সূচীপত্র- শীত সংখ্যা ২০১৩

খেলাঘরখেলাঘর

সুকুমার রায়
সুকুমার রায়

গত ৩০শে অক্টোবর ২০১২ ছিল বরেণ্য শিশুসাহিত্যিক সুকুমার রায়ের ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী।  ইচ্ছামতীর বন্ধুদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে তাঁর লেখা আবোল-তাবোল পড়ে নি কিংবা "হ-য-ব-র-ল'-এর স্বপ্নের জগতে বেড়াতে যায়নি?  সেই কোন্ ছোট্টবেলায় পড়তে শেখার সময় থেকেই আর পাঁচটা রঙবেরঙের ছবি-ছড়ার বই-এর ভিড়েও অদ্ভুত সব ছবিওয়ালা আবোল-তাবোলের আকর্ষণই ছিল আলাদা। কিণ্ডারগার্টেন স্কুলের ক্লাসরুমে বা পাড়ার অ্যানুয়াল ফাংশানে স্টেজে দাঁড়িয়ে আধো- আধো গলায় বাবুরাম সাপুড়ে আবৃত্তি করে নি এমন "বেচারাথেরিয়াম' অন্তত: আমাদের ছোটবেলায় মনে হয় না কেউ ছিল। এখন আছে কি ?
১৮৮৭ সালে কলকাতার বিখ্যাত রায়চৌধুরি পরিবারে জন্ম হয় সুকুমারের। তাঁর পিতা উপেন্দ্রকিশোর ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের এক পথিকৃৎ। বহুমুখী প্রতিভাধর এই মনীষী শুধুমাত্র শিশুসাহিত্য রচনাই নয়, তা শিশুদের হাতে তুলে দিতে স্থাপন করেন ইউ রায় এণ্ড সন্স প্রেস, যা ভারতীয় মুদ্রণশিল্পের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক। সুকুমারও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে মুদ্রণশিল্পে আকৃষ্ট হন। ফোটোগ্রাফি চর্চাতেও ছিল তাঁর আকর্ষণ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ডবল অনার্স সহ বি এস সি পাস করে তিনি
মুদ্রণশিল্পে উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯১১ সালে ইংলণ্ড পাড়ি দেন। ১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর  মাসিক পত্রিকা সন্দেশ প্রকাশ করে বাংলা শিশুসাহিত্যের  এক নতুন দিগন্ত খুলে দেন। এর দু-বছর পর উপেন্দ্রকিশোরের অকালপ্রয়াণের পর সুকুমার সন্দেশের সম্পাদনার দায়িত্ব নেন। এরপর সন্দেশের পাতায় পাতায় ফুটে ওঠে সুকুমারের সাহিত্যপ্রতিভার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তিনি লেখেন ছোটদের জন্য নানা বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ, মজাদার ছড়া-কবিতা ও ছোটগল্প।

চীনেপটকা

সঙ্গে অসাধারণ ইলাসট্রেসন। লেখেন  অবাক জলপান, লক্ষ্মণের শক্তিশেল, ঝালাপালার মত দমফাটা হাসির নাটক। আবার "ইস্কুলের গল্প' সিরিজে নিয়ে আসেন পাগলা দাশুকে। অন্যদিকে হেঁশোরাম হুঁসিয়ার আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন এক অজানা "লস্ট ওয়ার্ল্ড'-এর সাথে। সুকুমারই আবার শিশু-কিশোরদের বাস্তবের জগৎ থেকে হাত ধরে সাদরে নিয়ে আসেন "হ-য-ব-র-ল'-র "ওয়াণ্ডারল্যাণ্ডে'! 

হযবরল

সেখানে কাকেশ্বর কুচকুচে আমাদের নতুন করে অঙ্ক কষতে শেখায়। ইচ্ছে হলেই সেখানে কেউ বয়সটা কমতির দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। গায়ে পড়ে গা-জ্বালানো গান শোনায় ন্যাড়া। হিজিবিজবিজ নিজের মনে হিজিবিজি ভাবে আর হেসে খুন হয়। উধো-বুধো ফাটাফাটি মারদাঙ্গা করে আবার গলা জড়াজড়ি করে গাছের কোটরে অদৃশ্য হয়। এ এক অলীক ফ্যান্টাসির জগৎ। তবু যেন কত চেনা। সেই জগতে প্রবেশের চাবিকাঠিটি আছে সুকুমারের কলমে।

আবোল তাবোল

এইসব অতুলনীয় সাহিত্যকীর্তি সত্ত্বেও যে মাস্টারপিসটি তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে তা অবশ্যই আবোল তাবোল ।  বাংলা ননসেন্স রাইমের জনক সুকুমারের  ছড়া-কবিতার এই সংকলনের জুড়ি বিশ্বসাহিত্যেও মেলা ভার। এই ক্লাসিকে আছে কচিকাঁচাদের প্রতি তাঁর এই "ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দেতে' মেতে ওঠার হাতছানি। পাশাপাশি কচিকাঁচাদের  মা-বাবারাও নতুন করে ফিরে দেখতে পারেন তাঁদের ফেলে আসা ছেলেবেলা। আবিস্কার করতে পারেন আবোল-তাবোল শুধুই ছেলেভুলানো হাসির ছড়া নয়, আরো বেশি কিছু। বাবুরাম সাপুড়ের কাছ থেকে গোটা-দুই নিরীহ নির্বিষ "জ্যান্ত' সাপ নিয়ে তাদের ডান্ডা পিটিয়ে ঠান্ডা করার ইচ্ছে যাদের হয়, তাদের মগজের ঘিলু "ভেস্তিয়ে' গেছে কি না সেটা "ফুটোস্কোপ' দিয়ে দেখে নিশ্চয়ই (মনো-)"বিজ্ঞান শিক্ষা'র প্রয়োজন আছে ! যে ভদ্রলোক তাঁর জীবনের সমস্ত প্রশ্নই নোটবুকে লিখে রাখেন, আর নিজে উত্তরের সন্ধান না করে মেজদাকে খোঁচাখুচি করে জবাবটা জেনে নিতে চান - তাঁকে কি খুব অচেনা লাগে?  আবার আরেক পড়ুয়া দুনিয়ার সব খবর কেতাবের পাতা উল্টেই জেনে নেবেন। কিন্তু পাগলা ষাঁড়ের তাড়া থেকে রক্ষা পাওয়ার দাওয়াই তাঁর অজানাই রয়ে যায়। সৎপাত্র গঙ্গারাম, রামগরুড়ের ছানা, ট্যাঁশগরু, হেড অফিসের বড়বাবু সকলেই আছেন আমাদের আশেপাশেই। আজকাল টিভির চ্যানেলে  চ্যানেলে নানান রিয়েলিটি কমেডি শো-তে পরিবেশিত জোকস,( যা " শুনলে পরে হাসির চেয়ে কান্না আসে বেশি') - সাথে মিনিটে মিনিটে রেকর্ড করা অকারণ হাসির দমক একইসঙ্গে মনে করিয়ে দেয় আহ্লাদী আর কাতুকুতু বুড়োর কথা - টিভি পর্দার এপার আর ওপার!
লড়াই ক্ষ্যাপা পাগলা জগাইকে মনে আছে তো ? সাত জার্মানকে একাই মেরে শহীদ হবার নেশায় মত্ত কোনো ভবঘুরে পাগল সৈনিক কি ঘুরে বেড়াত প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কলকাতার রাজপথে ? সেদিনের ইংরেজ প্রভুর রাজত্বেই  হোক বা আজকের দিনে - রাজনীতির ব্যবসাদারদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের দম একুশে আইনের প্যাঁচে আটকা পড়েছে ! হাতে মুগুর আর মাথায় ব্যারাম নিয়ে তারা আশ্বাস দেয়, "ভয় পেয়ো না ভয় পেয়ো না - তোমায় আমি মারব না' ! - শিবঠাকুরের আপন দেশ !
রূঢ় বাস্তবের নানা খণ্ডচিত্র, প্রতিদিন ঘটে চলা অজস্র অসঙ্গতিকে হাস্যরসে শোধন করে সুকুমার জন্ম দিয়েছেন তাঁর আবোল-তাবোলের অমর চরিত্রদের। তাই তারা ছোটদের হাসায় আর বড়দের বিস্মিত করে। ১৯২৩ সালে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেহত্যাগের আগে সুকুমার রায় তাঁর প্রিয় আবোল-তাবোল বই-আকারে দেখে যেতে পারেননি। অসামান্য প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এই চিরনবীন কবি নিজের অকালমৃত্যুকেও যেন ব্যঙ্গ করেছেন তাঁর শেষ কবিতায়।

আজকে দাদা যাবার আগে
বল্‌ব যা মোর চিত্তে লাগে-
নাই বা তাহার অর্থ হোক্‌
নাইবা বুঝুক বেবাক্‌ লোক ।
আপনাকে আজ আপন হতে
ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে ।
ছুট্‌লে কথা থামায় কে ?
আজকে ঠেকায় আমায় কে ?
আজকে আমার মনের মাঝে
ধাঁই ধপাধপ্‌ তব্‌লা বাজে-
রাম-খটাখট্‌ ঘ্যাচাং ঘ্যাঁচ্‌
কথায় কাটে কথার প্যাঁচ্‌ ।
আলোয় ঢাকা অন্ধকার,
ঘণ্টা বাজে গন্ধে তার ।
গোপন প্রাণে স্বপন দূত,
মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভূত !
হ্যাংলা হাতি চ্যাং-দোলা,
শূন্যে তাদের ঠ্যাং তোলা ।
মক্ষি রাণী পক্ষীরাজ-
দস্যি ছেলে লক্ষী আজ ।
আদিম কালের চাঁদিম হিম
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম ।
ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর,
গানের পালা সাঙ্গ মোর ।

ছবিঃ
উইকিপিডিয়া
sukumarray.freehostia.org