ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

'সায়েন্স' পত্রিকায় বেরনো একটি প্রবন্ধ মন দিয়ে পড়ছিলেন ত্রিলোকেশ্বর। লোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ু ও মনস্ত্বত্ত্ব বিভাগের এক অধ্যাপক আর তাঁর এক ছাত্র গবেষণা করে দেখেছেন মানবমস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ন এক অংশ হল অ্যামিগডালা। বাদামের মতো আকৃতির এই জিনিসটিই আমাদের ভয় এবং প্যানিকের জন্য দায়ী। সাধারণ মানুষের অ্যামিগডালায় খুঁত নেই, সে কারণে ভয়ের প্রবৃত্তি সাধারণ মানুষের মজ্জাগত। তবে যাঁদের অ্যামিগডালা ক্ষতিগ্রস্ত তাঁরা হন অকুতোভয় স্বভাবের। সুখ দুঃখের অনুভূতি থাকলেও তাঁর ভয়কে অনয়াসে জয় করতে পারেন।

ভূত-প্রেতে ভয় ত্রিলোকেশ্বরের নেই। বয়স যখন কম ছিল তখন বাজি ধরে পোড়োবাড়িতে রাত কাটিয়েছেন, মাঝরাতে একা একা শ্মশানে গিয়েছেন, কখনও সামান্যতম ভয় পাননি। ডাক্তারি পড়ার সময় মড়াও ঘেঁটেছেন নিরুদ্বিগ্ন চিত্তে, বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। তাঁর খুঁতো অ্যামিগডালাই যে এসবের পেছনে কলকাঠি নাড়াছে সেটা অ্যাদ্দিনে ধরতে পারলেন তিনি। শরীরের কোনও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে খুঁত থাকলে সকলেরই একটু খারাপ লাগে, কিন্তু ত্রিলোকেশ্বরের হল উল্টোটা। মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেল তাঁর।

ত্রিলোকেশ্বর কলকাতায় এক হাসপাতালে চিকিৎসক ছিলেন, অবসর নিয়েছেন সম্প্রতি। ছেলেপুলে নেই নেই, স্ত্রী গত হয়েছেন বহু বছর আগে।রিটায়ার করার পর শহরের ক্যাচরম্যাচর থেকে দূরে কোথাও একটা বাড়ি খঁজছিলেন তিনি। যেমন চাইছিলেন অবশেষে ঠিক তেমন-তেমন একটা বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেল পুরনো কলিগ ডক্টর সান্যালের কাছে থেকে। এক বিকেলে ত্রিলোকেশ্বরের বাড়িতে এসে ব্যাগ থেকে একটা ডিভিডি বার করে তাঁর হাতে দিয়ে ডক্টর সান্যাল বলেলেন, ত্রিলোকদা, এটা 'হানাবাড়ি' নামে একটা বাংলা ছবি। ছবিটা হিট করেছে এ'বছর। সময় করে সিনেমাটা একবার দেখো।

ত্রিলোকেশ্বর হাসলেন, বইপত্র পড়ে আর জার্নাল ঘেঁটেই আমাদের দিন কেটে যায়। সিনেমা দেখে নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই।

ডক্টর সান্যাল বললেন, ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে একটা চমৎকার বাড়ির খোঁজ পেয়েছি। 'হানাবাড়ি' ছবির প্রোডিউসার ঈশ্বর ঢোলাকিয়া বাড়িটার মালিক। লাটাগুড়ির ওই বাড়িতে 'হানাবাড়ি' শুট করা হয়েছে। ঢোলাকিয়া বাড়িটা বিক্রি করে দিতে চেয়ে ইন্টারনেটে অ্যাড দিয়েছেন। তাঁর ফোন নম্বরও দেওয়া আছে সেখানে। তুমি ডিভিডিটা চালিয়ে ছবিটা দ্যাখো, তারপর জানিও বাড়িটা পছন্দ হয় কিনা।

সন্ধেবেলা ছবিটা দেখলেন ত্রিলোকেশ্বর। জয়ন্ত নন্দী নামে এক ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রী আর শিশুপুত্র নিয়ে বাস করতেন ছবির মতো একটা বাড়িতে। এক বর্ষার রাতে শর্ট সার্কিট হয়ে সারা বাড়িতে আগুন ধরে যায়, আগুনে পুড়ে একসঙ্গে তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। জয়ন্ত নন্দী যেহেতু ব্যাংক-লোন নিয়ে বাড়িটা করেছিলেন তাই তাঁর মৃত্যুর পর ব্যাঙ্ক বাড়িটা ক্রোক করে নেয়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বাড়িটা কিনে নিয়ে কটেজ হিসেব চালাতে চেষ্টা করেছিলেন। কটেজ উদ্বোধনের দিন এক দক্ষিণ ভারতীয় ট্যুরিস্ট থাকতে এসেছিলেন, পরদিন সকালে তাঁকে উন্মাদ অবস্থায় পাওয়া যায়। কটেজের ব্যবসা উঠে যায় রাতারাতি। যাগযজ্ঞ করিয়ে কিছু লাভ হয় নি, বেঘোরে মারা পড়ছে একা ওঝা। এখন জনপদের এক প্রান্তে সেই স্বপ্নের মতো বাড়িটা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়ছে। কেউ সে বাড়িতে পা ফেলতে সাহস করে না, অশরীরীদের আস্তানা সেখানে।

পরদিন সকালে ডক্টর সান্যালকে ফোন করলেন ত্রিলোকেশ্বর, বুঝলে সান্যাল, সিনেমাটা গাঁজাখুড়ি। তবে বাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে। তুমি ফাঁকা আছো নেক্স্‌ট্‌ উইক ? তবে চলো যাই, সরেজমিনে সব দেখে আসি গিয়ে।

পরের সপ্তাহেই লাটাগুড়ি এসে পড়লেন দুজন। ঈশ্বর ঢোলাকিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল, উনি স্বাধীনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে বলতে দিয়েছিলেন।লাটাগুড়ি পৌঁছে তাঁকে ফোন করতেই মাঝবয়সি ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে চলে এলেন। লাটাগুড়িতে ঈশ্বর ঢোলাকিয়ার একটা কাঠ চেরাইয়ের মিল আছে, তার দেখাশোনা করেন স্বাধীনবাবু। তিনিই নিয়ে গেলেন গন্তব্যে। লাটাগুড়ি বাজার থেকে মিনিট দশেক হাঁটাপথ, গরুমারা জঙ্গল ঘেঁষে বড় রাস্তার ধারে শালসেগুনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে একতলা বাড়িটা। ত্রিলোকেশ্বর খুশি হয়ে বললেন, দেখেছ সান্যাল, কী অপার শান্তি বিছিয়ে আছে বাড়িটায় ? এর নাম 'শান্তিবাড়ি' দিলেই বুঝি জুতসই হয়।

তালা খুলে ঢোকা হল। সবগুলো ঘর ঘুরে ঘুরে দেখলেন স্বাধীনবাবু। তিনটে মাঝারি সাইজের ঘর, অ্যাটাচ্‌ড্‌ বাথরুম আর টয়লেট রয়েছে। তবে কিচেনের দেওয়ালটা দেখে মেজাজ চটিতং হয়ে গেল ত্রিলোকেশ্বরের। পেন্সিল দিয়ে মিকি মাউস আর ডোনাল্ড ডাকের কার্টুন কেউ এঁকে রেখেছে দেওয়ালে। ত্রিলোকেশ্বর ভ্রু কুঁচকে বললেন, এটা কার কাজ ?

স্বাধীনবাবু বিড়বিড় করে বললেন, বাড়ি দেখতে আসেন তো অনেকে, তখনই চোখের আড়ালে কোনও দুষ্টু বাচ্চা এই কান্ডটা ঘটিয়েছ হয়তো ! ঢোলাকিয়া স্যারকে বলে বাড়িটা আর একবার রং করাতে হবে।

ডক্টর সান্যাল বললেন, বাড়িটা দাম বেশি রাখা হয়নি, কাগজপত্রও ঠিক আছে, তবুও বাড়িটা খালি আছে কেন বলুন তো ?

স্বাধীনবাবু জিভ দিয়ে চুকচুক শব্দ করলেন, আর বলবেন না, 'হানাবাড়ি' দেখে লোকে মনে করেছে এটা সত্যই ভূতের বাড়ি। সেজন্যই ...

ত্রিলোকেশ্বর কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, আপনি অ্যামিগডালার নাম শুনেছেন কখনও ?

স্বাধীনবাবু অবাক হয়ে গিয়ে বললেন, কী ডালা বললেন স্যার?

ত্রিলোকেশ্বর ছাত্র বোঝাবার ঢঙে আমিগডালার রহস্য ব্যাখ্যা করলেন দু'-চার কথায়। তারপর ডক্টর সান্যালের কাঁধে চাপড় মেরে বললেন, বুঝলে সান্যাল, আমার মস্তিষ্কের এই অ্যামিগডালা বস্তুটি একটু ডিফেক্টিভ। তাই ছেলেবেলা থেকেই আমার ডিকশনারিতে ভয় বলে কোনও শব্দ নেই। বাড়ি যখন পছন্দ হয়েছে তখন ভূতের ভয়ে ভিরমি খেয়ে পিছিয়ে যাবার লোক আমি নই। কলকাতায় গিয়ে টাকার জোগাড় করে দু'-এক সপ্তাহের মধ্যেই আমি এখানে আসছি তল্পিতল্পা নিয়ে।

কলকাতায় ফিরে এলেন ত্রিলোকেশ্বর, ঈশ্বর ঢোলাকিয়ার সঙ্গে দেখা করলেন একদিন। বললেন, আপনার লাটাগুড়ির বাড়িটা আমার বড় পছন্দ। তবে আমার কয়েকটা ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙতে হবে, তাতে কয়েকটা দিন সময় লাগবে। তবে আপনি চাইলে আমি কিছু টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে বায়না করে রাখতে পারি।

ঈশ্বর ঢোলাকিয়ার বয়স পঞ্চাশের মতো, একটু ভারীর দিকে চেহারা। ভাঙা ভাঙা বাংলায় তিনি বললেন, ব্যাপারটা কী জানেন তো ডক্টর, সিটিলাইফে হ্যাবিচুয়েটেড মানুষের ওরকম ডেজার্টেড জায়গায় গিয়ে থাকতে প্রথম প্রথম ভালই লাগে। কিছুদিন পর কিন্তু দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন সে আবার হ্যাবিচুয়েটেড লাইফে ব্যাক করতে চায়। কাজেই ...

ত্রিলোকেশ্বর মাঝখানে বাধা দিয়ে বললেন, সিটিলাইফ আমার মোটেই পছন্দ নয়। এতদিন চাকরিসূত্রে কলকাতায় থাকতে বাধ্য হয়েছি। এখন রিটায়ার করেছি, তাই জেনেবুঝেই নির্জন কোনও জায়গায় গিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে চাইছি। ঢোলাকিয়া বললেন, আমি আপনাকে ডিসকারেজ করছি না, কিন্তু মিস্টার ব্যানার্জির ঘটনাটা বললে আপনি আমার হেজিটেশনের ব্যপারটা বুঝবেন। পিনাকী ব্যানার্জি নামে একজন এক্স-আর্মি অফিসার ইন্টারনেটে অ্যাড দেখে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এরকম জোর করে আমার হাতে পুরো অ্যামাউন্টের চেক ধরিয়ে দিয়ে লাটাগুড়ির বাড়িতে থাকতে চলে গিয়েছিলেন ভদ্রলোক। কিন্তু একরাত থেকেই ফিরে এলেন মিস্টার ব্যানার্জি, বাড়ি নাকি তাঁর পছন্দ নয়। আমি ব্যস্ত লোক, আমার কি এসব হ্যাজার্ড পোষায়?

ত্রিলোকেশ্বর চুপ করে আছেন। ঢোলাকিয়া বললেন, সেজন্যই বলছিলাম, আপনি ওখানে গিয়ে দু'-চারদিন থেকে দেখুন। ইচ্ছে না করলে আবার ফিরে আসুন কলকাতায়, নো প্রবলেম। এখন আপনাকে এক পয়সাও অ্যাডভান্স করতে হবে না।

সপ্তাহ দুয়েকের মাথায় একটা গাড়িতে লটবহর চাপিয়ে ত্রিলোকেশ্বর রওনা দিলেন লাটা গুড়ির উদ্দেশ্যে। ডক্টর সান্যাল চেন্নাই গিয়েছেন একটা কাজে, তাই আসতে পারলেন না। সড়কপথের হাল খুব খারাপ, লাটাগুড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে ত্রিলোকেশ্বরের বিকেল হয়ে গেল। ফোনে কথা বলে নিয়েছিলেন, দেখা গেল স্বাধীনবাবু হাসিমুখে দাঁড়িয়ে।

জিনিসপত্র নামিয়ে ড্রাইভার ছেলেটাকে ছেড়ে দিলেন ত্রিলোকেশ্বর। ঘরে ঢুকে মন ভাল হয়ে গেল তাঁর। কিছুদিন আগেই রং করা হয়েছে, ঝকঝক করছে ঘর। স্বাধীনবাবু একটা খাট ভাড়া করে নিয়ে এসেছেন, রান্নার জন্য একজনকে বলে রেখেছেন। রান্নাঘরের সরঞ্জাম ট্রান্সপোর্টের গাড়িতে আছে। দু'-চারদিনের মধ্যে সেসব ঢুকে গেলেই সেই রাঁধুনি মহিলা কাজে আসতে শুরু করবে। তবে আপাতত হোটেলেই খাওয়াদাওয়া সারতে হবে।

আকাশে বেশ মেঘ রয়েছে, গরমটাও তেমন নেই। সন্ধে হতে শুরু করেছে। এক-আধটা গাড়ি চলছিল বড় রাস্তা দিয়ে, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক একেবারে শুনশান। ঝিঁঝিপোকার ডাক শোনা যাচ্ছে, কেমন একটা বুনো গন্ধ ভেসে আসছে জঙ্গলের দিক থেকে। বর্ষাকাল শুরু হয়েছে, এখন অরণ্যের দ্বার বন্ধ। পুজোর সময় দরজা খুললে জঙ্গলের কোন কোন কোর এরিয়া এলিফ্যান্ট রাইডিং করা যেতে পারে সেসব নিয়ে কথা হল দুজনের। একটুক্ষণ বাদে লাটাগুড়ি বাজারে একটা হোটেলে গিয়ে ডিনার সেরে এলেন ত্রিলোকেশ্বর। স্বাধীনবাবু দরজা অবধি এসে তাঁকে পৌঁছে দিয়ে চলে গেলেন। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছিল। স্বাধীনবাবু চলে যাওয়ার খানিক্ষণের মধ্যেই মুষলধারে শুরু হল বৃষ্টি। হটাৎ বিকট শব্দ করে একটা বাজ পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং, নিকষ অন্ধকারে ডুবে গেল সব।

ঘরের এক কোণে একটা লন্ঠন রেখে গিয়েছিলেন স্বাধীনবাবু। টর্চ জ্বেলে বিছানা থেকে নেমে লন্ঠনটা জ্বালিয়ে সলতেটার আঁচটা মৃদু করে দিয়ে আবার শুতে গেলেন তিনি। সারাদিন জার্নি করে এসেছে, বিছানায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছেন ত্রিলোকেশ্বর। ঘুমটা চট করে ভেঙ্গে গেল, ঘরে অন্য কারও অস্পষ্ট শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে যেন?

ধড়মড় করে উঠে বসছেন তিনি। অন্ধকার ঘরের মধ্যেই মনে হল দেওয়ালের সামনে একটা ছায়া ছায়া মতো কেউ দাঁড়িয়ে ছিল, তিনি তাকাতেই ছায়ামূর্তিটি ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেল যেন।

বালিশের পাশের টর্চটা জ্বালিয়ে জানালার দিকে ফেললেন ত্রিলোকেশ্বর।জানালাটা হাট করে খোলা। বাইরে শোঁ শোঁ হাওয়া দিচ্ছে, জানালার পাল্লাটা ধমাস ধমাস করে এসে লাগছে গ্রিলের সঙ্গে। অবাক কান্ড! তাঁর পরিষ্কার মনে আছে নিজের হাতে জানালা বন্ধ করে বিছানায় গিয়েছিলেন। ত্রিলোকেশ্বর ঠোঁট কামড়ে ভাবলেন, তবে কি ছিটকিনিটা খুলে গেছে কোনওভবে?

ঘরে লন্ঠনটা জ্বলছে। ঘুমের ঘোরে আবছা আলোয় কিছুই নজরে আসছে না। মশারি সরিয়ে বাইরে এসেও কিছু ঠাহর করতে পারলেন না। জানালাটা আবার বন্ধ করে দিয়ে এলেন। মনে হল শ্বাসের শব্দটা যেন আসছে খাটের নিচ থেকে। একটু ঝুঁকে তাঁর খাটের নিচের দিকে তাকাতেই চক্ষুস্থির হয়ে গেল ত্রিলোকেশ্বরর। অন্ধকারের মধ্যে আরও একতলা অন্ধকার জমা হয়ে আবছা আদল তৈরি করেছে। জ্বলজ্বল করছে তিন জোড়া চোখ, তাড়া খাওয়া বেড়ালের মতো ঘাড় গুঁজে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সিঁটিয়ে বসে আছে একজন পুরুষ, একজন মহিলা আর একটি শিশু।

বুকের মধ্যেটা কেমন করছে। ত্রিলোকেশ্বর অস্ফুটে বললেন, ক্‌-কে আপনারা? এখানে বসে রয়েছেন কেন?

রক্ত হিম করে দেওয়া একটা হাসির শব্দ ভেসে এল। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছে ত্রিলোকেশ্বরের। শীতল হাসিটা বদলে গেছে কর্কশ স্বরে, আমার নাম জয়ন্ত নন্দী। এটা আমার বাড়ি, এখানে কাউকে থাকতে দেব না আমি। জোর করে থাকতে গেলে তার ফল ভাল হবে না।

ত্রিলোকেশ্বর ঘাবড়েছেন, পেটের মধ্যেটা খালি খালি লাগছে। হটাৎ একটা শব্দে মুখ ফিরিয়েছিলেন উল্টোদিকে। প্রচন্ড একটা দমকা বাতাস জানালা দিয়ে এসে উলটে ফেলে দিল লন্ঠনটাকে। দু'-এক মুহুর্তের মধ্যে আগুন ধরে গেল ঘরে। উপচে পড়া কেরোসিন তেলের গন্ধে ম' ম' করতে লাগল ঘর। দেখতে দেখতে আগুন ছড়িয়ে পড়ল চোখের নিমেষে।

বাইরে বেরোবার দরজার সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে এক মানুষ উঁচু আগুন জ্বলছে। সেখান দিয়ে বেরোবার কোনও উপায় নেই। জানালায় লোহার পাকাপোক্ত গ্রিল। উদভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করে ধ্বস্ত হয়ে বসে পড়েছেন ত্রিলোকেশ্বর। সারা গায়ে গরম আগুনের তাপ এসে লাগছে, পুড়ে যাচ্ছে চামড়া। খাটের নাচের দিক থেকে ভেসে আসছে অট্টহেসি। সেদিকে চোখ গেল এবার। ত্রিলোকেশ্বর দেখলেন ভ্যানিশিং ইন্‌ক যেমন করে উবে যায় ঠিক তেমন করে একটু একটু করে মুছে যাচ্ছে তিনজনের অবয়ব। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে জ্ঞান হারালেন তিনি।

চোখ মেললেন ত্রিলোকেশ্বর। তিনি খাটে শুয়ে আছেন, মাথার উপর পাখা চলছে, দুধসাদা আলোয় স্নান করছে ঘর। সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজব করছে। মাথায় প্রবল ব্যাথা, টলমল পায়ে বিছানা থেকে নামলেন ত্রিলোকেশ্বর। ঘরের এক কোণে দেখলেন লন্ঠনটা রয়েছে, যেমন রেখে গিয়েছেলেন স্বাধীনবাবু। বুক ধুকধুক করছে, তবুও সাহসে ভর করে উবু হয়ে বসে খাটের নিচে একবার উঁকি দিলেন ত্রিলোকেশ্বর। নাহ, কেউ নেই সেখানে।

বিছানার পাশে টেবিলে ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস থেকে জল খেলেন কিছুটা। বাথরুমে গিয়ে মুখেচোখে জলের ঝাপটা দিয়ে এলেন। আকাশপাতাল ভাবতে লাগলেন ত্রিলোকেশ্বর। একটুক্ষণ আগে যেটা হতে দেখলেন সেটা কি তবে দুঃস্বপ্ন ? কোনও হ্যালুসিনেশন ? বাকি রাতটা শুতে সাহস পান নি, বিছানায় গুটিসুটি হয়ে বসেই কাটিয়ে দিলেন ত্রিলোকেশ্বর।

ভোরবেলা স্বাধীনবাবু চলে এসেছেন। স্মিতমুখে বললেন, সুপ্রভাত স্যার। রাতে ভালো ঘুম হয়েছিল তো?

ত্রিলোকেশ্বর বললেন, পিনাকী ব্যনার্জি এখানে প্রথম রাত কাটিয়েই ফিরে গিয়েছিলেন কলকাতায়। কী হয়েছিল বলুন তো স্বাধীনবাবু।

স্বাধীনবাবুর মুখ শুকিয়ে গেছে। ঠোঁট চেটে আমতা আমতা করে বললেন, কাল রাতে কিছু দেখছেন নাকি স্যার?

ত্রিলোকেশ্বর সংক্ষেপে সব বললেন। স্বাধীনবাবু খাটে বসে পড়েছেন। ঘাড়ে নেড়ে বললেন, পিনাকী ব্যানার্জিকে যদি একবার দেখতেন স্যার! লম্বাচওড়া দশসই চেহারা, লাইসেন্সড পিস্তল সঙ্গে থাকে সবসময়। মেজাজেও মিলিটারি, বাজখাঁই গলায় কথা বলেন, হো হো করে হাসলে দশ মাইল দূর থেকে আওয়াজ পাওয়া যায়। সন্ধ্যেবেলা তাঁর সঙ্গে গল্পগুজব করে গেলাম। পরদিন সকালে এসে দেখি দেখি একেবারে নুন দেওয়া জোঁকের মতো নেতিয়ে গেছেন সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ ভদ্রলোক। কী হয়েছে, কিছুই বললেন না, মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে।

ত্রিলোকেশ্বর ভ্রু জড়ো করে বললেন, জয়ন্ত নন্দী কার নাম ?

স্বাধীনবাবু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, জয়ন্ত নন্দী সরকারি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, ফ্যামিলি নিয়ে থাকতেন এই বাড়িতে। ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে বাড়িটা বানিয়েছিলেন, এটা ছিল জয়ন্তবাবুর স্বপ্নের বাড়ি। বাড়ির প্ল্যানিং আর ডিজাইনিং করেছিলেন উনি নিজেই। এক বর্ষার রাতে কিভাবে যেন শর্ট সার্কিট হয়ে বাড়িতে আগুন জ্বলে যায়। ঘুমের মধ্যেই আগুনে পুড়ে মারা যান তিনজন।

ত্রিলোকেশ্বর ইষৎ বিরক্ত হয়ে বললেন, আপনি তো 'হানাবাড়ি' সিনেমার গপ্‌পো হুবহু শুনিয়ে যাচ্ছেন দেখছি।

সিনেমাটা আসল ঘটনাটার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল যে ! স্বাধীনবাবু ম্লান হেসে বললেন, যে কথা বলছিলাম স্যার, জয়ন্ত নন্দীর মৃত্যুর পর ব্যাংক বাড়িটা ক্রোক করে নিলাম করে দেয়। স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বাড়িটা কিনে কটেজের ব্যবসা চালাবার চেষ্টা করছিলেন।যেদিন কটেজ উদ্বোধন হয় সেদিন সাউথ ইন্ডিয়ান এক টুরিস্ট রাতে ছিলেন এখানে। পরদিন সকালে তাঁকে বদ্ধ উন্মাদ অবস্থায় পাওয়া যায়। ঈশ্বর ঢোলাকিয়া সে সময় চালসায় এসেছিলেন একটা ফিল্মের কাজে। তাঁর ইচ্ছে ছিল এদিকে কোথাও একটা আউটহউজ করার। খবর পেয়ে বাড়িটা তাঁকে চড়া দামে বিক্রি করে দেন সেই ব্যবসায়ী ভদ্রলোক।

ত্রিলোকেশ্বর রুদ্ধশ্বাসে বললেন, তারপর ?

স্বাধীনবাবু বললেন, ঈশ্বর ঢোলাকিয়া কিছুদিন পর কয়েকজন বন্ধু মিলে লাটাগুড়িতে এসেছিলেন ছুটি কাটাতে। এই বাড়িতে রাত্রিবাস করেছিলেন ওঁরা। পরিচালক অনির্বাণ দেবও ছিলেন ওঁদের দলে। কী দেখেছিলেন কে জানে, সারা রাত জেগে কাটিয়েছিলেন ওঁরা। পরদিন সকালে লাটাগুড়ি বাজারে গিয়ে জয়ন্ত নন্দীর ঘটনাটা জানতে পারেন সকলে। ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে জানেন তো, কলকাতায় ফিরে গিয়ে স্ক্রিপ্ট তৈরি করিয়ে অনির্বাণ দেবকে দিয়ে একটা ছবি বানিয়ে ফেলেন ঈশ্বর ঢোলাকিয়া। তবে এ বাড়িতে ছবির শুটিং হত শুধু দিনের বেলায়। ইউনিটের সকালে লাটাগুড়ির হোটেলগুলোতে থাকতেন, সন্ধ্যে হলেই তাঁরা ফিরে যেতেন নিজের নিজের ডেরায়।

ত্রিলোকেশ্বর চিন্তিত মুখে বললেন, বাড়িটাকে বাসযোগ্য করার জন্য ঈশ্বর ঢোলাকিয়া পূজো দেন নি কখনও ?

স্বাধীনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ধূপঝোরা থেকে একজন ওঝাকে ডেকে এনেছিলাম আমি নিজে। সন্ধেবেলা সে আঁকিবুকি কেটে মন্ত্রটন্ত্র পড়ে যজ্ঞ করল। রাতে সেই গুণিন প্রচুর হাঁড়িয়া খেয়ে একা ছিল এখানে। সকালে বাড়ির ছাদে তার ডেডবাডি পাওয়া যায়। চোখ খোল, মুখ হাঁ করা, সম্ভবত প্রচন্ড ভয়ের কিছু দেখে প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছিল তার।

ত্রিলোকেশ্বর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, চোখ পড়েছে ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে। কাল রাতে যেখানে ছায়ামুর্তিটাকে দেখেছিলেন সেখানে পেন্সিল দিয়ে আঁকা একটা ছবি। একটা দোচালা ছোট্ট বাড়ি। সামনে তিনজন হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। আলুর দমের মতো মুন্ডুআলা দূটো প্রমাণ সাইজের মানুষ হাত ধরে আছে ক্ষুদে একজন। আঁকাবাঁকা কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং মার্কা আকৃতি তিনজনের।

ত্রিলোকেশ্বর আঙ্গুল বুলিয়ে দেখলেন দেওয়ালে। কাল সন্ধ্যেবেলা তো সব দেওয়াল ফটফটে পরিষ্কার ছিল। কী আশ্চর্য, ছবিটা কে আঁকল তবে? কখনই বা আঁকল ?

স্বাধীনবাবু গুটিসুটি এসে দাঁড়িয়েছেন পাশে। ছবিটা দেখে স্বগতোক্তি করলেন, যতবার রং করাই ততবার ক্যারিকেচার এঁকে দেওয়ালটা বারোটা বাজিয়ে দেয় জয়ন্ত নন্দীর দস্যি ছেলেটা। নাহ, আর তো পারা যায় না !

ত্রিলোকেশ্বর টের পেলেন ভাদ্রের এই গুমোটে গরমের মধ্যেও তাঁর মেরুদাঁড়া দিয়ে কেমন একটা হিম-হিম ভাব চারিয়ে যাচ্ছে। অজস্র অদৃশ্য প্রজাপতি যেন নাচতে শুরু করেছে পেটের ভেতরে। হাত-পা ঠান্ডা। বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করছে। এতদিন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়নি বলে টের পান নি। এখন বুঝলেন, বাকিদের মতো আতঙ্ক এবং ভয় তাঁর ভেতরেও রয়েছে এবং পূর্ণমাত্রাতেই রয়েছে! তাঁর মস্তিষ্কের অ্যামিগডালাও আর পাঁচজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই। নিটোল এবং নিখুঁত।

খাটের উপর ধপ করে বসে পড়ে ধ্বস্ত গলায় ত্রিলোকেশ্বর বললেন, এখানে দ্বিতীয় রাত কাটানোর সাহস আমার নেই। স্বাধীনবাবু কলকাতা যাওয়ার ট্রেন কখন পাওয়া যাবে বলতে পারেন ?


ছবিঃদীপায়ন সরকার

লেখক পরিচিতি

মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য

জলপাইগুড়ির বাসিন্দা মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের স্কুলে পড়ার সময় থেকেই লেখালিখিতে হাতেখড়ি। পেশায় সরকারি চাকুরে মৃগাঙ্ক নিয়মিত বিভিন্ন প্রতিষ্টিত এবং স্বল্প পরিচিত কাগুজে পত্রিকায় এবং ওয়েব ম্যাগাজিনে বড়দের এবং ছোটদের জন্য গল্প এবং ভ্রমণকাহিনী লেখেন। লেখালিখির পাশাপাশি সুযোগ পেলেই ক্রিকেট ব্যাট হাতে মাঠে নেমে পড়েন মৃগাঙ্ক।
নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা