সূচীপত্র-শরত সংখ্যা ২০১১

খেলাঘরখেলাঘর

সব পেয়েছির দেশে
তাই সকাল থেকেই মেঘনা আর পূর্ণদাদা বেরিয়ে পড়ত সেই দেশটার খোঁজে।ওদের বাড়ি থেকে একটু দুরে একটা নদী
আছে।সেই নদীর জল খুব স্বচ্ছ,একেবারে আয়নার কাঁচের মতো।সেখানে অনেক কাঁকড়াও আছে।পূর্ণদাদা কাঁকড়া ধরত।নদীর ধারে রংবেরংএর পাথর পড়ে থাকত।
লাল,নীল,সবুজ, ভারী অদ্ভুত দেখতে পাথরগুলো।পূর্ণদাদা বলত ওই পাথরগুলোয় হাত দিস না।দিনেরবেলা ওরা পাথর কিন্তু রাত্রিবেলায় ওরা পরী হয়ে যায়
মেঘনা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করত,এখানে পরী আসে?পূর্ণদাদা বলত, কেন আসবে না,তবে ওরা কি আমাদের সামনে আসবে?ওরা আসে রাতের অন্ধকারে
যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন।
-তুমি দেখেছ?
-হ্যাঁ
-কবে দেখলে?
-কাউকে বলিসনা যেন।একদিন অনেক রাত্রে চুপি চুপি এসে ছিলাম।হঠাৎ দেখি পাথরগুলো জ্বলছে।তারপর দেখি ছোট্ট ছোট্ট পরী জোনাকির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে।
জায়গাটাকে কি অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছিল তখন।তুই আসবি,তোকেও দেখাব।মেঘনা বলত, না বাবা,আমার ভয় করবেনা বুঝি!
এমনই একদিন পূর্ণদাদা এসে বলল ,ব্যাঙ্গমার  ডিম আনতে যাবি?মেঘনা তো রূপকথায় পড়েছিল ব্যাঙ্গমা পাখির কথা।সে পাখি সত্যি আছে নাকি?
কিন্তু পূর্ণদাদা যখন বলেছে সত্যি হতেও পারে।মেঘনা দের বাড়ির কাছে একটা ছোট্ট জঙ্গল আছে।
ঘন গাছপালায় ঘেরা ।বন্য জন্তু বিশেষ নেই।
সেই জঙ্গলের একটা উঁচু গাছের মাথায় পূর্ণদাদা আবিষ্কার করেছে ব্যাঙ্গমা পাখি, সত্যি সত্যি ভারী অদ্ভুত দেখতে পাখিটা।ঠোঁট গুলো লম্বা বাঁকানো,
রংটা বাদামী আর সাদাতে,সবুজ রঙের বড়বড় চোখ দুটো। খানিক বাদেই উড়ে গেল মা পাখিটা ।
পূর্ণদাদা খুব ভালো গাছে চড়তে পারে।তখনি গাছে উঠল।
খানিকবাদেই গাছ থেকে নেমে এল।হাতের মধ্যে একটা কি যেন খুব সাবধানে ধরে এনেছে ।
-তোমার হাতে কি?
-ব্যাঙ্গমার ছানা!
-ইস কি সুন্দর দেখতে!
-খুব সাবধানে রাখবি কিন্তু।কেউ যেন টের না পায়।
-আচ্ছা বাবা ঠিক আছে।
 কিছুদিন বাদেই ছানাটা বেশ বড় হয়ে উঠল।সাদা আর বাদামী রঙের পালকে তার কচি গা ঢেকে গেল।কথাটা আর চেপে রাখতে পারেনি মেঘনা,বলে ফেলেছে দাদু কে।অবশেষে
সেই অদ্ভুত পাখিটার কথা উঠে এলো খবরের কাগজে।এর ফল মোটেই ভালো হয়নি।ওরা একদিন জঙ্গলে এসে দেখে সেই গাছটার নীচে ছড়িয়ে আছে পাখিটার পালক আর রক্তের দাগ।পূর্ণদাদা ভীষণ কেঁদেছিল।দাদু সঙ্গে সঙ্গে খবর দিয়েছিলেন তাঁর এক বন্ধুকে। তিনি থাকেন উত্তরপ্রদেশে।পাখি নিয়ে গবেষনা করেন ।পরদিন সকালেই তিনি চলে এলেন মেঘনা দের বাড়িতে ।তিনি পালক গুলো পরীক্ষা করে বললেন যে,এ এক বিরল প্রজাতির পাখি এদের বাসস্থান গ্রানাডায়।।এদের মাংস খুব সুস্বাদু ।এই জন্যই এদের প্রাণ দিতে হয়।কিন্তু এই গ্রামে এই পাখির দেখা পাওয়া -এ তো খুব চমৎকার ব্যাপার !এই প্রজাতি কে আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে ।আমি আজই বনদপ্তরের লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।
পূর্ণদাদাও লেগে পড়ল কাজে।ওই রকম আরও অনেকগুলো পাখির সন্ধান পাওয়া গেল ওই জঙ্গলে।

একদিন ধরা পড়ল চোরাশিকারীর দল। পূর্ণদাদাই খবরটা দিয়েছিল
দাদু পিঠ চাপড়ে বললেন, সাবাস পূর্ণেন্দু ,তুমি দারুণ কাজ করেছ,এর জন্য তোমার পুরস্কার পাওয়াউচিৎ।দাদুর সেই বন্ধু পূর্ণদাদার গলায় পরিয়ে দিলেন একটি সোনার মেডেল, যেটি তিনি ওই বিচিত্র পাখির খোঁজের জন্য পেয়েছিলেন।
আজ সেই গ্রাম ছেড়ে এতদুরে এই ঘিঞ্জি শহরের দোতলা বাড়িটায় এসে মেঘনার মনে হয়,ওই গ্রামটাই ছিল যেন সব পেয়েছির দেশ আর পূর্ণদাদা সেই দেশের রাজপুত্র।সেইদেশের গাছপালা, পশুপাখি সবকিছু রক্ষার ভার তার হাতে।
এ সমস্ত ভাবতে ভাবতে আনমনে পড়ার বইটা খুলল মেঘনা।
অমনি জানলা দিয়ে মিষ্টি হাওয়ায় উড়ে এল একটা পালক।
পালকটা সাদা আর বাদামী রঙের।

 

দ্বৈতা গোস্বামী
ব্যাঙ্গালোর, কর্ণাটক      
 
ছবিঃ
কৌস্তুভ রায়
কলকাতা