ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
বাঘের দেশে

হাওড়া থেকে ট্রেনে চেপে পরের দিন কাটনি পৌঁছলাম প্রায় দুপুর ২.৪৫। ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত। বাইরে তখন লু বইছে। এই কাটনি থেকে আমাদের যেতে হবে উমারিয়া। উমারিয়া স্টেশন থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আমাদের গন্তব্যস্থল, 'বান্ধবগড় ন্যাশানাল পার্ক', বর্তমানে ভারতবর্ষের যে জঙ্গলে বাঘের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। এক ট্রাভেল এজেন্সি খুঁজে বার করে গাড়ির ব্যাবস্থা হল। এই ১২০ কিলোমিটার রাস্তা পৌছতে দু ঘণ্টা সময় লাগবে। আমরা যখন রওনা হলাম, ঘড়িতে তখন বিকেল ৪.৩০। কাটনি শহর ছেড়ে গ্রামের রাস্তায় ঢুকে পড়লাম আমরা। লাল মাটির ধুলো উড়িয়ে ছুটে চলল আমাদের বোলেরো। রাস্তার অবস্থা বেশ খারাপ, গাড়ির ঝাঁকুনিতে সারা গায়ে ব্যাথা হওয়ার জোগাড়। দুপাশে শাল আর ইউক্যালিপটাসের সারি। প্রায় পৌনে দুঘণ্টার পথ পেরিয়ে আসার পর হটাৎই চোখের সামনে দেখতে পেলাম এক বিশাল বড় সাইনবোর্ড যাতে লেখা 'ওয়েলকাম টু দা কান্ট্রি অফ টাইগার্স'। দুঘণ্টা গাড়ির ঝাঁকুনি আর রোদের হলকা সব যেন মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল।মন আনন্দে নেচে উঠল।

বাঘের দেশে
লাঙ্গুর

আমাদের ড্রাইভার বলল "আব তো জানওয়ার দিখনা চালু হো জায়েগা"। বলার সাথে সাথেই কথাটা যেন ম্যাজিকের মত ফলে গেল। বাঁদিকের জানলা দিয়ে হটাৎ দেখি রাস্তার একদম ধারে, প্রায় রাস্তার ওপরেই বসে আছে একদল লাঙ্গুর। দুচোখ ভরে ওদের দেখার আগেই কানে এল ড্রাইভারের গলা "উয়ো দেখিয়ে সামনে"। তাকিয়ে দেখি একটা মস্ত শিংওয়ালা হরিণ আমাদের গাড়ির সামনে দিয়ে হেলেদুলে রাস্তা পার হচ্ছে। একটু দূর যেতেই দেখি একটা ময়ূর। ময়ূর আগে দেখিনি তা নয়, কিন্তু এত কাছ থেকে এই অপূর্ব সুন্দর পাখিটাকে দেখে মনে মনে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা না করে পারলাম না।

বাঘের দেশে
জাঙ্গল প্রিনিয়া

আর মিনিট কুড়ির পথ পেরিয়ে আমরা পোঁছে গেলাম গেস্ট হাউসে। ন্যাশানাল পার্কটি যে জায়গায় অবস্থিত তার নাম তালা। গেস্ট হাউসে লাগেজ রেখেই তাড়াতাড়ি ডিনার অর্ডার দিয়ে দিলাম। পরেরদিন সকালে যথাসময়ে আমাদের গাড়ি এসে হাজির। সাদা রঙের জিপ্সি, ড্রাইভার বছর পঁচিশের সন্তোষ।গাড়িতে আমরা স্বামী স্ত্রী শুধু দুজন। আমার বুকের মধ্যে ততক্ষণে ধিব ধিব শুরু হয়ে গেছে। এই খোলা গাড়ির ভেতর থেকে তো বাঘ অনায়াসেই আমায় তুলে নিয়ে গিয়ে ব্রেকফাস্ট সারতে পারে। লজ্জা ত্যাগ করে সন্তোষকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম "আপকো ডর নেহি লাগতা ভাইসাব"?সে মাথা নেড়ে উত্তর দিল "আপ জানোয়ারোকো ডিস্টার্ব নেহি কারেঙ্গি তো উও আপকো কুছ নেহি কারেগা"। একটু আশ্বস্ত হলাম বটে, কিন্তু ভয়টা পুরোপুরি কাটল না। পার্কের রাস্তায় গাড়িটা ঢোকার একটু পরেই দেখতে পেলাম পার্কের মেন গেটের সামনে ততক্ষণে গাড়ির লাইন পরে গেছে। সাড়ে পাঁচটায় গেট খুলবে। এটি হচ্ছে পার্কের মেন গেট বা তালা গেট। আরও চারটি গেট আছে – গোহাডি গেট, পানপাথা গেট, কালোয়া গেট আর খেতৌলি গেট। আমরা মেন গেটের সামনে গাড়ির লাইনে এসে দাঁড়ালাম। বাঁদিকে একটা ছোট দোতলা বাড়ি, সেখান থেকেই নিতে হয় জঙ্গলে ঢোকার পারমিট। সাথে একজন ফরেস্ট গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। আমাদের ড্রাইভার চলে গেল পারমিট করাতে। বাঁদিকে একটা ছোট নেচার শপ আছে যেখানে বান্ধবগড়ের নানারকমের মেমরিবিলিয়া পাওয়া যায়। ডানদিকে বিশাল বড় এক হোর্ডিংয়ে পর্যটকদের সুবিধার জন্য নানান তথ্য দেওয়া আছে। চোখে পড়ল অনেক লোক একটা গাছের ওপর কিছুর ছবি তুলছে। ক্যামেরাটা নিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। কাছে গিয়ে দেখি গাছের ডালে একটা প্যাঁচার বাচ্চা চুপটি করে বসে আছে।

হটাৎ হইহই শব্দ শুনে দেখি গেট খুলে গেছে। যথাসময়ে আমাদের গাড়ি গেটের মুখে এসে দাঁড়াতেই ফরেস্ট গার্ড সিপাহিলাল মাহোবিয়া এগিয়ে এসে পারমিট দেখতে চাইল। মজার লোক এই সিপাহিলাল। সারাদিন শুধু রাম নাম করে চলে, ড্রাইভার আর পর্যটকদেরও ধরে ধরে রাম নাম করায়। চোখে পড়ল গেটের বাঁদিকে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, বুঝলাম ফরেস্টেরই কর্মী, তার নাকমুখ সর্বস্ব কাপড়ে ঢাকা। পরে জেনেছিলাম তার নাম বিশ্বম্ভর। বছর দুয়েক আগে জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে গিয়ে স্লথবিয়ারে তাকে আক্রমন করেছিল। এতই বীভৎস হয়ে গেছিল তার মুখ যে কাপড়ে ঢেকে রাখতে হয়। সন্তোষ জানালো জঙ্গলের ভেতরে পাঁচটি রুট আছে। সকালে প্রতিটা গাড়িকে একটা নিদিষ্ট রুট দেয়া হয়। আমরা পেলাম রুট 'এ'। বিকেলে কোনো রুটের বাধা নেই, যেকোনো রুটেই যাওয়া যেতে পারে।

বাঘের দেশে
স্পটেড ডিয়ার /চিতল

লাল মাটির ধুলো উড়িয়ে উঁচু নিচু জঙ্গলের রাস্তা ধরে চলতে লাগল আমাদের জিপসি। কত চিতল যে দেখলাম তার হিসেব নেই, আর ততই লাঙ্গুর। সন্তোষ বলল চিতল আর লাঙ্গুরের নাকি দারুন বন্ধুত্ব। সত্যিই তাই, যেখানেই দেখি হরিণ সেখানেই কাছাকাছি দেখি লাঙ্গুর। দুপাশে ঝোপঝাড় গাছপালার ভিতর দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। বান্ধবগড় মালভূমিকে ঘিরে এই জঙ্গল। বাঁদিকে ঝোপের মধ্যে দেখতে পেলাম এক বড়সড় রংবাহারি মোরগ, তার ইংরেজি নাম 'রেড জাঙ্গল ফাউল'। সারাক্ষণ মনে একটা উত্তেজনা কাজ করছে এই বুঝি বাঘের দেখা পেলাম। যেতে যেতে হটাৎ আমাদের গাইড বালা বলে উঠল "চিতল কল কর রাহা হায়"।কল করছে মানে বিপদের সংকেত।অর্থাৎ বাঘ বেরিয়েছে।শব্দ অনুসরণ করে আমাদের গাড়ি তীরবেগে সেদিকে ছুটল। সে জায়গাটার নাম 'সি রোড'। গিয়ে দেখি আরও কয়েকটি গাড়ি জড় হয়েছে সেখানে। বাঁদিকে আঙুল দেখিয়ে বালা আর সন্তোষ প্রায় একসাথে বলল "উও দেখিয়ে, আ রাহা হায়"। তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসছে এক বাঘিনী, পিছনে তিনটি বাচ্চা। এর আগে জীবনে যে ক'বার বাঘ দেখেছি তা চিড়িয়াখানায়, খাঁচার এপার থেকে। এই প্রথম খোলা জায়গায় বাঘ দেখলাম, তার রোমাঞ্চই আলাদা। মা বাঘ তার ছানাদের নিয়ে ক্রমশঃ অদৃশ্য হয়ে গেল ঝোপঝাড়ের ভিতরে।

দেখতে দেখতে আমরা একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম যার নাম 'সেন্টার পয়েন্ট'।দেখলাম সব গাড়ি জড়ো হয়েছে সেখানে। এই সেন্টার পয়েন্ট পৌঁছনোর পর যেকোনো গাড়ি যেকোনো রুটে যেতে পারে। এখান থেকেই টোকেন নিতে হয় 'টাইগার শো'র।চা-জলখাবার খাওয়ার ব্যাবস্থাও আছে এখানে। আমরাও এখানে জলযোগ সেরে বেরিয়ে পড়লাম। পথে মিরচাহনির বাঘিনী আর তার দুই ছানারও দেখা পাওয়া গেল।

বাঘের দেশে
বনের রা্জা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার

খবর এল এক জায়গায় 'টাইগার শো' হচ্ছে। টাইগার শোর মানে হচ্ছে একটি বাঘকে চারিদিক থেকে হাতি দিয়ে ঘিরে রাখা হয় আর পর্যটকরা অন্য হাতির পিঠে চড়ে তাকে দেখতে যায়।এ জঙ্গলে কোন বন্য হাতি নেই। ছটি কুনকি হাতি আছে বনদপ্তরের। এদের নাম বনরাজ, সুন্দরগজ, সুদর্শিনী, বনয়নী আর অষ্টম। এই পরিবারের সবচেয়ে খুদে সদস্য এক বছরের মুন্না। তাকে এখনও ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। শুনলাম সে নাকি ভীষণ দুষ্টু। প্রায় রোজই মাহুতদের মারধর করছে। শুঁড়ে করে সে সবাইকে কাছে ডাকে আর তারপর কাছে গেলেই তাকে লাথি মেরে দেয়।আমাদের জিপ্সির পাশে এসে দাঁড়াল হাতি। আমাদের মাহুত কুটাপ্পা, যাকে নিয়ে লেখা আমরা আগেই পড়েছিলাম ইন্টারনেটে। এই কুটাপ্পা 'ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক', 'এ্যানিম্যাল্‌ প্ল্যানেট', 'ডিস্কভারি' ইত্যাদির জন্য ছবি তোলেন। শুকনো পাতার ওপর দিয়ে মচমচ শব্দ করে হাতি চলতে লাগল বাঘকে অনুসরণ করে। এতক্ষণ বাঘটি বসে ছিল রাস্তার ওপরে, নালার পাশে। পর্যটকদের কোলাহলে বিরক্ত হয়ে উঠে চলতে শুরু করছে ওপরে, পাহাড়ের দিকে। আমরা অনেকক্ষন তার পিছন পিছন চলে তার গুহার সামনে এসে পোঁছলাম। হাতির দুলুনিতে ছবি তোলা মুশকিল হচ্ছিল বটে তবুও অনেক ছবি তুলেছি। সময় শেষ হয়ে এসেছিল, তাই বেরিয়ে আসতে হল জঙ্গল থেকে। গেটের বাইরে এসে দেখি একটা 'মনিটর লিজার্ড' বা গোসাপের বাচ্চা।

বাঘের দেশে
বার্কিং ডিয়ার

দুপুর ৩.৩০ নাগাদ আবার গাড়ি এসে গেল। আজ বিকেল থেকে আমাদের ড্রাইভার মাঝবয়েসি আর অভিজ্ঞ নারায়নভাই বর্মণ। কোন পেশাদার ফটোগ্রাফার এই জঙ্গলে ছবি তুলতে এলেই খোঁজ হয় নারায়ণভাইয়ের। পার্কে ঢুকতেই নারায়নভাই দেখাল "উও দেখিয়ে বার্কিং ডিয়ার"। এই হরিণের বৈশিষ্ট্য হল যে এর ডাক কুকুরের মত, তাই এর নাম 'বার্কিং ডিয়ার'। যেতে যেতে চোখে পড়ল সাম্বার, নীলগাই, শিয়াল আর বুনো শুয়োরের দল। বুনো শুয়োর হল বাঘের সবচেয়ে প্রিয় খাদ্য। নারায়নভাই আর গাইড চৌরঙ্গীলালের সাথে কথা বলে অনেক কিছু জানতে পারলাম। শুনলাম এ জঙ্গলে এখন যত বাঘ আছে সবই চার্জারের(বান্ধবগড়ের বিখ্যাত বাঘ) বংশধর। 'ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক', 'ডিসকভারি', 'এ্যানিম্যাল প্ল্যানেট' থেকে চার্জারকে নিয়ে অনেক তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়েছিল। এই চার্জারের যার সাথে সবচেয়ে বেশিবার মেটিং হয়েছিল সেই সীতাকে নিয়েও অনেক তথ্যচিত্র আছে। এখন আর চার্জার বা সীতা কেউই বেঁচে নেই। বয়েসকালে চার্জার অন্ধ হয়ে গেছিল। তখন তাকে একটা ঘেরা জায়গায় রাখা হয়েছিল আর নিয়মিত খেতে দেয়া হত। সীতা যে জায়গাটায় থাকত সেটি এখন 'সীতা মণ্ডপ' নামে পরিচিত। সেখানে একটা 'ওয়াটার হোল' আছে, যেখানে বাঘেরা জল খেতে যায়।

রোদের তেজ ততক্ষণে কমে এসেছে। এই বিকেলবেলাটাই বাঘ দেখার ভালো সময়। এই সময় ওরা জল খেতে বেরোয়। এই অনুমানে আমরা এক একটি বাঘের বাসস্থানের কাছে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বাঘেরা পরিবার নিয়ে থাকে না, একা থাকতেই ওরা ভালোবাসে।যতদিন ছোট থাকে বাচ্চারা মায়ের সাথে থাকে, স্বাবলম্বী হয়ে গেলেই তারা নিজেদের পথ বেছে নেয়।প্রত্যেকে নিজেদের একটা এলাকা খুঁজে নেয়।মানুষের মত এলাকা দখল নিয়ে এদের মধ্যেও মারপিটের শেষ নেই।

বাঘের দেশে
আবারও বাঘ

ঝুরঝুরায় গিয়ে দেখি বাঘিনী আর তার তিনটি ছানা তখনও আরাম করে গুহায় শুয়ে আছে। চক্রধারায় গিয়ে দেখতে পেলাম চক্রধারার বাঘিনীকে। হটাৎ ঘড়ি দেখে খেয়াল হল সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বেরতে পাঁচ মিনিট দেরি হলেও ফাইন আর গাড়ি আর ড্রাইভার সাত দিনের জন্য সাসপেন্ড। বেরিয়ে আসার সময় গেটের প্রায় কাছেই চৌরঙ্গীলাল ইশারা করল। ঝোপের মধ্যে এক ঝলক হলদে কালো ডোরাকাটা চোখে পড়ল। নারায়নভাই গাড়িটা আরেকটু এগোতেই পরিষ্কারদেখতে পেলাম এক বিশাল বড় বাঘিনী নালায় জল খেতে নেমে আসছে। এই হল 'সিধবাবা ফিমেল'। সে এখন অন্তঃসত্বা। আমাদের সাথে তার দূরত্ব খুব বেশি হলে সাত থেকে আট ফুট। ছবি তোলার জন্য যেই ক্যামেরা হাতে উঠে দাঁড়িয়েছি, অমনি বাঘিনী চলা থামিয়ে দাঁত বার করে সটান তাকাল আমাদের দিকে, একেবারে চোখে চোখ। নারায়ণভাই আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে তীরবেগে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে চলে এল। পরে জানালো যে পরিস্থিতি খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারত। আমরা ক্যামেরা হাতে হটাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ায় বাঘিনী ভয় পেয়ে গেছিল আর ভয় পেয়ে সে আক্রমণ করে দিতে পারত। আশেপাশে আর অন্য কোন গাড়িও ছিল না সেই সময়ে। পার্কের বাইরে এসে ট্যুরিজম রেঞ্জার বিমল দুবের সাথে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। অনেক কিছু জানতে পারলাম ওনার থেকে।

পরেরদিন সকালবেলায় আমরাই সবার আগে পার্কে ঢুকলাম। চারিদিক তখনও শান্ত, নিস্তব্ধ। সারারাত শিশির পরে মাটি ভেজা। সবার আগে পার্কে ঢোকার দৌলতে আগের গাড়ির উড়িয়ে যাওয়া ধুলোর প্রকোপ আজ নেই।চারিদিকে শুধু একটা অদ্ভুত সুন্দর মনমাতানো জঙ্গলের গন্ধ। সবে সকাল হয়েছে, তাই জন্তু জানোয়ারদের প্রায় রাস্তার ওপরেই পাওয়া যাচ্ছিল। যেতে যেতে হটাৎই আমাদের গাড়ির গতি কমে এল। আমাদের গাইড দেখাল মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ, একদম টাটকা। ছাপটা কোন পুরুষ বাঘের কারন ছাপটা গোল গোল, বাঘিনীদের পায়ের ছাপ একটু লম্বাটে ধরনের হয়।সেখান থেকে আরও খানিক দূর এগিয়ে এক জায়গায় দেখতে পেলাম স্লথ বিয়ারের পায়ের ছাপ। গাইড বলল ভাল্লুকটি জল খেয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে গেছে, আজ আর তাকে দেখা যাবে না।

বাঘের দেশে
নীল গাই

চলতে চলতে এক জায়গায় দেখতে পেলাম একটা জ্যাকেল। আর গাছের ডালে ডালে কত যে পাখি দেখলাম তার হিসেব নেই। ২৫০ রকমের পাখি আছে এই জঙ্গলে। এদিন সকালেও বাঘ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমাদের। রাজভৈরার বাঘিনীকে দেখলাম দূরে তার বাচ্চাদের নিয়ে জলের মধ্যে খেলা করতে। হটাৎ খবর পাওয়া গেল 'বি-২'কে স্পট করা গেছে। খবর পাওয়া মাত্রই আমরা ছুটলাম সেদিকে। হাতির পিঠে চড়ে ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে একটা জায়গায় এসে আমরা থমকে গেলাম। এক বিশাল পাথরের ওপর বসে আছে 'বি-২' - এই জঙ্গলের 'ডমিন্যান্ট মেল'। তিনদিক থেকে তিনটি হাতি তাকে ঘিরে রেখেছে। যে জায়গাটায় সে বসে আছে সেটির উচ্চতা প্রায় হাতির সমান এবং আমাদের সাথে তার দুরত্ব মাত্র পাঁচ-ছ ফুট। অর্থাৎ চাইলেই সে অনায়াসে লাফিয়ে আমাদের ঘাড়ে পড়তে পারে। কিন্তু তাকে দেখে মনে হল না সে আমাদের দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত। আমাদের কাউকে পাত্তা না দিয়ে সে আপনমনে বসে আলসেমি করছে। মাঝে মাঝে ঘাড়টা এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছে, সামনে তাকাচ্ছে, হাই তুলছে।দেখে মনে হল সে যেন আমাদের ছবি তোলার জন্যই পোজ দিচ্ছে। বেশ করে মনপ্রান ভরে যখন আমাদের ছবি তোলা হয়ে গেছে, 'বি-২'-র হটাৎ কি খেয়াল হল, এক লাফে নিচে নেমে দৌড়ে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেল। এত দ্রুত সবকিছু হয়ে গেল যে তার লাফিয়ে নামার ছবিটা তুলতে পারলাম না।

সেদিন বিকেলে শেষবারের মত জঙ্গলে গেলাম।পরেরদিন আমাদের ফেরার টিকিট। জঙ্গলে ঢুকতেই দেখতে পেলাম 'সিধবাবা ফিমেল' বসে একটা বুনো শুয়োর খাচ্ছে। অন্য পর্যটকদের কাছে শুনলাম আজ সকালেই সে এটা শিকার করেছে। তাঁরা দেখেছেন। আমাদের সে সৌভাগ্য হয়নি। যেতে যেতে আমাদের গাইড হটাৎ বলল চিতল কল করছে। তার মানে বাঘ বেড়িয়েছে।পরক্ষনেই দেখি কি যেন একটা আমাদের বাঁদিকে লম্বা ঘাসের ভিতর থেকে দৌড়ে ডানদিকের ঘন জঙ্গলে ঢুকে গেল। খেয়াল করলাম একটা জিপ্সি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম ফটোগ্রাফার ভদ্রলোক একটু আগে ঝোপের মধ্যে এক ঝলক একটি বাঘকে দেখেছেন। তাই শিকারের ছবি তোলার জন্য তিনি ওখানে অপেক্ষা করছেন। আমরাও দাঁড়ালাম, আর আমাদের দেখাদেখি আরও এত গাড়ি এসে হইচই শুরু করে দিল যে বাঘ আর কিছুতেই ঘাসের ভিতর থেকে বেরলোনা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে হতাশ হয়ে আমরা চলে গেলাম।

বাঘের দেশে
লেসার অ্যাডজুট্যান্ট স্টর্ক

প্রথমদিন থেকেই অনেকগুলো গুহা দেখছিলাম জঙ্গলের ভিতর। আজ জানলাম এই গুহাগুলো সবকটাই মানুষের তৈরি। রেওয়ার মহারাজ তৈরি করিয়েছিলেন তার সৈন্য সামন্ত থাকবে বলে, আজ এই গুহাগুলোয় বাঘ-ভাল্লুকের বাস। এই গুহাগুলোয় পর্যটকদের ঢোকা নিষেধ, বলাই বাহুল্য বিপদের আশঙ্কায়। একমাত্র একটি গুহাতেই ঢোকার অনুমতি আছে, তার নাম 'বারি গুফা'। সেটির মুখে একটা লোহার দরজা আছে, যেটা বন্ধ থাকে। দরজা খুলে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে অন্ধকারে বাদুড়ের বাস। গুহার ছাদে দেখলাম নিয়মিত দুরত্বে গোল গোল গর্ত করা। সূর্যের আলো আসার জন্যই এই ব্যাবস্থা। গুহা থেকে বেরিয়ে এসে মনটা খারাপ হয়ে গেল যখন শুনলাম অন্য একটি পর্যটকদের গাড়ির সামনে দিয়ে সেইমাত্রই একটি লেপার্ড দৌড়ে রাস্তা পার হয়েছে। লেপার্ড দেখা খুবই ভাগ্যের ব্যাপার কারণ ওদের সচরাচর দেখা যায় না।

আমরা একটাও লেপার্ড দেখতে পাইনি এই দুঃখ মনে নিয়েই জঙ্গলকে বিদায় জানাতে হল।পরেরদিন সকালে আমাদের গাড়ি এসে গেল। কাটনি থেকেই আবার ট্রেন ধরব আমরা। আসার সময় রাস্তার ওপর যে হরিণ আর লাঙ্গুরগুলোকে দেখে ভীষণ আনন্দ হয়েছিল, ফেরার সময় তাদের দেখেই চোখে জল আসছিল।এই তিনদিনেই এই জঙ্গল আর জঙ্গলের পশুপাখি যেন কত আপন হয়ে গেছে।তাই কোন একান্ত নিকট মানুষকে ছেড়ে যাওয়ার মতই বেদনা অনুভব করলাম।নিজেকে এই ভেবে স্বান্তনা দিলাম যে তিনমাস বর্ষার পর, ১লা অক্টোবর জঙ্গল খুললে আমরা আবার ফিরে আসব এই বান্ধবগড়ে।


ছবিঃ লেখক

লেখক পরিচিতি

পিয়ালী গাঙ্গুলি

পেশায় শিক্ষিকা। বসবাস কলকাতায়। বই পড়তে, লিখতে, ছবি আঁকতে এবং বেড়াতে ভালবাসেন।
নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা