ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ

হ্যাপি বার্থডে টু ইউ,
হ্যাপি বার্থডে টু ইউ...

-এই গানটা কে না জানে? জন্মদিন মানেই তো ভাল ভাল খাবার, উপহার, হই-চই-এর সাথে এই গান, তাই না? - সে তুমি জন্মদিনে লুচি-আলুভাজা-পায়েসই খাও, কি কেক-পিৎজা-বার্গারই খাও; তোমার জন্মদিন বাড়িতেই কয়েকজন বন্ধু নিয়ে পালন করা হোক, বা অন্য কোথাও অনেক বড় অনুষ্ঠান করে হোক। শুধু তোমার-আমার জন্মদিনে কেন, ইংরেজি ভাষার সাথে পরিচিত সমস্ত সংস্কৃতিতেই,রেডিও- সিনেমা- নাটকে, যখনই কোন জন্মদিনের দৃশ্য শোনানো বা দেখানো হয়েছে, এই গান সেখানে শোনা গেছে। এই গান বা গানের সুর শোনা গেছে মিউজিক্যাল গ্রিটিং কার্ডে, ঘড়িতে, হয়ত বা মোবাইল ফোনের রিং টোন হিসাবেও। এমনকি অনেক সময়ে কোন জিনিষের বিজ্ঞাপনেও হয়ত এই গানের কিছু অংশ শোনা গেছে। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে এবং গাওয়া হয়েছে এই গান। ইংরেজি ভাষায় সবথেকে জনপ্রিয় এবং পরিচিত গান হিসাবে এই গান এক নম্বর জায়গায় রয়েছে। এই গান তো অনেকেই জানে, কিন্তু এই গানের ইতিহাস জান কি? কিভাবে তৈরি হল এই গান? তার থেকেও বড় খবর যেটা, জান কি, এই গান নিয়ে এখন রীতিমত আইনি লড়াই চলছে? তা সেই আইনি লড়াইয়ের গল্পে পরে আসব, আগে বলি এই গান তৈরির ইতিহাস।

উনবিংশ শতকের শেষ থেকে বিংশ শতকের মাঝামাঝি ,আমেরিকার কেন্টাকিতে দুই বোন ছিলেন প্যাটি এবং মিল্ড্রেড হিল। প্যাটি হিল (জন্ম ১৮৬৮) ছিলেন একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা, আর তাঁর দিদি মিল্ড্রেড (জন্ম ১৮৫৯), ছোটদের পড়ানোর সাথে সাথে পিয়ানো বাজাতেন এবং সুর তৈরি করতেন। ছোটদের আনন্দ দিয়ে পড়াশোনা করানোর নানা রকমের পদ্ধতি তৈরি করেন প্যাটি। তাঁর তৈরি করা পদ্ধতিগুলি সারা দেশের সব স্কুলে ব্যবহার করা হত। বলা হয়,১৮৯৩, লুইসভিল এক্সপেরিমেন্টাল কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ানোর সময়ে মিল্ড্রেড এই ছোট্ট মিষ্টি সুরটি সৃষ্টি করেন। প্যাটি সেই সুরে কথা বসান, তৈরি হয় 'গুড মর্নিং টু ইউ' - যে গান গেয়ে সকালবেলার ক্লাসে শিক্ষক-শিক্ষিকারা ছোটদের স্বাগত জানাবেন। সেই গানের কথা ছিল এইরকমঃ

গুড মর্নিং টু ইউ
গুড মর্নিং টু ইউ
গুড মর্নিং ডিয়ার চিল্ড্রেন
গুড মর্ণিং টু অল।

১৮৯৩ খ্রীষ্টাব্দেই 'সং স্টোরিস ফর দ্য কিন্ডারগার্টেন' নামের এক বইতে এই গান প্রকাশ করা হয়।এই বই লিখেছিলেন প্যাটি এবং মিল্ড্রেড।

এর পরের ব্যাপারটা প্রায় পুরোটাই ধোঁয়াশায় ঢাকা। কিভাবে 'গুড মর্নিং টু ইউ' হয়ে গেল 'হ্যাপি বার্থডে টু ইউ', কেই বা এই নতুন কথাগুলি তৈরি করে সেই সুরে বসালেন, তার কোন সঠিক তথ্য কারোরই জানা নেই। ১৯২৪ সালে রবার্ট এইচ কোলম্যান নামের এক ভদ্রলোকের সম্পাদনায় একটি গানের বই প্রকাশ হয়। সেখানে প্রথম 'হ্যাপি বার্থডে টু ইউ' গানটি ছাপা দেখা যায়। এদিকে সেই সময়ে বিনোদনমূলক রেডিও সম্প্রচার শুরু হয়েছে। ছায়াছবি নির্বাক যুগ পেরোচ্ছে। সিনেমাতে শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফলে এই গানের জনপ্রিয়তা হুহু করে বাড়তে থাকে, এবং বিভিন্ন সিনেমায় এই গানটি ব্যবহার হতে থাকে। দুঃখের বিষয় হল, কোথাওই প্যাটি এবং মিল্ড্রেড হিলকে এত সুন্দর একটা গান সৃষ্টি করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হল না। এর ফলে খুব রেগে গেলেন প্যাটি এবং মিল্ড্রেড-এর আরেক বোন জেসিকা। তিনি তাঁর দিদিদের গান 'গুড মর্ণিং টু ইউ' এর কপিরাইট এর দেখাশোনা করতেন। তিনি 'হ্যাপি বার্থডে টু ইউ' গানের কপিরাইট বা স্বত্বাধিকার, হিল বোনেদের নামে করার জন্য আইনি আবেদন জানালেন। কোর্টে তিনি প্রমাণ করে দিলেন, এই দুটো গানের সুর একইরকম। ১৯৩৪ সালে অবশেষে এই গানের কপিরাইট হিল বোনেদের নামে এল।

জেসিকা কাজ করতেন শিকাগোর 'ক্লেটন এফ সামি কোম্পানি' নামে এক সঙ্গীত প্রকাশক সংস্থার সাথে । ১৯৩৫ সালে, এই সংস্থা থেকে, কপিরাইট শুদ্ধ 'হ্যাপি বার্থডে টু ইউ' বাজারে ছাড়া হল। এর কিছুদিন পরে , ১৯৩০ এর দশকেই, সামি কোম্পানিকে কিনে নেন জন সেংস্ট্যাক। ১৯৭০ এর দশকে তিনি সংস্থাটিকে নিয়ে যান নিউ জার্সিতে আর তার নতুন নাম দেন বার্চ ট্রি লিমিটেড। এর পরে, ১৯৯৮ সালে, বিশ্বের বৃহত্তম সঙ্গীত প্রকাশক সংস্থা, ওয়ার্নার চ্যাপেল, বার্চ ট্রি কোম্পানি কিনে নেয় ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়ে। নতুন করে সংস্থার নাম হয় সামি-বারচার্ড, যা এওএল টাইম ওয়ার্নার নামের আমাদের সবার পরিচিত বিশাল গণমাধ্যম জোটের একটা অংশ। জানা যাচ্ছে যে কপিরাইট আছে বলে, এই গানটি বছরে প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার রয়্যাল্টি এনে দেয় সামি -বারচার্ড কোম্পানিকে। সেই টাকার বেশ কিছু অংশ যায় হিল ফাউন্ডেশন নামে সংস্থার কাছে।

আর এই রয়্যাল্টি দেয় কারা? -যদি কেউ গানটিকে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করতে চায়, টেলিভিশিন বা সিনেমাতে, অথবা কোন অনুষ্ঠানে, যেখান থেকে কোন আর্থিক লাভ হতে পারে, তাহলে তাদেরকে এই গানের জন্য সামি-বারচার্ডকে রয়্যাল্টি দিতে হবে। তুমি বা আমি যদি বাড়িতে , আমাদের ছোট্ট জন্মদিনের অনুষ্ঠানে, বন্ধুদের সাথে এই গান গাই, তাহলে অবশ্য দিতে হবে না।কিন্তু কপিরাইট আইন অনুসারে, তুমি যদি এই গান কোন রেস্তোঁরা বা খেলার মাঠেও গাও, যেখানে তোমার পরিবার-বন্ধু ছাড়া আরো অন্যান্য লোক থাকতে পারে, তাহলেও কিন্তু তুমি কপিরাইট অমান্য করছ ! অবশ্য এইসব ক্ষেত্রে কেউ এসে ধরে আদালতে নিয়ে যায়না, কিন্তু এরকম একটা একুশে আইন ঠিক আছে। ভাব একবার !

এত সব খবর কি আর আমরা, সাধারণ মানুষেরা জানতে পারতাম? জানার কথাও নয়, এক যদি না কোন ব্যবসায়িক কাজে এই গান ব্যবহার করার জন্য আমাদের আইনি পরামর্শ নিতে হত, তাই না? ২০১৩ সালে, নিউ ইয়র্কের 'গুড মর্নিং টু ইউ প্রোডাকশন কর্প' নামে এক প্রযোজনা সংস্থা 'হ্যাপি বার্থডে টু ইউ' গানটির ইতিহাস নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই গানের একটি দৃশ্যে আসল গানটি ব্যবহার করার দরকার হয়। 'গুড মর্নিং টু ইউ প্রোডাকশন কর্প'-এর প্রেসিডেন্ট জেনিফার নেলসনকে ওয়ার্নার চ্যাপেল এর তরফ থেকে জানানো হয়, গানটি স্বত্ব কিনতে হলে তাঁকে লাইসেন্স খরচা বাবদ ১৫০০ ডলার দিতে হবে !

এই ঘটনার প্রতিবাদে জেনিফার নেলসনের সংস্থা নিউ ইয়র্কের ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে একটি মামলা করেন। এই মামলায় বলা হয়েছে, ওয়ার্নার চ্যাপেল অন্যায় ভাবে এই গানের কপিরাইট রেখে মানুষের থেকে টাকা নিচ্ছে। তাদের এই সুবিধা বাতিল করে গানটিকে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য কপিরাইট মুক্ত করা হোক। এই গানের কথা কে লিখেছেন , কেউই জানে না। ওয়ার্নার চ্যাপেল সংস্থা যে লেখেনি, সেটা নিশ্চিত। তাহলে তারা এর কপিরাইট উপভোগ করে কি করে?

এই মামলার এখন অবধি কোন নিষ্পত্তি হয়নি। আর যতদিন না মামলার রায় বেরোয়, অথবা যদি মামলার রায় ওয়ার্নার চ্যাপেলের পক্ষে যায়, তাহলে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট রক্ষা আইন অনুযায়ী, অন্ততপক্ষে ২০৩০ সাল অবধি, যারাই এই গানটিকে ব্যবসায়িক কাজে বা অনেক লোকের মাঝখানে ব্যবহার করতে চাইবেন, তাদেরকেই ওয়ার্নার চ্যাপেলের কাছে মোটা টাকা দিয়ে অনুমতি নিতে হবে। কারণ ২০৩০ সাল অবধি এই গানের কপিরাইট যে তাদেরই আছে।

প্যাটি আর মিল্ড্রেড হিল কি কোনদিন ভেবেছিলেন, যে সুর একদিন তাঁরা কথায় সাজিয়ে গান তৈরি করেছিলেন ছোটদের আনন্দ দিয়ে পড়াশোনা শেখানোর জন্য, সেই গান নিয়ে এতদিন পরেও এত হইচই হবে? কিন্ডারগার্টেন স্কুলের ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়বে সারা বিশ্বে, প্রতি বছর গাওয়া হবে লক্ষ্য লক্ষ্য ঘরে, অগুন্তি ভাষায়? আবার তাই নিয়ে এত আইনি জটিলতা, মামলা মোকদ্দমাও হবে?

লেখক পরিচিতি

মহাশ্বেতা রায়

মহাশ্বেতা রায় চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ওয়েব ডিজাইন, ফরমায়েশি লেখালিখি এবং অনুবাদ করা পেশা । একদা রূপনারায়ণপুর, এই মূহুর্তে কলকাতার বাসিন্দা মহাশ্বেতা ইচ্ছামতী ওয়েব পত্রিকার সম্পাদনা এবং বিভিন্ন বিভাগে লেখালিখি ছাড়াও এই ওয়েবসাইটের দেখভাল এবং অলংকরণের কাজ করেন। মূলতঃ ইচ্ছামতীর পাতায় ছোটদের জন্য লিখলেও, মাঝেমধ্যে বড়দের জন্যেও লেখার চেষ্টা করেন।
নয় পেরিয়ে দশে পা

undefined

আরো পড়তে পার...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা