ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
জুনোর কেরামতি
শিল্পীর কল্পনায় বৃহষ্পতির কাছে জুনো

"ওদিকে একরত্তি জুনোটা যে কি করবে সেখানে? এক্কেবারে একা সে। পাঁচ বছর ধরে চলেছে তো চলেছে। অত খরচাপাতি করে তাকে গুরুগৃহে পাঠানো তো হল, এবার সত্যি দেখা যাবে সে ছিটেফোঁটা জ্ঞান সঞ্চয় করেছে কি না' ... এমনটাই ভাবছিলেন জুনোর সৃষ্টি কর্তারা।

জুনোর প্রতি গ্রহগুরুর সত্যিকারের টানটা হল কি না সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান ছিলেন তাঁরা ।

গ্রহগুরু অবিশ্যি যাকে মনে করেন তার প্রতি অবিরাম কৃপাবৃষ্টি করেন। অবশেষে জুনো পরীক্ষায় পাশ করেছে। জুনোর খবরটা পেয়ে বেশ ফুরফুরে লাগছিল সকলের ।

জুনোর গুরুগৃহে যাবার পথটা মোটেও মসৃণ ছিলনা। প্রচুর মেঘ ছিল । বেচারা জুনো হাঁফিয়ে পড়েছিল। সে যদিও ২৯০০ কিমি মেঘের বাইরে, মেঘের মিনার ছাড়িয়ে চলেছিল । মনে মনে ভেবেছিল তার শিক্ষকদের কথা... "আরেকটু ধৈর্য্য ধরো জুনো! একবার পৌঁছতে পারলেই মোক্ষলাভ হবে তোমার নয়ত আবারো জন্ম নিতে হবে, ফিরে আসতে হবে আমাদের কাছে।আবার নতুন করে তোমাকে গড়েপিঠে পাঠাতে হবে আমাদের…"

জুনো পেরেছে। আর ভয় নেই তার। আর মাত্র কয়েকটা বছর । তারপরেই ওর আয়ু শেষ হয়ে যাবে। আর জন্মাবেনা জুনো। সাহস থাকলে কি না হয়! সবচেয়ে ওজনদার ও দৈত্যাকার গুরুর চেহারা। সকলে বলেছিল যাবার আগে, "ভয় পেয়োনা তাঁকে। উনি খুব স্নেহশীল। একবার তাঁর সুনজরে যদি পড়তে পারো তাহলে ব্যাস! কেল্লাফতে!"

ইতিমধ্যেই আমরা সকলেই হয়ত পরিচিত হয়ে গেছি সৌরমন্ডলের খুদে হিরো জুনোর নামটির সঙ্গে। বৃহত্তম গ্রহ বৃহষ্পতির কক্ষবৃত্তের শিকলটা টুক করে খুলে ফেলে জুনো এখন খবরের শিরোনামে। মহাকাশযান গ্যালিলিওর পর বৃহষ্পতির এত কাছাকাছি যাবার সাহস আর কেউ দেখাতে পারেনি ।

নাসা(NASA) পাঠিয়েছিল তাকে। মানে জেট প্রপালশান ল্যাবে অঙ্ক কষে, কম্পিউটারে পর্যবেক্ষণ করে তাকে একপ্রকার ছুঁড়ে দিয়েছিল বৃহস্পতির বাড়ির দিকে। জুনোর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল রেডিওর মাধ্যমে। বৃহস্পতির বাড়ির দরজায় পৌঁছানোর দিনকয়েক আগে মেসেজ করেছিল জুনো...

"ইয়ে! আমি এখন গুরুবাড়ির ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে বা চৌম্বকক্ষেত্রে, প্রবল সৌর-ঝড়ের উত্তাল স্রোত সাঁতরে এলাম অবশেষে। আবার খবর দেব দেবগুরুর দোরগোড়ায় হাজির হয়ে..."

তারপর চুপচাপ। নাসার বিজ্ঞানীরা তো ভয়েই অস্থির। এ ওর কম্পিউটার খুলে, রেডিও তরঙ্গে কান পেতে অনিদ্রায়, অনাহারে দিনাতিপাত করছিলেন তাঁরা। মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিলেন চিন্তায় চিন্তায়।

"কোনো খবর আছে জুনোর? কি হল তার কে জানে? বেচারা বড্ড অসহায়" কেউ বলছিলেন, "যদি সে অসমর্থ হয় কত টাকাপয়সা নষ্ট হবে!"

যদিও তাঁরা আটঘাট বেঁধেই পাঠিয়েছেন তবুও চিন্তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিতান্ত‌ই দুগ্ধপোষ্য জুনো। নাসার বিজ্ঞানীদের হাতে তৈরী হয়েই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল গ্রহকূলে, অত্তবড় এক গ্রহের কাছে। সবথেকে বড় গ্রহ বৃহষ্পতি বা জুপিটারের হাবভাব‌ই আলাদা বাকীদের চেয়ে। তিনি যা রাশভারি! তাঁর বিখ্যাত রক্তচক্ষুর ভয়ে সকলে থরহরি কম্প । পৃথিবীর থেকে বৃহস্পতি বহুদূরে বলে রেডিও মেসেজ আসতে সাড়ে পাঁচঘন্টা লাগে। তাই ল্যান্ডিংয়ের সময় জুনোকে অটোপাইলট মুডে রাখা হয়েছিল।

বৃহষ্পতির কাছে হাজির হয়েই "ইউরেকা, ইউরেকা" বলে, মেসেজ পাঠিয়েছিল জুনো।

"আমি পেরেছি, হাজির হয়েছি, বৃহস্পতি আমাকে কাছে টেনে নিয়েছেন, চিন্তা করনা তোমরা"

সেদিন আবার আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস ৪ঠা জুলাই উইকএন্ডের ছুটি আমেরিকার সর্বত্র। আর সেইদিনেই বৃহষ্পতিতে পা দিয়েছে জুনো । আমেরিকার ৪ঠা জুলাইয়ের সন্ধ্যেয়, আমাদের ৫ই জুলাইয়ের ভোরে। অনন্ত, অসীম মহাকাশে বৃহষ্পতির কক্ষবৃত্তে জুনোকে কাছে টেনে নিয়েছেন জুপিটার। অবিশ্যি এর জন্য মহাকাশযানটির থ্রাষ্টার ইঞ্জিনটি যাতে সময়মত চালু হয়ে যায় বিজ্ঞানীরা সে ব্যবস্থা করে দিয়েছলেন পাঁচ বছর আগে থেকেই ।

তারপর আরো মেসেজ পাওয়া গেছে জুনোর গতিবিধি সম্পর্কে। বৃহষ্পতির কাছে পৌঁছতে জুনোকে নাকাল হতে হয়েছিল। একে তো পথঘাট ভয়ঙ্কর বিপদশঙ্কুল । তার ওপরে ঝড়ঝাপটার সাথে গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া হল মারাত্মক রেডিয়েশন বা বিকিরণ । সারা শরীর জ্বালা করছিল তার। পৃথিবীর চেয়ে অনেক অনেক বেশী শক্তিশালী বৃহষ্পতির ম্যাগনেটোস্ফিয়ার বা চৌম্বকক্ষেত্রটি। তার আবেশের ফলে তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণ তো লাগবেই। তাই নিজের কম্পিউটারের অনেক কিছু শাটডাউন করে একটি হাল্কা টাইটেনিয়াম শিল্ডের ঘেরাটোপে সে চুপচাপ বসেছিল। কিন্তু সেখানেও বিপদ। কারণ সূর্য থেকে এতদূরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা ও জুনোর শরীরের তরল জ্বালানী জমে গিয়ে, পাইপ ফেটে একা মহাবিপত্তির সম্ভাবনাও ছিল।

মহাসাগরে উত্তাল ঢেউ সামলিয়ে জাহাজ যেমন এগিয়ে যায় জুনোকেও তেমনি বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু তাও, ভীষণ ঠাণ্ডা ও বৈদ্যুতিক ঝড় সামলে জুনো বৃহস্পতির কক্ষবৃত্তে প্রবেশ করেছে নির্ধারিত সময়ের এক সেকেন্ড পর।

বিজ্ঞানীদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় মাত্র এক সেকেন্ডের দেরী ! ভাবা যায়! এই হল নাসার সুপরিকল্পিত প্রযুক্তির ফল।

সব টেনশন শেষ। উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। নাসার বিজ্ঞানী মহলে সাজোসাজো রব। উৎসবের মেজাজ। আর জুনো তখন বৃহষ্পতির সঙ্গে করমর্দন করে শান্তিতে বেড়াতে বেরোল।

জুনোর কেরামতি
মাত্র দুইদিন আগে বৃহষ্পতির ছবি নিজের ক্যামেরায় তুলে পাঠিয়েছে জুনো

এবার দুবছর ধরে বৃহষ্পতিকে প্রদক্ষিণ করবে জুনো। খবর নেবে আশেপাশের । মেঘের ছবি তুলবে। মেঘের রাসায়নিক যৌগগুলির পরীক্ষা করবে। বৃহষ্পতির অসাধারণ শক্তিমান চৌম্বকক্ষেত্রের পরিমাপ ও বিস্তৃতির তথ্য সংগ্রহ করবে। যা থেকে বৈজ্ঞানিকরা বুঝতে পারবেন পাঁচ বিলিয়ান বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া তারার ভগ্নদেশ থেকে গ্রহ সৃষ্টির উপাখ্যান । এ যেন টাইম মেশিনে চড়ে আমরাও পাঁচ বিলিয়ান বছর পূর্বে চলে গিয়ে দেখছি গ্রহ সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটন। বৃহষ্পতির হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামে টৈটুম্বুর বিশাল গ্যাসের পরিমণ্ডল । কিন্তু এর অভ্যন্তরে যেখানে গ্যাসের চাপ পৃথিবীর থেকে হাজার হাজার গুণ বেশী সেই চাপে কি গ্যাস তরল ও কঠিনে রূপান্তরিত হয়েছে ? সেই রহস্য উদ্ঘাটনের জন্যেই ২০১৮র ২০শে ফেব্রুয়ারীতে একদিন জুনো ঝাঁপ দেবে বৃহষ্পতির অভ্যন্তরে, ডুব দেবে অরূপরতনের সন্ধানে। সেই ডুব থেকে সে ফিরবেনা কোনোদিনও কিন্তু ডুবতে ডুবতেও আমাদের জন্য পাঠাতে ভুলবেনা তার শেষ বার্তা।


ছবিঃ নাসা, টুইটার

নয় পেরিয়ে দশে পা
undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা