খেলাঘরখেলাঘর

কি খবর ইচ্ছামতীর ছোট্ট বন্ধু?

আজ তোমাকে একটা মজার উৎসবের খবর দিই । তুমি যখন কলকাতায় দুর্গাপুজো, দীপাবলীর আনন্দ করছ, তার কিছুদিন পরেই ৩১শে অক্টোবর আমেরিকায় খুদে-দের ভারি মজার উৎসব হ্যালোউইন পালন করা হয় । শুধু আমেরিকা নয়, আয়ারল্যাণ্ড, স্কটল্যাণ্ড-সহ বেশ কিছু দেশে এই উৎসবের চল আছে ।তার প্রস্তুতি চলে মাসকয়েক আগে থেকে ।

হ্যালোউইন এক কথায় ভূত উৎসব ! ছোটরা ৩১শে অক্টোবরের রাতে নানারকম বিচিত্র ভূতের পোশাক পরে ঘরে ঘরে চড়াও হয়ে বলে, "Trick or treat?" অর্থাৎ, যদি ভালোয় ভালোয় ভূতবাবাজীকে treat হিসেবে চকোলেট, ক্যাণ্ডি ইত্যাদি উপহার হিসেবে
না দেওয়া হয়, তবে তিনি রেগে গিয়ে নানারকম trick বা তুকতাক করে গৃহস্থের ক্ষতি করবেন । গোটা ব্যাপারটাই অবশ্য স্রেফ ছোটদের মজা ।

এই হ্যালোউইন বেশ প্রাচীন প্রথা । ষোড়শ শতাব্দীতে শেক্সপীয়ারের এক নাটকেও এর উল্লেখ আছে ।প্রথমদিকে নাকি ভিক্ষুকেরা এই দিনটিতে ঘরে ঘরে গিয়ে পরিবারের মৃত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করত , আর বিনিময়ে পেত খাবার বা কিছু উপহার ।

এই উৎসবকে এখন রীতিমত বাণিজ্যের মোড়কে ঢেকে ফেলা হয়েছে । আগষ্ট মাস থেকেই দোকানে দোকানে এসে যায় বিচিত্র সব হ্যালোউইন কস্টিউম, প্রায় আমাদের পুজোর বাজারের মত । ভূত পেত্নী, ডাইনীবুড়ি, কঙ্কাল ছাড়াও যোগ হয়েছে নানান কার্টুন চরিত্রের পোশাক ।সেই গুপী-বাঘার গানের মতই রোগা-ভূত, মোটা-ভূত, বেঁটে-ভূত, ঢ্যাঙা-ভূত সবারই রংবাহারী মুখোশের মেলা । cছোটদের উৎসাহ দেখার মত ।

হ্যালোউইনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে Pumpkin Carving বা বিরাট বিরাট কুমড়োকে কায়দা করে কেটে তার গায়ে ভূতের চোখ-মুখ আঁকা ।ভেতরটা থাকবে ফাঁকা । সেখানে মোমবাতি জ্বেলে ঘরের বাইরে রাত্রে বসাতে হবে ।দূর থেকেও দেখা যাবে অন্ধকারে জ্বলছে ভূতের চোখ ! সমস্ত সুপার মার্কেট আর আনাজপাতির দোকানে মাসখানেক আগে থেকেই থরে থরে সাজানো হয় বিশেষ ধরনের কুমড়ো ।

দোকানে সাজানো কুমড়ো
দোকানে সাজানো কুমড়ো

এগুলো ফলানোই হয় হ্যালোউইনের জন্য ।এই জাতের কুমড়ো লোকে খায় না । কী বিচিত্র তাদের আকার ! হাতের তালুতে বসানো যাবে এমন মিনিয়েচার থেকে বারোশ পাউণ্ডের দৈত্যাকার কুমড়ো - সবই মিলবে এ বাজারে !

দৈত্যাকার কুমড়ো
দৈত্যাকার কুমড়ো

ক্ষুদে কুমড়ো
ক্ষুদে কুমড়ো

আমেরিকা প্রবাসের প্রথম বছরে সস্ত্রীক অংশ নিয়েছিলাম এই রকম এক কুমড়ো-শিল্পের ওয়ার্কশপে ।সৌজন্যে - আমাদের ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত একটি চার্চ ।তারা বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ছাত্রছাত্রী ও তাদের পরিবারের  সদস্যদের জন্য সারা বছর ধরেই সামাজিক মেলামেশা ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানমূলক অনুষ্ঠান করে থাকে ।হ্যালোউইন উপলক্ষেও এমন এক কর্মসূচী নিয়েছিল তারা । গিয়ে দেখি প্রচুর ছোটরা আর তাদের মা-বাবাদের ভিড় ।

কুমড়ো খোদাই করছে ছোটরা
কুমড়ো খোদাই করছে ছোটরা

অধিকাংশই চীন আর কোরিয়ার বাসিন্দা । দস্তুরমত বিশেষ বিশেষ যন্ত্রপাতিও আছে Pumkin Carving-এর জন্য । প্রথমে বেশ হৃষ্টপুষ্ট একটা কুমড়ো বাছাইএর পর হাতে এল ক্ষুদে করাত । তা দিয়ে কুমড়োর  বোঁটার  কাছ থেকে বেশ খানিকটা গোল করে কেটে হাত ঢোকানোর জায়গা করা হল ।আরো কিছু অস্ত্রশস্ত্র ছিল - ভেতর থেকে শাঁস বের করা আর শেষ অবধি কুমড়োর গায়ে খোদাই করে ভূতের নাক-মুখ-চোখ আঁকার জন্য ।

ঘন্টাদুয়েক ধরে গলদঘর্ম হয়ে ভূতের চক্ষুদান-পর্ব মিটলো । নানা দেশের একগাদা আনাড়ী লোকজন মিলে এই ওয়ার্কশপের হুড়োহুড়িতে বেশ মজা হয়েছিল।অবশ্য ঐ কেজি-পাঁচেক বস্তুটিকে হাতে করে ঘর অবধি আনার অভিজ্ঞতাটা বিশেষ সুখকর হয় নি ।

খোদাই শেষ হওয়ার পরে
খোদাই শেষ হওয়ার পরে

কুমড়ো-ভূত ছাড়াও হ্যালোউইনের অন্যান্য আকর্ষণ হল scare crow বা আমাদের পরিচিত কাকতাড়ুয়া । খড় দিয়ে মানুষের সাইজের পুতুল বানিয়ে তাকে রীতিমত বাহারী জামা, ডেনিম, টুপি পরিয়ে সাজানো হয় । আর ঝাঁটায় চড়া ডাইনি বুড়িরও ভালোই জনপ্রিয়তা !

কাকতাড়ুয়া
কাকতাড়ুয়া

ডাইনি-বুড়ি
ডাইনি-বুড়ি

তোমার জন্য এই মজার উৎসবের প্রস্তুতিপর্বের কিছু ছবি পাঠালাম দুর্গাপুজোর সাথে সাথে ভিনদেশের আরেক মজাদার উৎসবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্যে ।

জ্যোতির্ময় দালালের জন্ম ও পড়াশোনা কলকাতায়। ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকার টেক্সাস প্রদেশে কলেজ ষ্টেশন শহরে 'টেক্সাস এ এন্ড এম' বিশ্ববিদ্যালয়ে ইণ্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ডক্টরেট-এর ছাত্র। এর আগে আই আই টি খড়্গপুর থেকে এম টেক এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি ই ডিগ্রী লাভ। আই টি ইণ্ডাস্ট্রিতে বছর চারেক কোডিং করে করে তিতিবিরক্ত হয়ে সেক্টর ফাইভকে দুচ্ছাই বলে পি এইচ ডি করতে পলায়ন। লেখালিখি ছাড়া শখ ভ্রমণ ও ফোটোগ্রাফি চর্চা ।