ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা

"দেখেছো, এবারও মিঠাই অঙ্কে কত কম নম্বর পেয়েছে?" বাবার চীৎকার শুনে মিঠাই খাটের তলায়। এখানে ওর প্রিয় টেডি আছে। টেডির পাশে বসে নিশ্চিন্ত হল মিঠাই। বাবা এখন ওকে আর খুঁজে পাবে না। যাক্‌, মা ঠিক ম্যানেজ করে দেবে।  

আজ সবে হাফ-ইয়ার্লি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। মিঠাই অঙ্কে একটু কাঁচা। তাতে কী হয়েছে? আর এমন কিছু তো কম পায়নি সে -- ৬৮। ৬৮ আবার কম নম্বর হল নাকি! আর বাকী সাবজেক্টগুলোতে যে মিঠাই ৮০ এর ওপরে নম্বর পেয়েছে সেগুলোর কথা তো বাবা একবারও বলছে না।

"আমাদের পরিবারে অঙ্কে কেউ কোনোদিন ৯০ এর নীচে পায়নি। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে। আমি কী করে এখন অফিসে সবাইকে বলব? এই তো কাল দীপেনবাবুর ছেলের রেজাল্ট বেরিয়েছে। অঙ্কে ৯৮ পেয়েছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি সুবিমলবাবু, আপনার মেয়ের রেজাল্ট বেরলো? অঙ্কে কত পেল? আপনি তো মশাই অঙ্কে ব্রিলিয়ান্ট ছিলেন, আপনার মেয়েও নিশ্চয়ই তাই।"

"ও এই ব্যাপার। বাবা যে কেন সবার কথায় এত কান দেয় কে জানে। দীপেনকাকুর ছেলে তো আমার চেয়ে তিন ক্লাস উঁচুতে পড়ে। বড় হলে আমিও ঐ রকম নম্বর পাব।"—নিজের মনে বলতে থাকল মিঠাই। আর দীপেনকাকুর ছেলে সামাইদাদা তো কেমন যেন রাগী রাগী। বই ছাড়া কিছু বোঝে না। মিঠাইয়ের এত বই পড়তে ভালো লাগে না। তার বাপু অনেক কাজ আছে। টেডিকে চান করানো, খাওয়ানো, পাশের বাড়ীর বিড়াল মিয়াঁও এর বাচ্চাগুলোকে একবার দেখে আসা, মিনতিদিদিকে একটু অ-আ-ক-খ শেখানো আরো কত কী। তারপর বারান্দায় যে পাখিগুলো আসে তাদের সাথে গল্প করা তো আছেই। তবে মিঠাই এর প্রিয় কাজ হল আকাশ দেখা। এত বড় আকাশ আর এত ছোট্ট মিঠাই-খুব অদ্ভুত লাগে মিঠাইয়ের। আকাশটা নিশ্চয়ই অনেক কিছু জানে। সামাইদাদার চেয়েও বেশী। মিঠাই তো মনে মনে ঠিক করেই রেখেছে বড় হলে ঐ আকাশটার মতই হবে সে।

আজ সকাল থেকে বাবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বড়রা কেন যে ছোটদের বোঝে না। আজ রবিবার। বাবা ঠিক করেই রেখেছে যে মিঠাইকে আজ অঙ্ক শেখাবে। এদিকে মিঠাই পড়েছে ফাঁপড়ে। গুবলুদের বাড়ীতে নতুন অ্যাকোয়ারিয়াম কেনা হয়েছে। আজ মিঠাই আর ওর সব বন্ধুরা সকালে ওখানে যাবে। মা-কে মিঠাই বলেও রেখেছে সে কথা। কিন্তু বাবাকে সে কথা বোঝায় কার সাধ্য। অগত্যা মিঠাই কাঁদতে কাঁদতে পড়ার টেবিলে। সামনে অঙ্ক খাতা খোলা। বাবা চেয়ারে বসে খাতায় প্রশ্ন লিখছে। মিঠাইয়ের মন তো এখন ঐ গুবলুদের বাড়ীতেই। ইস্‌, সবাই বুঝি এসে গেল এতক্ষণে।

'দেখেছো কাণ্ড!' মিঠাই পড়ে ক্লাস টু-তে। আর এদিকে বাবা কত কঠিন অঙ্ক দিয়েছে। বাবা যেন ভুলেই গেছে সে কথা। অনেক মাথা চুলকেও ৫টার মধ্যে ২টোর বেশী অঙ্ক করতে পারল না মিঠাই। বাবা তো রেগেই আগুন। "এই তোমার পড়াশোনার নমুনা। কিচ্ছু শেখনি। আজ থেকে রোজ ১ ঘন্টা আমার কাছে অঙ্ক শিখবে।" বেগতিক দেখে মা ভাগ্যিস লুচির থালাটা নিয়ে এল। একটু রেহাই পেল মিঠাই। মা ঠিক মিঠাইকে বোঝে। কী সুন্দর করে পড়ায় মিঠাইকে। আর একটুও বকে না। মা বলেছে মিঠাইকে- "পড়াশোনায় শুধু ভালো হলেই হয় না, ভালো মানুষ হওয়াটা সবচেয়ে বেশী দরকার। আর সবসময় একটা শেখার মন রাখবে। তাহলেই আজ যেটা তুমি বুঝতে পারছ না, কাল ঠিক সেটা বুঝে যাবে।"

ল্যান্ডফোনটা বাজছে। মিঠাই তক্কে তক্কে। তারপর যেই না বাবা ফোন ধরতে পাশের ঘরে গেছে, মিঠাই দে ছুট্‌। মা আড়চোখে একবার তাকাল আর বলল-"তাড়াতাড়ি ফিরিস কিন্তু।" গুবলুরা দোতলায় একটা ফ্ল্যাটে থাকে। মিঠাইদের ফ্ল্যাট চারতলায়। একই অ্যাপার্টমেন্ট। মিঠাই তাড়াতাড়ি গিয়ে কলিং বেল বাজাল। গুবলুর মা কাকিমা দরজা খুলে দিলেন। রিনি, সুমেধা, সপ্তর্ষি সবাই চলে এসেছে। গুবলুর অ্যাকোয়ারিয়ামে কত মাছ। গোল্ড ফিশ আছে অনেকগুলো। আরো কত নতুন নতুন মাছ। মিঠাই নামই জানে না। গুবলু সবাইকে মাছ চেনাচ্ছে। মিঠাই মন দিয়ে শিখছে। এরই মধ্যে কাকিমা ওদের সবার জন্য গাজরের হালুয়া দিয়ে গেলেন। দেখতে দেখতে এক ঘন্টা কেটে গেল। মিঠাই এবার বাড়ী ফিরল।

বাড়ী গিয়ে শুনল দীপেনকাকু ফোন করেছিল। দীপেনকাকুর ছেলে সামাইদাদার আজ জন্মদিন। বিকেলে বার্থডে পার্টি। মিঠাই খুব খুশী হল। ভাগ্য ভালো বাবার কাছে আর বকা খেতে হয়নি। বাবা এখন দীপেন কাকুর সাথে জন্মদিনের পার্টি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কী সব প্ল্যানও আছে।

সন্ধেবেলা তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে মিঠাইরা সামাইদাদার বাড়ী গেল। সামাইদাদাদের বাড়িটা আলো, বেলুন দিয়ে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সামাইদাদা নতুন ড্রেস পরে একমনে একটা বই পড়ছে ঘরে। তার এইসব হইচই ভালো লাগে না। নেহাত বাবা-মা জোর করেছে তাই এত আয়োজন। লোকজন এখনো বিশেষ কেউ আসেনি। মিঠাই সামাইদাদাকে বার্থডে উইশ করে বাইরের ঘরে এসে বসল। দীপেনকাকু একটা বড় কেক এনে রাখল টেবিলে। আস্তে আস্তে লোকজনে ভরে যাচ্ছে ঘর।

সন্ধে সাতটায় কেক কাটা হল। অনেক বাচ্চা এসেছে আজ। বাবার অফিসের অনেক বন্ধুর ছেলে, মেয়ে। কেউ কেউ মিঠাই এর বয়সী, কেউ বা আবার আরো ছোট। সামাইদাদার স্কুলের বন্ধুরাও এসেছে। মিঠাই এখন সবার সাথে গল্প করছে, খেলছে। হঠাৎ দীপেনকাকু কী একটা বলার জন্য উঠে দাঁড়াল। ব্যাপারটা হল- সামাইদাদার জন্মদিন উপলক্ষ্যে একটা খেলার আয়োজন করা হয়েছে। সব বাচ্চাদের একটা করে কাগজ আর পেন দেওয়া হবে। আর ১৫ মিনিটের মধ্যে লিখতে হবে যে, বড় হয়ে কে কী হতে চায়? তিনটে প্রাইজও আছে। ড্রয়িং খাতা আর রং-পেন্সিল বাক্স। ও এইজন্যই রং-পেন্সিলগুলো আলাদা করে ঐ কোণায় রাখা। মিঠাই এসেই লক্ষ্য করেছিল। ভেবেছিল- সামাইদাদা হয়ত জন্মদিনে পেয়েছে।

সব বাচ্চারা লাইন দিয়ে যে যেখানে পারছে বসে গেছে। সবার হাতে একটা করে কাগজ। সময় শুরু হল। সামাইদাদাও এই খেলা খেলছে। ১৫ মিনিটের মধ্যে সবাই যে যার লেখা জমা দিয়ে দিল। মোট ১৫টা লেখা। লেখাগুলো পড়বে রুমেলা আন্টি আর নীহার কাকু। ওরা দীপেনকাকুর আত্মীয়। তারা দু’জনেই একটা কলেজে বাংলা পড়ায়। দু'জনেই খুব হাসিখুশি। তারা আগেই বলে রেখেছে- যেহেতু সবার বয়স এক নয়, তাই তারা বানান ভুল খুব একটা দেখবে না। শুধু দেখবে কে কী ভাবছে।

সবচেয়ে ছোট রিঙ্কি। সে লিখেছে- 'আমি বড় হয়ে দিদিমণি হতে চাই। আর যারা হোমটাস্ক করবে না, তাদের বকে দেব।' সবাই খুব হাসল। তাপ্তী একটু বড়। সে লিখেছে- 'আমি বড় হয়ে মায়ের মত ডাক্তার হতে চাই আর গ্রামে গিয়ে গরীব মানুষের সেবা করতে চাই।' সবাই তাপ্তীকে বাহবা দিল। সামাইদাদা বলল- 'আমি বড় হয়ে সায়েন্টিস্ট হতে চাই আর গবেষণা করতে চাই। আমি বাবা-মা এর মুখ উজ্জল করতে চাই।' দীপেনকাকু আর স্নিগ্ধা কাকীমা খুব খুশী হল এই কথা শুনে। সবাই সামাইদাদার পিঠ চাপড়ে দিল আর হাততালি দিল।

এরই মধ্যে মিঠাই লক্ষ্য করেছে বাবা কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিশ্চয়ই ভাবছে মিঠাই কী না কীকি লিখেছে। মা এসে মিঠাই এর মাথায় দু’বার হাত বুলিয়ে দিয়ে গেল। আচ্ছা মিঠাই এর লেখাটা কোথায় গেল? একদম শেষে সে জমা দিয়েছে তাই মনে হয় সবশেষে পড়া হবে।

রুমেলা আন্টি বলল- 'এবার যে লেখাটা পড়ছি তা হল ছোট্ট মিঠাই এর লেখা। আমার কিছু বলার ভাষা নেই। আপনারা শুনুন।'

'আমি বড় হয়ে আকাশ হতে চাই। ঐ যে আকাশটা আমি দেখি, সেই আকাশটা। কত বড়। কিন্তু সবসময় চুপ করে থাকে। আকাশটা কত কিছু জানে। পুরো পৃথিবীকেই তো সে দেখতে পায়। সে জানে মানুষ কী পারে, কী পারে না। সে জানে কী করে সূর্য ওঠে আর চারদিক আলোয় ভরিয়ে দেয়। সে পাখির ডাক শোনে। সে জানে কখন মেঘ আসবে, বৃষ্টি হবে। আকাশ কত কিছু জানে অথচ কিছু বলে না। চুপ করে সে সবকিছুর সাক্ষী থাকে। তার মন কত উদার। সে শুধু নিজের কথা ভাবে না। সে সারা পৃথিবীর কথা ভাবে। আমি ঐ আকাশের মত হতে চাই। শান্ত, ধীর, স্থির। অনেক কিছু শিখব, জানব কিন্তু কোনো অহঙ্কার থাকবে না। আমি আকাশের মত একটা খোলা মন চাই। আমি আকাশ হয়ে এই পৃথিবীকে অনেক সুন্দর করে দিতে চাই।'

কেউ আর কোনো কথা বলছে না। চারদিকে একটা অদ্ভুত নীরবতা। হঠাৎ ঘরটা গম্‌গম্‌ করে উঠল একটা গানে-'আকাশ আমায় ভরল আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে’। সবাই তাকিয়ে দেখল- মিঠাইয়ের বাবা চোখ বন্ধ করে উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে চলেছেন।

আমরা বড় হয়ে কী হব বা কী হতে চাই, সবকিছু আমাদের মন জানে। একটা শিশুর মন কী হতে চায়, তার আভাস তার স্বতঃস্ফুর্ততার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়। কল্পনা বাস্তব থেকে অনেক দূরে থাকলেও একটা সুন্দর কল্পনাই কিন্তু একটা সুন্দর মন গড়ে দিতে পারে। আর মন সুন্দর হলে তবেই এই পৃথিবীর সঙ্গে বোঝাপড়াটাও সুন্দর হয়ে ওঠে। অর্থ, প্রতিপত্তির বাইরেও একটা স্থান থাকে, যেটা মানুষকে মানুষ হতে চেনায়। সেই স্থানটুকু ভুলে গেলে মানুষের জীবনের একটা বিরাট অংশ না-পাওয়া থাকে। পুঁথিগত শিক্ষার বাইরে অনেক বেশী শিক্ষা দেয় প্রকৃতি আর উপলব্ধি। ছোট্ট মিঠাই যে শিক্ষাকে আজ আত্মস্থ করেছে, গতানুগতিক কোনো ব্যবস্থা তাকে আর বেশী শিক্ষিত করতে পারবে না। খোলা মনকে ভিত্তি করে মিঠাই জয়ী হবে আর শিক্ষিত করতে পারবে আরো অনেক মনকে যারা এতদিন সীমার মধ্যে নিজেদের ভাবনাকে বেঁধে রেখেছিল।

ছবিঃ পিক্সাবে

এই লেখকের অন্যান্য পোস্ট(গুলি)

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা