সূচীপত্র-শরত সংখ্যা ২০১১

খেলাঘরখেলাঘর

কুকুর কেন বিড়ালকে অপছন্দ করে

এক সকালে যখন তার ছেলে কাজের খোঁজে বেরচ্ছিল, তখন বুড়ি ওয়াং তাকে বলল, "আগামিকাল আমরা কি খাব, আমি ভেবেই পাচ্ছি না।"

"ওহ, ঈশ্বর সে ব্যবস্থা করবেন। আমি কিছু টাকা আনার চেষ্টা করি", হাসিমুখে বলল তার ছেলে, যদিও সে নিজেও মনে মনে জানত না কি ভাবে কি হবে।

শীতকাল খুব খারাপ কেটেছেঃ প্রচন্ড ঠান্ডা, পুরু বরফ, আর তীব্র হাওয়া। ওয়াং দের বাড়ির অবস্থা শোচনীয়। পুরু বরফের ভারে ছাদ ভেঙ্গে পড়েছে। তারপরে এক বিরাট ঝড়ে একটা দেওয়াল ভেঙ্গে পড়েছে, আর ওয়াং দের ছেলে, মিং-লি, সারারাত ঠান্ডা বাতাসে জেগে বসে থেকে, সর্দিজ্বর বাঁধিয়েছে। অনেকদিন অসুস্থ ছিল সে, তার ওষুধ কেনার জন্য খরচা হয়ে গেছে জমানো টাকা। যেটুকু টাকা পয়সা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে, আর মিং লি যে দোকানে কাজ করত, সেখানে অন্য লোক কাজ করছে। যখন সে শেষ অবধি বিছানা ছাড়ল, তখনো ভারি কাজ করার পক্ষে তার শরীর খুব দুর্বল, আর আশেপাশের গ্রামে তার করার মত কোন কাজ ছিল না। রাতের পর রাত সে বাড়ি ফিরে আসত, চেষ্টা করত ভেঙ্গে না পড়তে, কিন্তু তার মা'কে খাবার এবং পোষাকের জন্য কষ্ট পেতে দেখে এই ভাল ছেলের মন দুঃখে ভরে যেত।

"ঈশ্বর ওকে রক্ষা করুন!" ছেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তার মা বলল।" কোন মায়ের এত ভাল ছেলে হয় না। ওর কথা সত্যি হোক যে ঈশ্বর আমাদের যোগান দেবেন। গত কয়েক সপ্তাহে যা খারাপ অবস্থা গেছে তাতে মনে হচ্ছে আমার পেটটা যেন একটা ধনী লোকের মাথার মতই ফাঁকা। ইঁদুরগুলি পর্যন্ত আমাদের কুঁড়েঘর ছেড়ে চলে গেছে, পুষির জন্য কিচ্ছু নেই, আর বুড়ো ভুলুর তো না খেতে পেয়ে মরমর দশা।"

যখন বুড়ি তার পোষ্যদের দুঃখের কথা বলছিল, তার কথায় সায় দিয়ে ঘরের কোণ থেকে একটা করুণ মিউ মিউ আর হতাশ ঘৌ ঘৌ ডাক ভেসে এল, যেখানে পুষি আর ভুলু ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে একসঙ্গে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে ছিল।
ঠিক তখনি বাগানের দরজায় একটা জোরে আওয়াজ শোনা গেল। ওয়াং বুড়ি ডেকে উঠল, "ভেতরে এস!" সে অবাক হয়ে দেখল, দরজায় একজন বুড়ো টাক মাথা পুরুত দাঁড়িয়ে আছে। এই অতিথি কিছু চাইতে এসেছে সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে সে বলতে থাকল, "মাপ কর বাছা, কিন্তু আমার কাছে দেওয়ার মত কিছু নেই। আমরা গত দুই সপ্তাহ ধরে কোনমতে খেয়ে থাকছি - তলানি, টুকরো -টাকরা খেয়ে - আর এখন খালি বসে ভাবি আমার স্বামী বেঁচে থাকার সময়ে আমরা কত খেতাম। আমাদের বিড়ালটা এত মোটা ছিল যে চাল বেয়ে উঠতে পারত না। এখন ওকে দেখ একবার। ও কত রোগা হয়ে গেছে। না, আমাকে মাপ কর পুরুতমশাই, আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না, তুমি বুঝতেই পারছ কেন।"

"আমি ভিক্ষা চাইতে আসিনি, " তার দিকে দয়ালু চোখে তাকিয়ে সেই মানুষটি বললেন, "আমি দেখতে এলাম তোমাকে কি ভাবে সাহায্য করতে পারি। দেব-দেবীরা তোমার অনুগত ছেলের নিরন্তর প্রার্থনা শুনেছেন। তাঁরা তাকে সম্মান করেন, কারণ সে তোমার জন্য ত্যাগ স্বীকার করবে বলে, তোমার মরে যাওয়া অবধি অপেক্ষা করেনি। তাঁরা দেখেছেন, অসুখের পর থেকে সে কিভাবে তোমার সেবাযত্ন করেছে, আর এখন, যখন সে দুর্বল আর কাজ করতে অক্ষম, তাঁরা ঠিক করেছেন তার সুকৃতির জন্য তাকে পুরষ্কৃত করবেন। তুমিও একজন ভাল মা, আর তাই আমি যে উপহারটা এনেছি সেটা তুমি পাবে।"

"কি বলতে চাইছ তুমি?" ওয়াং বুড়ি তোতলাতে থাকল। সে নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারল না যে একজন পুরুত তাকে আশীর্বাদ করছেন।"তুমি কি আমাদের দুর্ভাগ্যে হাসতে এসেছ?"

"একদমই না। এই যে আমি আমার হাতে ধরে আছি একটা ছোট্ট সোনালি গুবরে পোকা, যেটার জাদু শক্তির সম্পর্কে তুমি ভাবতেই পারবে না। আমি এই দারুণ জিনিষটাকে তোমার কাছে রেখে যাব, এটা একটা ভাল উপহার, যেটা তোমাদের উপহার পাঠিয়েছেন সু-সম্পর্কের দেবতা।"

"হ্যাঁ, এটা ভাল দামে বিক্রি হবে," ছোট্ট গয়নাটাকে ভাল করে দেখে বুড়ি বিড়বিড় করে বলল, " আর আমাদের অনেকদিনের  যবের যোগান দেবে। ধন্যবাদ, পুরুতমশাই, আপনার দয়ার জন্য।"

"কিন্তু তুমি কোনভাবেই এই সোনালি গুবরে-পোকাটিকে বিক্রি করতে পারবে না, কারণ এটার শক্তি আছে সারা জীবনের মত তোমাদের পেট ভরে রাখার।"

পুরুতের অবাক করা কথা শুনে বুড়ির মুখ হাঁ হয়ে গেল।

"হ্যাঁ, তুমি আমাকে সন্দেহ কর না, বরং আমি যা বলছি, মন দিয়ে শোন । যখনি তোমার খাবার লাগবে, তুমি এই ছোট্ট গয়নাটাকে এক কেটলি ফুটন্ত জলে ফেলে দেবে, আর যা খেতে চাও , সেই খাবারের নাম আওড়াতে থাকবে। তিন মিনিটের মাথায় ডাকনা খুলে দিও, আর তোমার গরমাগরম খাবার তৈরি পাবে, যা অন্য যেকোন খাবারের থেকে অনেক বেশি সুস্বাদু।"

"আমি কি এখন চেষ্টা করতে পারি?" বুড়ি উতসুক ভাবে জিজ্ঞাসা করল।

"আমি চলে গেলেই পারবে।"

দরজা বন্ধ করে দিয়ে, বুড়ি তাড়াতাড়ি আগুন জ্বালালো, জল ফুটাল , আর তার মধ্যে সোনালি গুবরে-পোকাটাকে ছেড়ে দিয়ে আওড়াতে লাগলঃ

"ওলো পোলাও, ওলো পোলাও, আয়রে আমার কাছে,
না খেয়ে খেয়ে বাছা আমার রোগা হয়ে গেছে,
গরম গরম পোলাও, আয়রে তাড়াতাড়ি
শিগগির এসে ভর্তি কর আমার ফাঁকা হাঁড়ি"

সেই তিন মিনিট সময় কি আর কাটে ? পুরুত কি সত্যি কথা বলেছিল? কেটলির ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখে উত্তেজনায় তার তো মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার যোগাড়। ঢাকনাটা খুলে এল! সে আর অপেক্ষা করতে পারল না। ওহ, কি অবাক করা দৃশ্য! তার অবিশ্বাসী চোখের সামনে, পাত্রভর্তি সুগন্ধযুক্ত পোলাও - তেমন পোলাও সে জীবনে কোনদিন চেখে দেখেনি! সে হামলে পড়ে খেতেই থাকল, যতক্ষণ না তার লোভি পেট একদম ভরে গেল, আর তারপরে সে কুকুর আর বেড়ালটাকে এত খাওয়াল যে তাদের পেট ফেটে যাওয়ার যোগাড়।

" অবশেষে ভাগ্য ফিরল,"  বাইরে রোদে শুয়ে ফিসফিস করে পুষি বেড়ালকে বলল ভুলু কুকুর। "আমি বোধ হয় খাবারের খোঁজে না বেরিয়ে আর এক সপ্তাহও টিকে থাকতে পারতাম না। আমি জানিনা ঠিক কি হল, তবে দেব দেবীদের মতি বোঝা ভার।"

লেখক পরিচিতি

মহাশ্বেতা রায়

মহাশ্বেতা রায় চলচ্চিত্রবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ওয়েব ডিজাইন, ফরমায়েশি লেখালিখি এবং অনুবাদ করা পেশা । একদা রূপনারায়ণপুর, এই মূহুর্তে কলকাতার বাসিন্দা মহাশ্বেতা ইচ্ছামতী ওয়েব পত্রিকার সম্পাদনা এবং বিভিন্ন বিভাগে লেখালিখি ছাড়াও এই ওয়েবসাইটের দেখভাল এবং অলংকরণের কাজ করেন। মূলতঃ ইচ্ছামতীর পাতায় ছোটদের জন্য লিখলেও, মাঝেমধ্যে বড়দের জন্যেও লেখার চেষ্টা করেন।