ছোটদের মনের মত ওয়েব পত্রিকা
যাঁর হাত ধরে হয় বর্ণ পরিচয়

'বর্ণপরিচয়' -সেই এক্কেবারে ছোটবেলায়, প্রথম যখন নিজের মাতৃভাষাকে জানার সময় এসেছিল, যখন বাংলা ভাষার অক্ষরগুলিকে চেনার সময় এসেছিল, তখন এই নামের বইটাই ছিল তোমার প্রথম বই। আর শুধু তোমার কেন, এই একই বই ছিল তোমার বাবা-মায়ের ও প্রথম বই; এমন কি দাদুন-দিদুনও এই বইটা দেখেই প্রথম অক্ষর চিনেছিলেন। গত ১৬০ বছর ধরে - হ্যাঁ, একদম ঠিক পড়েছ- দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বইটাই রয়ে গেছে বাংলা ভাষা শেখার প্রথম বই। ১৮৫৫ সালে এই বইটা, বা বলা ভাল, এই বইয়ের দুটি ভাগ- প্রথম ভাগ ও দ্বিতীয় ভাগ, লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনিই আমাদের এই পর্বের মনের মানুষ ।

যারা একটু বড় , তারা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম, বা তাঁর জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে একটু একটু বা বেশ খানিকটা জানে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শুধু মহাপন্ডিতই ছিলেন না, তিনি তাঁর অপরিমেয় দান এবং সাহায্যকার্যের জন্য 'দয়ারসাগর' , 'করুণাসাগর' নামেও পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁকে আমরা কোনদিনই 'শিশুসাহিত্যিক' বলে তো চিনিনি! আর যাই হোক, 'বর্ণপরিচয়' তো আর গল্পের বই নয়, যা পড়লে মনে আনন্দ হবে। সে তো হল পড়ার বই, যা দেখে বানান মুখস্থ করতে হয়, আর বানান ভুল হলে জুটতে পারে বকুনি কিম্বা কানমলা। তাহলে আমরা তাঁকে নিয়ে 'মনের মানুষ' বিভাগে আলোচনা করছি কেন?

কেন আলোচনা করতে বসেছি, বুঝতে হলে , আগে জানতে হবে তিনি যে যুগে এই বাংলায় জন্মেছিলেন এবং তাঁর বিশাল কর্মকান্ড চালিয়ে গেছিলেন (১৮২০ -১৮৯১), সেই যুগের কথা। সে ছিল এক বড় অদ্ভূত যুগ। একদিকে ইংরেজ শাসকদের প্রভাবে শহরের কিছু মানুষেরা হয়ে উঠছিল ইংরেজি ভাষা আর চলনে বলনে কেতা দুরস্ত, কিছু মানুষ আধুনিক ভাবনা চিন্তা করছিলেন, কিছু কিছু মানুষ দূর করার চেষ্টা করছিলেন সমাজের জমে থাকা অন্ধকার আর কুসংস্কারকে। রাজা রামমোহন রায় তার আগে আইন করে বন্ধ করেছেন 'সতীদাহ প্রথা'র মত বিশ্রি সামাজিক এক নিয়মকে। কিন্তু তার পরেও বাকি ছিল সমাজে বদল আনার আরো অনেক অনেক কাজ; দূরদূরান্তের গ্রামগঞ্জে ছিল শুধুই কুসংস্কার এবং অশিক্ষার কালোছায়া। আর এই অশিক্ষা আর কুসংস্কারের জালে পড়ে সবথেকে কষ্টে থাকত বাংলার মেয়েরা। ছোট ছোট মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত বয়সে অনেক বড় , বলা ভাল, বুড়োদের সাথে; কিছু মানুষ 'কুলীন ব্রাহ্মণ' হওয়ার সুযোগ নিয়ে একসাথে বহু বহু মেয়েকে বিয়ে করত। আর সেই বর মারা গেলে, এক সাথে সবক'টি মেয়ে হয়ে যেত বিধবা। সাত, আট, নয়, দশ বছরের মেয়েদের সাদা কাপড় পরে, শাস্ত্রে বলে দেওয়া কঠিণ নিয়ম কানুন মেনে, জীবনের সব রং-রস থেকে বঞ্চিত হয়ে জীবন কাটাতে হত। এমনও হত, সেই ছোট্ট মেয়ে, যে কিনা বিধবা হয়ে গেল, সে বিয়ের দিন ছাড়া আর একদিনও নিজের বরকে দেখেনি, চেনেইনা, শ্বশুরবাড়ি যায়ও নি, কিন্তু সে 'বিধবা'-র তক্‌মা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে বাধ্য হল। যুক্তিবাদী, কোমলহৃদয় ঈশ্বরচন্দ্র বাংলার ঘরে ঘরে মেয়েদের এই কষ্ট সহ্য করতে পারেন নি। তাই তথাকথিত পন্ডিতদের মেনে চলা শাস্ত্র গভীরভাবে পড়াশোনা করেন এবং সবার সামনে প্রমাণ দেন যে শাস্ত্রেও বিধবাদের আরেকবার বিয়ের অনুমতি দেওয়া আছে। ইংরেজ সরকারের সামনে এই প্রমাণ পেশ করে তিনি বিধবা-বিবাহ আইন চালু করতে বাধ্য করেন।

এই সব কাজকর্ম করতে গিয়েই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষ যদি শিক্ষিত না হয়, তাহলে এই সমাজের মানুষদের মানসিক উন্নতি কখনই হবেনা। আর মেয়েদের জীবন হতে থাকবে আরো অনেক বেশি কঠিণ। তাই সমাজের মানুষকে দিতে হবে শিক্ষা, যাতে তাদের মধ্যে শুভবুদ্ধি জন্মায়, ঠিক-ভুল, ভালো-খারাপের তফাৎ তারা করতে শেখে। অন্য কারোর বলে দেওয়া বুলি আউড়ে যেন তাদের জীবন না যায়। এই আলোচনায় আমরা তাঁর সমস্ত রকম সমাজ সংস্কারের কাজ বা মানুষের কল্যাণের কাজের কথা বিস্তারে আলোচনা করব না। আমরা বোঝার চেষ্টা করব, কিভাবে শিক্ষা ও সাহিত্যের সাহায্যে তিনি সমাজে বদল আনতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু শিক্ষা দেব বললেই তো আর হল না। সে সময়ে সারা বাংলা জুড়ে ছোটদের পড়াশোনা করার মত স্কুল প্রায় ছিলই না বললে চলে। আর মেয়েদের পড়াশোনা করার জন্য আলাদা স্কুল? তার কথা তো কেউ ভাবতেই পারত না। বেশিরভাগ গ্রামেগঞ্জে ছেলেরা টোলে বা চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত, ন্যায়শাস্ত্র এইসব পড়ত। কলকাতা শহরে এসে অনেকে ইংরেজি শেখার জন্য হেয়ার সাহেবের স্কুলে ভর্তি হত, কারণ ইংরেজি জানা থাকলে ইংরেজ সরকারের বিভিন্ন অফিসে সহজেই চাকরি পাওয়া যেত। ঈশ্বরচন্দ্রের ছোটবেলার সেই গল্পটা জান তো? - আট বছর বয়সে, তাঁর বাবার সাথে প্রথমবার বীরসিংহ থেকে কলকাতা হেঁটে আসার পথে, পথের ধারে কিছু কিছু দূরত্বে বসানো পাথরের মাইলফলকগুলি একবার মাত্র দেখেই সেই ছোট্ট ছেলে ইংরেজিতে সব সংখ্যা চিনে নিয়েছিল। তাই দেখে তাদের সাথে অন্যান্য যারা কলকাতায় আসছিলেন, তাঁরা সবাই ঈশ্বরচন্দ্রের বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে উপদেশ দেন ছেলেকে কলকাতায় ইংরেজি শেখার স্কুলে ভর্তি করতে। ঠাকুরদাসের পরিবার খুবই দুঃস্থ ছিল। বিভিন্ন পারিবারিক কারণে ঠাকুরদাসকে অনেক ছোটবেলা থেকেই কলকাতায় এসে অন্যের কাছারিতে কাজ করতে হত। কিন্তু তিনি মনে মনে চেয়েছিলেন নিজের গ্রামে চতুষ্পাঠী খুলে শিক্ষকতা করতে। তাই নিজে যেটা পারেন নি, সেটা যাতে তাঁর ছেলে করতে পারে, মনে মনে সেই আশা নিয়ে,তিনি অন্যদের কথা না শুনে ছেলেকে সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনা করার জন্য ভর্তি করে দিলেন।

সংস্কৃত কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র প্রায় বারো বছর পড়াশোনা করেন এবং কাব্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, স্মৃতি, জ্যোতিষ, ন্যায়শাস্ত্র -এইসব বিষয়ে খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করে অগাধ পান্ডিত্য লাভ করেন। এই সময়েই 'স্মৃতি' শ্রেণীতে তাঁর পান্ডিত্য দেখে তাঁকে 'বিদ্যাসাগর' উপাধি দেওয়া হয়। এর পরে ঈশ্বরচন্দ্র বিভিন্ন সময়ে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করেন, এবং এক সময়ে ইংরেজ সরকারের বিদ্যালয় পরিদর্শকও হন। বিদ্যালয় পরিদর্শক হয়ে সারা বাংলা ঘুরে বেড়াতেন তিনি। এই সময়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে , এক বছরের ও কম সময়ের মধ্যে, তিনি সারা বাংলা জুড়ে শুধুমাত্র মেয়েদের জন্যই পঁয়ত্রিশটি স্কুল স্থাপন করেন। এবং এই সমস্ত স্কুলগুলিকে চালানোর সব খরচ খর্চা তিনি নিজে যোগান দিতেন। এছাড়া বাংলার বিভিন্ন গ্রামে তিনি আরো কুড়িটি বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

স্কুল তো হল, কিন্তু বই কোথায় ? ঈশ্বরচন্দ্র নিজে সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনা করতে গিয়ে বুঝেছিলেন সংস্কৃত ভাষার সাহায্যে সব রকমের বিষয় ভাল করে পড়ানো বা বোঝানো যায় না, যেমন অঙ্ক। এছাড়া সংস্কৃত ভাষা শেখার বইগুলিও অত্যন্ত কঠিণ ছিল। তাই তিনি বর্ণপরিচয় প্রণয়ন করার অনেক আগেই সংস্কৃত ভাষার ব্যকরণকে সহজে বোঝানোর জন্য দুটো বই লিখে ফেলেছিলেন- 'উপক্রমণিকা' আর 'ব্যকরণ কৌমুদী' ।

কিন্তু সে সব তো কলেজের ছাত্ররা পড়বে। যারা নতুন গড়ে ওঠা স্কুলে পড়তে আসবে, তাদের জন্য বই কোথায়? তাই ১৮৫৫ সালে দেখা দিল 'বর্ণপরিচয়'। তারপর একে একে দেখা দিল 'বোধোদয়', 'কথামালা', 'চরিতাবলী', 'আখ্যানমঞ্জরী' । এই বইগুলিতে কি ছিল ভাবছ তো? বোধোদয় কে তুলনা করতে পার আজকের দিনের 'জেনারেল নলেজ' বইগুলির সাথে; 'কথামালা' ছিল ইউরোপে জনপ্রিয় 'ঈশপ'স্‌ ফেব্‌ল্‌স্‌' এর বঙ্গানুবাদ; আর 'চরিতাবলী' ছিল দেশ বিদেশের বিভিন্ন বিখ্যাত মানুষদের জীবনচরিত, যেগুলি পড়ে ছোট ছোট ছেলেরা আর মেয়েরা অনুপ্রাণিত হতে পারে। 'আখ্যানমঞ্জরী' তে ছিল দেশ বিদেশের ছোট ছোট গল্পের অনুবাদ। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি, ঈশ্বরচন্দ্র তো সংস্কৃত কলেজে পড়েছিলেন, সেখানে ইংরেজি শেখা হলেও, সেভাবে খুব ভাল করে শেখা হয়নি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাঁর জেদ ছিল খুব বেশি; কোন কিছু একবার করবেন ঠিক করলে আর কেউ সেই মত বদল করতে পারত না। ১৮৪১ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগে হেড পন্ডিত হয়ে যোগ দেন। তাঁর কাজ ছিল ইংরেজ সরকারি কর্মচারী বা সিভিল সার্ভেন্টদের বাংলা আর হিন্দি শেখানো। পড়াতে গিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বুঝতে পারলেন, সাহেব ছাত্রদের ভাল করে বাংলা আর হিন্দি শেখাতে হলে আগে তাঁর নিজের ইংরেজি আর হিন্দি ভাষায় ভাল দখল থাকা দরকার। তাই তিনি কি করলেন জান? এই দুই ভাষা শেখার জন্য নিজের জন্য আলাদা করে শিক্ষক নিযুক্ত করলেন। আর শিখেও নিলেন খুব ভাল করে। তাই পরে ইংরেজি এবং হিন্দি ভাষা থেকে নানাধরণের বই অনুবাদ করতে তাঁর কোনই অসুবিধা হয়নি। তাঁর নিজের একটা ছাপাখানাও ছিল, সেখান থেকেই নিজের বইগুলি ছাপাতেন, আর সেইসব বই খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

যাঁর হাত ধরে হয় বর্ণ পরিচয়

'বর্ণপরিচয়' সম্পর্কে একটু আলাদা করে বলা দরকার। বর্ণপরিচয় প্রণয়নের মাধ্যমে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আধুনিক বাংলা বর্ণমালাকে একটি নতুন রূপ দেন। বাংলা ভাষায় যে যে অক্ষরগুলির ব্যবহার কমে এসেছিল বা আর ব্যবহার হচ্ছিল না, সেগুলিকে বাদ দিয়ে তিনি বারোটি স্বরবর্ণ এবং চল্লিশটি ব্যঞ্জনবর্ণে ভাগ করেন। নিজের বইয়ের বিজ্ঞাপন তিনি নিজে লিখতেন। কেন পুরনো বর্ণমালার বদলে তিনি নতুন বর্ণমালা তৈরি করলেন, সেই ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন বর্ণপরিচয়-এর প্রথম ভাগের বিজ্ঞাপনে। কোন শব্দ কিভাবে উচ্চারণ করতে হবে সে বিষয়েও নির্দেশ থাকত তাঁর বিজ্ঞাপনে। আরো এক আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করা যায় তাঁর লেখা 'বোধোদয়'-এর বিজ্ঞাপনে। এই বইটিও বহুবার নতুন নতুন সংস্করনে প্রকাশিত হয়েছিল। এই বইয়ের কিছু তথ্যভিত্তিক ভুল যদি কোন পাঠক ধরিয়ে দিতেন এবং বিদ্যাসাগরমশাইকে সেটা লিখে জানাতেন, তিনি কি করতেন জান? বইয়ের পরবর্তী সংস্করনে শুধু সেই ভুলটা শুধরেই দিতেন না, কারা তাঁর কোন ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, সেটাও নতুন সংস্করনের বিজ্ঞাপনে লিখে দিতেন। এরকম সৎসাহস আর বুকের পাটা ক'জন মানুষের হয় বলতো?

স্কুল ও তৈরি হল, বই ও লেখা হল, কিন্তু সেইসব স্কুলে পড়াতে যাবে কারা? সেইসব স্কুলে পড়ানোর জন্য চাই অনেক শিক্ষক। আর এই শিক্ষক গড়ার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতায় ফিরে এসে , সংস্কৃত কলেজ চত্বরেই আলাদা করে আবার একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন।

শুধু ছোটদের স্কুলে পড়ার বই নয়, সেগুলি ছাড়াও, সবার পড়তে ভাল লাগবে এরকম আরো অনেক বই লিখেছিলেন তিনি। হিন্দি থেকে তিনি অনুবাদ করেছিলেন 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', ইংরেজি থেকে মার্শ্‌ম্যান সাহেবের লেখা 'বাংলার ইতিহাস' । শেক্‌স্‌পিয়রের 'কমেডি অফ এরর্‌স্‌' কে অনুবাদ করে নাম দিয়েছিলেন ' ভ্রান্তিবিলাস' এছাড়াও লিখেছিলেন 'শকুন্তলা', 'সীতার বনবাস'। আর এইভাবে একের পর এক বই লিখতে লিখতে তিনি যে কাজটা করে ফেলেছিলেন, সেটার জন্য আধুনিক বাংলা গদ্য তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। সেই সময়ের অনেক আগে থেকেই বাংলা কবিতা, পালাগানের একটা নিজস্বতা তো ছিলই। কিন্তু বাংলা গদ্যকে কত সুন্দরভাবে, সহজভাবে লেখা যায়, তার উদাহরণ হয়ে রইল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা বইগুলি। বাংলা কথ্য ভাষার নিজস্ব মাধুর্য, যা এতদিন বাংলা গদ্য লেখায় সঠিকভাবে ফুটে উঠছিল না, তাতে প্রয়োজনমত যতিচিহ্ন বা বিরামচিহ্ন ব্যবহার করে লিখে তিনি দেখিয়ে দিলেন, পাঠ্য গদ্যের ভাষাও কত সুন্দর হতে পারে। বাক্যের অর্থের ওপর নির্ভর করে ব্যবহার হতে থাকল সঠিক যতিচিহ্ন। বাংলা গদ্যের এই ক্ষমতার সবথেকে সেরা উদাহরণগুলি দেখতে পাওয়া যায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়। কিন্তু এঁদের সবার আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের এই লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য্যকে আবিষ্কার করেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে 'আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক' বলা হয়।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কখনই বিশুদ্ধ 'সাহিত্যিক' ছিলেন না। সমাজের নানারকমের সমস্যার প্রতিকার করতে তিনি এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, আলাদা করে সাহিত্যচর্চা করার কথা তাঁর মনে ঠাঁই পায় নি। তিনি সমাজের অশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে ভাষা ও সাহিত্যকে হাতিয়ার করেছিলেন। তাই তাঁর লেখা বইগুলির 'সাহিত্যমূল্য' আছে কিনা, অথবা এখন সেগুলি আর কেউ পড়ে কিনা, এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলার দুঃসাহস যেন কারোর না হয়।

তাঁর দেখিয়ে দেওয়া পথ ধরে বাংলা গদ্য এগিয়ে চলেছে গত প্রায় দেড়শো বছর ধরে। দুই একজন ব্যতিক্রমী লেখক ছাড়া, বাংলা গদ্যে ভাষার ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করার কথা খুব একটা কেউ ভাবেননি।

আর বাংলা অক্ষর চেনার প্রথম বই ? আজও একটাই নাম- 'বর্ণপরিচয়' ।


ছবিঃ উইকিপিডিয়া



বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ
ডঃ প্রশান্ত ব্যানার্জির পরিবার
সায়রী মুখোপাধ্যায়

undefined

আরও পড়তে পারো...

ফেসবুকে ইচ্ছামতীর বন্ধুরা