ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
ডাকাত সন্ন্যাসী- অঞ্জন নাথ

সন্তুদের অনেক দিনের ইচ্ছে পড়ো বাড়িটার ওপাশে কী আছে সেটা জানার কিন্তু সাপের ভয়ে ওদিকে যাওয়া হয়ে ওঠে নি। তাই পুজোর ছুটি পড়তেই এক দুপুরে ওরা সাইকেল নিয়ে বাঁই বাঁই করে চলে এলো পবার কাছে। পবার পেছনে ও অন্য ধারে ঘন জঙ্গলের জন্য ওদিক দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় তবে একটু খোঁজা খুঁজি করতে পবার অনেকটা পেছন দিয়ে একটা সরু মেঠো পথ দেখতে পেলো। ছোট খাটো ঝোপ ঝাড়ে ভরা ওই এবড়ো খেবড়ো পথ দিয়ে বট, জঙ্গলী ডুমুর ইত্যাদি গাছের ফাঁক দিয়ে ওরা সাবধানে সাইকেল চালিয়ে এগিয়ে গেলো – খানা খন্দগুলোতে সাইকেল ঠেলে ঠেলে নিতে হচ্ছে, দু এক জায়গাতে তো সাইকেলকে প্রায় ঘাড়ে তুলতে হলো। মিনিট দশেক এ ভাবে চলার পর দেখলো সামনেই একটা মোটামুটি চওড়া ইট বসানো রাস্তা। সাইকেল থেকে নেমে এদিক ওদিক ভালো করে দেখে সন্তু বললো,

‘মনে হচ্ছে রাস্তাটা ডান দিকে বাস রাস্তা থেকে এসেছে আর বাঁদিকে ঝিলের ওপাশ দিয়ে গিয়েছে নবনারায়ণপুর গ্রামের দিকে। চল, বাঁ দিকে একটু এগিয়ে দেখা যাক ঠিক কিনা আর ওদিকে কী আছে।’

বাঁ দিকে বেশ খানিকটা এগিয়ে ওরা দেখে রাস্তার ধারে একটা বহু পুরাতন বিরাট বট গাছ - ডালগুলো থেকে মোটা মোটা ঝুরি নেমে মাটিতে চলে গেছে – মনে হচ্ছে গাছের মোটা মোটা ডালগুলোকে ওই ঝুরিগুলো লাঠির মত ধরে রেখেছে আর পুরো বট গাছটা অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। ঘন ডাল পালার জন্য গাছের নিচে সূর্যের আলো খুব একটা আসতে পারছে না তাই কেমন একটা আলো ছায়ার লুকোচুরি চলছে সেখানে। গাছটার গোড়াতে একটা গোল লম্বা মত পাথরে কে বা কারা সিঁদুর লাগিয়ে জবা ফুল দিয়ে বোধহয় পুজো করেছে আর জায়গাটা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করা। অন্তু বললো,

‘আরেঃ, এটা তো সেই বুড়ো বট রে – এর কথাই আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েটা বলছিলো। গাছের নিচের শিবলিঙ্গটা নাকি পৃথিবীর মাঝখান থেকে উঠে এসেছে – গ্রামের লোকের খুব বিশ্বাস – বলে এটা নাকি জাগ্রত শিব তাই অনেকেই এখানে আসে পুজো দিতে – তার মানে নবনারায়ণপুর গ্রাম এখান থেকে খুব বেশি দূর হবে না।’

ওরা ঘুরে গাছটার পেছন দিকে আসতেই রন্তু চেঁচিয়ে উঠলো,
‘দেখ্‌ দেখ্‌ ওই তো সেই পড়ো বাড়িটা, তবে ওদিকে যাওয়া যাবে না – বড্ড ঝোপ ঝাড় আর কাঁটা গাছের জঙ্গল।’

বট গাছের অনেক ডাল নিচু হয়ে মাটির কাছে নেমে এসেছে, ফলে গাছে উঠতে কোন অসুবিধাই নেই। তিনজনই গাছে উঠে দেখলো গাছের উঁচু ডালের দিকে অনেক পাখি বাসা বেঁধেছে – গাছটা যেন সেই টার্জানের গল্পের মত বিরাট আর উপর দিকে ঘন ডাল পালার মধ্যে খুব সহজেই ঘর তৈরি করে থাকা যাবে। ওই কাল কেউটের জন্য এদিকে এখন কোন সাপ বা অন্য কিছুর ভয় নেই – সব ওরা খেয়ে নিয়েছিলো তাই সন্তুরা নিশ্চিন্ত মনে চার দিকটা ঘুরে দেখলো। ইতিমধ্যে সূর্য ঢলে আসছে দেখে আর দেরি না করে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিতে হলো – অন্ধকার হয়ে গেলে ওই খানা খন্দের মেঠো পথ ধরে যেতে খুব ঝামেলা হবে আর বেশি দেরি করলে বাড়িতেও সবাই চিন্তা করবে। আর এক দিন না হয় তাড়াতাড়ি এসে গ্রামের দিকে যাওয়া যাবে।

পরদিন সন্তুরা ঠিক করলো নবনারায়ণপুর গ্রামে তো যে কোন সময়ই যাওয়া যাবে বরং একবার ওই পড়ো বাড়ি আর পেছনের ওই ঘরটা দেখে এলে হয় – এখন তো ওই বিরাট যমদূতের মত কাল কেউটে দুটোর আর ভয়ও নেই আর ওদের দৌলতে অন্য সাপ খোপের ভয়ও নেই তবে ওই গিরগিটি দুটোর কী হাল কে জানে। দুপুরবেলা ওরা মাঠের দিকের ভাঙ্গা গেট দিয়ে পবাতে ঢুকে ওই সুঁড়ি পথ দিয়ে এগিয়ে গেলো পেছনের ঘরের দিকে। ঘরের দরজা হাট করে খোলা – ওরা ভেতরে ঢুকে দেখে অনেক শুকনো পাতা আর আবর্জনার মধ্যে একটা মস্ত বড় সাপের খোলস পড়ে আছে আর এক কোনাতে কিছু ভাঙা ডিমের খোলা। সন্তু নাকটা কুঁচকে নিয়ে বললো,
‘সাপ দুটো বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ভালোই সংসার করছিলো মনে হয় – আর কিছুদিন পর ওই বাচ্চা গুলো বড় হলে কি অবস্থা হতো বল তো? এত গুলো কাল কেউটে এক জায়গাতে - ভাবতেই ভয় করছে। ঘরটায় কেমন একটা বিচ্ছিরি গন্ধ করছে রে - চল বাইরে যাই।’

অন্তু বাড়ির ভেতর দিকে যাবার দরজাটা দেখে বললো,
‘এটা তো ওপাশ থেকে বন্ধ। আচ্ছা, এই বাড়িতে কারা থাকতো রে? মাঠের মধ্যে কেনই বা বাড়িটা করেছিলো আর সব বন্ধ করে চলে গেলো কেন? চলে যাওয়ারও তো অনেক বছর হয়েছে নিশ্চয়ই। কেমন একটা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি - তোদের কি মনে হয়?’

পেছনের চাতালে বেরিয়ে এসে ওরা দরজাটা বন্ধ করে ওই বড় পাথরটা চাপা দিয়ে দিলো যাতে হাওয়াতে না খুলে যায়। তারপর রন্তু বললো,
‘অন্তু, তোর প্রশ্নের উত্তর মনে হয় নবনারায়ণপুরের পুরাতন লোকেরাই দিতে পারবে। আচ্ছা, গুরুজী বলেছিলো কাল কেউটেরা সাধারণতঃ গভীর জঙ্গল আর পাহাড়ে থাকে - তাহলে কি ওদের বছর ১৮ / ১৯ আগে কেউ এনে এখানে ছেড়ে দিয়েছিলো? আমার মনে হয় গুরুজী কিছু একটা জানে বা আন্দাজ করেছে - তাই আমাদের বারণ করেছিলো এখানে আসতে - বলেছিলো বাড়িটা ভালো না। তাহলে কি কাল কেউটের সাথে এই পবার কোন সম্পর্ক আছে?’

সন্তু একটু ভেবে বললো,
‘গুরুজীও কিন্তু অবাক হয়েছিলো এই কাল কেউটেদের দেখে। তোরা ঠিকই বলেছিস - পবার একটা গভীর রহস্য আছে। তবে এখন কারুর সাথে এ নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো – পরে আস্তে আস্তে খোঁজ খবর করা যাবে। শুধু আমাদের ধারণায় তো কিছু হবে না - সত্যি ঘটনা খুঁজে বের করতে হবে।’

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা