ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
 বারণাবত থেকে পান্ডবদের পলায়ন

হস্তিনাপুরের রাজা কৌরবকুলপতি ধৃতরাষ্ট্রের মনে বড় দুঃখ। বংশের জ্যেষ্ঠপুত্র হওয়া সত্ত্বেও অন্ধ বলে মন্ত্রীপরিষদ তাঁকে রাজত্ব পেতে বাধা দিয়েছিল। তাই ভগ্নস্বাস্থ্য হলেও রাজা হলেন কনিষ্ঠ ভাই পাণ্ডু। সেই পাণ্ডু যখন অনির্দিষ্টকালের জন্য চিকিৎসকের নির্দেশে স্বাস্থ্যোদ্ধারের নাম করে দুই স্ত্রীসমেত হিমালয়ে বেড়াতে চলে গেলেন, ধৃতরাষ্ট্রের মনে রাজা হবার ইচ্ছেটাতে গোপনে যেন বাতাস লাগল। তারপর পাণ্ডু যখন সেখানেই মারা গেলেন, তিনি স্পষ্টতঃই খুশিমনে রাজা হবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। কিন্তু কপালের কি লিখন! মন্ত্রীসভা সিদ্ধান্ত নিল, ধৃতরাষ্ট্র হবেন পূর্ণ রাজা নন, সিংহাসনের অছি মাত্র। যদি খবর পাওয়া যায় যে পাণ্ডুর সন্তান বেঁচে আছে এবং সে পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্র, তবে সে প্রাপ্তবয়স্ক হলে সেই হবে রাজ্যের রাজা। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত তিনি তাতেই রাজি হলেন। তবু তো সিংহাসনের কাছে থাকা যাবে। এখনও তো পাণ্ডুপুত্রদের কোন খবরই পাওয়া গেল না।
 
ধৃতরাষ্ট্রের কপাল সত্যিই মন্দ। একদিন সকালে প্রজাদের জয়ধ্বনি শুনে তিনি জানলেন, ভ্রাতৃবধূ কুন্তীর সঙ্গে রাজ্যে ফিরে এসেছে তাঁর পাঁচটি ভ্রাতুষ্পুত্র; তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির পরিবারেরও জ্যেষ্ঠ সন্তান। অর্থাৎ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী উপস্থিত। ধৃতরাষ্ট্র মুখে আনন্দ প্রকাশ করলেও মনে তাঁর হিংসার বিষবাষ্প ঘনিয়ে উঠল। পুত্র দুর্যোধনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গোপনে পাণ্ডবদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করতে লাগলেন। রাজসভার দুষ্ট মন্ত্রীরাও সেই চক্রান্তে যোগ দিল। কণিক নামে এক মন্ত্রী পরামর্শ দিল যে, শত্রু যদি বলবান হয়, তবে প্রকাশ্যে তার সঙ্গে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করে গোপনে তাকে বিনাশ করাই সার্থক রাজনীতি। এইসব পরামর্শ ধৃতরাষ্টের খুব মনের মত হল। সত্যিই তো, রাজ্যে পাণ্ডুপুত্রদের খুব জনপ্রিয়তা। তাদের মিষ্টি ব্যবহার, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের বিপদে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, কথায় কথায় রাজপুত্রের অহংকার এবং শক্তি না দেখানো, এইসব আচরণ প্রজাদের খুব খুশি করেছিল। দুর্যোধনের কাছ থেকে সবাই তো এর উলটো ব্যবহারই পেয়ে এসেছে। তাই রাজ্যে নবাগত হওয়া সত্ত্বেও পাণ্ডুপুত্ররা প্রজাদের হৃদয়ে স্থান করে নিল। এর উপর আছেন মন্ত্রীরা। এঁরা তো শুধু মন্ত্রী নন, কুরু-পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যও বটে। এঁরা কেউই দুর্যোধনের উদ্ধত আচরণে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সবাই আনন্দের সঙ্গেই কুন্তীসহ পাঁচভাইকে বরণ করে নিলেন।

ধৃতরাষ্ট্রের সংকট ঘনীভূত হল। প্রধানমন্ত্রী বিদুর, যিনি আবার সম্পর্কে বর্তমান রাজপুত্রদের কাকাও বটে, প্রকাশ্য সভায় যৌবরাজ্যের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় বসলেন। সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যখন এসেই গেছেন, তখন সিংহাসনকে খালি ফেলে রাখা উচিত নয়। তিনি যুধিষ্ঠিরকে সরাসরি রাজা ঘোষণা করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্যরা, বিশেষ করে ভীষ্মের মত ছিল ধীরে এগোনোর। পরিবারের ভিতরকার কলহবাষ্পের আঁচ পাচ্ছিলেন তিনি। সিংহাসন সম্পর্কে ধৃতরাষ্ট্রের মনোভাব তিনি জানতেন। দুর্যোধন অঘোষিতভাবে এতকাল যুবরাজের ক্ষমতা ভোগ করে এসেছেন; এবার তারই রাজা হবার কথা। ক্ষমতালিপ্সু এই রাজপুত্র কি এত সহজে সিংহাসনের দাবি ছেড়ে দেবেন? এইসব সমস্যা ভীষ্মকে ভাবিয়ে তুলছিল। যুবরাজ হলে, জনসাধারণকে যুধিষ্ঠিরের সম্পর্কে একটা সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া যাবে, আর সিংহাসনের উপর পাণ্ডুপুত্রের দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

ধৃতরাষ্ট্রের সে কী অবস্থা! তিনি সরাসরি এসব পরামর্শকে অগ্রাহ্য করতে পারছেন না, আবার আন্তরিকভাবে সম্মতি দেওয়াও তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তিনি বিমূঢ় হয়ে বসে রইলেন। রাজসভা মুলতুবি হলে তিনি ঝটিতি তাঁর নিজস্ব মন্ত্রীদের ডেকে পাঠালেন। তাদের পরামর্শে তিনি ভীষ্মকে জানালেন, যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হলে যুধিষ্ঠিরের অনেক দায়িত্ব বেড়ে যাবে। তাই এইসব অনুষ্ঠানের আগেই তারা যদি রাজ্যটাকে একটু ঘুরে দেখে নেয়। ভীষ্ম এই প্রস্তাবে রাজি হলেন, কিন্তু সব কিছুই হবে যৌবরাজ্যে অভিষেক অনুষ্ঠানের পর। ধৃতরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য সফল হল না। তিনি চিন্তিত মনে নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। ধৃতরাষ্ট্রের সহচররা কিন্তু খুব নিরাশ হল না। তারা বুঝেছিল যে একবার পাণ্ডবদের যদি প্রাসাদের বাইরে এনে ফেলা যায়, তবে তাদের হত্যা করতে অসুবিধা হবে না। তার নতুন করে মতলব ভাঁজতে লাগল।

প্রজাদের বিপুল উৎসাহের মধ্যে যুধিষ্ঠির যুবরাজ হলেন। দৃশ্যতঃ খুশিমুখে কৌরবরা এই উৎসবে যোগ দিল। কিন্তু তলে তলে তারা অন্যরকম ঠিক করেছিল। উৎসবের পরে পরেই দুর্যোধন খুব জোরালোভাবে মন্ত্রীসভায় প্রস্তাব রাখল যে সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বারণাবত নামের একটি অঞ্চল ক্ষুব্ধ হয়ে রয়েছে। এখন যুবরাজের ভ্রমণের জন্য যদি এই স্থানটি নির্বাচন করা হয়, তবে ভ্রমণও হবে আর পরিবেশ পর্য্যবেক্ষণ করে প্রজাদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ককে কী করে মিত্রতায় পরিবর্তিত করা যায়, তার একটা রূপরেখা যুবরাজ পেশ করতে পারবেন।

দুর্যোধনকে মন্ত্রীসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যরা কেউই বিশ্বাস করতেন না। কিন্তু তার কথার যাথার্থ্য অস্বীকার করা গেল না। বিদুর ও ভীষ্ম ক্ষণিক দৃষ্টিবিনিময় করে শেষে চিন্তিত মুখে সম্মতি জানালেন। বিদুর চকিতে দুর্যোধনের মুখে দেখতে পেলেন উল্লাসের ছায়া। তাঁর চিন্তা বাড়ল। সভা ভঙ্গ হলে বিদুর সোজা নিজের ঘরে না গিয়ে, ভীষ্মের আবাসে এলেন। ভীষ্ম মনে হল বিদুরের অপেক্ষাতেই বসেছিলেন। আসন্ন রাজভ্রমণের জন্য তাঁরা নিম্নস্বরে নিজেদের মত করে কিছু আলোচনা সেরে নিলেন।

যুবরাজ আসছেন বলে বারণাবতের মানুষদের উল্লাসের সীমা নেই। এই প্রথম কোন রাজপুরুষ তাদের অঞ্চলে আসছেন! সরল সাদাসিধে মানুষগুলি নিজেদের মত করে তৈরি হল যুবরাজকে অভ্যর্থনা জানাতে। কিন্তু তাদের আয়োজনই তো শেষ কথা নয়। তারা সবিস্ময়ে দেখল, হস্তিনাপুর থেকে একদঙ্গল লোক এসে রাজবাড়িকে ধুয়ে মুছে নতুন করে সাজিয়ে তুলছে। মন্ত্রী কণিক সব কিছুর তত্ত্বাবধান করছেন। গাঁয়ের মানুষ উঁকি মারতে গিয়ে বেজায় তাড়া খেল। বাড়ির ভিতর প্রবেশের অধিকার নেই কারো; সব যেন কেমন চুপচাপ ব্যাপার।

কাজ শেষ করে লোকেরা চলে গেছে। গভীর রাতে পাহারা এড়িয়ে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে একজন ঢ্যাঙা লোক ঢুকল রাজবাড়ির ভিতর। কেউ টের পেল না। লোকটি সন্তর্পণে এঘর ওঘর ঘুরতে লাগল। মাঝে মাঝে দেয়ালের কাছে গিয়ে কী যেন খোঁচা মারে আর লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস টানে। একটু পরে তার মুখ নিঃশব্দ হাসিতে ভরে গেল; জানালার কাছে গিয়ে কাকে যেন ইশারা করল, দেখা গেল, আরো সাত-আটজন লোক ভিতরে ঢুকে আসল। এবার শুরু হল আসল কাজ। তারা মেঝের উপর থেকে গোটা চারেক চকমিলান পাথর সরিয়ে ফেলল, তারপর প্রাণপণে একটা সুড়ঙ্গ খোদাইয়ের কাজে লেগে পড়ল। সময় বেশি নেই, রাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে হবে।

(২)

মহাসমারোহে বন্ধুবান্ধব, দাসদাসী সহযোগে মাতা কুন্তী ও ভ্রাতাদের সঙ্গে নিয়ে যুধিষ্ঠির এসে পৌঁছালেন বারণাবতে। যুধিষ্ঠির দুর্যোধনকে অনেক করে অনুরোধ করেছিলেন সঙ্গে আসার জন্য। কিন্তু দুর্যোধন নানা অছিলায় তা বাতিল করলেন। বারণাবতের প্রাকৃতিক দৃশ্য অতি মনোরম। তার উপর দিনটি ঈষৎ মেঘলা হওয়াতে এতটা পথ রথে আসতে কোন কষ্টই হয়নি ওঁদের। গ্রামের মানুষদের যুধিষ্ঠিরদের খুব পছন্দ হল। রথ থেকে নেমে মাতা কুন্তী সমবেত সবাইকে নিজের হাতে মিষ্টান্ন বিতরণ করলেন। তাঁর স্নিগ্ধ ব্যবহারে সবাই মুগ্ধ। রাজমাতা কী সুন্দর, কেমন মর্যাদাপূর্ণ তাঁর ব্যবহার, গ্রামবাসীদের কাছে তিনি কোন রাজোচিত অহংকার দেখাননি, কী সরল অনাড়ম্বর ব্যবহারে এই দরিদ্র গ্রামবাসীদের আপনজন হয়ে গেলেন, এইসব আলোচনাই গ্রামের লোকজনদের মধ্যে চলতে লাগল। বলতে গেলে, মাতাসহ পাণ্ডবরা বারণাবত এলেন, দেখলেন, জয় করলেন।

সারাদিন লোকজনদের সঙ্গে দেখা, পরিচয় ও নানা কথার মধ্য দিয়ে কাটল। সূর্য অস্তাচলে যাবার সময় হল। কুন্তী সারাদিন অনেক দান-ধ্যান করেছেন, যেই এসেছে, তাদেরকেই পেট ভরে খাইয়েছেন, এখন তিনি ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের আশায় ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর জন্য দুর্যোধন নিজের পছন্দে ঘরটি বিশেষভাবে সাজিয়েছেন, একথা তিনি আসার সময় শুনেছিলেন; এখন দেখে ভালই লাগল। দিনের বেলা যখনই তিনি কোন কাজে ঘরে এসেছেন, তাঁর মনে বিসদৃশ কোন ভাবনার উদয় হয়নি। কিন্তু এখন ঘরে ঘরে আলো জ্বালা হয়েছে, ঘরগুলিও ঈষৎ তপ্ত হয়েছে, তাঁর নাকে যেন কেমন গন্ধ লাগল। একে রাজকুলের বধূ, তায় বহুকাল ধরে নানা প্রতিকূল অবস্থায় চলতে চলতে কুন্তী স্বভাবতই  অল্প কথার মানুষ, তিনি এই গন্ধ নিয়ে কোন উচ্যবাচ্য করলেন না।

সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হলে, সবাই যখন যে যার বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেছে, একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল। রাজবাড়িতে পাঁচ সন্তানসহ এক নিষাদরমণী এসে কুন্তীর কাছে রাতের জন্য আশ্রয় চাইল। কুন্তী অবাক হয়ে শুনলেন, রমনীর নাম কুন্তী এবং তার পাঁচ পুত্রের নাম যথাক্রমে যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল এবং সহদেব। একি, ওদের এরকম নাম কেন? তিনি হঠাৎ কেঁপে উঠলেন, তাঁর মনে হল, একটা অমঙ্গলের ছায়া যেন তাঁকে ঘিরে ফেলছে। ওই গন্ধটা কিসের, এই বিশেষ পরিবারটাই বা আজই এখানে কেন, কোন কি যোগসূত্র আছে – প্রশ্নগুলি তাঁকে আচ্ছন্ন করছে কেন? তিনি একটু বিভ্রান্ত হয়ে কোনরকমে এই সদ্য আগতদের খাবার ব্যবস্থা করে ঘরে গিয়ে যুধিষ্ঠিরকে ডেকে পাঠালেন।

যুধিষ্ঠির কুন্তীর কাছে এলেন একটু রাতের দিকে, গম্ভীর চিন্তিত মুখে। যেকোন কূট বিষয়েই তিনি কুন্তীর সঙ্গে পরামর্শ করে থাকেন। মা তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা। আজ উৎসবের কোলাহলের ফাঁকে একটি  অচেনা লোক তাঁকে এসে যে খবরটি দিয়েছে, সেটা তাঁর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মাকে না জানালেই চলে না।

কুন্তী নিজের ঘরে নানারকম চিন্তায় মগ্ন ছিলেন; গন্ধটা তাঁকে বড্ডই ভাবাচ্ছিল। বসবাসের ঘরে তো এরকম গন্ধ থাকেনা, বিশেষ করে যে বাড়ি সদ্য পরিষ্কৃত ও নতুন করে সাজানো হয়েছে। ছেলের মুখ দেখে আরো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। যুধিষ্ঠির জানালেন, হস্তিনাপুর থেকে গুপ্তচর মারফৎ খুড়োমশাই মহামন্ত্রী বিদুর খুব গোপনীয় কিছু খবর পাঠিয়েছেন। তার কাছে মহামন্ত্রীর বিশেষ আংটি ছিল। তার গতিবিধি রহস্যাবৃত থাকা উচিত বলে সে এখানে থাকতে পারেনি।

এতক্ষণের দুশ্চিন্তাতে বিদুরের নামটি কুন্তীর কাছে আশার রূপালী রেখার মত মনে হল। হস্তিনাপুরে আসার পর একমাত্র এই বিদুরই আন্তরিকভাবে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, তাঁর বিশ্বাসভাজন আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। আংটিটি দেখে তাঁর মনে পড়ল, এতো তাঁরই জিনিষ। আজই ভোরে যাত্রার আগে বিদুর এটি তাঁর থেকে প্রার্থনা করে নিয়েছিলেন। নিঃশ্বাস ফেলে এবার বিদুর কী খবর পাঠিয়েছেন, তা জানতে চাইলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, এই বাড়িটা লাক্ষা, ঘৃত প্রভৃতি সর্বরকমের দাহ্য পদার্থ দিয়ে তৈরি। যে কোন মূহুর্তে এখানে অগ্নিসংযোগ করা হবে। শুনেই কুন্তীর কাছে সেই বিচিত্র গন্ধরহস্য পরিষ্কার হল। "কিন্তু এরকম ভাবে", কুন্তী রুদ্ধশ্বাসে কিছু বলতে যেতেই যুধিষ্ঠির বললেন, "মা, তুমি রাজকুলবধূ, রাজপুরীতে পদে পদে শঠতা, ছলনা, চক্রান্ত। তোমায় কি বিচলিত হলে মানায়? এই মূহুর্তে,  খুড়োমশাই জানিয়েছেন, আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে। তার ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন। মা, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রওনা হব। আমি ভাইদের এখানে আসতে বলেছি। তবে সাবধান, এখানকার পরিজনেরা আমাদের মুখে বা ব্যবহারে যেন কোন বৈলক্ষণ টের না পান। তুমি খুব গোপনে আমাদের সবকিছু গুছিয়ে নাও।"

রাত্রি বাড়তে, যুধিষ্ঠির লক্ষ্য করলেন, একমাত্র পুরোচন বাদে আর কেউই সেই গৃহে থাকলেন না। এই পুরোচনই হস্তিনাপুর থেকে তাঁদের সঙ্গে এসেছে তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নিয়ে। এর নামও বিদুরের সাবধানবানীতে রয়েছে। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। অকারণে অধিক লোকহানি তাঁকে স্বস্তি দেয় না।

সেরাত্রে সকলেই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। রাজপুত্ররা পথশ্রম আর সারাদিনের কোলাহলে ক্লান্ত রয়েছেন। তাঁরা শুয়ে পড়লে পুরোচনেরও আর কোন কাজ থাকে না। তার মূল কাজ তো শেষরাত্রে। একটি ঘরে সে এবং সপুত্র নিষাদরমনী গভীরভাবে নিদ্রামগ্ন হল।
 
রাজপুত্ররা কিন্তু ঘুমাননি। তাঁরা একটি বিশেষ ঘরে শুয়েছিলেন, সেটি কুন্তীর ঘর। সেই ঘরের খাটের তলাতেই তৈরি হয়েছিল গোপন সুড়ঙ্গ। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেলে তাঁরা মেঝের পাথর সরিয়ে একে একে সুড়ঙ্গের ভিতর প্রবেশ করলেন। সবচেয়ে শেষে নামলেন ভীম। মা এবং ভাইরা নিরাপদে সুড়ঙ্গপথে অগ্রসর হলে তিনি বাড়িটাতে অগ্নিসংযোগ করে সুড়ঙ্গে নেমে গেলেন।

পুরোচন স্বপ্ন দেখছিল, চারদিক আগুনের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে আর সে কলস্বরে হাততালি দিচ্ছে। হস্তিনাপুর থেকে তার জন্য কত বস্ত্র আর অলঙ্কার এসেছে, সে যে কোনটা আগে পরবে স্থির করে উঠতে পারছে না। কিন্তু তার এত গরম লাগছে কেন? তার ঘুম ভেঙে গেল, দেখল, এক প্রকান্ড অগ্নিবলয়ের মধ্যে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একি! আগুন লাগাল কে? একাজটা তো তারই করার কথা! পান্ডবরা কোথায় গেলেন? নানা প্রশ্নের ভীড়ে সে দিশেহারা হয়ে গেল। কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। দাহ্য পদার্থে ভর্তি বাড়িটাতে ভয়ঙ্কর আগুনের পাক তাকে মূহুর্তেই গ্রাস করে নিল। প্রাণ বাঁচানোর জন্য তার পক্ষে সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা আর সম্ভব হল না। বাইরে তখন এই অগ্নিবলয়কে ঘিরে সমবেত গ্রামবাসীদের হাহাকার ও অর্থহীন চিৎকার চলছে।

ভীষ্ম ও বিদুর সেরাত্রে শয্যা স্পর্শমাত্র করেন নি। ভীষ্ম জানতেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আর বিদুর? তিনি তো পুরো পরিকল্পনাটার হোতা! বিন্দুমাত্র ভুল হলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। প্রচন্ড উৎকন্ঠায় যে যার ঘরে শুধু স্থানুবৎ বসেছিলেন।

ঊষাকালে গঙ্গাতীরে ভ্রমণ ভীষ্মের বহুকালের অভ্যাস; শরীর মন স্নিগ্ধ হয়। আজ চলতে চলতে বিদুর এসে যোগ দিলেন। কোন বাক্যালাপ না করে চলতে চলতে বিদুর যেন কিসের প্রতীক্ষা করছিলেন। কুয়াশার মধ্যে দূরে এক অশ্বারোহীর মূর্তি দেখা দিল। বিদুর দাঁড়িয়ে পড়লেন। কাছে এসে অশ্বারোহী তাঁকে জানাল, তাঁর পরিকল্পনা সফল হয়েছে। পাণ্ডুপুত্ররা এখন বারণাবত থেকে অনেক দূরে। তবে পুরোচনের সঙ্গে আরো ছয়টি দগ্ধ দেহ, তাদের একজন মহিলা এবং বাকি পাঁচজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ, পাওয়া গিয়েছে। তাদের পরিচয় অশ্বারোহীর অজ্ঞাত।

একটু বেলা হলে, হস্তিনাপুরের রাজসভায় এসে পৌঁছাল বারণাবতের গ্রামবাসীদের একটি দল। রাজা এবং মন্ত্রীসভার সামনে তারা হাহাকার করে কেঁদে দুঃসংবাদটি জানাল। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ বটে কিন্তু অভিনয়ে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। অন্তরে তিনি উল্লসিত হলেও রাজাসনে বসে দুচোখ ভাসিয়ে অশ্রুপাত করে সবাইকে বললেন, " হায়, হায়, এ কোন সকাল হল আজ! প্রিয় পাণ্ডু তাঁকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেছেন। এত বছর পর তাঁর প্রিয় পুত্রদের পেয়ে আমি সে শোক সংবরণ করেছিলাম। আজ তাও হারালাম।" তিনি সভামধ্যেই জ্ঞানহারা হলেন। তাঁর পারিষদরা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিয়ে গেল অন্তঃপুরে, রাজবৈদ্যকেও ডেকে পাঠানো হল। তিনি সেদিন আর সভায় ফিরে এলেন না। ভীষ্ম ও বিদুর সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর হলেন।

 বারণাবত থেকে পান্ডবদের পলায়ন

(৩)

সুড়ঙ্গপথ থেকে বেড়িয়ে অনেকটা দূর এসে পড়েছেন পাণ্ডবরা। মা তাড়াতাড়ি চলতে পারবেন না বলে, ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বলশালী ভীম তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। এখন সবাই একটা বিশাল বটগাছের তলায় এসে বসলেন। যুধিষ্ঠির বললেন, "মা, মূল রহস্যটা তো তুমি অনুধাবন করতে পেরেছ। দাহ্যপদার্থে তৈরি গৃহে আমরা রাত্রিযাপন করলে, পুরোচন শেষ রাত্রে অগ্নিসংযোগ করে আমাদের পুড়িয়ে মেরে ফেলত। আমরা খুড়োমশাইএর বুদ্ধিতে এযাত্রা বেঁচে গিয়েছি বটে, কিন্তু আমরা নিরাপদ হইনি। শীঘ্রই কোন না কোনভাবে তারা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জেনে যাবে। তাই এখন থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ভীম, অর্জুন, নিজেদের এমনভাবে সংযত রেখো, যেন তোমাদের শক্তি সম্পর্কে কারো কৌতূহল না জন্মায়। ভীম, আমাদের সকলেরই বড়ই তৃষ্ণা পেয়েছে। একটু জলের ব্যবস্থা করো।"

জলের খোঁজে ভীমকে অনেক দূর যেতে হয়েছিল। ফিরে এসে দেখল, পথশ্রমে ক্লান্ত মা আর ভাইএরা গাছতলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার চোখে জল এল। নিয়তির কী পরিহাস, মহান কুন্তীভোজ রাজার আদরের একমাত্র কন্যা, ভারতখ্যাত কৌরব বংশের বধূ কিনা আজ গাছের তলায় ধূলিশয্যায় ঘুমিয়ে আছেন! যাই হোক একটু পর সবাই উঠে জল খেয়ে সুস্থ হয়ে গন্তব্য স্থল নিয়ে খানিক পরামর্শ করলেন, তারপর নিকটবর্তী গ্রামের দিকে রওনা হলেন। এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে একদল ভাগ্যতাড়িতের নতুন যাত্রা শুরু হল।

উৎসঃ মহাভারত

ছবিঃ অনুভব সোম

লেখক পরিচিতি

শুক্তি দত্ত

শুক্তি দত্ত ভালবেসে প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। রূপকথা, প্রাচীন সাহিত্য, দেশবিদেশের লোকসাহিত্য, গল্পকথা পড়তে ভালবাসেন। সেগুলো নিয়ে আলোচনা বা শিশুদের সেই গল্প শোনাতেও ভালবাসেন। প্রধানতঃ শিশুমনস্তত্ত্ব ও তাদের শিক্ষাসংক্রান্ত কাজে দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন। সেটা শুধু পড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তিনি শিশু সাহিত্য, লোকসাহিত্য প্রভৃতিকে তাদের মূল্যবোধ বিকাশে কাজে লাগাতে চান।
নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা