ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

আজ আঠারই আগষ্ট। ঘুম ভাঙ্গলো খুব ভোরে। আজই আমাদের আসল যাত্রা শুরু হবার দিন। চা খেয়ে গতকালের মতো রাস্তা ধরে কোয়েলগঙ্গার ধারে চলে গেলাম। খানিক পরে ফিরে এসে দেখি গঙ্গা, কুমার ও হরিশ এসে হাজির। ওরা মালপত্র বার করে, দড়ি দিয়ে সুন্দর রুকস্যাকের মতো বেঁধে, পিঠে তুলে নিল। আমরাও ঝোলা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রস্তুত। শুরু হ’ল "মরণ হ্রদ" অভিযান।

খুব ধীরে পথ চলছি। আজ আমাদের "ওয়ান" যাবার কথা। কোয়েলগঙ্গাকে ডানপাশে বহুনীচে রেখে আমরা এগিয়ে চলেছি। সুন্দর চওড়া রাস্তা, তাই কুলি দু’টো অনেক পিছিয়ে পড়লেও আমরা না থেমে, ওদের জন্য অপেক্ষা না করে পথ চলছি। রাস্তার সৌন্দর্যে কোন নতুনত্ব নেই। গঙ্গা দেখি খানিক বাদে বাদেই আমাদের বিশ্রাম নিতে বলছে। এটুকু পথ হাঁটতে যা পরিশ্রম হয়েছে, তাতে বিশ্রাম নেবার প্রয়োজন হয় না। ওর কী মতলব বুঝছি না। ও কী আমাদের একবারে নতুন ভেবেছে, নাকি ওর আজ ওয়ান পর্যন্ত যাবার ইচ্ছা নেই। দশটা স্টেজকে ও বার তেরটা স্টেজ করতে চাইছে না তো?

"হলগাঁও" নামে একটা গ্রামে এসে উপস্থিত হ’লাম। বাঁহাতে রাস্তার একটু ওপরে একটা চায়ের দোকান। ওখানে গেলাম এক রাউন্ড্ চা খেতে। দোকানের সামনে একরকম গাছ, অনেক হয়ে আছে। আগে কোথাও কে যেন ওগুলো সিদ্ধি গাছ বলেছিল। আমি সিতাংশুকে জিজ্ঞাসা করলাম "বল দেখি ওগুলো কী গাছ"? সিতাংশু চেনে না। কিন্তু দোকানদার আমাকে বোধহয় পাকা সিদ্ধিখোর ভেবে বসলো। সে খুব আগ্রহ নিয়ে বললো "তৈরী করে দেব"? ওরা নিজেদের মধ্যে একটু হাসাহাসিও করলো। আমরা চায়ের দাম মিটিয়ে রাস্তায় নামলাম। রাস্তা খুব আস্তে আস্তে ওপরে উঠছে, কাজেই হাঁটতে কোন কষ্ট হচ্ছে না। আমরা কুলিদের থেকে বোধহয় অনেক এগিয়ে গেছি। গঙ্গা কখনও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে, এবং আমাদের বিশ্রাম নিতে বলছে। আবার কখনও আমাদের বিশ্রাম নিতে আগ্রহ নেই দেখে পিছিয়ে পড়ছে। এক সময় রাস্তার ধারে একটা জায়গায় গঙ্গার কথামতো বসলাম। বাদাম ভাজা, লজেন্স্ খেলাম। কিছুক্ষণ বাদে ওরা এসে উপস্থিত হলে, ওদেরও দিলাম।

কিছুক্ষণ বসে এবার আবার হাঁটা শুরু করলাম। সামান্য একটু পথ গেছি, ডানপাশে একটা চায়ের দোকান। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গা বললো একটু চা খেয়ে নেওয়া যাক। এ পথে এত চা কে খায় জানিনা। সিতাংশু ওদের এত ঘনঘন বিশ্রাম নেওয়াতে বিরক্ত হচ্ছে। আমি কোন কথা বললাম না। প্রথম থেকে বিরক্ত ভাব দেখিয়ে অশান্তি করে লাভও নেই। ঠিক করলাম এবার আমরা অনেক এগিয়ে যাব, এবং কোথাও বসবো না। তাহলে ওদের এই মতলব বিশেষ কাজ করবে না। এই জায়গাটা নাম "পিলখোরা"। আগে রাস্তার ধারে যে জায়গাটায় বসেছিলাম, সে জায়গাটার নাম "কান্ডে"। ওখানে সিতাংশুর ক্যামেরার ফিল্ম্ ছিঁড়ে গেছিল। এখন এখানে চায়ের দোকানটার ঠিক পাশে, একটা ছোট্ট অন্ধকার মতো ঘরে ঢুকে আমি ক্যামেরাটার ফিল্ম্ খুলে নতুন করে লাগাবার চেষ্টা করলাম। ঘরটার ভিতরে ঢুকে বুঝলাম, এটাও একটা দোকান ঘর। তবে ঘরটা বেশ অন্ধকার। কিন্তু ক্যামেরা নিয়ে অন্ধকার ঘরে আমি কী করছি দেখবার জন্য বেশ কয়েকজন দরজা খুলে ঘরের ভিতর ঢুকতে গিয়ে, ঘরটায় বেশ আলো ঢুকিয়ে দিল।

এই দোকান থেকে কুলি গাইডের জন্য বেশ কিছু সিগারেট কিনে, দাম মিটিয়ে, আবার পথে নামলাম। রাস্তার সৌন্দর্য ক্রমে বাড়ছে। গাইড আমাদের সাথে নেই, রাস্তাও চিনে যেতে না পারার মতো নয়। এবার একটা ব্রীজ পার হতে হ’ল। ব্রীজটার একটু ওপর দিয়ে একটা নতুন এবং অনেক চওড়া ব্রীজ তৈরী হচ্ছে। ব্রীজটা পার হয়ে দেখি, রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এবার আমরা একটু চিন্তায় পড়লাম। শেষ পর্যন্ত বাঁ হাতের রাস্তাটাই আমাদের যাবার পথ বলে মনে হ’ল। কাউকে জিজ্ঞাসা করার মতো সুযোগও নেই। হঠাৎ রাস্তার ওপর দিকের চুড়া থেকে ছোট বড় কয়েকটা পাথর রাস্তায় নেমে এল। সিতাংশু আমার থেকে কিছু আগে আগে যাচ্ছিল। ও আমাকে পাথর পড়া জায়গাটা সম্বন্ধে সাবধান করে, আবার এগিয়ে চললো।

পিলখোরার পর "লোহানি" নামে একটা জায়গায়, গঙ্গার সাথে আমাদের শেষ দেখা হয়। ওখানে অনেক নীচু দিয়ে, রূপালী শাড়ী পরে, পাথুরে এলাকার ওপর দিয়ে নেচে নেচে কোয়েলগঙ্গার যাওয়ার দৃশ্য ভুলবার নয়। যাহোক্, লোহানির পরে ওদের সঙ্গে আর দেখা হয় নি। ঠিক রাস্তায় যাচ্ছি কী না, সেটাও তো জানা প্রয়োজন। বাধ্য হয়ে রাস্তার ধারে বসে বাদাম ও টুকিটাকি খাবার খেলাম। অনেকক্ষণ বসার পরেও, ওদের টিকি দেখা গেল না। শেষ পর্যন্ত উঠে পড়ে এগতে শুরু করলাম। বেশ কিছুটা পথ পার হবার পরে দেখলাম, দু’টো একবারে বাচ্চা ছেলে, প্রকান্ড দু’টো মোষ নিয়ে আসছে। ওদের মধ্যে যেটা বয়সে একটু বড়, তাকে "মান্দোলী"-র কথা জিজ্ঞাসা করলে সে ওপর দিকে হাত তুলে দেখালো। এই মান্দোলীতেই আমাদের দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা। বাচ্চাটার ইশারা মতো রাস্তা ধরে ওপর দিকে এগিয়ে চললাম। কিন্তু গঙ্গারা না আসলে আমাদের এগিয়েও তো কোন লাভ নেই। ওরা আসবে, খাবার ব্যবস্থা হবে, খাওয়া হবে, তবে আবার পথ চলা। কয়েকটা ছোট ছোট ঘর পেরিয়ে, একটু ওপরে উঠে, একটা পাথরের ওপর দু’জনে বসে, বহু নীচে ওরা আসছে কিনা লক্ষ্য করতে লাগলাম। কোথাও ওদের কোন চিহ্ন দেখলাম না। ওদের এরকম ব্যবহারে বিরক্ত লাগছে। হঠাৎ গঙ্গা এসে হাজির। অর্থাৎ ও আমাদের প্রায় পিছনেই ছিল। তাহলে ওকে রাস্তার অত নীচু পর্যন্ত লক্ষ্য করেও দেখতে না পাওয়ার কারণ কী বুঝলাম না। ওর কথায় বুঝলাম, যেখানে রাস্তা দু’ভাগে ভাগ হয়েছিল, আমরা বাঁদিকের রাস্তা ধরে এসেছিলাম, সেখান থেকে ও ডানদিকের পথ ধরে এসেছে। গঙ্গা জানালো দুরের ঐ ঘরগুলো যে জায়গাটায় রয়েছে, ঐ জায়গাটার নামই "বগরীগড়"। এখান থেকে মান্দোলী সামান্যই পথ। এবার কুলিদের এত আস্তে হাঁটার জন্য, গঙ্গা নিজেও বিরক্তি প্রকাশ করলো। বুঝলাম না ও সত্যিই বিরক্ত হচ্ছে, না আমাদের দেখাবার জন্য অভিনয় করছে। আমরা উঠে পড়লাম। আস্তে আস্তে খাড়াই পথ পার হয়ে কয়েকটা বাড়িঘরের পাশ দিয়ে, একটা বাড়ির বারান্দায় এলাম। এখানে একটা স্কুল বাড়িতে সবাই রাত কাটায়। আমাদের প্ল্যানও তাই ছিল। কিন্তু আজই আমরা ওয়ান চলে যাব। ওয়ান এ পথের শেষ গ্রাম।

বাড়িটার বারান্দায় একটা দোকান মতো। গঙ্গা একটা পলিথিন শীট পেতে দিল। আমরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগলাম। এই জায়গাটাই মান্দোলী। এখানেই আমরা দুপুরের খাবার খাব। গঙ্গা দোকানদারকে খাবারের ব্যবস্থা করতে বললো। দোকানদার আমাদের চা করে খাওয়ালো। গঙ্গার দেখলাম এখানে বিরাট পরিচিতি। রাস্তাতেও দেখেছি ওকে সবাই চেনে। আসলে বীর সিং এর পরিচয়েই ওর পরিচিতি। দোকানের উল্টোদিকে পরপর দুটো ছোট ঘর। ঐ ঘর থেকে একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এসে গঙ্গাকে বললো একজনের মতো খাবার তৈরী আছে। আমরা গঙ্কাকে খেয়ে নিতে বললাম। ও প্রথমে যেতে চাইলো না। কিন্তু আমরা আাবার ওকে প্রথমে খেয়ে নিতে বলাতে, সে একটা ঘরের ভিতর চলে গেল। আসলে গঙ্গা এদের পরিচিত, তাই গঙ্গাকে এরা একটু ভালমন্দ, অর্থাৎ ভাত-ডালের সাথে একটা সবজি খাওয়াতে চায়। কুলিরা এখনও এসে পৌঁছয় নি। গঙ্গা একটু পরে ঘর থেকে খেয়েদেয়ে এল। দোকানদার বোধহয় পূর্ণা গ্রামে, অর্থাৎ বীর সিং এর গ্রামে থাকে। কারণ গঙ্গাকে সে পাড়াতুত ভাই বলে পরিচয় দিল। সিতাংশু কাছেপিঠে একটু ঘুরতে গেছে। দোকানদার আমায় জানালো যে গঙ্গা, বীর সিং এর সাথে থাকে না। সে তার বাবা, মা, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলে না। গঙ্গা বীর সিং এর একমাত্র ছেলে। দোকানদার আরও জানালো যে গঙ্গা, বীর সিং এর অনেক টাকা আজেবাজে ভাবে উড়িয়েছে। সে দারু খায়, জুয়া খেলে। বীর সিং ওর বিয়ের ব্যবস্থা করেছিল, কিন্তু কেউ ভাংচি দেওয়াতে তার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে। দোকানদার এসব কথা হঠাৎ এত লোক থাকতে আমায় কেন বলতে বসলো জানিনা। কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি এসব কথা আমাকে বলাতে, গঙ্গা বেশ অসন্তুষ্ট হচ্ছে। আমি কী করা উচিৎ ভেবে না পেয়ে গঙ্গাকে বললাম, এটা ভাল কথা নয়। সে বীর সিং এর একমাত্র সন্তান, কাজেই তার বাবা মা’র সাথেই থাকা উচিৎ। দোকানদার আবার শুরু করলো--বীর সিংকে গোটা হিন্দুস্থান চেনে। আর তার ছেলে এরকম বাঁদর তৈরী হয়েছে। এবার আমার অস্বস্তি বোধ করার পালা। আমার সামনে সে গঙ্গাকে বাঁদর বলছে, গঙ্গা বিরক্ত হয়ে আমাদের ভোগাবে না তো? দোকানদার কিন্তু থামবার পাত্র নয়। সে গঙ্গাকে বললো গঙ্গা যেন বাড়ি যায়, বাবা-মাকে রোজ পূজো করে। গঙ্গার বিয়ের ব্যবস্থা তিনিই করে দেবেন।

কুলিরা এসে গেল। আমাদের খাবারও প্রস্তুত। আমি ও সিতাংশু খেতে বসলাম। গ্র্যান্ড খানাপিনার ব্যবস্থা। ভাত আর ডাল। আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে কুলিরা খেয়ে নিল। আর কিছুক্ষণ বসে, দাম মিটিয়ে, আমরা রওনা হলাম। কুলি দু’টোর জন্য অনেক বেলা হয়ে গেল। ভাবছি আজ ওয়ান যাওয়া যাবে তো? আগেই শুনেছিলাম "লোহাজঙ্গ" এর চড়াই এ প্রানান্তকর কষ্ট। আমরা এখন সেই লোহাজঙ্গ এই যাচ্ছি। ছোট ছোট গাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, চড়াই ভাঙ্গতে শুরু করলাম। হঠাৎ গঙ্গা বললো "বাবুজী এক কাজ কর, আজ লোহাজঙ্গে থেকে যাও। কাল ওখান থেকে বৈদিনী চলে যাব"। আগামীকালই আমাদের "বৈদিনী বুগিয়াল" যাবার কথা। লোহাজঙ্গ এ থাকার কথা গঙ্গা "পিলখোরাতে"ও বলেছিল। আমরা তখন আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমরা বললাম আজকে ওয়ান যাওয়াই ঠিক হবে। তাছাড়া আমাদের হাতে ছুটিও খুব কম। সিতাংশু আমাকে বললো ওরা ইচ্ছা করে দেরী করছে। ওরা হয়তো কায়দা করে দশ দিনের বেশী সময় লাগিয়ে দেবে। যাহোক্, আমরা গঙ্গার পিছন পিছন জঙ্গলের রাস্তা ভেঙ্গে, ওপরে উঠতে শুরু করলাম। বেশ কিছুক্ষণ পরে জঙ্গল পার হয়ে আমরা চওড়া রাস্তায় এসে উপস্থিত হলাম। এবার আমরা ওদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গেলাম। উদ্দেশ্য সেই এক। একসাথে গেলেই গঙ্গা আমাদের বারবার বিশ্রাম নিতে বলবে। রাস্তা একভাবে ওপর দিকে এঁকেবেঁকে উঠেছে। কোথাও একটু উতরাই নেই। ফলে মধ্যে মধ্যে আমাদের বিশ্রাম নিতেও হচ্ছে। গঙ্গা কখনও কখনও আমাদের ধরে ফেলছে, আবার পিছিয়ে পড়ছে। মধ্যে মধ্যে আমি ওর জন্য অপেক্ষা করে কিট্ ব্যাগের ফিতের রিংটা পরীক্ষা করে নিচ্ছি। সিতাংশু আমার থেকে অনেকটা এগিয়ে গেছে। আরও বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙ্গে দেখি, ও বসে আছে। কাঁধের ঝোলা ব্যাগ নামিয়ে একটা পাথরের ওপর শুয়ে পড়লাম। লোহাজঙ্গ নামটা সার্থক। শরীরজঙ্গ বা দেহজঙ্গ হলে বোধহয় আরও সার্থক হ’ত। ওখানে পৌঁছতে সারা শরীরে জঙ্গ ধরিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে উঠে পড়লাম। সিঁড়ির মতো এঁকেবেঁকে রাস্তা সোজা ওপরে উঠছে। রাস্তা যেন আর শেষ হয় না। শেষে বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ আমরা লোহাজঙ্গে এসে পৌঁছলাম।

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা