির নামও খুব সুন্দর। কালজানি, বাসরা, ডিমা, তোর্সা, আংরাভাসা। সেই সব নদীর তীরে তীরে ছড়িয়ে রয়েছে ভাওয়াইয়া গানের দরিয়ার টান। ডুয়ার্সের প্রত্যেকটা শাল, সেগুন গাছের পাতায় রয়েছে অনাবিল এক সবুজ দীপ্তি আর আরণ্যক সুষমা।

একটা কথা প্রায়েই বলেন রোদ্দুরের বাবা। যার কাছ থেকে কিছু নিচ্ছি তাকে কিছু ফিরিয়ে দিতে হয়। তাই ডুয়ার্স যখন সবুজ ঐশ্বর্য দিয়ে ভরিয়ে দেয় অন্তরের অন্তঃপুর তখন তাকেও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু ফেরত দেওয়া কর্তব্য। তা সে যতই সামান্য হোক না কেন।

বাংলোর বাইরে অনেকটা হাতা, তার ওদিকে ফ্যাক্টরি আর লেবার লাইনের মাঝখান দিয়ে ফুটবল মাঠের দিকে চলে গেছে একটা মেটে রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছে দুই কিশোর। হেঁটে হেঁটে কথা বলাটা ঠিক হল না। আসলে দুজনের মধ্যে একজন আসছে লেংচে লেংচে। একমাথা কোঁকড়া চুলের অন্যজন ধরে নিয়ে আসছে। তাদের সিল্যুয়েট দেখা যাচ্ছে দূরের বারান্দা থেকে।

কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ছুট্টে নীচে নেমে এলেন মা। যা ভেবেছেন তাই । রোদ্দুর আবার খেলতে গিয়ে চোট পেয়েছে। এ অবশ্য নতুন কিছু নয়, লেগেই থাকে এসব। গত বছর পায়ের হাড়ে হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচারও হয়েছিল রোদ্দুরের। রোদ্দুর যার কাঁধে হাত রেখে হাঁটছে তার নাম মুকুট। মুকুটের বাবা মেঘমুলুক চা বাগানের সিনিয়ার ম্যানেজার। মুকুট আর রোদ্দুর দুজনেই কার্সিয়াংয়ের এক বোর্ডিং স্কুলে এক ক্লাসে পড়ে। এখন সামার ভ্যাকেশন চলছে। ফলে দুজনেই এসেছে মেঘমুলুক চা বাগানে ছুটি কাটাতে। এসেই হয়েছে মুশকিল। মুকুটের সঙ্গে প্রতিদিন তুচ্ছ কারণে ঝগড়াঝাটি লেগেই আছে রোদ্দুরের। ওদিকে আবার একে অন্যকে ছাড়া থাকতেও পারছে না দুজন।

মা নীচে নেমে এসে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। রোদ্দুর অপরাধী অপরাধী মুখ করে তাকিয়ে বলল, খেলার মাঠে চোট পেয়েছি মা।

মায়ের চোখ সরু হল, কীভাবে চোট পেয়েছ?

মুকুট মাথা নীচু করে ছিল এতক্ষণ। এবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার জন্যই রোদ্দুরের ইনজুরি হয়েছে। ও বল নিয়ে পাঁই পাঁই করে ছুট দিয়ে গোল করতে যাচ্ছিল। আমি ওর অপোনেন্ট টিমের স্টপার। ও গোল করবে আর আমি তো আর সেটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে পারি না। তাই ওকে ল্যাং মেরে ফেলে দিয়েছি। কিন্তু এমন যে হবে সেটা বুঝিনি। আন্টি, আমার এখন খুব গিল্টি ফিলিং হচ্ছে।

মা হেসে ফেললেন। মুকুটের ঘাড়ে হাত দিয়ে সান্ত্বনার স্বরে বললেন, খেলতে গেলে চোট আঘাত তো লাগবেই। তাতে তোমার কোনও দোষ নেই। নেভার মাইন্ড মাই চাইল্ড।

গোটা ডুয়ার্সে রোদ্দুরের বাবা ডক্টর মুখার্জির মাপের সার্জেন নেই একজনও। তার হাতযশের কথা সকলেই জানে । ডুয়ার্সের পেশেন্ট কলকাতায় চিকিৎসার জন্য গেলে ডাক্তাররা বলেন, ডক্টর মুখার্জিকে একবার দেখালেন না কেন? চা বাগানের হাসপাতালে একটা রুটিন রাউন্ড দিয়ে রোদ্দুরের বাবা বাড়ি ফিরলেন যখন তখন সন্ধে একটু গাঢ় হয়েছে।

জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে ডক্টর মুখার্জি একবার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন। দুজনের চোখের ইশারায় কথা হল। রোদ্দুর পায়ে চুন হলুদ লাগিয়ে ব্যাজার মুখ করে বসে আছে পড়ার ঘরে। রোদ্দুরের বাবা মুচকি হেসে বললেন, হোয়াট হ্যাপেনড ইয়াং ম্যান?

রোদ্দুর মুখে কিছু না বলে পা-টা দেখালো বাবাকে। ডক্টর মুখার্জি যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব করে হেসে বললেন, খেলতে গেলে চোট তো লাগবেই। সেজন্য মুখ শুকনো করে বসে থাকার কিছু নেই । চিন্তা নেই, আমি এসে গিয়েছি।

ডক্টর মুখার্জি রোদ্দুরের কাছে গিয়ে বসলেন। পা-টা নেড়েচেড়ে পরীক্ষা করে রোদ্দুরের মায়ের দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন একবার।

রোদ্দুর ঢোক গিলে বলল, ভেঙেছে নাকি বাবা?
ডক্টর মুখার্জি হাসলেন, উঁহু ভাঙেনি, মচকেছে। আমি ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি, ব্যথা কমে যাবে। আজ রাতটুকু ঘুমিয়ে নে। কাল সকালে উঠে শরীরটা ঝরঝরে হয়ে যাবে। দেখবি অনেকটা ফিট হয়ে গিয়েছিস। ডক্টর মুখার্জি ভুরু কুঁচকে বললেন, তুই এখনও মুখটাকে প্যাঁচার মতো করে রেখেছিস কেন?
রোদ্দুর বলল, আজ আমার মন ভালো নেই।
ডক্টর মুখার্জি বললেন, মুকুটের সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে বুঝি?
রোদ্দুর ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, আজ মুকুটের কাছ থেকে একটা বই নিতে ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। মুকুট ওদের ফুলবাগানটা ঘুরিয়ে দেখাল। দেখে চোখে একেবারে ধাঁধা লেগে গেল!
ডক্টর মুখার্জি বললেন, তাই?
রোদ্দুর চোখ বড় বড় করে বলল, কী সুন্দর ফুলবাগান – যদি তুমি দেখতে বাবা! গোলাপ, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, যুঁই, অপরাজিতা, পদ্ম – কী নেই সেই বাগানে! দু'জন মালি যত্ন করে বানিয়েছে ফুলবাগানটা। এমন ফুলবাগান নাকি গোটা ডুয়ার্সে নেই।
মা বাবা-ছেলের কথা শুনছিলেন। পাশ থেকে বললেন, তাহলে তো সেই বাগানটা একদিন আমাদের দেখে আসতে হয়।
রোদ্দুর বলল, মুকুট আমাকে চ্যালেঞ্জ করেছে মা। বলেছে এমন সুন্দর ফুলবাগান বানাবার সাধ্য আর নাকি কারও নেই।
মা খিলখিল করে হেসে বললেন, তুই কি সেই চ্যালেঞ্জ আ্যকসেপ্ট করেছিস?
রোদ্দুর ঢক করে মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
মা বললেন, তাহলে কাল থেকে লেগে পড়। আমরাও ফুলবাগান তৈরি করব একটা। আমি হাত লাগাব তোর সঙ্গে। চাই কি তোর বাবাও অবসর সময়ে তোকে সাহায্য করবেন। উইন্টার ভ্যাকেশনে তুই যখন মেঘমুলুকে আসবি তখন দেখবি ফুলের জলসা বসে গেছে আমাদের বাড়িতে।
রোদ্দুর হাততালি দিয়ে বলল, গ্র্যান্ড আইডিয়া!

ডিনার টেবিলে রুটি ছিঁড়ে চিকেনের ঝোল মাখাতে মাখাতে ডক্টর মুখার্জি হেসে বললেন, ফুলবাগান নয়। অন্য একটা বাগান করার আইডিয়া মাথায় এসেছে আমার ।
রোদ্দুর অবাক হয়ে বলল, অন্য বাগান মানে ?
ডক্টর মুখার্জি বললেন, আমার এক বন্ধু চেন্নাইতে থাকে, তার নাম রাধাকৃষ্ণণ। নাম করা উদ্ভিদবিজ্ঞানী। রাধার সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি কাল সকালে। আমি এই সপ্তাহের মধ্যেই চেন্নাই থেকে শ'খানেক গাছের চারা আর সার-টার নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছি। তারপর আমরা সকলে মিলে সেই গাছগুলো লাগাব আমাদের কম্পাউন্ডে। মুকুটরা লাগিয়েছে ফুলগাছ, আমরা লাগাব অন্য ধরনের গাছ।

রোদ্দুর বলল, চেন্নাই থেকে শ'খানেক গাছ আনাবে মানে? কী গাছ আনাবে?
ডক্টর মুখার্জি স্মিতমুখে একবার একবার স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপরে চোখেমুখে রহস্য ফুটিয়ে বললেন, ডুয়ার্স আমাদের দিয়েছে অনেকখানি। আমরা এতদিন নিয়েছিই শুধু। এবার সময় এসেছে ঋণ শোধের । এবার আমাদের ডুয়ার্সকে কিছু ফেরত দেওয়ার পালা।
রোদ্দুরের মা-ও কিছু বুঝতে পারেননি। তিনি বললেন, কিন্তু কী ফেরত দেব? কীভাবে?
ডক্টর মুখার্জি বললেন, আমার বদলির চাকরি। একদিন না একদিন আমাকে অন্য কোনও চা বাগানে চলে যেতে হবে ফ্যামিলি নিয়ে। কিন্তু মেঘমুলুক ছেড়ে চলে যাবার পরেও লোকে আমাদের মনে রাখবে আর কিছু না হোক শুধু এই বাগানটার জন্য। দেখে নিও তুমি।

কিছুদিন পর যেদিন রোদ্দুর কার্সিয়াংয়ের বোর্ডিং স্কুলে ফিরে যাবে, তার আগের দিন একটা টেম্পোতে করে শ'খানেক গাছের চারা এল রোদ্দুরের বাংলোয়। শাল-সেগুন-লালি-জারুল নয়, আমলতাস-নাগকেশর-কাঞ্চন নয়, গোলাপ-পদ্ম-বুগেনভিলিয়া তো নয়ই। এই গাছগুলোর একটা গাছও জীবনে দেখেনি রোদ্দুর। এমনকী মা পর্যন্ত একটাও গাছ চিনতে পারলেন না। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কী গাছ?

ডক্টর মুখার্জি নিজে মাটি খুঁড়ছেন খুরপি দিয়ে। হাসছেন মিটিমিটি। হেসে বললেন, সেটাই তো সাসপেন্স। সময় হলে সব জানতে পারবে। একদিন এই বাগানকে লোকে বলবে 'জাদুনগরী', দেখে নিও তোমরা।

অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছে। মেঘমুলুক থেকে বদলি হয়ে শিলচরের কাছে এক বাগানে চলে গিয়েছিল রোদ্দুররা। কার্সিয়াংয়ের স্কুল থেকে টিসি নিয়ে রোদ্দুর ভর্তি হয়েছিল শিলচরের স্কুলে। শিলচরে কয়েক বছর থেকে ডক্টর মুখার্জি বদলি হয়েছিলেন মেঘালয়ের এক চা বাগানে। এর মধ্যেই স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছে রোদ্দুর। এখন সে বিদেশে চাকরি করে। এদিকে ডক্টর মুখার্জি আর নেই। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী চোখ বুঁজেছেন কয়েক বছর হতে চলল। মুকুটের সাথে যোগাযোগের সুতোটা একেবারেই ছিঁড়ে গিয়েছিল রোদ্দুরদের।

অবসর সময়ে একটুক্ষণ ফেসবুক করে রোদ্দুর। ছাত্রজীবনে অনেকগুলো স্কুলে পড়েছে, অনেক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে এভাবেই রিইউনিয়ন হয়েছে রোদ্দুরের। একদিন আচমকা মিউচুয়াল ফ্রেন্ডদের সূত্র ধরে যোগাযোগ হয়ে গেল মুকুটের সঙ্গে।

মুকুটের বয়স এখন চল্লিশের উপর। মুকুটের সেই একমাথা কোঁকড়া চুল আর নেই। মাথাজোড়া টাক এখন। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, ভারিক্কি চেহারা দেখে মুকুটকে এখন চেনাই দায়। রোদ্দুরের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পরদিনই আ্যকসেপ্ট করে নিল মুকুট। নতুন করে আলাপ হল দুই বন্ধুর। জানা গেল মুকুট ওর বাবার পথেই হেঁটেছে। টোকলাই ট্রেনিং নিয়ে চা বাগানের ম্যানেজার হয়েছে মুকুট। অনেকগুলো বাগান ঘুরে মুকুট এখন মেঘমুলুক চা বাগানের ম্যানেজার।

দুজনে অনেক চ্যাটিং হল। এ কথা সে কথার পর মুকুট রোদ্দুরের কী একটা কথায় বলল, পঁচিশ বছর আগের কথা মনে আছে তোর? ডাক্তারকাকু যে কী কান্ড সেদিন করেছিলেন তখন বুঝিনি আমরা কেউ। এখন বুঝতে পারছি। আমার সেই ফুলবাগান তোর বাবার তৈরি করা জাদুনগরীর কাছে দশ গোল খেয়ে গেছে।

রোদ্দুর অবাক হয়ে বলল, কী বলছিস আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
মুকুট বলল, তুই কবে আসছিস সেটা বল।
রোদ্দুর বলল, সামনের মাসে পুজোর সময় একবার যাবার কথা আছে। কলকাতায় আমার শ্বশুরবাড়ি। সেখানেই উঠব। কেন বল তো?
মুকুট বলল, তাহলে একবার দু'দিনের জন্য মেঘমুলুকে ঢুঁ দিয়ে যা। ডাক্তারকাকু যে গাছগুলো লাগিয়েছিলেন সেগুলো এখন দশাসই চেহারা নিয়েছে। একশো গাছের বন এখন ডুয়ার্সের সেরা আকর্ষণ। গাছগুলো দেখতে দূর দূরান্ত থেকে পর্যটক তো বটেই, বটানির স্টুডেন্টরাও দল বেঁধে আসছে মেঘমুলুকে।
রোদ্দুর অবাক হয়ে বলল, কী গাছ ওগুলো?
মুকুট রহস্য তৈরী করে বলল, ফেসবুকে বলব না সেটা। জানতে গেলে তোকে আসতে হবে মেঘমুলুকে। তুই এলে দুই বন্ধুতে দেখাও হবে পঁচিশ বছর পর।

মুকুট একটা গাছের নীচে পড়ে থাকা পাতা তুলে নিয়ে রোদ্দুরের হাতে দিল। হেসে বলল, পাতাটা চিবো একটু। তারপর বলছি সব।
রোদ্দুর আলগোছে পাতাটা হাতে নিল। সন্তর্পণে চিবোচ্ছে। ভুরু কুঁচকে বলল, খুব একটা আলাদা কিছু তো বুঝছি না। কেমন কষটে স্বাদ, ব্যাস।
মুকুট এবার বুকপকেট থেকে পার্পল রংয়ের ক্যাডবেরির প্যাকেট বার করল। মোড়ক খুলে একটা চকোলেট বার করে ভেঙে রোদ্দুরের হাতে দিয়ে বলল, এবার এটা খেয়ে দ্যাখ কেমন খেতে লাগে।
রোদ্দুর চকোলেটটা মুখে দিয়ে অবাক। বোকা বোকা মুখ করে বলল, এই ব্র্যান্ডের চকোলেট তো আমি অনেক খেয়েছি। আমার ফেবারিট জিনিস এটা। কিন্তু এই চকোলেটটা বিদঘুটে লাগছে খেতে। কোনও স্বাদ পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে কোনও কারণে নষ্ট হয়ে গেছে ওটা।
মুকুট হো হো করে হেসে বলল, চকোলেট ঠিকই আছে। আসল ঘটনা ঘটিয়েছে এই গাছের পাতাটা। এই গাছের নাম 'গুরমার' । এই গাছের পাতা খেয়ে চকোলেট মুখে দিলেও তা মিষ্টি লাগে না। বরং মনে হয় সেটা বালিপাথরের তৈরি।

রোদ্দুর অন্য একটা গাছের পাতায় সন্তর্পনে হাত বোলাচ্ছিল। বলল, এটা কী গাছ?
মুকুট বলল, এর নাম 'জিঙ্গবাইলোবা'। এটা ডাইনোসর যুগের গাছ। সেই আমলেও এই গাছ ছিল। মুকুট আঙুল উঁচিয়ে অন্য একটা গাছ দেখিয়ে বলল, ওই ফুলগাছটা যে দেখছিস ওর নাম 'টাক্কর'। এর ফুলটা লক্ষ করেছিস? অদ্ভুত না?
রোদ্দুর বিস্মিত হয়ে বলল, ঠিক বলেছিস তো! অবিকল ডানা মেলা বাদুরের মতো দেখতে এর ফুল। তারপর অন্য একটা গাছ দেখিয়ে বলল, আর এটা? এই গাছটার কী স্পেশালিটি?
মুকুট বলল, ওই গাছটার আবার অন্য গুণ। এর থেকে তৈরী হয় আগর তেল। সুগন্ধী হিসেবে এই তেলের খ্যাতি সারা পৃথিবী জোড়া। পাঁচ মিলিলিটার আগর তেলের দাম পনেরো হাজার টাকা।
রোদ্দুর একটা গাছের কাণ্ডে হাত দিয়ে বলল, একটা গাছ অন্তত আমি চিনেছি। এটা বট গাছ, তাই না রে?
মুকুট হাসল, উঁহু চিনিসনি। এটা সাধারণ বট নয়, এর নাম কৃষ্ণবট। লোকমুখে প্রচলিত আছে এই গাছের ঠোঙার মতো পাতায় ভগবান কৃষ্ণ ননী খেতেন।
রোদ্দুর ঢোক গিলে বলল, ও মাই গড!
মুকুট হেসে বলল, সাধে কি আর এই বাগানটাকে লোকে বলছে 'জাদুনগরী'!

জাদুনগরী

রোদ্দুর বলল, তুই এত কিছু কী করে জানলি?
মুকুট হো হো হাসল, তোরা যখন চলে গেলি মেঘমুলুক ছেড়ে তখন এগুলো চারাগাছ ছিল। তখন আমার বাবা বাগানের মালিদের দিয়ে গাছগুলোর পরিচর্যা করিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না যে এগুলো কী গাছ। ইন ফ্যাক্ট আমরা কেউই জানতাম না। তোদের দু'বছর পর আমরাও এই বাগান ছেড়ে অন্য বাগানে চলে যাই। বাবার জায়গায় যে ম্যানেজার এসেছিলেন তাঁকে বাবা বলেছিলেন গাছগুলির দেখাশোনা করতে। তিনিও তাঁর সাকসেসরকে বলে গিয়েছিলেন গাছগুলিকে পরিচর্যা করতে। এভাবেই গাছ গুলো একটু একটু করে বড় হয়েছে গত পঁচিশ বছর ধরে।

রোদ্দুর বলল, তারপর?
মুকুট বলল, এর মধ্যে তিস্তা, ডিমা, বালাসান, তোর্সা, আংরাভাসা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আমি টোকলাই ট্রেনিং নিয়ে ম্যানেজার হয়েছি। বাবা যে কোম্পানিতে চাকরি করতেন, সেই কোম্পানি আমিও জয়েন করেছি। অসম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়ের বিভিন্ন বাগান ঘুরে অবশেষে আমাদের কৈশোরের স্মৃতি জড়ানো মেঘমুলুক বাগানে। আমার ডেস্টিনিই আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে। তোর সঙ্গে যে হঠাৎ যোগাযোগ হয়ে গেল সেটাও ডেস্টিনি।

রোদ্দুর বলল, কিন্তু এই গাছগুলি যে আসলে কী গাছ সেটা জানা গেল কী করে?
মুকুট বলল, আমার বউ উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে পড়েছে। এই গাছগুলোকে প্রথম আইডেন্টিফাই করে সে। তারপর এটা নিয়ে যোগাযোগ করে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। রাজ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দফতরের সঙ্গেও কথা বলে। তারপর টনক নড়ে সকলের।

রোদ্দুর অস্ফুটস্বরে বলল, ডুয়ার্সকে ভীষণ ভালোবাসতেন বাবা। এখানকার নির্ভেজাল সবুজ থেকে চা-বাগান নদীনালা ঝোরা ঝরনা আদিগন্ত বনবনানী ওঁদের আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। এদিকের আদিবাসী লৌকিক জনজীবন ওঁর চেতনায় মিশে গিয়েছিল। কিন্তু এখন দেখছি ডুয়ার্স থেকে বাবা যেমন নিয়েছেন তেমন ফিরিয়েও দিয়েছেন। এই জাদুনগরী ওঁর তরফ থেকে ডুয়ার্সকে দেওয়া এক অসমান্য উপহার।


ছবিঃঅঙ্কিতা নস্কর

লেখক পরিচিতি

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

জলপাইগুড়ির বাসিন্দা মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের স্কুলে পড়ার সময় থেকেই লেখালিখিতে হাতেখড়ি। পেশায় সরকারি চাকুরে মৃগাঙ্ক নিয়মিত বিভিন্ন প্রতিষ্টিত এবং স্বল্প পরিচিত কাগুজে পত্রিকায় এবং ওয়েব ম্যাগাজিনে বড়দের এবং ছোটদের জন্য গল্প এবং ভ্রমণকাহিনী লেখেন। লেখালিখির পাশাপাশি সুযোগ পেলেই ক্রিকেট ব্যাট হাতে মাঠে নেমে পড়েন মৃগাঙ্ক।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা